সুরমা ঘটক বলতেন, বিজনদা আমাদের পুরোহিত। কথাটা আজ বিজন ভট্টাচার্যের ১০৫তম জন্মদিনে বারবার মনে পড়ছে। দেশটাকেই মা ভাবতেন বিজন-ঋত্বিকরা। স্বভাবতই দেশমাতার মূর্তি দেখা যেত বারবার দেবীগর্জন-এর শেষে। বা ঋত্বিকের ফ্রেমে। ‘যান্ত্রিক মার্কসবাদ’ তা কখনওই মেনে নিতে পারেনি। আর তাই আজ ভুল বামপন্থার যখন ধাক্কা খেতে খেতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, তখন বারবার মনে পড়ছে শ্রী বিজন ভট্টাচার্যকে। মনে পড়ছে, একাধারে অনাপোষী আদ্যন্ত সৎ এই মানুষটিকে ঘিরে ভরানীপুরের রাজেন্দ্র রোডের হরেক গল্প। দিনভর সেখানে চলা রিহার্সাল। নবারুণকে নিয়ে একমাসব্যাপী কাজ করতে গিয়ে এসব গল্প শুনেছি বিজনবাবুর নাট্যদলের সদস্য সুবীর বসু ও নবান্ন দলের শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। কখনও শিবাদিত্য দশগুপ্তর কাছেও। মনে পড়ছে, একই মানুষ মুম্বইতে রাজ কাপুরের নাগিন বা সাড়ে চুয়াত্তর-এর স্ক্রিপ্ট লিখছেন, লিখছেন অনবদ্য সে সব সংলাপ, আবার কখনও তিনি বুনো সাপকে কাবু করছেন বাঁ হাতে। ভেঙে দিচ্ছেন তার বিষদাঁত। এ ঘটনার কথা নবারুণ লিখেছেন তাঁর ‘বাবাকে কখনও হারতে দেখিনি’ লেখায়। বস্তুত নবারুণের হয়ে ওঠার সবটুকু কৃতিত্ব তিনি বিজনবাবুকেই দিয়েছেন বারবার। নিজের গল্পগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন “আমার বাবা বিজন ভট্টাচার্যকে”। আমাদের প্রজন্ম যখন আত্মাহীনতার চূড়ান্ত দ্বন্দ্বে বিপন্ন আজ, তখন নবারুণের সাহিত্যের অন্তর ও অন্দর দিয়ে আমরা স্পর্শ করছি সেই বিজনবাবুকেই, বিজনবাবুই যেন-বা আমাদের হয়ে কোরাপ্ট নেতা ও মন্ত্রীদের দিকে আঙুল তুলে বলছেন, “আই অ্যাকিউজ…”। বলছেন, “রাত কত হল? উত্তর মেলে না?”

