বাঙালি আজকাল সেইসব ছবিই দেখে যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন, নাগরিককে বললেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে শতবর্ষ পার হওয়া সত্যজিৎ রায়ের ছবি নিয়ে কথা বলার জন্য সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের চেয়ে যোগ্যতর লোক পাওয়া দুষ্কর। তা বলে তাঁর সাথে কথা বলতে বসে সিনেমার গণ্ডিতে আটকে থাকলে ভুল হয়। তিনি আসলে বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বিনাশের একজন একনিষ্ঠ পাঠক। তাই তাঁর সত্যজিৎ আলোচনা কেবল সেলুলয়েডে আটকে থাকে না। নাগরিক ডট নেটের পক্ষ থেকে কিছু প্রশ্ন পেশ করে আলোচনা উপভোগ করলেন প্রতীক

সঞ্জয়দা, আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে অন্ধ ধর্মবিশ্বাস আর বিজ্ঞান প্রায় সম্মুখসমরে। সেই প্রেক্ষিতে সত্যজিতের বিজ্ঞানমনস্কতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? মানে দেবীমহাপুরুষ বা গণশত্রু ছবিতে দেখি ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর স্পষ্ট অবস্থান। আবার তাঁর গল্পগুলোতে, এমনকি প্রফেসর শঙ্কুর মত কল্পবিজ্ঞানের গল্পেও, অনেক অলৌকিক ঘটনা রয়েছে। সেগুলোকে কিন্তু সবসময় অসম্ভব বা বুজরুকি হিসাবে দেখানো হয়নি।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই প্রশ্নটার উত্তরে প্রথমেই বলব, সত্যজিৎ রায় নিজে রসিকতা করে বলতেন যে তিনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না, কিন্তু ভূতে বিশ্বাস করেন। যে ধরনের অলৌকিকতা বা ব্যাখ্যার অতীত কিছু ঘটনা তিনি দেখেছেন, সেগুলো সাধারণ সংস্কারের মত তাঁর মধ্যে কাজ করেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সত্যজিৎ রায় একজন যুক্তিবাদী। ব্যাপারটা অপরাজিত ছবিতে প্রথম দেখা যায়। অপু স্কুলে গিয়ে প্রথম দেশ শব্দটার মানে জানল। তারপর ইন্সপেক্টর তার প্রশংসা করে গেলেন, হেডমাস্টার তাকে লিভিংস্টোনের ভ্রমণ বৃত্তান্ত দিলেন, বাইরের বই পড়ার উৎসাহ দিলেন। এরপর সে বাড়িতে সাইফনের পরীক্ষা করছে, গ্রহণ যে রাহু কেতুর ব্যাপার নয়, চন্দ্র সূর্যের বিশেষ অবস্থানের ফলে হয় — সেটা মাকে বোঝাচ্ছে। অপু প্রথম ভাষার রহস্য (মেটাফর, মেটোনিমি ইত্যাদি) জানছে, ল্যাবরেটরি দেখছে। অর্থাৎ সত্যজিতের স্বাধীনোত্তর দেশে আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলার যে অভিপ্রায়, তার মধ্যে সবসময়েই থাকছে ধর্মমুক্ত যুক্তিবাদের উন্মোচন, যার উৎস আমরা ইউরোপের রেনেসাঁয় পাই। আমাদের দেশে এই যুক্তিবাদের আগমন উনিশ শতকে। সত্যজিৎ এমন একটা পরিবারের সদস্য ছিলেন, যেখানে আমরা উনিশ শতক বলতে যা বোঝাই তার সমস্তটাই ছিল। কেবল উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার এবং সত্যজিৎ নয়, মনে রাখতে হবে কলকাতার বাইরে যে ক্রিকেট খেলা হত ময়মনসিংহে, তারও উদ্গাতা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোরেরই এক ভাই সারদারঞ্জন রায়। ফলে ইউরোপিয় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রথম যুগের সত্যজিতের মধ্যে খুবই সক্রিয়।

