মওলানা ভাসানী

মওলানা হামিদ খান ভাসানী এই উপমহাদেশের একজন প্রবাদপ্রতিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পূর্ব বাংলার কিংবদন্তি কৃষক সংগঠন এবং জননেতা ভাসানি পরিচিত ছিলেন ‘লাল মওলানা’ বা ‘রেড ভাসানী’ নামে। গণআন্দোলনের ঝড় তুলে দেওয়া ভাসানীকে শাসক ‘Prophet of Violence’ (হিংসার পয়গম্বর) তকমা দিয়েছিল। ১৯৬৩ সালে তিনি চীনের সরকারের আমন্ত্রণে সেখানে যান। সেই সফরের অভিজ্ঞতা ধরা রয়েছে তাঁর মাও সেতুঙের দেশে বইতে। আজ মাওয়ের মৃত্যুদিন। এই দিনে আমরা মওলানা ভাসানীর লেখার একটি অংশ তুলে দিলাম নাগরিক ডট নেটের পাঠকদের জন্য।
নাগরিকের পক্ষ থেকে আমরা আমি ও আমার মওলানা ভাসানী গ্রন্থের লেখক, বিশিষ্ট তথ্যচিত্রনির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার এবং জনাব আজাদ খান ভাসানীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

আমরা বলি আমাদের দেশ সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা। কিন্তু দিন দিন শ্যামলিমা আমাদের দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। পিকিং বিমানবন্দরে নেমে দেখলাম সবুজের সমারোহ। বিমানবন্দর থেকে শহর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে লক্ষ লক্ষ গাছ, সবগুলিই প্রায় নতুন লাগানো। আমার ধারণা আগামী দশ বৎসরের মধ্যে এই লক্ষ লক্ষ গাছের দাম হবে কোটি কোটি টাকা। চীনের প্রত্যন্ত প্রদেশগুলি ঘোরার সময় দেখেছি সারা দেশব্যাপী বৃক্ষ রোপণের বিপুল উদ্যোগ। শুনেছি গত ১৪ বছরে চীনের ৭০ কোটি মানুষ ২০০ কোটি নতুন গাছ লাগিয়েছে। সমগ্র দেশের প্রাকৃতিক রূপ গত দশ বছরে অনেক বদলে গেছে।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একজন দোভাষীর মুখে শুনেছি, বিপ্লবের পূর্বে পিকিং নগরী ছিল ধুলিধুসরিত। সবুজের শোভা তখনও ছিল অভাবিতপূর্ব। চীনের পার্বত্য অঞ্চলে কোনো বৃক্ষরাজি ছিল না। এখন পার্বত্য অঞ্চলে পাইন এবং অন্যান্য পাহাড়ি এলাকার জন্য উপযুক্ত গাছ লাগানো হয়েছে।

পিকিং পৌঁছানোর পরের দিনই আবার আমার কাশি বেড়ে গেল। ডাক্তাররা বললেন, দেশ থেকে আমি যেসব কাপড়জামা নিয়ে গেছি পিকিং-এ তা অচল। চীনে পৌঁছানোর প্রথম কয়েক দিন শওকত আলী খান আমার দোভাষীর কাজ করেন। ৭ই অক্টোবর তিনি পিকিং ছেড়ে আসার পর প্রথমে ওখানকার পাকিস্তানি দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি জনাব ফারুক চৌধুরী (ঢাকা বিভাগের কমিশনার জনাব গিয়াসউদ্দীন আহমদের পুত্র) এবং পরে একটি চীনা দম্পতি দোভাষীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই চীনা দম্পতির দুইজনেই অধ্যাপক। এক সময়ে তাঁরা শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করতেন। বাংলা এবং ইংরেজী দুটো ভাষাতে তাঁদের দখল আছে। চীনা দম্পতির কাছে আমি নানাভাবে ঋণী। এমন কি আর্থিক দিক দিয়েও। তাঁরা কেবল আমার দোভাষীই ছিলেন না, আমার সবকিছু দেখাশোনার দায়িত্বও তাঁরা স্বেচ্ছায় হাতে তুলে নিয়েছিলেন। দুজনেই তাঁরা পন্ডিত, কিন্তু কখনও কোনো ব্যাপারে তাঁদের পন্ডিতম্মন্যতা বা অহমিকা প্রকাশ পেতে দেখিনি। সেই অর্থে অহমিকা দেখিনি চীনের ছোট বড় নানা পদের যত মানুষের সাথে মিশবার সুযোগ পেয়েছি তাদের কারো মাঝে। সমগ্র জাতি রাতারাতি কেমন করে যে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলি— লোভ, ঈর্ষা, দ্বেষ জয় করেছে তা ভাবতেও আমার অবাক লাগে।

