‘মেরে দিল কো ফির ইয়াদ তড়পা গয়া হ্যায়

উয়ো মনজর মেরে সামনে আ গয়া হ্যায়…’

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একটা সময় ছিল যখন আমি এক যৌথ পরিবারে বড় হয়ে উঠছিলাম। বাবা-মা-জ্যাঠা-জেঠি-পিসি-ঠাকুমা-ঠাকুরদা-দুই জেঠতুতো দিদি-বোন… তখন ছিল দূরদর্শন- রঙ্গোলি-চিত্রহার-সুপারহিট মুকাবলার যুগ।

খুব ছোটবেলায় (আশির দশকের শেষে) চিত্রহারে রফি-কিশোরের গান বাজত। কারণ তখন তাঁরা খুব পুরনো নন। তেমনই রঙ্গোলিতে সুরাইয়ার গান হতো।

রেডিও ছিল। আর ছিল টেপ রেকর্ডার উইথ ক্যাসেট প্লেয়ার। আর প্রচুর ক্যাসেট। এই ভাবেই আমার মহম্মদ রফির গান শোনা।

তখন মুক্ত বাজার ঢুকছে। নয়া উদারবাদ থাবা বসাচ্ছে। তার বাজারের উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে চলেছে নস্ট্যালজিয়া। ফলে জোর কদমে চলছে রিমেক। টি সিরিজের ক্যাসেটে ‘রফি কি ইয়াদেঁ’ অ্যালবামে উঠে আসছেন সোনু নিগম, প্রাণপণে লড়ছেন দেবাশীষ দাশগুপ্ত (এককালে কলকাতা কাঁপানো রত্না-দেবাশীষ-রিমার দেবাশীষ) আর বিপিন সচদেব। কদিন পরেই ‘দূরের বলাকা’ নিয়ে হাজির হবেন ইন্দ্রনীল সেন (যদিও তাঁর প্লেব্যাক অনেক আগে) আর ‘মনের জানালা’ নিয়ে শ্রীকান্ত আচার্য।

এদিকে বাংলা গানে নতুন যুগ এসেছে। রেডিওতে ‘নিঝুম সন্ধ্যায়’ আর ‘মধুমালতী ডাকে আয়’ চলছে; পাড়ার পুজোয় ‘সুমন-অঞ্জন-নচিকেতা’ এসেছে। কদিন বাদেই এক ঝাঁক রোদ্দুর ফেলে বারান্দায় হাজির হবে ‘ভূমি’।

এই রকম কেইনসিয় মডেলের পতন আর মুক্ত বাজারের আগমনে আমি হয়েছিলাম মহম্মদ রফির ভক্ত। যৌথ পরিবারের ধ্বসে যাওয়া ‘মানসিকতা’ নিয়ে। তাই বোধ হয় অনেক পড়াশোনা করে রাত দশটার পরে টিউশন সেরে ক্লান্ত মনে একা ঘরে ফেরার সময় রফির কণ্ঠে ‘আগর ম্যায় পুছুঁ জবাব দোগে’ আমাকে একাকিত্ব অনুভব করতে দেয় না। তাই বাড়ি থেকে কলেজ স্ট্রিট, মুদিয়ালি, হাজরা, গড়িয়া, যাদবপুরে যাওয়ার সময় হেডফোনে ভেসে আসা কণ্ঠ আমাকে ক্লান্ত হতে দেয় না, যখন শুনতে পাই ‘হায় তবস্সুম তেরা’…।

‘জমানে কো জিসনে দিওয়ানা বনায়া….’