দেবী ছবিতে শুধু যে অন্ধ কুসংস্কার কোন অভিশাপের জন্ম দিতে পারে, কীভাবে এক ধরনের ফিমেল হিস্টিরিয়ার উৎপত্তি হতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন শুধু তা-ই নয়, ভারতীয় সম্পর্কের বিন্যাস দেখানোর ক্ষেত্রেও তিনি প্রায় বিপ্লবী। শ্বশুরমশাইয়ের পায়ে দয়াময়ী তেল মাখিয়ে দেওয়ার পরে, ফ্রয়েডিয় প্রতিস্থাপনের তত্ত্ব মেনেই সত্যজিৎ দেখান যে সেই রাত্তিরেই শ্বশুরের স্বপ্নে মা কালী দেখা দেন। আসলে পুত্রবধূর শরীর স্পর্শে যদি কোন সুখানুভূতি হয়, তা আমাদের সচেতন নীতিবোধকে আঘাত করে। তার প্রতিক্রিয়াতেই কালী দর্শন। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে পারি না, যে গণশত্রুহীরক রাজার দেশে বা মহাপুরুষ ছবিতে, তিনি যে কেবল আচারগুলোর মধ্যেকার সংস্কারান্ধতাকে আক্রমণ করছেন, তা নয়। ধর্ম আরো বড় জিনিস। বিশেষত ভারতবর্ষে ধর্ম, অন্তত হিন্দুধর্ম, একটা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। এটা কোন বাঁধাধরা ধর্ম নয় এবং সেই কারণেই সেখান থেকে বিপদের সম্ভাবনাও বেশি। সত্যজিৎ সারাজীবনই এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর প্রগতি চিন্তায় কোন খাদ ছিল না।

আসলে আমার মনে হয় সমস্যার জায়গাটা হল আমাদের উনিশ শতকীয় প্রগতি চিন্তা। তাকে নবজাগরণ বা অন্য যে নামেই ডাকুন, তার মধ্যে এক ধরনের দ্বৈততা (ambiguity) ছিল। আমরা যেমনভাবে বাইরের জগতের প্রগতির কথা ভেবেছিলাম, তেমনভাবে অন্তর্জগতের প্রগতির কথা ভাবিনি। এটা ঠাকুর পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য, কেশবচন্দ্র সেনের পরিবারের ক্ষেত্রে সত্য, এমনকি বিদ্যাসাগরের পরিবারের ক্ষেত্রেও সত্য। আমাদের পরিবারের নারী সদস্যদের উন্নতি এবং পুরুষ সদস্যদের মানসিকতার মধ্যে বিরাট পার্থক্য থেকে গেছে। এই স্ববিরোধটা আমার মনে হয় উনিশ শতকের ঐতিহ্য যাঁরা বহন করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছে। সত্যজিৎ রায়ও সেই সমস্যা থেকে মুক্ত নন।

আপনি বললেন সত্যজিতের মধ্যে উনিশ শতকের মনীষা ছিল। তা ইদানীং অনেকেই যে বলছেন সেই সময়ের সমস্ত অর্জন আমরা বাঙালিরা হারিয়ে ফেলছি, তাহলে ঐ মনীষার অংশ হিসাবে সত্যজিতের ছবিও কি অদূর ভবিষ্যতে বাঙালির কাছে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

আপনি তো ভিমরুলের চাকে ঢিল মারলেন। দেখুন, বাঙালিরা অনেক বানানো সত্যের মধ্যে বাস করে। চলচ্চিত্র আমার ভাত কাপড়ের জোগান দেয় বলেই আমি জানি যে সত্যজিৎ রায়ের ছবি সত্যি সত্যি কতটা দেখা হয় আজকাল। সত্যজিৎ রায়ের ছবি বলতে আজকের বাঙালি মধ্যবিত্ত, মানে আমার আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কোন ছবিগুলো বোঝে? শেষ তিনটে ছবি — গণশত্রু, শাখা প্রশাখা, আগন্তুক; ফেলুদার ছবিগুলো — সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথ এবং একটা ছোটদের জন্য ছবি — গুপী গাইন বাঘা বাইন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের যে ঐতিহাসিক পর্ব, যখন তাঁর শিল্প শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেছে, অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের পথের পাঁচালী থেকে ১৯৬৪ সালের চারুলতা পর্যন্ত, সেই ছবিগুলো কজন দ্যাখে? এমনকি তাঁর যে বিখ্যাত শহর ত্রয়ী — জনঅরণ্য, সীমাবদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বী — যেখানে অপূর্ব কুমার রায়ের মধ্যে দিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে নাগরিকের যে পুনর্নির্মাণ সত্যজিৎ রায় করেছিলেন, সেই ধারণাকে তিনি নিজেই প্রশ্ন করেছেন, সেই ছবিগুলোই বা কতটা দেখা হয়?

