সুশীতল

বইমেলার ভিড়ে হাঁটতে ভয় হয়, এই বুঝি কেউ শ্বাসরোধ করে খুন করে দিল। তারপর সেই খুন নিয়েই তুরন্ত একটা রুদ্ধশ্বাস থ্রিলার লিখে ফেলল। প্রকাশক অপেক্ষা করেই আছে, থ্রিলারের বাজার মারকাটারি। পাঠক স্টলের বাইরে লাইন দিয়েই আছে। হাতে গরম খুনে রাঙা থ্রিলার “সেলিং লাইক হট কচুরিস”। উত্তেজক মলাট আর লেখকের সই — লেখক বিজ্ঞাপন দিয়ে দিয়েছে কবে থেকে নিমাইয়ের মত, “অমুক তারিখে তমুক স্টলে আমি সই বিলোব। যারা যারা দেখা করতে চান…” সই তো নিতেই হবে, নইলে রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারের মৃত চরিত্র বনে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।

বইমেলায় যতগুলো স্টল আর লিটল ম্যাগাজিনে যতগুলো টেবিল, তার সম্মিলিত সংখ্যার দ্বিগুণ থ্রিলার প্রকাশিত হয়েছে। তার থেকেও বেশি থ্রিলার লেখক হত্যায় ডক্টরেট করে ফেলেছে আর হত্যাকারীকে ধরার পরিকল্পনায় স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে যোগ দিয়েছে। গত দু বছরে ওটিটি মঞ্চে হাতে হাতে সিরিজ, সিনেমা দেখার চল বেড়েছে। মধ্যবিত্ত উচ্চ মধ্যবিত্তের কাছে দু-তিনটে ওটিটির সাবস্ক্রিপশন আর টেলিগ্রামের হরেক চ্যানেলে পাওয়া বিভিন্ন সিরিজ, সিনেমা তো আছেই। প্রায় ৯০% সিরিজ সিনেমার বিষয়বস্তু থ্রিলার — খুন, একের পর এক খুন, ডাকাতি, রাহাজানি, ঘিনঘিনে অপরাধ, ভাল অপরাধী, দুষ্টু মিষ্টি চুরি, পুলিশই নায়ক, ভূতুড়ে অভিশাপ ইত্যাদি। সেই দর্শকরাই দলে দলে বইমেলায় আসছে; বেড়ে যাওয়া থ্রিলার-খিদে আর স্ক্রুয়ের থেকেও প্যাঁচালো ও প্রত্যাশিত টুইস্টের উপরে অতি প্রত্যাশিত টুইস্টের পোঁচ লাগানো হরর-থ্রিলারের দৃষ্টি-খিদের জাবর জোগান দিতে লেখক-প্রকাশক মুখিয়ে রয়েছে। উপন্যাসের আখ্যান ধর্ম যেন ওটিটি-সিরিজের পর্ব ভাগ মেনে চলে এবং সম্ভাব্য অডিও-স্টোরির মারকাটারি ‘কন্টেন্ট’ হয়ে উঠতে পারে, লেখক সেই ব্যাপারে খুবই সচেতন। বীভৎস হরর আর লোমখাড়া থ্রিলারে মোড়া বইমেলার ফাল্গুনসন্ধ্যায় শিহরণ জাগে বইকি!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আরেকটা ভয়ও থেকেই যায়। কখন কোন তন্ত্রসিদ্ধ বা তন্ত্রবিশারদ হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে উদয় হবে মেলায়। গিজগিজে লোকের ভেতরে দু-একজন অঘোরী বা নাগা কিংবা সেমি-কাপালিক কি নেই? ফেসবুকের বইয়ের গ্রুপগুলোতে ‘তান্ত্রিক থ্রিলার’, তন্ত্রকাহিনীর চাহিদা-জোগানের বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি। ইউটিউবে অডিও চ্যানেলে জনতোষী আখ্যানগুলো পড়ে শোনানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। বইয়ের গ্রুপে