মূল ওড়িয়া – সুরেন্দ্র মোহান্তি

অনুবাদ – মৃণাল চ্যাটার্জী

তাঁরা বারান্দায় নিরাপদ দূরত্বে বসে পান খাচ্ছিলেন। আর তাঁদের সামনে দণ্ডায়মান এক বিরাট পাঁচিলের দিকে তাকিয়ে অভিশাপ বর্ষণ করছিলেন।  এই পাঁচিল সূর্যকে তাঁদের থেকে লুকিয়ে রাখে। দক্ষিণের হাওয়াও পাঁচিল লাফিয়ে কখনও তাঁদের স্পর্শ করতে পারল না আজ পর্যন্ত। পাঁচিলের নিষ্প্রাণ, শীতল ছায়া তাঁদের নিত্য আশঙ্কায় ও উৎপীড়নের ভয়ে ভীত করে রেখেছিল। এ পাঁচিল তাঁদের জন্য ছিল এক অভিশাপ।

প্রতিদিন বারান্দার উপরে বসে পান খেতে খেতে তাঁরা পাঁচিলের উপরে এই ভাবে অভিশাপ বর্ষণ করত। তাঁরা হলেন আমার শহরের বুদ্ধিজীবী! আঁতেল।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পাগলের মতো দেখতে একটা লোক একদিন সেই বারান্দার পাশ দিয়ে যেতে যেতে তাঁদের কাছে থমকে গেল। তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন, “কী চাই? এই পাঁচিলকে দেখছ তো! এই পাঁচিল আমাদের জন্য এক অভিশাপ।”

পাগলের মতো দেখতে সেই লোকটি উত্তর দিল, “এ পাঁচিলকে আমি ভেঙে দেব। এখান থেকে হটিয়ে দেব। এখান থেকে দূর করে দেব।”

সেই কথা শুনে বুদ্ধিজীবীরা পান খাওয়া ছেড়ে, তার খুব তারিফ করলেন। তার নামে জিন্দাবাদও দিলেন। একটা ফুলের মালাও তার গলায় ঝুলিয়ে দিলেন।

একদিন সকালে সেই পাগল, প্রভাতের সূর্যকে নমস্কার করে দুহাতে পাঁচিলকে ঠেলতে লাগল। ওদিকে তাঁরাও বারান্দা থেকে নিচে নেমে পাগলের পিছনে দাঁড়িয়ে তাকে পিছন থেকে ঠেললেন। সাহায্য করার চেষ্টা করলেন। তার নামে জয়ধ্বনিও দিলেন। পাঁচিল কিন্তু একটুও নড়ল না।

এভাবে কিছুদিন পরে পাগলকে যারা পিছন থেকে ঠেলছিল, সেই বুদ্ধিজীবীদের চোখের ভুল ছিল, কী সত্যিই তাঁরা লক্ষ্য করলেন, যে পাঁচিলের পাথরের মুখে ফুটে উঠেছে ভ্রূকুটি।

তাঁরা ত্রাহি ত্রাহি রবে এক এক জন করে আবার সেই বারান্দার নিরাপত্তার ভিতরে ফিরে এলেন। আর পান খেতে খেতে নিজেদের ভিতরে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, “বুঝলে, আমরা হলাম দর্শকের জাতি। ষাঁড়ের লড়াই থেকে নেতার লড়াই, ফুটবল ম্যাচ থেকে ক্রিকেট ম্যাচ, ফিল্মস্টার থেকে ক্রিকেট স্টার, সবাইকে আমরা ভিড় করে, ঠেলাঠেলি করে দেখি। তাদের উপর পাণ্ডিত্যপূর্ণ টিকা টিপ্পনি করি। আমরা হলাম দর্শকের জাতি। সেই জন্য বোধহয় পণ্ডিতরা আমাদের দেশকে দার্শনিকের দেশ বলেন। এ নিয়ে তাঁরা তো বইও লিখেছেন। পাগলের পাগলামিতে আমাদের কী! এসবে আমরা কেন নাক গলাই। এসো, আমরা এখানে বসে পাগলের কাণ্ড দেখি, আর টিকা টিপ্পনি দিই। লিখিও।”

পাথরের পাঁচিলের সঙ্গে লড়াইতে পাগলের কিন্তু বিরাম নেই। মাঝে মাঝেই তাকে প্রেরণা দেওয়ার জন্য বুদ্ধিজীবীরা তার জন্য জিন্দাবাদ ধ্বনি দেন, হাততালি দেন। লড়ে লড়ে ক্রমে সে পাগলটির দুই বাহু অবশ হয়ে গেল। দাঁড়িয়ে থাকার জন্য পায়ের মাংসপেশী আর শক্তি পেল না। তবুও সে মাটির উপরে বসে পাঁচিলের গায়ে নিজের মাথা ঠুকতে লাগল। পাগলের এই বীরত্ব দেখে, বারান্দার উপরের লোকেরা হাততালি দিলেন। সত্যিই তো, এ এক শহীদ সুলভ বীরত্ব! পাগল পাঁচিলের গায়ে মাথা ঠুকে ঠুকে রক্তাক্ত হয়ে গেল। বুদ্ধিজীবীরা আরও জোরে জোরে হাততালি দিলেন। একটা দুটো জিন্দাবাদ ধ্বনিও। সব রক্ত শরীর থেকে নিঃসৃত হয়ে যাওয়ার পরে পাগলের হৃদপিণ্ড মাটির উপর লুটিয়ে পড়লো। পাগলও মাটির উপরে লুটিয়ে পড়লো।