অপরাজিত ছবির অপু গ্লোব হাতে কলকাতা শহরে পা দিয়েছিল এবং হ্যারিসন রোডের দিকে তাকিয়েছিল। আর প্রতিদ্বন্দ্বী ছবির সিদ্ধার্থ যখন গ্র্যান্ড হোটেলের সামনে থেকে বা লিন্ডসে স্ট্রিটের সামনে থেকে একটি অবলিক অ্যাঙ্গেল ক্যামেরায় একজন তরুণীর বক্ষদেশের প্রতি তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। যদি ভাবা যায় বাঙালি যুবকের অপূর্ব থেকে সিদ্ধার্থে রূপান্তর হল। বা শ্যামলেন্দুতে রূপান্তর হল, যে চাকরিতে উন্নতির জন্য খুনের অভিপ্রায় বহন করতে পারে। সোমনাথের কথা ভাবুন। যুবক অপূর্ব গ্লোব হাতে বিশ্ববোধের শরিক হতে চেয়েছিল। সেই যুবকের স্বপ্ন এমনভাবে ভেঙে গেল, যে সে সোমনাথ হয়ে নৈশ অভিযানে মেয়েমানুষের সাপ্লায়ার হয়ে গেল। সত্যজিতের এই যে স্বপ্নের নির্মাণ এবং স্বপ্নভঙ্গ, এখানেই তিনি শিল্পী হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন। অথচ এইসব ছবি আজকাল বড় একটা কেউ দেখে না। চারুলতা, দেবী, কাঞ্চনজঙ্ঘা কেউ দ্যাখে? অভিযান ছবিটা কবে কে শেষ দেখেছে? অপরাজিত ছবিটা তো প্রায় দেখাই হয় না। পথের পাঁচালীই বা কতটা দেখা হয়? দেখা হয় সেইসব ছবি, যেখানে সত্যজিৎ রায় ঈশপের গল্পের মত নীতিবাক্য প্রচার করেন। তখন সত্যজিৎ রায়ের শরীরও খারাপ হয়ে গেছে। তাই এই ছবিগুলো নেহাতই সামাজিক অনুশাসনের দায়িত্ব নেয়।

সঞ্জয়দা, আপনার কি মনে হয় সত্যজিতের কাজ নিয়ে চর্চা করার বদলে, তাঁর দর্শন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার বদলে, তাঁর আবহসঙ্গীতকে রিংটোন বানিয়ে, ছবির ব্যর্থ রিটেলিং করে বা যেখানে সেখানে সেগুলো থেকে এক-আধটা সংলাপ গুঁজে দিয়ে আমরা রবীন্দ্রপুজোর মত সত্যজিৎ পুজো শুরু করে দিয়েছি?

আসলে আমাদের বিয়ের দিন যেমন ঠাকুর্দার ছবি বার করা হয়, কারণ আমাদের একটা বংশপরিচয় আছে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী বা অপরাজিত সেই ধরনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ দ্যাখে না, কিন্তু সবাই জানে ওগুলো ক্লাসিক। এমনও বলা চালু হয়েছে যে সত্যজিৎ রায় আজ আর প্রাসঙ্গিক নন। আজকাল টিভিতে এমন সব অলৌকিক মেগা সিরিয়াল চলে, যা দেখে ভূতেদেরও গা ছমছম করবে। তার গল্পগুলো সপ্তদশ শতকেও অবাস্তব ছিল। কিন্তু সেগুলো যে চলছে, তার মানে এগুলোর সামাজিক অনুমোদন আছে। তা এমন সমাজের তো সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখার কোন কারণ নেই। তিনি একটা উপলক্ষ মাত্র। তাঁর যে ছবিগুলো দেখা হয়, সেগুলো একটা বার্তা পাওয়ার জন্য। যেমন আগন্তুক বা হীরক রাজার দেশে। এগুলো জনপ্রিয় কেন? কারণ এগুলোতে এমন বার্তা রয়েছে, আমাদের মনের দুর্বলতা, ভীতি থেকে যেগুলোর প্রতি আমরা সমর্থন আশা করি। “দড়ি ধরে মারো টান/রাজা হবে খানখান” বলে যে বিদ্রোহ, তা আমাদের সহজে ইচ্ছাপূরণের সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। মনমোহনবাবু বাইরে থেকে এসে আমাদের হঠাৎ ভাল করে দেন, আমরা ভাবি যে আমরা বাঙালিরা আবার হঠাৎ একদিন জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লব। পরিশ্রম, মেধা এবং ধীশক্তির কোন প্রয়োজন নেই।