গ্রুপে উৎসাহী পাঠপ্রতিক্রিয়াশীল সমাবেশ; এবং অধিকাংশের প্রশংসাসূচক বাক্য গঠন ও শব্দাবলির মধ্যে প্রভূত মিল রয়েছে। ‘তারানাথ তান্ত্রিক’-এর পাঠপ্রিয়তা বিগত কয়েক বছরে হঠাৎ পুনর্জাগরিত হয় এবং কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের কয়েক শতাব্দী পুরনো ‘তন্ত্রসার’ খুঁচিয়ে তুলে বাংলা সাহিত্যে বেশ একটা ঝিনচ্যাক উপস্থিত হয়। নিষিদ্ধ ও গুপ্ত বস্তু/পদ্ধতির প্রতি সব বয়সের মানুষেরই আগ্রহ থাকে। তবে, ধর্মের সর্বগ্রাসী গতিপথ যখন রীতি-সংস্কৃতি-ইতিহাস-মিথ-সাহিত্য সবকিছুকেই গিলে নিতে চায়, তখন ওই আগ্রহের সঙ্গে জনতোষী জনপ্রিয়তা লাউচিংড়ির স্বাদের মতো জমে ওঠে। পাঠক ‘খায়’ বলে বাজারও ‘খায়’, আর প্রকাশকরাও তন্ত্র-গুণিন-ধর্ম-রোমাঞ্চ-মিথ্যে মিশিয়ে স্বাদু আলু-বিরিয়ানি বানিয়ে দেয়। ‘বইমেলায় ফ্যাতাড়ু’-তে ফ্যাতাড়ুরা পোড়া বইমেলা থেকে বই ঝাড়তে গিয়েছিল। মদন আর ডিএস নভেল-গল্প-কবিতা ছুঁড়ে ফেলে কুড়িয়েছিল ‘বগলামুখীর ধ্যান’, ‘তান্ত্রিক সাধনা ও সিদ্ধান্ত’, ‘জ্যোতির্বিজ্ঞান-কল্পলতিকা’, ‘রামপ্রসাদী জগদ্রামী রামায়ণী’ ইত্যাদি। ডাকিনীবিদ্যা, হোরা, কোকশাস্ত্রের বই বস্তাবন্দি করার জন্যে পুলিশ-দমকলের সঙ্গেও বাওয়াল বাধায় তারা। কিন্তু, তারা যে ধর্মভক্ত ছিল বা সনাতনের সঙ্গে ইতিহাসের ঘ্যাঁট বানিয়ে বই ‘খেতে’ ভালবাসত, তা নয়। নৈরাজ্যের উদ্গাতা ফ্যাতাড়ুরা অন্তর্ঘাত ঘটাতে চাইত। সুসজ্জিত পরিশীলিত মার্জিত ভদ্রররুচির প্রতিষ্ঠানতোষী পাঠপ্রবণতার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত। যা কিছু শুদ্ধ-সংস্কৃত, যা কিছু উচ্চবর্গের কুক্ষিগত, সেই সবের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতী বয়ান হিসাবে নবনী ধর, বজরা ঘোষ, পুরন্দর ভাটেদের সাহিত্য মাথায় তুলে রাখে ফ্যাতাড়ু-চোক্তাররা। ভিক্টোরীয় নৈতিকতা অনুসৃত শ্লীল-শুদ্ধ আধুনিকতার বিরুদ্ধে বড্ড ‘অশ্লীল-রুক্ষ-স্থূল’ পাঠরুচিতে তন্ত্র-যোগের বই ঝেড়ে নেয় ফ্যাতাড়ুরা এবং চোক্তাররা কালোজাদু-তন্ত্র-গুপ্তসাধনায় মাতে। নাঃ, বিগত কয়েক বছরে, বিশেষত এ বছরে স্টলে স্টলে রং বেরঙের মলাটশোভিত গুণিন-ডাকিনী-গুপ্তহিন্দুসাধনা-সাধুকাহিনীর সঙ্গে ফ্যাতাড়ুদের অন্তর্ঘাতের কোনো যোগ নেই। যোগ আছে নব্যহেঁদু প্রতর্কের — “আহা, এসব তন্ত্রমন্ত্র পিশাচালৌকিক ভুলিয়ে রেখেছে বিজ্ঞান”, “বেদ আর পুরাণের নব ব্যাখ্যায় সব রহস্যের সমাধান আছে গো”, সনাতনবাদ আর গ্রহ-নক্ষত্র-তন্ত্রেই সঙ্কটমুক্তির শিহরণ জাগবে ইত্যাদি বিশ্বাসে।