১৯২৪ সালে অবিভক্ত পাঞ্জাবের কোটা সুলতান শাহ গ্রামে জন্মেছিলেন মহম্মদ রফি। ১৯৪২ সালে শ্যামসুন্দরের সুরে গুল বালোচ ছবিতে তিনটি গান গেয়েছিলেন। প্রথম গান ছিল ‘সোনিয়ে নি/হেরিয়ে নি/ তেরে ইয়াদ নে আন সতায়া’। কিন্তু এই গান পরবর্তীকালে রফি আর কোনওদিনই খুঁজে পাননি।

১৯৪৩ সালে বোম্বে শহরে আবার আসেন (প্রথমবার গান রেকর্ড করতে; গুল বালোচের)। কারণ গ্রামের মেলায় নিজের গান শুনে রফির মনে হয়েছিল হয়তো কিছু করা সম্ভব। তিনি যদিও ছোট থেকেই গান পাগল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে সায়গলের প্রশংসা বা ১৪ বছর বয়স থেকে আকাশবাণীর লাহোর কেন্দ্রে গান করা — সবই তাঁর প্রতিভার প্রমাণ।

এরপরেই বোম্বেতে শ্যামসুন্দর তাঁকে গাঁও কি গোরি – দ্য ভিলেজ গার্ল ফিল্মে সুযোগ দিলেন (‘ইয়ার কি অ্যায়সি কি ত্যায়সি’) কিন্তু সেটা প্রকাশের আগেই বেরিয়ে গেলো নওশাদের সুরে ‘হিন্দুস্তান কে হাম হ্যাঁয়’। ফলে কার্যত এটাই প্রথম প্রকাশিত রেকর্ড।

যদিও সবাই মনে করেন বৈজু বাওরা-র আগে রফি নাকি একেবারেই বিখ্যাত ছিলেন না; ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। মেলা (‘ইয়ে জিন্দেগি কে মেলে’), শহীদ (‘ওয়াতন কি রাহ মে’), জুগনু (‘ইয়াহাঁ বদলা ওয়াফা কা বেওয়াফা কে’), তেরা খিলৌনা টুটা বালক কিংবা অন্দাজ (‘বচপন কে দিন ভুলা না দেনা’) প্রভৃতি গান বিপুল জনপ্রিয় হয়। মহম্মদ রফির শুধু হিন্দি ফিল্মে প্রকাশিত গানের সংখ্যা বৈজু বাওরার আগে ছিল ২৫০-এর বেশি।

‘বহত খুব সুরত ইয়ে আওয়াজ তেরি’

তারপর ফিল্ম ফেয়ার, পদ্মশ্রী, রাষ্ট্রপতি পুরস্কার — সবই পেয়েছেন। ভজন হোক বা নাদ, গজল হোক বা দেশাত্মবোধক, চটুল হোক বা রাগপ্রধান, কোনও গানেই দুর্বল ছিলেন না রফি।

কত গান গেয়েছেন তিনি?

ছাব্বিশ হাজারের গল্পটা ভুয়ো। মেরে কেটে সাড়ে ছয় হাজার। সেটাই অনেক। বাইশটা ভাষায় গান গেয়েছেন। হিন্দি/উর্দু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি, মারাঠি, কোঙ্কনি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু, কন্নড়, ছত্তিশগড়িয়া, ওড়িয়া, অসমিয়া, বাংলা, মৈথিলী, ভোজপুরী, অওধি, ব্রজভাষা — এই সতেরোটা ভারতীয় ভাষা ছাড়া ইংরেজি, ডাচ, মরিশাসের ভাষা, ক্রেওল, আরবি, ফারসি (দারি) — এই ছটা বিদেশি ভাষায়। এর মধ্যে ডাচ গানটি লাইভ রেকর্ড বলে অনেকে হিসাবের মধ্যে রাখেন না।

নেপালি ভাষায় গান করেননি, কিন্তু একটি গানের প্রথম লাইন ছিল নেপালি (আজকো জুনলি রাতমা)।

বাংলায় প্রথম গান ১৯৫৭ (নাকি ‘৫৯?) । ‘ওই দূর দিগন্ত পারে’ আর ‘নাই বা পরিলে আজ মালা চন্দন’ । কথা পবিত্র মিত্র, সুর বিনোদ চট্টোপাধ্যায়।