বাংলায় ইদানীং গোয়েন্দা গল্প নিয়ে বহু নির্দেশক ছবি, ওয়েব সিরিজ ইত্যাদি করছেন। অথচ সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র ফেলুদাকে নিয়ে তিনি নিজে দুটোর বেশি ছবি করেননি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশকে নিয়েও তিনি ‘চিড়িয়াখানা’ করেছিলেন অনেকটা দায়ে পড়ে। অথচ তিনি তো রহস্য গল্প লিখতে ভালবাসতেন। ছবি করার ক্ষেত্রে এই অনিচ্ছা কেন সেদিকটায় যদি একটু আলোকপাত করেন।

আসলে কী জানেন, সত্যজিৎ রায়ের সময়ে, এমনকি সত্তরের দশকেও, বাঙালি স্থিরতার প্রতীক ছিল। ফেলুদা রহস্য অনুসন্ধান করত এবং রহস্যভেদ করত। ছোটদের জন্যে লেখা সত্যজিৎদের পরিবারে বংশ পরম্পরায় চলেছে। উপেন্দ্রকিশোর লিখেছেন একেবারে শিশুদের জন্য, সুকুমার রায় লিখেছেন অনতি কিশোরদের জন্য, আর সত্যজিৎ লিখেছেন যারা প্রায় স্কুলের শেষ ধাপে — তাদের জন্য। ফেলুদার গল্পগুলো মূলত কিশোরপাঠ্য, ফলে প্রায় স্ত্রী চরিত্র বর্জিত। কিন্তু আজ যে গল্পগুলো নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে, সেগুলো এক ঈশ্বর পরিত্যক্ত সমাজের লক্ষণ।

এই সমাজের মানুষ সামাজিক সংলাপের জন্য অন্য কোন এজেন্সির দ্বারস্থ। রাষ্ট্রাতিরিক্ত কাউকে তার দরকার। রাষ্ট্র স্বাধীনতার এই সত্তর-আশি বছর পরে আর খুব একটা নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ বলে মনে হচ্ছে না আমাদের। স্বাধীনতার প্রথম প্রতিশ্রুতি ফিকে হয়ে গেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে আমরা ঈশ্বরকে নির্বাসন দিয়েছি। কবচ, তাবিজ, শেকড় হিসাবে বা আমাদের ভাষার ব্যবহারে যতটা ঈশ্বরকে কাজে লাগাই, তত কিন্তু বিশ্বাস হিসাবে কাজে লাগাই না। আজকের নিরীশ্বর মানুষ, জীবনানন্দ দাশের ভাষায় “মানুষ কাউকে চায় — তার সেই নিহত উজ্জ্বল / ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল”। রাষ্ট্র এবং ঈশ্বর যদি অশক্ত হন, তাহলে নিরাপত্তা পেতে আমাদের একটা মধ্যস্থ এজেন্সি দরকার। সেই এজেন্সিটা কে? সেটা হল রাষ্ট্রাতিরিক্ত চরিত্র — গোয়েন্দা। মনে রাখবেন, গোয়েন্দা কিন্তু পুলিস নয়। সে অপরাধ আটকানোর দায়িত্ব নিতে পারে না, কিন্তু অপরাধের সমাধান করে দেয়। বাকি কাজ পুলিস করে।

অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে হঠাৎ যে বিত্তস্ফীতি মধ্যবিত্তদের মধ্যে, তারপর খবরের কাগজ পড়লেই বোঝা যায়, আমাদের অপরাধেরও মাত্রা বদল ঘটে গেছে। এখন কলকাতা শহরে যে ধরনের অপরাধ হয়, এমনকি যৌন অপরাধ হয়, সেগুলো আগে হত না। এই সমাজ কার কাছে দায়বদ্ধ থাকতে চায়? সে সেলফ জাস্টিসের ভাবনায়, আত্মসমর্থনের জন্য, এমন একজনকে খুঁজে নেয়, যে তার হয়ে এই কাজটা করে দেবে। বাঙালি এমন এক সমাজ গড়ে তুলেছে, যেখানে অন্য কিছু ভাবার জায়গা নেই।