‘বেস্টসেলার’ বইয়ে ছেয়ে যাওয়া বইমেলায় বিগত কয়েক বছরে ইতিহাস আর ধর্ম, ইতিহাস আর বিশ্বাসকে গোঁজামিলে চুবিয়ে পাঠক মগজে ঠুসে দেওয়ার চেষ্টাটা বেশ চোখে পড়ার মত। সেই পি এন ওক কবে থেকে ‘তেজো মহালয়া’-র জঞ্জাল ছড়িয়ে গেছে, যার প্রমাণ পুরাতত্ত্ব বিভাগ অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও পায়নি। আরএসএস এবং তাদের অনেক ল্যাজ-প্রতিষ্ঠান হেঁদুবাদের পুনরুত্থানের জন্যে বিশ্বাস, গালগল্পের সিডেটিভ জুগিয়েই চলেছে। বিশ্বাসে কোনো প্রমাণ লাগে না, ধর্মীয় প্রচারে কোনো বিজ্ঞান খাটে না। শুধু মনোরঞ্জক ভাষায় সহজপাচ্য কল্পতত্ত্ব আখ্যানে পুরে ফেলতে হয়। গুজবে গুজবে ছড়িয়ে যায়, যদি তা উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে হয় তাহলে তো কথাই নেই। কারণ, উপন্যাসের বা ফিকশনের কিছু প্রমাণের দায় নেই অথচ সংখ্যাগুরু জনতোষী মতামতকে উস্কে দেওয়া যায়।

ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা কি খুব কঠিন? সনাতনী প্রোপাগান্ডার বই আছে, উইকিপিডিয়া আছে, চাট্টি হাট্টিমাটিম ব্লগ আছে — বইমেলার মাঠে তাই ডিমও পাড়া হচ্ছে যথেচ্ছ। বঙ্কিমচন্দ্রের দায় ছিল অনেক, দায়বদ্ধতাও। ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ যে ইতিহাস নয়, সেকথা বারবার বলেছেন। উপন্যাসের ভাষা নির্মাণ করেছেন। হ্যাঁ, সে যুগের বেস্টসেলারও ছিল তাঁর উপন্যাস। অবশ্য নব্যহেঁদু লেখকদের অত দায়বদ্ধতা নেই, বাজার তৈরি ছাড়া। তাই এক হপ্তার মাথায় দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়ে পড়ছে, প্রথম সংস্করণে কত কপি মুদ্রণ হয়েছে তা কেউ জানে না অবিশ্যি। শেয়াল রিভিউয়াররা পাঠককে সুপারলেটিভে ছড়াছড়ি রিভিউয়ের কুমিরছানা দেখিয়ে যাচ্ছে। খেটেখুটে তথ্য তত্ত্ব খুঁজে ইতিহাসের ‘সত্যে’ পৌঁছনোর হ্যাপা অনেক। সে হ্যাপা পোয়াতে পোয়াতে গরমকাল এসে যাবে। তার চেয়ে ঝ্যারঝ্যারে ভাষায় বঙ্কিম-সুনীল-শরদিন্দুর ভাষা-বাক্যগঠন টুকেটাকে লেখা উপন্যাসেই বেশ ইতিহাস বুঝে ফেলা যায়। পুজোয় যেমন থিম হয় না? মিশরের পিরামিড দেখুন! ওই দেখুন প্রাচীন সভ্যতা! মন্ত্রী নাড়ুদার পুজোর এবারের থিম বৈদিক যুগে বিজ্ঞানের মোহ। হ্যাপা কম। কমেন্ট আর সেলফি আর সইমাখা বইয়ের ‘রিচ’ বেশি। অবিশ্যি নিন্দুক পাঠকদের নামে লেখক মানহানির মামলা করেছে, এমন উদাহরণও রয়েছে। বইমেলা — তন্ত্রমেলা, থ্রিলারমেলা আর গুল্পেতিহাসমেলা (গুল+গল্প+ইতিহাস)।

