আমার মনে হয় বিজন ভট্টাচার্য যেন একজন তপস্বী। নৈরঞ্জনা নদীতীরে গৌতম বুদ্ধ যেমন নির্বিকল্প হয়ে বসেছিলেন, বিজন ভট্টাচার্যকে তেমনভাবে বসে থাকতে দেখেছি। আমার তাঁকে দেখার কারণটা অবশ্য ব্যক্তিগত। তাঁর ছেলে নবারুণ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ওরা তখন ভবানীপুরের চোদ্দ নম্বর রাজেন্দ্র রোডে থাকত। আমি নবারুণের সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়ে বিজনবাবুকে মাঝে মাঝে দেখতে পেতাম। শুভ্র ধুতি পরিহিত, হয়তো দাঁত মাজছেন কি টুকটাক সাংসারিক কাজ করছেন। অথচ এই মানুষটা আসলে আধুনিক ভারতীয় নাটকের স্রষ্টা!

এ কথা না বলে কোনো উপায় নেই। আমাদের সব ছিল। পারিবারিক নাটক ছিল, ঐতিহাসিক নাটক ছিল, মহাকাব্য ছিল। কিন্তু বিজনবাবু যেভাবে নবান্ন নাটকে আমাদের পথে নামিয়ে আনলেন, নাটককে সরাসরি সড়কে নিয়ে এলেন — তা আমরা অনুমানও করতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, দুর্গেশনন্দিনী বাঙালির হৃদয় লুঠ করে নিয়েছিল। উপন্যাসের মত একটা বিদেশি ফর্ম যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে পড়ে আমাদের চমৎকৃত করেছিল, তেমনি নবান্নও এক নতুন আলোকসম্পাত। একে শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষ, অনশনের মঞ্চায়ন বলে পার পাওয়া যাবে না।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এমন একটা মানুষ কি অবহেলায় কাটিয়েছেন! তাঁর মৃত্যুও অবহেলার মধ্যেই। মুক্তাঙ্গনে অভিনয় করতে গিয়ে পায়ে পেরেক ঢুকে গেল। সামান্য কয়েকজন দর্শকের সামনে আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক বিজন ভট্টাচার্য চলে গেলেন। কিন্তু এ নিয়ে একটা কথাই বলার আছে। তা হল শিল্পীকে এইরকম ছদ্মবেশী সম্রাটের মতই জীবন কাটাতে হয়। তাঁর যে সুনির্দিষ্ট রাজনীতি ছিল তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু এটাও লক্ষ করার মত যে বিজনবাবু সেই রাজনীতির কাছ থেকেও তেমন সম্মান পাননি। কারণ দলীয় রাজনীতি সবসময়েই আনুগত্য দাবি করে, আর বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন স্বাধীন মানুষ।

মনে আছে কবি মণীন্দ্র রায় একবার বিজনবাবুকে এই নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেন “এ দেশে এসব প্রত্যাশা থাকলে কবিতা লেখা বা নাটক করা বন্ধ করে দেওয়াই ভাল। তোমার উপায় নেই তাই তুমি কবিতা লেখো, আমারও উপায় নেই বলে নাটক করি। ঋত্বিক যে সিনেমা করে তাও একই কারণে। অন্য কোন উপায় থাকলে করত না। আমরা তো আর কিছু করতে জানি না, তাই করে যেতে হবে। কিন্তু করতে গিয়ে তো আর অন্য দলে নাম লেখাতে পারব না, কারণ এই রাজনীতিটা আমার বিশ্বাসের জায়গা।”