গেয়েছেন নজরুলগীতি, কথা ছিল শ্যামাসঙ্গীত গাইবেন। হয়ে ওঠেনি। তবে শুধু বিনোদ চট্টোপাধ্যায় নন, গেয়েছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, বাসু-মনোহরির সুরেও (বাংলা)।

আর হিন্দিতে তো ছিলেনই। শঙ্কর-জয়কিষন, ও পি নায়ার, শচীন দেববর্মন, রাহুল দেববর্মন, নওশাদ, চিত্রগুপ্ত, কল্যাণজি-আনন্দজি, লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল, রবি, সর্দার মল্লিক, সলিল চৌধুরী, হুস্নলাল ভগতরাম, সোনিক-ওমি… কত বলব!

‘চলে জায়েঙ্গে হম মুসাফির হ্যাঁয় সারে

মগর এক শিকওয়া হ্যায় লব পে হমারে…’

আমার জন্মের পাঁচ বছর আগে মহম্মদ রফি মারা যান। ফলে তাঁকে লাইভ দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু কোনওদিন মনে হয়নি যে তিনি নেই। আজকের এই অশান্ত ভারতে তিনি হারিয়ে যাওয়া এক সমাজের চিহ্ন, যা চেষ্টা করলেও মুছে ফেলা যায় না।

আজ যখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে পড়েছে, তখন মনে পড়ে এই লোকটির গান ছাড়া রামনবমী পালন হয় না (‘রামজি কি নিকলি সওয়ারি’)। আবার মেহনতি মানুষের গানও এঁরই কণ্ঠে ধ্বনিত হয় (‘হম মেহনতওয়ালোঁ নে জব ভি মিলকর কদম বঢ়ায়া / সাগর নে রাস্তা ছোড়া পর্বত নে শিশ ঝুকায়া… সাথী হাত বঢ়ানা)।

কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর গন্ডি টপকে ইনি পৌঁছে যান পাকিস্তানে। আবার ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশের বাঙালিরা এঁর গানে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন (মনে রাখবেন, রফি কিন্তু পশ্চিম পাঞ্জাবের)।

লন্ডনের সুরম্য অট্টালিকা থেকে বোম্বের ধরভি বস্তি, টোকিও থেকে কলকাতার কোনও শান্ত বাঙালি পাড়া — সর্বত্র রফির গান চলে।

ফলে নয়া উদারবাদকে পথ করে নিতে হলে রফিকে আশ্রয় করতে হয়, তার বিরুদ্ধে লড়তেও রফিকেই লাগে।

বোম্বের ফিল্মে প্লে ব্যাক শুরু হয়েছিল প্রায় একশ বছর আগে। সারা দুনিয়ার ফিল্মের ক্ষেত্রে এটা ভারতের অবদান, যার উৎস ও প্রেরণা লুকিয়ে ছিল দেশীয় কথকথা ও যাত্রা থিয়েটারে। হিন্দি ফিল্মও প্রথম দিকে পার্শি থিয়েটারের প্রভাব (বাংলা থিয়েটারেরও) এড়াতে পারেনি। ফলে প্রবল অতিনাটকীয়তা ছিল।

দিনের পরিশ্রম শেষে শ্রমজীবী মানুষ ভিড় করতেন এইসব থিয়েটার, সিনেমায়। সেই বোম্বের শ্রমজীবীরা, যাঁরা নৌ সেনাদের সমর্থনে হাতে অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড গড়ে লড়েছিলেন। “যাহাই জনপ্রিয় তাহাই পরিত্যাজ্য” ফর্মুলায় বিশ্বাসী মানুষ বোম্বের ফিল্মকে পাত্তা দিতে চান না। অথচ সেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছিল বামপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মীদের রক্ত মাংস মজ্জা দিয়ে।

এখানেই মেহনতী মানুষের মনের রাজা রফি-কিশোর-হেমন্ত-মুকেশ-মান্নার গুরুত্ব। তাঁদের গানই পারে নয়া উদারবাদের উল্টো পথ দেখাতে, অন্য গানের ভোর তৈরি করতে।

Leave a Reply