‘কবচকুণ্ডল’ ও পরে ‘নবান্ন’ নাট্যদলে বিজনবাবুর নাটকগুলিকে গণনাট্য ধারায় অভিনয় করতেন নবারুণ। নবান্নদেবীগর্জনগর্ভবতী জননীহাঁসখালির হাঁসজিয়নকন্যাচলো সাগরেজবানবন্দীমরাচাঁদ নাটকগুলি ধারাবাহিক পাঠে ফিরে ফিরে আসে দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে এ দেশের। মানুষের জীবনও প্রবহমান। তাই রাস্তা হাঁটার পথে উদ্বাস্তুদের সামান্য সংলাপ শুনেই নবান্ন-র আইডিয়া মাথায় আসে বিজনবাবুর। বাড়ি ফিরেই লিখতে বসে যান। মাত্র ১১ দিনে এ নাটক লিখেছিলেন তিনি। দেশজ প্রান্তিক ঐতিহ্যের শেকড় বারবার ফিরে এসেছে তাঁর কাজে, আগেই বললাম। আজকের চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদের আবহে তাই নতুন ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয় বিজনবাবুর নাটকে। আমাদের লোকায়ত পরম্পরার ভেতরেই জাতির শেকড় ও চেতনা জানতেন বিজন। বর্তমানে বাঙালি অবশ্য বড় বেশি গ্লো-বাল। কখনওই সে এতটা পয়সাওলা ভিখিরি (পড়ুন খচ্চর) ছিল না। আগে তার পয়সা ছিল না, তবু দেওঘর/ঘাটশিলায় বসেই চাঁদের পাহাড় লিখত। এখন পয়সা হয়েছে তাই সপ্তাহান্তে সিঙ্গাপুর গিয়ে হটপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জিতে সে ট্যাটু-শোভিত সেল্ফি দেয়, কিন্তু কি ভীষণ গরিব সেসব! অথচ, সমাজের প্রান্তিক মানুষ; যারা ফুটপাথবাসী, যাদের ম্যানহোলের অন্ধকার গর্তেই চাপা পড়ে থাকে জীবন, তাদের কথা তাদের অবস্থানে দাঁড়িয়েই বলতে চেয়েছেন বিজনবাবু। নবারুণকে বারবারই বলতেন, জীবনে এমন কিছু না করতে যার জন্য রিগ্রেট থাকে। নিজের অবস্থানে একইভাবে আজীবন অনড় ছিলেন বিজনবাবু।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমাদের থিয়েটারের বিবর্তন তো পাশ্চাত্য ধারায় বিকশিত। সেখানে মঞ্চের স্থাপত্যে প্রসেনিয়ম, অভিনেতারা সেখানে স্টারডমের প্রতিভূ। কিন্তু এ কথা আজ সবাই জানি, বিজনবাবু চেয়েছিলেন জনগণের নাট্য জনগণ করুক। আধুনিক শিল্প-সংস্কৃতির দরবারে বারেবারেই এই কমন ম্যানেরা ঢুকে পড়েছে। তা কখনও ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কবিতায় তো কখনও ব্রেখটের এলিয়েনেশান তত্ত্বে। ভূতলবাসীরাই নোটস লিখেছে ইতিপূর্বে ডস্টয়ভস্কির উপন্যাসে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে। বিজনবাবু অবশ্য মানুষকে খুঁজছিলেন লোকায়ত পরম্পরায়। যেভাবে ঋত্বিকও তাঁর ছবির নন্দনতত্ত্বে দেশজ নানা উপকরণ ব্যবহার করেছেন বারবার। একক অভিনেতার গ্ল্যামারের বদলে বিজনবাবু সন্ধান করেছেন মানুষের মিছিল। আজকের দগদগে ঘায়ের মত কালচার ইন্ডাস্ট্রি শব্দবন্ধকে বারেবারে ধাক্কা মেরে নিজের কাজে তিনি পরীক্ষা করেছেন। পদাতিক ছবিতে তাই নকশাল ছেলের সাথে তর্ক করতে করতেও শেষমেশ মিছিলে দেখা যায় তাঁকে। যেমন হাজার চুরাশির মা উপন্যাসে প্রয়াত পুত্রকে খুঁজতে খুঁজতে তার বইপত্রের মধ্যে থেকে পুত্রের নকশালপন্থা সত্য হয়ে ওঠে মায়ের কাছে। আসলে বাজারে আগুন ধরে গেছিল। ভাঙন ধরেছিল পার্টির ভেতরেও। পি সি যোশির স্বপ্ন যে গণনাট্য সংঘ তা ভাঙতে ভাঙতে আলাদা হয়ে পড়ছিলেন বিজন-ঋত্বিক ছাড়াও হেমাঙ্গ-শম্ভু-উৎপল-তাপস সকলেই। এক রকম বিচ্ছিন্নতার কাব্যগাথা যেন-বা গাইছিল সময়। স্বভাবতই সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় রাজেন্দ্র রোডের বাড়িতে বিজনবাবুর সাথে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে লেখেন, বিজনবাবুর বিছানায় গত রাতের “বিজন ও ঋত্বিকের বমির দাগ” লেগে থাকার কথা। মনে পড়ে যায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু মুহূর্ত। মাত্র পাঁচ পয়সার অভাবে তাঁর স্ত্রী ফোন করতে পারেননি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সে মুহূর্তে। মানিক নবান্ন শুনে বলেছিলেন, “আপনি তো জাত চাষা মশাই!” আর মানিকের শিষ্য তথা বিজনের আত্মার আত্মীয় ঋত্বিকের মৃত্যুর পর স্মরণসভায় বিজনের চিরস্মরণীয় উক্তি “ঋত্বিককে খুন করা হয়েছে।” এই বমি ও খুনের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে বিজনবাবুর নাটকগুলি। স্বভাবতই বাড়িতে কেউ উপহার নিয়ে এলে তিনি বলতেন, উপহার দেবেন না। কাজ দিন। শিল্পীর কাজের দরকার।