বইয়ের ‘রিচ’ বাড়াচ্ছে লেখকের বাজার মাপা বুদ্ধি এবং ফেসবুকে সময়োপযোগী বাণী প্রচার। “আমি কিন্তু অন্যদের মতো প্রচারপ্রিয় না” বলে কবি জুড়ে দিচ্ছেন কত কপি বই বিকিয়েছে তার হিসাব। ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে পাড়ার ঘেঁটুদা ঘোঁতনদা ফুলিমাসি সোনাদিদা কীরকম সাবাসি দিয়েছে কিংবা পুশ সেল করা বই হাতে পেয়ে ইস্কুলের বোচো আর কলেজের প্রজ্ঞাপারমিতা কী দারুণ রিভিউ লিখেছে তা শেয়ার করছে লেখক নিজেই। কবি লিখছে জনপ্রিয় বাণী এবং “ঠোঁটে ব্যথা বুকে কাম/ শুধু তারা গুনলাম” জাতীয় আত্মমোচী কবিতা। এদিক ওদিক থেকে ঝাড়া বিরহকাতর শব্দ আর পংক্তি, সদ্যকলেজি ছেলেমেয়ের মনজোগানো ছন্দ এবং গ্যাদগ্যাদে জিয়ানস্ট্যালে ফোটানো দুখী প্রেমের চা-পাতা। ব্যাস, প্রি-বুকিংয়ের আড়ম্বর সম্পন্ন। ‘রিচ’ অতি সুষম বস্তু। ‘রিচ’ অর্থে সোশাল মিডিয়ায় থাকা বন্ধুতালিকার কতজনের কাছে নিজেকে বিজ্ঞাপিত করা গেল। বইমেলার ভিড়ে রিচকামী হতে হয়, নইলে ভিড়ে হারিয়ে যেতে হয়। বইমেলায় গিয়ে একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ঢিল ছুঁড়লে যার মাথায় পড়বে, সেই-ই এমন লেখক/কবি।

#

কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা ৪৫ বছরেও যে দ্বন্দ্বের নিরসন করতে পারেনি, তা হল, খাবারের দোকান আর বইয়ের দোকানের অনুপাত কত হবে। বইসঙ্গমী উচ্চপাঠপ্রবণ একদল রে রে করে তেড়ে আসে “বইমেলা কি খাবার খাওয়ার জায়গা?” কিংবা “বই ছাড়া অন্য কিছু খাই না আমরা” স্লোগান তুলে। অন্য দল খুবই খুশি, কারণ বাঞ্ছারাম থেকে বেনফিশ থেকে ফাস্ট ফুডের দেদার স্টল; উপরি পাওনা আচারের বিশাল দোকান। থরে বিথরে সাজানো বয়াম। বয়াম যে শুধু স্মৃতিরই হবে এবং তা থেকে শুধু হলদে দুপুরের চিলেকোঠায় জড়ানো প্রথম প্রেমের ওড়নায় মোড়া এলোমেলো কবিতার রোঁয়া উঠবে, এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? আর, ঠাকুরমশাই কবেই বাণী দিয়েছেন, “খালি পেটে পাঠ হয় না”। খালি পেটে যে জ্ঞান খোলে না, সে বিষয়ে আরুণি-শ্বেতকেতু সংলাপ পড়া যেতেই পারে। সূত্র — ছান্দোগ্যোপনিষদ। বইমেলায় কেউ খাবার খেতে যান, কেউ বই খেয়েই পেট ভরিয়ে ফেলেন, লেখকেরা লজ্জার মাথা খেয়ে ফেলেন আর, কেউ কেউ এখনও নস্ট্যালজিয়া খান। “বইমেলা কিন্তু সেই আগের মতো নেই”। “ইশ, সেই কোলে চেপে ময়দানে বইমেলা যেতুম”। “আহা, সেই ময়দান, সেই ঘোড়ার গুয়ের গন্ধ, সেই আইসক্রিম মাখিয়ে বই চেটে চেটে খাওয়া, সেই বইয়ের লেখক আর কোথায়…” নাঃ, এসবের বাইরেও থাকে দু-একটা খাওয়ার জিনিস। যেমন এসির হাওয়া। ফাল্গুনী গরমে বাটার-কর্নের মত ঘামচুপচুপে সেদ্ধ হতে হতে টুক করে জনগণ ঢুকে পড়ছে বড় বড় তাঁবুর ভেতরে। ইংরিজি বইয়ের দেদার সম্ভার। এসি তাঁবুতে বাংলা বইয়ের স্টল খুব একটা নেই। না থাকাই স্বাভাবিক। কৌলীন্য বলেও তো একটা ব্যাপার আছে, বিজ্ঞ কর্মকর্তারা তা বোঝেন। বইমেলার বনলতা সেন হয়ে ওই ‘হল’-গুলো ক্লান্ত পাঠকদের আশ্রয় দেয়। বিভিন্ন ভ্লগ (ভিডিও+ব্লগ) দেখলেও এই সময়োপযোগী তথ্য জানা যায়। এবার বইমেলার এই এক নতুন হুজুগ- ভ্লগ।

