পারফেক্ট ক্রাইম এর মানে যে ক্রাইম অপরাধ হিসাবে শনাক্ত হয়নি, প্রধান অভিযুক্তকে অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করা যায়নি। অনেকে আবার আনসলভড মিস্ট্রিকেও পারফেক্ট ক্রাইমের মধ্যে ফেলে, যদিও তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। পার্ফেক্ট ক্রাইম থ্রিলার হিসাবে যেসব ফিল্মের নাম করা যায় তার মধ্যে রয়েছে Dial M for MurderThe Rope, নীরজ পাণ্ডের A Wednesday, Special 26। তবে ইদানীংকালের সব থেকে আলোচিত পারফেক্ট ক্রাইম থ্রিলারের নাম হচ্ছে দৃশ্যম ১ আর । দৃশ্যম ১-এ যেমন হত্যা যে করেছে তার অপরাধের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি, সিকুয়েলেও সূত্র পাওয়া গেলেও অপরাধীকে কিছুতেই অপরাধের সাথে যুক্ত করা যায়নি। সাধারণত দেখা যায় কোনও ফিল্মের সিকুয়েল তৈরি হলে দ্বিতীয় পর্ব প্রথম পর্বের থেকে কম ভাল হয়। এর কারণ হয়ত প্রথম পর্বের প্লট যখন লেখা হয় তখন তার সিকুয়েল তৈরি হবে কিনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা মাথায় রাখা হয় না। কিন্তু দৃশ্যম ২-এর ক্ষেত্রে বলা যায় একটাও খুঁটিনাটি বাদ রাখা হয়নি।

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর থেকে সিনেমা বা সিরিজ দেখার ক্ষেত্রে দর্শকদের মধ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। দর্শকরা এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্মের তুলনামূলক গুণগত মান বিচার করতে পারে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্মকে পাশাপাশি রেখে। সেই জন্যই ওটিটির কনটেন্টে একটা প্রতিযোগিতার ছাপ থেকেই যায়। কার কন্টেন্ট কত ভালো সেই নিয়ে যেন একটা চাপা প্রতিযোগিতা সবসময় চলতেই থাকে। স্বীকার করতে বাধা নেই যে একটা সময়ে দক্ষিণী সিনেমা বলতে কেবল টিভির হিন্দি চ্যানেলগুলোতে যেরকম ডাব করা ফিল্ম দেখানো হত, যাতে মূলত অ্যাকশন নির্ভর ছবিগুলো থাকত, সেসব দেখে দেখে দক্ষিণী সিনেমা সম্পর্কে একটা অভক্তি চলে এসেছিল। দক্ষিণী সিনেমা মানেই মশালা সিনেমা, ভরপুর অ্যাকশন, ভরপুর বিনোদন। ব্যাস, আর কিছু নেই। যদিও দক্ষিণী সিনেমার ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ, সে আদুর গোপালকৃষ্ণন থেকে প্রিয়দর্শিনী বা মণি রত্নম, তালিকায় আরও অনেক নাম যোগ করা যায়। মুম্বইয়ের সিনেমার সাথে বাজেট আর অডিয়েন্স — দুটোতেই দক্ষিণী সিনেমা বেশ ভালো টক্কর দিত। তবে বাধা যেটা ছিল, মূলত সিনেফিল আর দক্ষিণ ভারতীয় দর্শক ছাড়া আমজনতার মধ্যে দক্ষিণী সিনেমার দর্শক সেরকম কেউ ছিল না। ভাষা একটা বড় ব্যবধান তো ছিলই, তা ছাড়াও কলকাতায় ওড়িয়া ভাষাভাষী আর বিহারী ছাড়া দক্ষিণ ভারতীয় লোকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে বাংলায় ওড়িয়া সিনেমা বা ভোজপুরি সিনেমার অল্প কিছু বাজার থাকলেও দক্ষিণী সিনেমা দেখার দর্শক একেবারেই ছিল না। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর এই খামতি পুরোটাই প্রায় দূর হয়ে গেছে বলা যায়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

লেখাটা শুরু করেছিলাম দৃশ্যম ১ আর  নিয়ে। কতটা পারফেক্ট হলে একটা ফিল্ম দেখে মন ভরে যায় সেটা দৃশ্যম দেখেই বোঝা গেছে। তুলনামূলকভাবে হিন্দি সিনেমার জগতে ইদানীংকালে এই মানের থ্রিলার শুধুমাত্র দৃশ্যমের হিন্দি অ্যাডাপ্টেশন আর অন্ধাধুন ছাড়া বড় পর্দায় খুব একটা দেখা যায়নি। তবে হ্যাঁ, ওটিটিতে পাতাললোক বা স্পাই থ্রিলার ফ্যামিলি ম্যানস্পেশাল অপস — এগুলোতে বেশ ভালো কাজ হয়েছে। এক কথায় বলা যায় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এখন বড় পর্দার থেকেও ভাল কাজ করছে। যাই হোক, সেসব অন্য প্রসঙ্গ। এখানে ওটিটি বনাম বড় পর্দার লড়াইয়ের কথা বলতে আসিনি, কনটেন্ট নিয়ে বলছি, সে ওটিটি হোক বা বড় পর্দা।