তবে দুঃখের বিষয়, স্রেফ ক্যামেরা দক্ষতা বা সম্পাদনা দক্ষতার দিক থেকেও সত্যজিৎ রায় অন্য পর্যায়ের শিল্পী ছিলেন। এখনকার এঁদের কোন দক্ষতাই নেই। আমি যখন রূপকলা কেন্দ্রের প্রধান ছিলাম, সেখানে সৌমেন্দু রায় পড়াতেন। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন “যা অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে সঞ্জয়, তাতে তুমি ক্যামেরা চালাচ্ছ, না সুব্রতদা (সুব্রত মিত্র) ক্যামেরা চালাচ্ছেন, বোঝা যাবে না। কারণ ডিজিটাল ক্যামেরা সেলফ কারেক্টিং মোডে চলে। যেমন এডিটিং সফটওয়্যার সবটাই নিজেই করে নেয়। ফলে এখনকার ছবিগুলোতে আপনি ঝলসানি পাচ্ছেন। ঝলসানি মানে কিন্তু সিনেমার উৎকর্ষ নয়। ভারতীয় সমাজ যেভাবে বিবর্তিত হচ্ছে, আপনি বাংলা ছবিতে তার কোন প্রমাণ দেখতে পান? এমনকি নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের আন্দোলন নিয়ে যারা গর্ব করে, তারাও কি বাংলা ছবিতে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুরের কোন প্রভাব দেখাতে পেরেছে? পারেনি।

আচ্ছা, খুদে পাঠকদের পক্ষ থেকে একটা প্রশ্ন। সত্যজিৎ প্রফেসর শঙ্কুর গল্প নিয়ে ছবি করেননি কেন?

যে কোন ছবি বানানোর ব্যাপারেই সত্যজিৎ রায়ের একটা জোরালো বিশ্বাস ছিল। আমরা সবাই যদি সেই বিশ্বাসের শরিক হতে পারতাম, তাহলে বাংলার চলচ্চিত্র শিল্প আজকের গাড্ডায় গিয়ে পড়ত না। সত্যজিৎ মনে করতেন, কেউ যদি তাঁকে ছবি করতে টাকা দেন, তাঁর একটা ন্যূনতম রিটার্ন পাওয়া উচিৎ। ফলে তিনি প্রথম থেকেই খুব কম বাজেটে ছবি করার কথা ভাবতেন। তাঁর মার্কেট কারা? প্রধানত বাঙালি মধ্যবিত্ত। তাই এদের রুচি অনুযায়ীই তিনি ছবি বানাতেন এবং কম খরচে বানাতেন। ছোটরা সঙ্গতভাবেই জানতে চাইতে পারে তিনি শঙ্কুকে নিয়ে কেন ছবি করলেন না? আমি যোগ করব, সত্যজিৎ রায় নিজে তো ঘনাদার গল্পের খুব ভক্ত ছিলেন। তা নিয়েই বা কেন ছবি করলেন না? এই গোটা জগৎটাকেই উনি বাইরে রাখলেন কেন? উত্তরটা সোজা। আসলে ঘনাদা বা প্রফেসর শঙ্কুতে যে টেকনিকাল এফেক্ট দরকার, সেই এফেক্ট আনতে সত্যজিৎ রায়কে যে প্রবল পরিশ্রম এবং খরচ করতে হত, তা আজকের বাঙালি পরিচালক ভাবতে পারে না। সে তো বিভূতিভূষণের গল্প নিয়ে ছবি করতে আফ্রিকায় চলে যেতে পারে। সে হনুমান টুপি পরে নরওয়েতে বসে থাকে। সেই সময়ে এই পরিমাণ খরচ সত্যজিৎ রায়ের সাধ্যের বাইরে ছিল।