হাতে হাতে স্মার্টফোনের যুগে বছর কয়েক আগে থেকেই ছবি আর সেলফির মাতামাতি। মেলা মানে দেখনস্মৃতি তো থাকবেই। সেলফি আর সেলফিস্টিক দেখন স্মৃতি ধরে রাখা সহজ করে দিয়েছে। উদাস পাঠক, আলাভোলা লেখক আর চেয়ারে-ঝিমোনো পুলিশরাও কিঞ্চিৎ সতর্ক হয়ে ঘুরছেন। কখন কার ফোটোফ্রেমে ঢুকে অজান্তেই ট্যাগড হয়ে যান। হয়তো হরর-কবি উকুন বাছছেন, ঐতিহাসিক-থ্রিলার লেখিকা শাড়ির ভাঁজে চোরকাঁটা গুণছেন বা ‘অপদার্থ পাবলিকেশন’-এর পাশের টুলে বসে পুলিশ স্টুডেন্ট-প্যাঁদানোর ভিডিও রোমন্থন করছে মোবাইলে। সবই অন্তর্বর্তী শূন্যতায় পাঁচ হাজারি লাইক-রিচ পাওয়া হুব্বার ছবিতে বন্দী হয়ে গেল। ছবি থেকে ভিডিও ব্লগে হুজুগ বদলেছে এ বছর। এক বছর বইমেলা না হওয়ার জমানো সব দুঃখ ভিডিওতে জমা হচ্ছে — চলমান ক্যামেরাধারী আনন্দ পাবলিশার্সের স্টলের সামনে ক্যামেরা উঁচিয়ে গোলচক্কর কেটে বলছেন, “আপনাদের দেখাব আনন্দর স্টলের সামনে লম্বা লাইন”। ফিশফ্রাইয়ের সামনে ঘুরতে ঘুরতে বলছেন “এই দেখছেন ফিশফ্রাই। দেখুন ধোঁয়া উঠছে কেমন!” দারুণ আশ্চর্য হয়ে কেউ বলছেন, “প্রতিবারের মত কলকাতা পুলিশের বেলুন উড়ছে। ওই দেখুন ফুড কোর্টের পাশে কত বইয়ের দোকান!” এমনও আছেন, যিনি কিছুই বলছেন না, শুধু স্মার্টফোন বাগিয়ে দম দেওয়া পুতুলের মত ঘুরে চলেছেন। প্রিয় দাদাই/দিদিয়া লেখকদের সামনে দু মিনিট দাঁড়িয়েই ফের পরের দিদিয়া/দাদাই খুঁজতে চলেছেন। সুধী পাঠক বিরক্ত হচ্ছেন এদের দেখে এবং আদিখ্যেতা, লোকদেখানো ইত্যাদি ঠাট্টা ছুঁড়ে বইমেলার কুলশীলতা রক্ষা নিয়ে চিন্তিত হচ্ছেন। তারপরই টুক করে নিজেরটা বার করে কোনো সুসজ্জিত স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। পুজোর ভিড়েও এরকম হয়। বাঁদরনাচ থেকে খুলে-যাওয়া-টুনির আলোকসজ্জা থেকে গ্রামবাংলা থিমের প্যান্ডেল — সবই ক্যামেরাবন্দী করতেই হয়। তারপর পুলিশ/কর্মকর্তারা ফোন কেড়ে নেবার ভয় দেখায়। বইমেলায় এখনো অবধি ক্যামেরা কাড়ার হুমকি দেয়নি, তবে সামনের বছর থেকেই স্টলকর্তারা হুমকি দিতে পারেন।

#

তবে গিল্ড এতদিনে একটা কাজ করতে সফল হয়েছে। বহুবছর চেষ্টা করেও পারেনি, এই বছর কায়দা করে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছে। