রুপোলি পর্দার নায়ক বললেই আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে কিছু স্টিরিওটাইপ। এমন একজন নায়ক যিনি একা দশজনের বিরুদ্ধে লড়ে যাবেন, উদ্ধার করবেন নায়িকাকে (ব্যাপকার্থেও), কষ্ট পেলেও চোখে জল আসবে না। কারণ তিনি পুরুষ, আর কে না জানে “মর্দকো দর্দ নেহি হোতা”। আর তাই, নাম পুষ্পা হলেও, তিনি জানান দেন তিনি ফুল নন, আগুন। ফুল তো হয় নায়িকা। নরমসরম, সুগন্ধি এবং আত্মরক্ষার্থে পুরুষই যার আশ্রয়। ভুল করে নায়িকা নায়কের মত তীর ধনুক চালানো শিখে গেলে নায়কের দায়িত্ব তাঁকে ‘নারীত্বে’ ফিরিয়া আনা। সেজন্য তাঁর পোষাক এবং শরীরকে ইচ্ছে মত স্পর্শ করাও ন্যায়সঙ্গত। প্রয়োজনে ‘নিজের’ নারীকে নানা রকম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করাও ভুল নয়। কারণ নায়ক তাঁকে ভালবাসেন, হয়ত তার প্রকাশে একটু আধটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, প্রেমিকাকে জোর করে চুমু খাওয়া থেকে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, সবটাই নায়কের অধিকারের মধ্যে পড়ে। এমন বাড়াবাড়িতে দর্শক চোখের জল মুছলেও, নায়কের অন্যায়কে ছেলেমানুষি বলেই মেনে নেন।

অথচ এ দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্প একসময় যথেষ্ট সমাদৃত ছিল। হেরো, নিরীহ, কিন্তু বৃহত্তর মানবিকতার অধিকারী চরিত্রগুলো তাই দর্শকের ভালবাসাও পেয়েছে। কিন্তু দিন বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদা। পুরুষতন্ত্র এবং ধনতন্ত্রের গাঁটছড়া মানবিক নায়ক আর পাশবিক মহানায়কের লড়াইটাকে করে তুলেছে একপেশে (অবশ্য ধনতন্ত্র যে নারীবাদের উপরেও প্রভাব বিস্তার করছে তা মিথ্যা নয়)। ফলত, সমাজেও যে কোনো মূল্যে জয়লাভ করাই (সিনেমার নায়কের ক্ষেত্রে যা স্রেফ প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা) হয়ে উঠেছে পৌরুষের লক্ষণ। আর কে না জানে, বীরভোগ্যা বসুন্ধরা। তাই জয়ী নায়কের পদতলে জায়গা পান নায়িকা। একেই সার্থক প্রেম বলে চিহ্নিত করেছে সমাজ। তাই জীবনেও প্রেমের জায়গা নিয়েছে দখল করার প্রবণতা (গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের রামাধীর সিং এর সেই (কু)খ্যাত বক্তব্য দ্রষ্টব্য, যতদিন ভারতে সিনেমা থাকবে ততদিন সাধারণ দর্শককে বোকা বানানো চলবে)।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এরকম নায়কদের মধ্যে এক আশ্চর্য বোকা নায়ক জয়েশভাইয়ের অকস্মাৎ প্রবেশ ওটিটির হাত ধরে। (প্রসঙ্গত, জয়েশভাই জোরদার ছবিটা বড় পর্দায় খুব একটা আলোড়ন তুলতে পারেনি; পুষ্পা, কবীর সিংরা বরং অনেক বেশি জনপ্রিয়) রক্ষণশীল গুজরাতি পরিবারের একমাত্র কুলপ্রদীপ জয়েশভাই, অতি নিরীহ, সাত চড়ে রা নেই, এবং ভয়ানক ‘স্ত্রৈণ’। যে স্ত্রী তাঁকে পুত্রসন্তান দিতে পারেন না (!) তাঁকে তাঁর ভাইয়ের কীর্তিকলাপের জন্য শিক্ষা দিতেও গায়ে হাত তুলতে পারেন না তিনি। কিন্তু দোর্দণ্ডপ্রতাপ বাবার ভয়ে স্ত্রীকে মারধোর করার অভিনয় করতে হয় ঘরের দরজা বন্ধ করে। কারণ গোবেচারা জয়েশভাইয়ের বাবার কথা অমান্য করারও শক্তি নেই।