এটাই আসল কথা।

নাট্যদর্শন পত্রিকায় ঋত্বিক ঘটক একবার বলেছিলেন, বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন যে কী করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কী করে সম্মিলিত অভিনয়ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কী করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ড রূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। গিরীশ ঘোষ থেকে শিশিরকুমার ভাদুড়ি পর্যন্ত প্রসারিত যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিনয়, তা প্রথম অস্বীকৃত হল নবান্ন নাটকে এবং তারপর গণনাট্য সঙ্ঘে। এই যে বিজন ইতিহাসের পট পাল্টানোর মুখে বাইরের দ্বন্দ্ব আত্মসাৎ করে নিলেন উচ্চগ্রামের শরীরী অভিব্যক্তি দিয়ে, এটা ঋত্বিক ঘটকের কাছে চিরকাল অবিস্মরণীয় মনে হয়েছে। কিন্তু এত যুগ পরে আমার মতে নবান্ন সম্পর্কে যে মন্তব্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা এমন একজনের, যাঁকে সাধারণত বিজন ভট্টাচার্যের বিপরীত মেরু বলে ভাবা হয়। অর্থাৎ শম্ভু মিত্র। তিনি বলেছিলেন, নবান্নের আগে অব্দি আমাদের সব ট্র্যাজেডিই পারিবারিক ট্র্যাজেডি। নবান্ন এল এপিকের ব্যাপ্তি নিয়ে।

ঠিক কী বলতে চেয়েছিলেন শম্ভুবাবু? তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, বিজনবাবুর প্রধান নাটক নবান্নতে যাকে নাট্য সংহতি বা নাট্য প্রবহমানতা বলে, তা পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। এই নাটক আধুনিকতার মূল ভাষ্যের প্রতি নজর রেখে মুহূর্ত নির্ভর। অনেকগুলো মুহূর্তের কোলাজের মত। দৃশ্যের পর দৃশ্য জুড়ে আছে কান্নার একটি অদৃশ্য সুতো দিয়ে। শম্ভু মিত্র একটা দৃশ্যের উল্লেখ করেছেন, যেখানে কুঞ্জকে কুকুরে কামড়েছে। শোভা কুকুরকে লক্ষ করে ভীষণ চেঁচিয়ে ওঠে। তারপরেই নরম গলায় জিজ্ঞেস করে “জল খাবে? তেষ্টা পেয়েছে?” মহর্ষি মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য এই দৃশ্যকে বলেছিলেন শাশ্বত। এই মুহূর্তের জয়ই নাটকটাকে চিরকালীন করে তুলেছিল। সবচেয়ে বড় কথা নবান্ন কোন নাট্য আখ্যান নয়, নাট্য সন্দর্ভ। এই নাটককে মঞ্চের উপরে যতটা খুঁজতে হবে, মঞ্চের বাইরেও ততটাই।

জীবনের শেষদিকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে এক আলোচনা চক্রে জীবনের শেষ নাটক দেবীগর্জন সম্পর্কে বিজন বলেছিলেন, যে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়ালে ভারতের জনসাধারণ বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়। “The violence of their revolt, I associated with Devi’s garjan — the roar of the angry goddess.” চণ্ডীতে যা পাওয়া যায়। পৌরাণিকতাকে ভারতীয় কৃষকের জীবনসংগ্রামের সাথে জুড়ে দেওয়া বিজনবাবুর অসাধারণ কীর্তি। সেই বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন “I am prepared to accommodate the belief of my people.” এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, উনি একজন মার্কসবাদী হয়ে কী করে দেবীগর্জনের কথা বললেন? ঋত্বিক ঘটক সম্বন্ধেও অনেকসময় এই সমালোচনা করা হয়। এ ব্যাপারে বিজনবাবুর বক্তব্য ছিল, দেশের মানুষ যা বিশ্বাস করে আমি তা একেবারে ফেলে দিতে পারি না। তবে তাকে আমি নতুনভাবে দেখতে পারি। বিজন ভট্টাচার্যের জীয়নকন্যা বা দেবীগর্জন খেয়াল করলে বোঝা যায় এই নতুনভাবে দেখা ব্যাপারটা কীরকম। এইসব নাটকে তিনি ভারতীয় সংস্কৃতিতে ব্রাহ্মণাতিরিক্ত মনীষা কীভাবে কাজ করে তা সন্ধান করেছেন। নবান্ন যখন প্রথম পড়া হচ্ছিল, তখন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। পড়া শেষ হলে বিজনবাবুর উদ্দেশে তাঁর প্রশংসাবাক্য ছিল “আপনি তো জাত চাষা।” বিজনবাবু সারাজীবন এই জাত চাষাদেরই বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাঁর নাটক সাফল্য-ব্যর্থতার ধার ধারে না, কিন্তু আজকাল আন্তোনিও গ্রামশির থেকে ধার করে আমরা যে ন্যাশনাল পপুলারের কথা বলি, ওগুলো সেই ন্যাশনাল পপুলারের খোঁজ করেছে পিয়ের পাওলো প্যাসোলিনি বা ঋত্বিকের সিনেমার মত।