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নকে টুকরো করার কাজ — এইবার প্রথম। বিগত দেড় দশক ধরে লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নের স্থান সঙ্কোচন হচ্ছে। টেবিল কমছে। গিল্ডের কর্তাব্যক্তিদের প্রত্যেকের নিজস্ব নামী প্রকাশনা আছে। বইমেলায় সুবিশাল স্টল আছে। মাইল তিনেক লম্বা লাইন আছে। প্রতিষ্ঠানসম্মত লেখক আছে। বইমেলার নিয়ন্ত্রক তাঁরাই। আর লিটল ম্যাগের কী আছে? আনকোরা সংখ্যা, অভূতপূর্ব ভাবনার কোনো সংখ্যা, নতুন লেখকদের সাহস পাওয়া, সাহসী লেখকদের নতুন পরীক্ষা নিরীক্ষা, স্বল্পবিক্রীত বইয়ের সঠিক পাঠককে খুঁজে নেওয়া, অন্তর্ঘাতী উদযাপন ইত্যাদি অনেককিছুই। এগুলো কি স্টল দেওয়া প্রকাশনায় থাকে না? থাকে, তবে তার সংখ্যা যৎসামান্য। আর, লিটল ম্যাগের আছে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, জেদ ও আকাঙ্ক্ষা। এমন লিটল ম্যাগ যা অনিয়মিত কিন্তু বইমেলার আগে দারুণ একটি সংখ্যা নিয়ে টেবিলে বসল। এমন লিটল ম্যাগ যেখানে মা/বাবা বসছেন অকালমৃত সন্তানের সম্পাদিত পত্রিকাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এমন লিটল ম্যাগ যারা চেনামুখ নামী চুল তাবড় হাসি স্বপিঠ চুলকানো লেখকদের লবিবাজিকে মধ্যমা দেখিয়ে অপরিচিত ভাল লেখককে তুলে আনছে পত্রিকার পাতায়। এমন লিটল ম্যাগ যারা প্রতিরোধী সাহিত্য উদযাপন করছে। এমন লিটল ম্যাগ যারা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করছে সাহিত্য ও নান্দনিকতা দিয়েই। নতুন বিকল্পের স্বপ্ন এঁকে রাখছে খুঁজে-নেওয়া পাঠকের চোখে। এরা বিপজ্জনক! লিটল ম্যাগাজিনের আরেকটা বিপজ্জনক দিক রাজনৈতিক সত্তা। তার মানে কি সব লিটল ম্যাগই তাই? না! উদারনৈতিক জনতোষী মতাদর্শপ্রিয়তার যুগে “আমরা নিরপেক্ষ”, “আমরা রাজনীতির বিরোধী”, “আমরা অরাজনৈতিক”, “আমরা শাসকের বিরুদ্ধে কিন্তু…” কিংবা “আমরা তো সারস্বত সাধনা করি, রাজনীতিটা ভাল বুঝি না” — এসব আওড়ানো লিটল ম্যাগাজিনও নেহাত কম নয়। তবে লিটল ম্যাগের প্রথাবিরুদ্ধ প্রতিষ্ঠানবিরুদ্ধ সত্তাটা বেশ কয়েক দশকের পুরনো। সাহিত্য-আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে জারিত। এই ভাঙনপ্রিয় ফ্যাসিস্তপ্রবণ সময়েও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যাবেও না। পূর্বতন শাসকের জমানায় পুলিশ হেফাজতে কমিউনিস্ট বন্দীর মৃত্যুর প্রতিবাদে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর থেকে মিছিল হয়েছিল, বেশ বড়। বর্তমান শাসকের জমানায় এনআরসি-সিএএ বিরোধী জমায়েত ও মিছিল হয়েছে এই চত্বর থেকেই। আরএসএস-ভিএইচপির বিরুদ্ধে খিস্তিধর্মী খিল্লি আর তুমুল বাকযুদ্ধ কয়েক বছর আগেই তো হয়েছিল। শাসকের রাজনৈতিক বিরুদ্ধতায় জমায়েত-মিছিলে পূর্বতন সরকার বা বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে লিটল ম্যাগাজিন চত্বর প্রাণকেন্দ্র