না, জয়েশভাই নারীবাদী নন। এমনকী ফেমিনিস্ট কথাটার মানে জানতেও বোধহয় তাঁকে সরলার (গুজরাতি অ্যালেক্সা) শরণাপন্ন হতে হবে বলে মনে হয়। এত কিছু সত্ত্বেও জয়েশভাইকে নিয়ে আলোড়ন পড়ে গেছে সোশাল মিডিয়ায়। কারণ বোধহয় এটাই, যে বিষাক্ত পৌরুষসম্পন্ন নায়ক চরিত্রগুলোর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর লোক জয়েশভাই। তিনি বাবার অন্যায় কথার প্রতিবাদ করতে পারেন না, কিন্তু স্ত্রী এবং মেয়েকে একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিতে চান। স্ত্রীর গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ জেনেও তিনি কোনোমতেই ভ্রূণহত্যায় রাজি হতে পারেন না। আর যখন স্ত্রী তাঁকে বলেন দ্বিতীয় বিয়ে করতে, তখন তিনি উলটে স্ত্রীকে বলেন কন্যাজন্মের জন্য দায়ী স্বয়ং তিনি, তাই স্ত্রীরই উচিত তাঁকে ত্যাগ করে দ্বিতীয় বিয়ে করে নেওয়া। এমনকি জোর করে স্ত্রীর থেকে আলাদা করে তাঁকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় জল ঢেলে তিনি পালিয়ে যেতে চান শ্বশুরবাড়িতে। তার আগের রাতে, মহিলা মহলে গোপনে নিজের দুঃখের কথা জানিয়ে ‘মেয়েদের মত’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন, বাকি মহিলাদেরও ওই ভয়ানক সমাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

আমরা রুপোলি পর্দায় যাদের দেখে অভ্যস্ত, জয়েশভাই সেই নায়কদের মত অতিমানবিক নন। তাই পাঁচ-পাঁচটা ভ্রুণহত্যা তিনি মেনে নিতে বাধ্য হন। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরও তিনি সরাসরি সংঘর্ষের রাস্তায় না গিয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজের স্ত্রী, কন্যা ও স্ত্রীর গর্ভস্থ ভ্রূণকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। ‘ইউবেরম্যানশ’-এর বদলে যে নিরীহ ছাপোষা মানুষেরা প্রতিদিন আরেকটু বেশি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন জয়েশভাই। তিনি নিখুঁত নন। একটু বাড়াবাড়ি রকমের সমঝোতা করেন, কিন্তু স্বপ্ন দেখেন একটা অন্যরকম সমাজের, যেখানে পুত্রসন্তানের জন্ম না দিতে পারা একজন মহিলার ব্যর্থতা নয়, বরং পুরুষের ক্রোমোজোমের সমস্যা হিসাবেই দেখা হবে। এখানেই ভারতের প্রেক্ষাপটে জয়েশভাই জরুরি হয়ে ওঠেন। কারণ এই একুশ শতকেও ভারতে কন্যাভ্রূণ হত্যা এক বড় সমস্যা। যতই সরকার “বেটি বাঁচাও” স্লোগান দিক আর নারী-পুরুষের অনুপাতের সমস্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করুক।

আরো পড়ুন বৈবাহিক ধর্ষণ: অপব্যবহারের জুজু দেখিয়ে পৃথক আইন করা হচ্ছে না

এমন একটা গল্প নিয়ে বাণিজ্যিক ছবি করার চেষ্টার জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য পরিচালক দিব্যাঙ্গ ঠক্কর এবং লেখক মনীশ শর্মার। জয়েশভাইয়ের চরিত্রচিত্রণ মনে করিয়ে দেয় আরও একজন বোকাসোকা “ঠকে যাওয়া” নায়ককে — সাই পরাঞ্জপের কথা ছবির রাজারাম, শেষ দানে ভালবাসার পাত্রীকে গ্রহণ করতে যার কোনও সংশয় ছিল না।

জয়েশভাই জোরদারে কিছু অতিসরলীকরণ আছে অবশ্য, কিছু অবাস্তব ধারণাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। কেউ কেউ অবশ্যই বলবেন এক্ষেত্রেও নারীর ক্ষমতায়নে বারবার পুরুষ সাহায্য করছে বলে দেখানো হয়েছে, কাজেই পলিটিকাল কারেক্টনেসের অভাব যথেষ্ট। কিন্তু জীবন তো পলিটিকাল কারেক্টনেস মেনে চলে না। নারীবাদী রাজনীতিও পুরুষকে শত্রু ভাবে না, ভাবার কথাও নয়। নারীবাদ শেখায় যে সমাজে সব লিঙ্গ পরিচয়েরই সাধারণ শত্রু পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো, যা শুধুই পুরুষের মধ্যে শিকড় বিস্তার করে তা নয় (এক্ষেত্রে জয়েশভাইয়ের মা যশোদার চরিত্রটি লক্ষণীয়, যদিও ধীরে ধীরে তিনি নিজের ছেলের দেখাদেখি ক্রমশ পুরুষতন্ত্রের বেষ্টনী থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন)। সুতরাং যে মূলধারার ছবি এমন এক ইউটোপিয়ান (?) সমাজের ছবি দেখায় যেখানে ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ান, তা মন্দ কি? বাস্তবের প্রতিহিংসা তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিনেমার নায়কের চরিত্রচিত্রণে প্রতিফলিত হয় এবং মানুষের মননে প্রভাব বিস্তার করে (কবীর সিং বা পুষ্পার মত)। তার বদলে নিরীহ, সাধারণ মানুষের মতই দোষে গুণে ভরা জয়েশভাইয়ের চরিত্র যদি কিছু আপাত সাধারণ কিন্তু প্রয়োজনীয় স্বপ্নের ছবি আঁকে, তাও তো কম নয়। প্রবল পরাক্রমী পৌরুষের ভিড়ে জয়েশভাইয়ের নরম সরম প্রতিবাদ কয়েকজন মানুষকে ভাবাতে পারলেও তার মূল্য কম নয়।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.