অভিযোগ, বিজনবাবুর অভিনয়ে মেলোড্রামা রয়েছে। বস্তুত থিয়েটার আর সিনেমাতে একইসাথে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে এ অভিযোগ নতুন কিছু না। কিন্তু এ মেলোড্রামাকে যদি সমকালের উদ্বাস্তু বাস্তবতার প্রেক্ষিতে গণচেতনার স্বাভাবিক উচ্চারণ ভাবি, তবে আধুনিকতার এক নতুন পরত খুলে যায়। স্বয়ং ঋত্বিক তাঁকে এশিয়ার “বিগেস্ট আর্টিস্ট” মনে করতেন। তাই সমকালের “বীভৎস মজা”-র সংলাপ কত সহজে মানিয়ে যায় এই মেলোড্রামার সাথে। নবান্ন যেমন হ্যাঁচকা টানে আধুনিক নাট্যের বয়ান খুলে দিয়েছিল বলে মনে করেন শম্ভু মিত্র। তিনি আরও মনে করেন, কালিদাস বা রবীন্দ্রনাথের পর এ আধুনিকতা একান্তই নতুন। ঋত্বিকও মনে করতেন, জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল এমন প্রযোজনা বাংলাদেশে আগে হয়নি। বিজনবাবুর উত্তরাধিকার হয়তো বা অন্যভাবে আমরা দেখব বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারের মধ্যে। আপাত অর্ডারের বিপরীতে ছন্নছাড়া এলোমেলো চলনে এক নয়া সন্দর্ভ নাটক নবান্ন

বিজনবাবুর ছায়া আমাদের প্রজন্ম আদ্যন্ত দেখেছে নবারুণের ভেতর দিয়ে। নবারুণের সত্তরের স্বপ্নের আগুন পেট্রল দিয়ে নেভাতে চেয়েছিল প্রশাসন। তাতে ফল হয় উল্টো। চুল্লি বার্স্ট করে যায় হারবার্টের। সেই চুল্লির বারুদ ধীরে ধীরে শান্ত শিশ্নের মত নুয়ে পড়ে লোকাল কমিটি হয়ে ৮০ ও ৯০ দশক জুড়ে। সোভিয়েত পতন হয়। এরপর, চায়ের দোকান উঠে দিকে দিকে গজায় স্পা। নাইটক্লাব আর হুক্কা বারে ছেয়ে যায় ইতরের দেশ। তরুণের স্বপ্নে নেমে আসে সানকিসড কাফেতে ম্যানিকুইন। যাঁরা আন্দোলন চেয়েছিলেন, তাঁরা হন মিসফিট। বন্দুকের মুখে বেধে যায় কনডোম-বহুতল-মল-গেটেড কমিউনিটি। জীবন মানে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, হয়ে দাঁড়ায়, আমি-বর-বস-ফেসবুক। এভাবেই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে “বীভৎস মজা”। রাত কত হল, তার উত্তর কি তবে এবার পাব? জানা নেই, শুধু বিস্মিত হয়ে দেখি, বিজনের উত্তরাধিকার কীভাবে ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে পড়ছে নবারুণের কাজে…

আমরা যারা গত দশ বছরে যৌবনের দিনগুলি কাটিয়েছি, যাদের সামনে নন্দীগ্রামের আন্দোলন ছিল, পিছনে ছিল আদর্শবিহীন সাউথ সিটি, যারা ইতিহাসবঞ্চিত হোয়্যাটস্যাপ-ফেসবুকের ধাক্কা প্রথম খেয়েছিল, যারা ডিপ্রেসড আর সাইকটিক একটা প্রজন্ম, বামপন্থার পরাজয় দেখল যারা, অ্যানালগ গিয়ে ডিজিটালের আসা দেখল, দেখল কি দ্রুত বদলে যেতে স্মার্টফোন-হাজার অ্যাপ-ডিজিটাল সমাজ-ভিডিও গেম ছেলেমেয়ে-ঈশ্বর যৌনতা, তাঁদের আইকন ছিলেন নবারুণ। আজ মেনে নিতে দ্বিধা নেই, নবারুণের পরিণতিতে আমরা নতুন ভাবে বিজন-ঋত্বিককে দেখলাম। তাই আমাদের প্রজন্মে জরুরি হয়ে উঠেছিল নবারুণ। তাঁর রাজনীতি-আধ্যাত্মিকতা-সাংবাদিকতা-সাহিত্য-পড়াশোনা-ইতিহাস ও শহর। আর অন্তর্ঘাত। এসবেই কোথাও থেকে গেলেন বিজন। এই সবটা আমাদের দিল ইতিহাসের আশ্রয়ও। বলল, বোকা বুড়ো নবারুণ বিজনের মতই পাহাড় ভাঙছেন। একদিন রাস্তা হবে। হবেই। ডিনামাইট ফাটবে। কবে কীভাবে ফাটবে, তা জানতে এখনও বাকি আছে… আর যেদিন ফাটবে, সেদিন দশ দিন না, দশ হাজার দিন ধরে দুনিয়া কাঁপাবে কমিউনিস্টরা…

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.