গত কয়েকদিন ধরে দক্ষিণ এবং পশ্চিম ইউরোপের একাধিক দেশ প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের জেরে অতিষ্ঠ। ফ্রান্সে জ্বলে গিয়েছে আশি বর্গমাইল অরণ্য, বিষাক্ত ধোঁয়ার থেকে বাঁচতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রায় সাঁইত্রিশ হাজার মানুষকে। ব্রিটেনের দমকল বাহিনীকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত ব্যস্ত কখনো থাকতে হয়নি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার পক্ষে অনুপযোগী প্রযুক্তি নির্মিত বহু বাড়িতে আগুন লেগে গেছে। গলে গেছে বিমানবন্দরের রানওয়ে, রাস্তার পিচ, আহত হয়েছেন দমকলকর্মীরা, শুধু ১৯ জুলাই মঙ্গলবারেই লন্ডনের দমকল বিভাগে আড়াই হাজারের বেশি ফোন এসেছে। ওই সপ্তাহের পরের দিকে ব্রিটেন, উত্তর ফ্রান্স, ও জার্মানির তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় হয়ে এলেও গ্রীস, স্পেন, পর্তুগাল ও দক্ষিণ ফ্রান্সে তাপপ্রবাহ এখনো প্রশমিত হয়নি।

উত্তর-পশ্চিম ভারত অথবা মধ্য এশিয়ার দেশগুলো চল্লিশ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় অভ্যস্ত হলেও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ এ ধরনের আবহাওয়ায় এখনো ততটা সড়গড় নয়। গত কয়েকটা গ্রীষ্মে ইউরোপে তাপপ্রবাহ ও দাবানলের ঘটনা অস্বাভাবিক দ্রুত হারে বেড়েছে এবং ক্রমবর্ধমান বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষাকৃত শীতল জলবায়ুর দেশগুলোতেও এই খরগ্রীষ্ম আরও প্রত্যাশিত হয়ে উঠছে। উচ্চ অক্ষাংশের শুকনো আবহাওয়ার কারণে তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনাও। শুকনো জলবায়ুতে মাটির আর্দ্রতার পরিমাণ কম থাকায় মাটি ও গাছপালার তাপ শোষণের ক্ষমতা যেমন কম হয়, তেমনই বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকায় দাহ্যবস্তু ও জ্বালানিতে আগুনও লাগে সহজে এবং ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। আর্দ্র মাটি থেকে যে বাষ্পীভবন ঘটে তা মাটির কাছাকাছি উচ্চতায় তাপমাত্রা কিছুটা কম রাখতে সাহায্য করে। একটা প্রবল তাপপ্রবাহ মাটির আর্দ্রতা শুষে নেওয়ার পর পরবর্তী তাপপ্রবাহ উপস্থিত হলে বাষ্পীভবনজনিত এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া আর কাজ করে না। এইভাবে একটা অঞ্চলে উপর্যুপরি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা ও তীব্রতা বাড়তে থাকে। বাতাসে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইড ও গ্রীনহাউস গ্যাস বাষ্পীভবন এবং বাতাসের তাপ পরিবহনের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে মাটির কাছাকাছি তাপ আটকে রাখে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০০৩ সালে ফ্রান্সের ভয়াবহ তাপপ্রবাহে প্রায় ১৫,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তার চেয়েও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ হয় ২০১০ সালে রাশিয়ায়। তাতে প্রাণ হারান প্রায় ৫৫,০০০ মানুষ। দৈনিক তাপপ্রবাহ পরিমাপক সূচক (HWMId) একটা অঞ্চলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কতটা বাড়ল এবং কতদিন ধরে এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকল – এই দুই মানদণ্ডের ভিত্তিতে তাপপ্রবাহের তীব্রতা নির্দেশ করে। ২০০৩ সালের ফরাসী তাপপ্রবাহে এই সূচকের মান ৪৫ ছুঁয়েছিল এবং ২০১০ সালের রাশিয়ান তাপপ্রবাহে এই সূচকের মান ছিল ৭২। রেডক্রস ও রেডক্রেসেন্ট সোসাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তাপপ্রবাহ পশ্চিম ইউরোপে তিন হাজারের বেশি প্রাণহানির কারণ হয়। মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে জলবায়ুতে গ্রীনহাউস গ্যাসগুলোর পরিমাণ বাড়ছে, যা পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিভিন্ন দেশ সম্মিলিতভাবে জলবায়ু সংক্রান্ত নানা প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে এই বৃদ্ধির মাত্রাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। বাতাসে গ্রীনহাউস গ্যাসের পরিমাণ ভবিষ্যতে কতটা বৃদ্ধি পেতে পারে তার নানারকম মাত্রা ধরে নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ইত্যাদি দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব কতটা বাড়বে তা অনুমান করার চেষ্টা করেন। যেমন, ২১০০ সাল অবধি বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পেলে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে বছরে দুই থেকে ছটা তাপপ্রবাহ প্রত্যাশিত। কিন্তু ২১০০ সাল অবধি গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন সময়ের তুলনায় ৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে সমগ্র মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে প্রত্যাশিত তাপপ্রবাহের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে হবে ১৫ থেকে ৩০।

আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, চীন বা ভারতীয় উপমহাদেশেও গ্রীষ্মকালে প্রবল তাপপ্রবাহে বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রীষ্মের প্রখরতা সব জায়গাতেই বাড়ছে। অতিরিক্ত তাপ ও জলসংকটের ফলে বহু জায়গার বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। বাড়ছে জলের উচ্চতা এবং আকস্মিক প্লাবনের ঘটনাও। ইউরোপে সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে এত আলোড়নের একটা কারণ অবশ্যই শিল্পায়ন পরবর্তী বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রত্যক্ষ প্রভাব নিয়ে উৎকণ্ঠা। কিন্তু আরেকটা কারণ কি এ-ও নয়, যে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের অকুস্থল ইউরোপের প্রথম বিশ্বের দেশগুলো? এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, জার্মানির বন শহরে জুন মাসে আয়োজিত ক্লাইমেট কনফারেন্সে উঠে আসা বিতর্ক। জলবায়ু সংক্রান্ত সংকট ও তার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলো বারেবারেই প্রথম বিশ্বের দেশগুলোর বিরুদ্ধে বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণকল্পে যথেষ্ট তৎপর না হওয়ার অভিযোগ আনে। গত বছরের গ্লাসগো সম্মেলনে অস্ট্রেলিয়া, চীন, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো ক্লীন এনার্জির ব্যবহার বাড়ানো এবং মিথেন নিঃসরণ কমানোর সংকল্প নেয়। কিন্তু বাস্তবে করোনা অতিমারী পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে চীন জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার বাড়ায়, উত্তর আমেরিকাও তার ক্লীন এনার্জি ব্যবহারের লক্ষ্যে যথেষ্ট অগ্রসর হতে পারেনি। ইউরোপে এখন পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তিতে যথেষ্ট বিনিয়োগের পরিবর্তে রাশিয়ার ওপর জ্বালানি সংক্রান্ত নির্ভরতা কমানোই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলত পারমিণবিক শক্তি এবং রাশিয়া ভিন্ন অন্য দেশ থেকে গ্যাস আমদানির উপর জোর দিচ্ছে তারা।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে পারমাণবিক শক্তি অন্যান্য শক্তির উৎসের তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য, কিন্তু সামান্য প্রযুক্তিগত গোলযোগ ঘটলেও পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্র কী ভয়ানক বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে তা ইউরোপের অন্তত অজানা নয়। প্রথম বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই কার্বন নিঃসরণের বৃহত্তম উৎস। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে ইতিপূর্বেই প্যারিস বা গ্লাসগো সম্মেলনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বন সম্মেলনেও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ক্রমাগত এই বিষয়টা এড়িয়ে যেতে থাকে। উপরন্তু যদিও মানুষের কার্যকলাপজনিত মিথেন নিঃসরণের প্রায় এক চতুর্থাংশ কৃষি থেকে আসে, কৃষিনির্ভর দেশগুলোর পক্ষে কৃষিক্ষেত্র থেকে নিঃসরণ কমানোর তুলনায় উন্নত দেশগুলোর পক্ষে ভারি শিল্প, তেল এবং গ্যাস উৎপাদনক্ষেত্র থেকে মিথেন নিঃসরণ কমানো প্রযুক্তিগত ভাবে সহজ, জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার দিক দিয়েও তার প্রভাব নগণ্য।

আরো পড়ুন যুদ্ধ মানে কেবল জীবনহানি নয়, পরিবেশ ধ্বংসও

মেলিসা ডেল, বেঞ্জামিন জোনস এবং বেনজামিন ওলকেন তাঁদের ২০১২ সালের গবেষণাপত্রে দেখান যে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে একটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার শিথিল হয়ে আসে। প্রবল গ্রীষ্ম, জলসংকট, খরা, বন্যার মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ইউরোপীয়রা বরাবর ক্রান্তীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেলগুলোর সমস্যা বলেই জেনে এসেছে। ইউরোপ-আমেরিকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় যত বাড়ছে, বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা নিয়ে বিশ্বের রাজনৈতিক পরিসরে আলোচনাও ততই বাড়ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন এখনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ের তালিকায় অথবা বিতর্কের পরিসরে কমই আসে, যেখানে এই দেশগুলোতেই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সর্বাধিক। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা কেবলই প্রথম বিশ্বের বিষয় হয়ে থাকলে একদিকে যেমন এই সমস্যার কার্যকরী সমাধানের দিকে এগোনো যাবে না, তেমনই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির নিরিখেও উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.