কি এই চারিত্রিক রূপান্তরের মুলে কাজ করেছে, তা নিয়ে ভাবতে চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়েছে সব শ্রেণীর সকল অবস্থার মানুষকে মাও সেতুঙ যে সমান মর্যাদা, মানুষের মহৎ মর্যাদা প্রদান করতে পেরেছেন, আজিকার চীনের রূপান্তরের মূলে তা-ই সব চেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করছে।

দেশে এবং দেশ ছাড়ার পূর্ব মূহূর্তেও শুনেছি যে, কমিউনিস্টদের দেশে মানুষের কোনো ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য নেই। নেই কারো কোনো ব্যক্তিগত জীবন ও মর্যাদা। ব্যক্তিস্বাধীনতা কমিউনিস্ট পার্টির কালেকটিভিজমের যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছে। রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশে এক একজন মানুষ কেবল বিরাট রাষ্ট্রযন্ত্রের এক একটি স্ক্রু। সোভিয়েত ইউনিয়ন বা অন্য কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশের কথা বলতে পারি না। তবে চীন দেশ ঘুরে দেখলাম এত বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। চীনের মানুষ, সে রিক্সাচালক হোক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হোক, তার কর্মক্ষেত্রের বাইরে একজন থেকে আরেকজনকে স্বতন্ত্র করে চেনা সম্ভব নয়। মাও সেতুঙ এবং চীনের বিপ্লবীরা মানুষকে যে আত্মসম্মান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন আমাদের দেশে তা অকল্পনীয়।

একটি ঘটনা বলি, তাহলে আমার বক্তব্যটা অনেক পরিষ্কার করে বোঝাতে পারবো। অসুস্থ হয়ে পিকিং- এর ইউনিয়ন হাসপাতালে আমাকে কিছুদিন কাটাতে হয়েছে। হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই একদিন আমাকে দেখতে এলেন। তাঁর হাতে একটা ফুলের তোড়া। চৌ যখন আমার কেবিনে ঢোকেন তখন একজন পুরুষ নার্স বসে আমার সাথে গল্প করছিল। তাঁর তখন ডিউটি ছিল না। সে একটা চেয়ারে বসে সিগারেট টানতে টানতে গল্প করছে এমন সময় চৌ এন-লাই এলেন। আমাদের দেশের রীতি হিসাবেই আমি প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে শশব্যস্ত হয়ে উঠলাম। চৌ এলেন এবং একটা চেয়ার টেনে বসে আমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি প্রায় আধঘন্টা আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। কিন্তু এই আধ ঘন্টার মধ্যে পুরুষ নার্সটি একবারও চেয়ার ছেড়ে উঠলো না, কিংবা তার হাতের সিগারেট লুকানোর কোন চেষ্টা করলো না। এমন কি প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই যে তার পাশে বসে সেদিকেও তার যথেষ্ট আগ্রহ আছে বলে মনে হলো না। এক কথায় আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থানুসারে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সম্মান জানানোর কোনো উদ্যোগই তার মধ্যে দেখলাম না। তার এ আচরণ আমার কাছে কেবল বিসদৃশই নয়, অপমানকর বলে মনে হলো। প্রধানমন্ত্রী এবং সেই পুরুষ নার্স উভয়ে চলে যাবার পর আমি হাসপাতালের তরুণ সুপারিন্টেন্ডেন্টকে ডেকে সমস্ত ব্যাপারটা বললাম। আমার কন্ঠে উষ্মার পরিচয় হয়ত ছিল। সব শুনে সুপারিন্টেন্ডেন্ট হেসে ফেললেন। বললেন, চেয়ারম্যান মাও, প্রধানমন্ত্রী চৌ এঁরা কেবল আমাদের নেতা এবং শাসকই নন, আমাদের বন্ধুও। এর পরেও কি আমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, সমাজতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তির মর্যাদা, ব্যক্তির স্বাধীনতা নেই?