তাঁর লেখা সংলাপ নিয়েও আলাদা করে ভাবা দরকার। তিনি বলতেন, দু মাইল অন্তর অন্তর আমাদের মুখের ভাষা পালটে যায়। এই পালটে যাওয়া তিনি সংলাপে ধরে রাখতেন। একেবারে মূলধারার জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর কাজ লক্ষ করলেও টের পাওয়া যাবে ব্যাপারটা। অনেকেই খেয়াল করেন না যে বিজনবাবু নির্মল দে নির্দেশিত দুটো ছবি — বসু পরিবার (১৯৫২) আর সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩)-এর চিত্রনাট্যকার। এই ছবি দুটো আমাদের আধুনিকতার মাইলফলক। প্রথমটা উত্তকুমারকে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আর দ্বিতীয়টা উত্তম-সুচিত্রার প্রথম হিট ছবি। দ্বিতীয় ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে সংলাপ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে — “মাসিমা মালপোয়া খামু” — তা বিজন ভট্টাচার্যের পক্ষেই লেখা সম্ভব ছিল।

বিজনবাবুর নাটক স্টেজ ছাড়িয়ে দরকার পড়লে একটা সামান্য তক্তপোষ বা ছেঁড়া চটের উপর তৈরি হত। সেই নাটক সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল, হাবিব তনবীর বা বিজয় তেন্ডুলকরের মত সমস্ত বড় বড় নাট্যকার এই নাটকগুলোর সামনে হাঁটু মুড়ে বসতেন। নবান্ন থেকে পরবর্তীকালে ধরতি কে লাল ছবি পর্যন্ত হল।

আসলে আজ বুঝতে পারি নবান্ন, জবানবন্দী-র মত নাটক দলগত নৈপুণ্যকে সম্মুখবর্তী করে। আর বিজনবাবু কখনো নাটকে, কখনো সিনেমায় একা, অনেকটা বিবেকের মত, শ্মশানের দিকে এগিয়ে যান। সুবর্ণরেখা ছবিতে তাঁর সংলাপ ছিল “ঈশ্বর, আমারে একবার কইলকাতায় নিয়া যাবা?” আজকের কলকাতা তো শূন্যতার পরিসর। এই কলকাতা তো হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই কলকাতায় বিজন ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণ অবাক করে। অবজ্ঞাই তাঁর নিয়তি। তাঁর সেই হাই পাওয়ারের চশমা পরে রাসবিহারীর মোড়ে হাঁটার কথা মনে পড়ে। কোথাও এক বিন্দু অহঙ্কার তো ছিলই না, কখনো এ কথাও ভাবতেন না, কবে কাগজে আমার ছবি ছাপা হবে।

অথচ নাটকে তাঁর অবদানের কথা বাদ দিয়ে যদি শুধু সিনেমায় অভিনয়ের কথাও ভাবি, বিশেষ করে ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে তিনি যেসব চরিত্রে অভিনয় করেছেন তা অন্য কারোর পক্ষে করা সম্ভব ছিল বলে হয় না। মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে নীতার বাবার চরিত্রে যে তীব্রতায় বিজন “I accuse” বলেন, বা সুবর্ণরেখা ছবিতে যেভাবে “ঢালো ঢালো ঢালো। মধ্যাভাবে গুড়ং দইদ্যাৎ। মধু না পাইলে গুড় দিবা” বলেন, তাতে অনুভূত হয় উনি গোটা সভ্যতাকে দণ্ডদান করছেন।

আসলে আমার প্রায়ই মনে হয় বিজন এবং ঋত্বিক, দুজনেই এক অর্থে জনতার শিল্পী। সেকথা জনতা হয়তো তখন বোঝেনি, সবসময় গ্রহণ করেনি। কিন্তু ওঁরা জনতার মুখপাত্র হিসাবেই ইতিহাসের কাছে নিজেদের নিবেদন করেছেন।

Leave a Reply