বারান্দার উপরের এক বুদ্ধিজীবি বললেন, “ওঠো হে। এই বিশাল প্রাচীর হল মেঘনাদ প্রাচীর, লেভিয়েথান! এই পাগলটা ওকে ভাঙবে? আমি তোমাকে প্রথম থেকে বলছিলাম, লোকটা একটা মূর্খ।” আরেকজন বললেন, “আমি জানতাম, পাগলের শেষে এই গতিই হবে। চলো চলো। খেলা শেষ হয়ে গেল।”

তাঁরা উঠে গেলেন।

শহরে এসেছেন হাজি মাস্তান, বচ্চন আর খান্না। তাদের দেখা আর তাদের ভাষণ শোনার ভিড়। আমি অবশ্য ওদের সঙ্গে ছিলাম না। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আমি প্রাচীর আর পাগলের লড়াই দেখছিলাম। পাগলের প্রতি আমার সম্মান ও শ্রদ্ধা আরও বাড়ছিল। তার মৃত্যুতে আমি আহা আহা করলাম। একজন শহীদ আত্মবলি দিল বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব জোর গলায় চিৎকার করলাম। এক মুঠো ঘাসফুল তুললাম। পাগলের মৃতদেহের উপরে ছড়িয়ে দিলাম।

কিন্তু আমার হঠাৎ মনে পড়ল, গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের কথা। এথেন্সের লোক সক্রেটিসকে এক বিপজ্জনক পাগল বলে ধরে নিয়ে তাঁকে হেমলক বিষ পান করিয়ে দিল। মৃত্যু অবধারিত। সক্রেটিসের প্রাণবায়ু যখন উড়ে যাওয়ার উপক্রম, তাঁর প্রিয় শিষ্য তাঁর শয্যার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার মৃতদেহ আমরা কীভাবে সৎকার করবো?” সক্রেটিস ক্ষীণ, মুমূর্ষু কণ্ঠে উত্তর দিলেন, “আমার আত্মা কোথায় গেল, তাকে যদি আটকাতে না পারো, জানতে না পারো, চিনতে না পারো, তাহলে আমার মৃতদেহকে যেমন ইচ্ছে তেমন সৎকার করো। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”

এই তথাকথিত পাগলের মৃতদেহকে মেথর তার ঠেলা গাড়িতে উঠিয়ে নিলেও ক্ষতি কী! তার জন্য বেদমন্ত্র পাঠ, চন্দন কাঠের চিতা এসব না হলেও চলবে। আমি ঘাসফুলগুলো নিচে ফেলে দিলাম। এ হয়ত তার প্রতি অসম্মান হবে।

শহরে এসেছেন হাজি মাস্তান, বচ্চন আর খান্নারা। দেশভক্তি সম্পর্কে ভাষণ দেবেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা চলেছেন, তাঁদের বক্তিমে শোনার জন্য। ওয়াকিং স্টিকের উপরে একটু নুয়ে। চিন্তা ও ভাবনায় তাঁরা নুয়ে পড়েছেন। কিন্তু সত্যি কথা হল, বারান্দায় বসে বসে তাঁদের মেরুদণ্ডটি দুর্বল হয়ে গেছে।

পাগলের মৃতদেহ থেকে একটু দূরে ঘাসের উপরে চিত হয়ে শুয়ে পড়লাম আমি। হয়ত, অন্য কোনও পাগল আসবে। এই অপেক্ষায়।

 

[ওড়িয়া সাহিত্যিক, সম্পাদক, রাজনীতিক এবং চিন্তাবিদ সুরেন্দ্র মোহান্তির জন্মশতবর্ষ শুরু হয়েছে ২১ জুন ২০২১। তিনি সংবাদ ও কলিঙ্গ — এই দুটি কাগজের সম্পাদনা করেছেন। ছাত্রাবস্থায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে লোকসভা ও রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। ওড়িশা ও কেন্দ্রীয় সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সুরেন্দ্র মোহান্তি এক ডজনের বেশি উপন্যাস ও ছোট গল্পের বই লিখেছেন। সংবাদ কাগজে ‘শেষস্তম্ভ’ নামে একটি সাপ্তাহিক কলাম তিনি লিখতেন। উপরের লেখাটি ৩ মে ১৯৮৭ সালের শেষস্তম্ভ কলামের অনুবাদ। অনুবাদক ভারতীয় জনসঞ্চার সংস্থান, ঢেঙ্কানলের পূর্বাঞ্চলীয় অধিকর্তা]

Leave a Reply