মাও সেতুঙ এর দেশে আমাকে সব থেকে মুগ্ধ করেছে কি-এ প্রশ্ন অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন। একদিক দিয়ে প্রশ্নটি দুরূহ। অপরদিকে একান্ত সহজ। অনেক ভেবে দেখেছি, প্রশ্নটির জবাব আমি এক কথায় দিতে পারি। হ্যাঁ। হাসিই আমায় সব থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে। চীনের মানুষ আজ হাসতে পারে। যে হাসিতে কান্না ঝরে না, যে হাসি অনশনক্লিষ্ট মুখে কুঞ্চন সৃষ্টি করে মুখ ব্যাদানের কারণ হয় না, যে হাসিতে আছে প্রাণের প্রাচুর্য আর জীবনের উচ্ছাস— চীনের ৭২ কোটি নরনারী শিশুর মুখে আমি দেখে এসেছি সেই হাসি। ওদের মাঝে থাকতে থাকতে সে হাসি হয়ত আমাতেও সঞ্চারিত হয়ে গিয়েছিল। তখন বুঝিনি এমন করে যে, হাসির অভাব কত নিষ্ঠুর। দেশে এসে আজ মিলিয়ে দেখছি আমার দেশের কৃষকের মুখের সাথে চীনের কৃষকের মুখ। আমার দেশের কোটি কোটি মানুষের মুখ দেখছি। কিন্তু হাসি খুঁজে পাচ্ছি না তো, যে হাসি দেখে এলাম চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ এর দেশে। মাও সেতুঙ চীনের মানুষকে কেবল হাসির ফোয়ারার পথ দেখিয়ে দেননি, তুলে দিয়েছেন সেই ফোয়ারা মুখ থেকে বঞ্চনা আর শোষণের ভারি পাথর। আমরা কি হাসির উৎসের সন্ধান পাবো না?

সাত সপ্তাহ আমি চীনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি। এক এক করে দেখিনি সত্য চীনের প্রতিটি মানুষকে, দেখা কারো পক্ষেই নিশ্চয় সম্ভব নয়। দেখেছি ছোট বড় মাঝারি শহর, কম্যুন ও গ্রাম। শহরের কাছের কম্যুন, শহর থেকে শত মাইল দূরের কম্যুন। আমাদের দেশের মানুষ যেমন নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চিন্তায় অহর্নিশ অবসন্ন, তেমনি অবসন্ন ছিল চীনের মানুষও তাদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবেরআগে। আজ চীনের কৃষক-মজুর ব্যক্তিচিন্তার উর্ধ্বে উঠে সমষ্টির চিন্তা করছে। তারা নিজ হাতে গড়ে তুলেছে তাদের সোনার দেশ, কলকারখানা, কম্যুন আর নতুন সংস্কৃতি-চেতনা, নতুন সভ্যতা। চীনের প্রতিটি কৃষক-মজুর তাদের অধিকার এবং রাজনীতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।

চীনের সাধারণ কৃষক-মজুরের জীবনে প্রাচুর্য আসেনি ঠিকই; কিন্তু এসেছে স্বাচ্ছল্য এবং স্বাচ্ছন্দ্য। একজন কৃষক বা একজন শ্রমিককে আমি দামি সিল্ক পরতে দেখিনি ঠিকই, কিন্তু খালি পায়ে রাস্তায় হাঁটতে কিংবা খামারে কাজ করতে দেখিনি কাউকে। চীনের মানুষ শীতকালেও সুতি কাপড় পরে। মোটা কাপড়ের মাঝে তুলা দিয়ে সেলাই করে তারা সুন্দর শীতবস্ত্র বানায় এবং তাতে পিকিং-এর মত ভীষণ শীতেও তাদের কোনো কষ্ট হয় না। অতি উচ্চ দামের শীত বস্ত্র নেই। কিন্তু সেই সাথে শীতে জমে আর কেউ মরছেও না। বিপ্লবের আগে কৃষক-শ্রমিকদেরই দুই বেলা দু’মুঠো অন্ন সংস্থান হতো না, মাথা গুঁজবার একটু নিরাপদ স্থানের প্রশ্ন তো উঠেই নি। ওদের প্রাক-বিপ্লবকালের অবস্থার সাথে আমাদের আজকের অবস্থা ও সমস্যার একটা আশ্চর্য সামঞ্জস্য আছে। আজ চীনের সেই বুভুক্ষু গৃহহারারা কাজ পেয়েছে, ঘর পেয়েছে, পেয়েছে জীবনের নিশ্চয়তা।