হয়ে থেকেছে। শাসকের পক্ষে খুব স্বস্তিদায়ক কি সেটা? আর লিটল ম্যাগ চত্বরেই প্রথম যৌবনের নৈরাজ্যবাদী রোম্যান্টিকতার চর্চাও তো হয়। এই চত্বরের পাশে সিগারেট খাওয়া যায় এবং পুলিশের সাথে বাওয়াল হলে অন্যান্য ম্যাগাজিনের তরুণ তরুণীরা জড়ো হয়ে যায়। হঠাৎ কেউ চিৎকার করে কবিতা পড়ে গিল্ড আর প্রশাসনের তুলো ধুনে দিল। কর্তৃপক্ষের বাধা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বসে পড়ল ছবি আঁকতে বা সদ্য প্রকাশিত লিটল ম্যাগ বিক্রি করতে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের বাওয়াল কেউ ঠেকাতে পারে না কোনো বছরেই।

এ বছর লিটল ম্যাগ চত্বরকে তাই তিন ভাগে ভাগ করে দিয়েছে গিল্ড কর্তৃপক্ষ আর প্রশাসন। টেবিল পাওয়ার লটারি হয়েছে অনেক দেরিতে। একেকটি পত্রিকার জন্য বরাদ্দ টেবিলের মাপ ছোট হয়েছে অন্য বছরের থেকে। সবেরই ছুতো অতিমারী ও “ভিড় কমানো”। “লিটল ম্যাগাজিনের সামনে আছি” — আগে এটুকু বললেই হত, কারণ লিটল ম্যাগ চত্বর অনেকের কাছেই ছিল সাক্ষাৎ স্থল। এ বছর বলতে হচ্ছে কোন গেট নম্বর আর কত নম্বর টেবিল। কারণ দুটো গেটের (১ ও ৯) দোরগোড়ায় লিটল ম্যাগাজিনকে জায়গা দিয়ে ধন্য করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের সুবিধে হয়েছে এই, যে লিটল ম্যাগ চত্বরের মিছিল-জমায়েতের অবাধ্যতাকে বিচ্ছিন্ন করা গেছে। কর্তৃপক্ষের সুবিধে হয়েছে কোনো লিটল ম্যাগ হম্বিতম্বি করলেও অন্য লিটল ম্যাগগুলো জোট বেঁধে তুলকালাম ঘটাতে পারছে না। আর টেবিল উঠে যাওয়ার ভয় সব লিটল ম্যাগ সম্পাদকেরই আছে কমবেশি। ফলে কে-ই বা যেচে কর্তৃপক্ষের বিষনজরে পড়তে চাইবে? এই এক চিরন্তন নীতি কর্তৃপক্ষের — ভাগ করে দাও বিচ্ছিন্ন করে দাও, তাতে আদেশ চাপিয়ে দিতে সুবিধে হবে। একটা লিটল ম্যাগ অবশ্য বইমেলার দ্বিতীয় দিনেই ঝামেলা বাঁধিয়েছিল বেমক্কা অপরিকল্পিতভাবে মাঠের মাঝে বই সাজিয়ে বসে পড়ে। পুলিশ এসে বইপত্তর গুটিয়ে দেয়, বিতণ্ডা গড়ায় গিল্ড অফিস অব্দি। শূন্য নম্বর স্টল নিয়েই অনড় থাকে তারা। ঐক্যবদ্ধ লিটল ম্যাগ চত্বরে এই ঘটনা ঘটলে আরও পাঁচ-দশটা লিটল ম্যাগের সম্পাদক হাত লাগাতেন বাওয়ালে; বিচ্ছেদের যুগে সে ভাবনা অলীক। কিন্তু লিটল ম্যাগের বারুদ এত সহজে মিইয়ে যাবে না বলেই মনে হয়।

প্রথম কয়েক দিনে ধুলোর মত চোখে পড়ল এইসব। চলুক মেলা। রমরমানো ছাপ্পায় ছাপ্পায় খেলা দেখার সংস্কৃতি যখন তৈরি হয়েই গেছে, তখন এমন মেলা কি আমাদের কম পাওনা? এত কিছু এবং আরও অনেককিছু নিয়ে কার্নিভাল তো বটেই। পাঠক জানেন যে, কার্নিভাল কখনো থেমে যায় না।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.