যেটা বলতে চাইছিলাম তা হলে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দক্ষিণী সিনেমা বা সিরিজ, শুধু থ্রিলার নয়, অন্য বিষয়ের কনটেন্ট যা রয়েছে হয়ত হিন্দি কনটেন্টও অত ভাল মানের নেই। দৃশ্যমের কথা তো আগেই লিখেছি, দৃশ্যম ২ ওটিটিতে রিলিজ করা ছাড়াও নায়াট্টু বা জোজি বা ইরুল — এসব ছবি সত্যিই অবাক করছে। শুধু মালয়ালম নয়, তামিল বা তেলুগু সিনেমাও এই দৌড়ে পিছিয়ে নেই। C/O Kancharapalem বা Karnan বা Pariyerum Perumal — এইসব ছবি অন্য সব টেকনিকাল দিক ছেড়ে দিলেও শুধুমাত্র গল্পের কারণেই দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখবে।

হিন্দিতে অতটা না হলেও বেশ কিছু ভাল ভাল কাজ আছে, কিন্তু যেখানে দক্ষিণের আঞ্চলিক কাজ এত ভালো হচ্ছে সেখানে আমাদের বাংলায় ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কনটেন্টের এত অভাব কেন! বা অভাব হয়ত নয়, গাদা গাদা কনটেন্ট রোজ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু একটা পঞ্চায়েত বা একটা দৃশ্যম বা একটা Great Indian Kitchen কেন তৈরি হচ্ছে না সে প্রশ্ন তোলাই যায়।

সমস্যাটা কিন্তু অর্থের নয়। আমি শ্যুটিং লোকেশন অনুযায়ী স্পেশাল অপস বা ফ্যামিলি ম্যান-এর মত স্পাই থ্রিলারের কথা তুলছিই না। ওগুলোর ক্ষেত্রে টাকা অনেক বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যেখানে টিভিএফের মত প্রোডাকশন খুবই অল্প খরচে অনবদ্য সব কনটেন্ট তৈরি করে যাচ্ছে, সেখানে বাংলার কনটেন্টের এত দৈন্য দশা কেন? যেখানে বরাবরই দেখে এসেছি বাংলায় মেধার কোনো খামতি নেই! ভারতীয়রা গোয়েন্দা গল্পের সাথে পরিচিত হয়েছে শরদিন্দুর ব্যোমকেশ বক্সি অথবা সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার হাত ধরে। যদিও বাংলার গোয়েন্দা গল্পে একমাত্র মনে হয় স্বপনকুমার ছাড়া বাকিরা থ্রিল ব্যাপারটা সেভাবে আনতে পারেননি। এখানে ব্যোমকেশকেও বাংলার জল হাওয়ায় পারিবারিক কোন্দলের মধ্যে পড়তে হয়। হ্যাঁ, ফেলুদার গল্পে সত্যজিৎ রায় কিছুটা থ্রিল এনেছিলেন। এখনও বাংলায় করতে ক্রাইম থ্রিলার গেলে সেই ব্যোমকেশ বা কিরীটিকেই নিয়ে আসতে হয়। সাহিত্যগুণে এত সমৃদ্ধ একটা জাতির আজকের দিনে একটা ভালো কনটেন্ট নেই! ভাল জিনিস দেখার জন্য আমাদের হয় দক্ষিণ ভারতীয়দের ওপর নির্ভর করতে হয়, আর নয়ত হিন্দি কনটেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু কেন? যে ভাষায় ভারতীয় গোয়েন্দা গল্পের জন্ম, যে ভাষার লোক একসময় হিন্দি সিনেমার জগতে দাপিয়ে বেরিয়েছে, এমনকি এখনও একটা ভাল অংশ দখল করে রেখেছে, সেই ভাষায় ভাল কোনও কনটেন্ট ইদানীং আর নেই। তা কি বিখ্যাত বাঙালি পরিচালকরা এখন অব্দি এই ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কোনওরকম উৎসাহ দেখাচ্ছেন না বলে? বাংলা কনটেন্টের নামে কিছু বোকা বোকা গল্প আর সফট পর্ন ধরণের কনটেন্ট বাঙালিকে খাইয়ে চলা হচ্ছে। হিন্দিতে গানকে কেন্দ্র করে খুবই জনপ্রিয় একটা সিরিজ বন্দিশ ব্যাণ্ডিট লোকজনের মন জিতে নিয়েছিল। বাংলাতে তানসেনের তানপুরা নামে একই ধরণের একটা কাজ হল যেটা মিউজিকাল থ্রিলার। সেখানে গানগুলো এত সুন্দর, লোকেশন নির্বাচন এত সুন্দর অথচ একটা জঘন্য গল্পের জন্য সিরিজটা আর দেখার উপযোগী রইল না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে অন্য সব কিছুর যোগান থাকলেও গল্প বা প্লটের অভাবটাই মূল অভাব হয়ে দেখা দিচ্ছে। অথচ একটা সময়ে ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায় কি সুন্দর পারিবারিক গল্প বলতেন। বাংলা সিনেমা মূলত চলত গল্পের জন্য। আজ সেই গল্প লেখার বড়ই অভাব দেখা দিয়েছে। এখনকার বাঙালি গল্প লেখকদের মধ্যে কারো গল্পই, সে থ্রিলারই হোক বা সামাজিক, সেই উচ্চতা অর্জন করতে পারেনি যা দিয়ে একটা ভালো কনটেন্টের ওয়েব সিরিজ হতে পারে বা একটা ভাল ফিল্ম হতে পারে। যতদিন না বাংলায় কোনও ভাল গল্প লেখক উঠে আসবে, মনে হয় বাংলায় সে ধরণের কাজ সম্ভব হবে না।

Leave a Reply