প্রযোজকদের ব্যাপারটাও মনে রাখতে হবে। আর ডি বনশল কিন্তু এমন ব্যবসা করতেন যার ব্যালান্স শীট হয়, অডিট রিপোর্ট হয়। আজকাল কিছু রহস্যজনক বিনিয়োগকারী হয়েছে বাংলা সিনেমায়। তাদের টাকা কোথা থেকে আসে, তারা কেন বিনিয়োগ করে, করতে না পারলে কোথায় চলে যায় — কেউ বলতে পারবে না। গত দশ-পনেরো বছরের বা পুরো একুশ শতকেরই এই ইতিহাসের হদিশ কোন সেন্ট্রাল বা স্টেট এজেন্সির কাছে নেই।

শেষ প্রশ্ন। লেখক হিসাবে সত্যজিৎ রায়কে আপনি কোনখানে রাখবেন? প্রশ্নটা করছি কারণ শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত হলেও অশোক মিত্রের মত মানুষ লিখেছেন “আমার গলা কেটে ফেললেও বলতে আদৌ সম্মত হব না যে সত্যজিৎ তেমন বাংলা গদ্য লিখতে জানতেন।”

নিরপেক্ষভাবে বলছি, অশোক মিত্র সমগ্র বাংলা সাহিত্যের কথা ভেবে লিখেছেন এবং এটা আংশিক সত্য। তিনি খুব ভুল বলেননি, তবে একটু নির্দয় হয়েছেন। কারণ তাঁর মাথায় হয়ত ছিল সাহিত্য রচনায় সত্যজিতের পারিবারিক ঐতিহ্য। তাঁর বংশের শিশুসাহিত্যিকরা যে মানের, ধরুন সুকুমার রায় বা লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় সেই মানের সাহিত্যিক ছিলেন না। যদিও তিনি দাবি করতেন সাহিত্য তাঁর রক্তে, সিনেমাটাই বরং আমদানি। আসলে সিনেমাই পেশা হওয়ার কারণে সত্যজিতের যে কোন গল্পেই দৃশ্য খুব গুরুত্ব পেত। দার্জিলিং জমজমাট, গ্যাংটকে গন্ডগোল বা বাদশাহী আংটি পড়লে দেখবেন দার্জিলিং, গ্যাংটক এবং লখনৌ ঘোরার জন্য কোন টুরিস্ট বোর্ডের গাইডবুক লাগবে না। একেবারে চিত্রনাট্যকারের ভঙ্গিতে, ক্যামেরা মুভমেন্ট যেভাবে হবে, সেভাবে সত্যজিৎ লিখতেন। কিন্তু শুধু চোখ তো সাহিত্য তৈরি করে না, অন্য অনুভূতিগুলোও করে। সত্যজিৎ সেগুলোর দিকে নজর দেওয়ার সময় পাননি। এটা সত্য। আবার তাঁর জনপ্রিয়তাও এই কারণেই। সত্যজিতের লেখা পড়লে ভাবতে হয় না।

সুকুমারের আবোল তাবোল কিন্তু মহত্তর সৃষ্টি, কারণ তার মধ্যে অনেক ভাবনার জায়গা আছে। আপনি প্রথম পড়ার সময় খুব মজা পাবেন, কিন্তু ক্রমশ বুঝতে পারবেন অনেক গভীরতর ভাবনা আছে লেখাগুলোর মধ্যে। সত্যজিৎ রায়ের লেখা শুধুই পড়ার আনন্দে পড়ার জন্য। যেন তরতর করে গাড়ি চলছে স্টেশনে না থেমে। এগুলো রেল যাত্রায় বা বড় প্লেন যাত্রায় নিখুঁত সঙ্গী হতে পারে। কিন্তু এমন নয় যে এগুলো মানুষের মনে স্থায়ী হতে পারে। সে চেষ্টা সত্যজিৎ করেনওনি। দৈবাৎ তাঁর ছবি তেমন না চললে তিনি বইগুলোর রয়্যালটি থেকে অনেক লাভ করতেন।

এই প্রসঙ্গে বলি, পরিচালক হিসাবে তাঁর পারিশ্রমিক কিন্তু খুব কম ছিল। আজকের পরিচালকরা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন যে সেদিনকার হিসাবে তাঁদের আজকের পারিশ্রমিকের চার ভাগের এক ভাগও সত্যজিৎ কোনদিন নেননি। যখন তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, তখনো।

সত্যজিৎ রায় – জন্ম শতবর্ষ (ছবি  Wikipediaথেকে)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.