চীনে যাবার সুযোগ পাবার পূর্ব পর্যন্ত শুনেছি, কমিউনিস্টরা শ্রমিকদের বন্দীশিবিরের মধ্যে আটক করে রাখে আর তাদের পিঠে চাবুক মেরে জোর করে কাজ করিয়ে নেয়। চীনে যেয়ে দেখলাম, এর চেয়ে বড় মিথ্যে আর কিছুই হতে পারে না। দেশটাই এখন শ্রমিক আর কৃষকদের। তারাই তাদের ভাগ্যনিয়ন্তা। চীনের মানুষ যে যে-কাজেই নিয়োজিত হোক না কেন পরম নিষ্ঠার সঙ্গে তা পালন করে যাচ্ছে। নির্ধারিত ডিউটির বাইরেও সকলকেই প্রায় পরিশ্রম করতে দেখেছি। জোর করে হয়তো নির্ধারিত ডিউটি করানো যায়; কিন্তু তারপর বাড়তি খাটুনি এবং নিষ্ঠাও কি কেবল চাবুক মেরে আদায় করা যায়?

সব কলকারখানাতেই দেখেছি, একটি করে বিরাট ব্লাকবোর্ড। প্রতিদিন কাজের শেষে সেইদিন যে শ্রমিক সবচেয়ে ভাল কাজ করেছে তার নাম সেই বোর্ডে লিখে দেওয়া হয়। শহরের একটি নিদির্ষ্ট স্থানে এমনি আরেকটি বড় বোর্ড টাঙ্গানো থাকে, সেখানে লেখা হয় তার নাম যে সেই শহরের সবকটি কারখানার মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রশংসনীয় কাজ করেছে। এমনিভাবে চীনে শ্রমিকদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করা হয়, তাদের যোগ্যতা দক্ষতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এটাকে কি আপনি বলবেন শ্রমিকদের উপর জুলুমবাজির আরেক পদ্ধতি? এটা আপনি ভাবতে পারেন; কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস চীন না দেখে কেবল সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচার শুনেই যদি আপনি অনুরূপ ধারণা করে থাকেন, তবে ভুল করছেন। সাম্রাজ্যবাদীদের প্রচারপত্রে চিত্রিত চীন আর সত্যিকার চীনের মধ্যে বেহেশত আর দোজখের পার্থক্য।

আমলাতন্ত্র বলতেই যে প্রচলিত ও পরিচিত চেহারাটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, অবাক হয়ে দেখলাম চীন সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। চীন বিপ্লবের অন্যতম প্রধান সাফল্য আমলাতন্ত্রের কবল থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের মুক্তি সাধন।

বিপ্লবের পূর্বে চীনের শাসনক্ষমতা ছিল মুষ্টিমেয় সামন্ত ও ধনিক শ্রেণীর হাতে কেন্দ্রীভূত। অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে তারা ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী হলেও প্রকৃতপক্ষে চীনের রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক ছিল সাম্রাজ্যবাদীরা। চিয়াং-কাই-শেক ছিলেন এই সাম্রাজ্যবাদী অনুচরদেরই নেতা। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে সেদিন কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণী যাঁরা দেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি, উপেক্ষিত ও লাঞ্ছিত হতেন। সেদিন সমগ্র চীনে শিক্ষিতের হার ছিল শতকরা মাত্র ২০ জন এবং তার মধ্যে কৃষক ও মজুরের সন্তান শতকরা মাত্র ১ জন এবং বাকি ১৯ জনই ধনিক ও সামন্ত শ্রেণীর। কিন্তু আজিকার চীনে সামাজিক জীবনে সার্বিক রূপান্তর ঘটেছে। আজ কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণীই ৭২ কোটি মানুষের দেশ চীনে সর্বাপেক্ষা অধিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লাভ করেছে। কৃষক এবং শ্রমিকই যে জাতীয় জীবনের মেরুদণ্ড এই স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। আমি নিজে দেখেছি, ওদেশের সরকারি কর্মচারীরা কৃষক ও মজুর প্রতিনিধিদের প্রতি কিভাবে সম্মান প্রদর্শন করে থাকে।

একদিন এক কম্যুন দেখতে গিয়েছি আমরা। কম্যুনে সেদিন সেই প্রদেশের কৃষিবিভাগের কয়েকজন পদস্থ কর্মচারী এসেছেন তদারকে। আশ্চর্য, কোথায় সরকারি কর্মচারীরা কম্যুনের চাষীদের উপর হম্বিতম্বি করবে তা নয়,তার বদলে কম্যুনের ১৭ জন নির্বাচিত প্রতিনিধির সামনে তাঁদের সেই তটস্থ অবস্থা দেখে আমার অনভ্যস্ত চোখ তো বিস্ফারিত। আমাদের দেশে জেলা মেজিস্ট্রেটের সামনে গেলে তাঁর অধীনস্থ কোনো কর্মচারী সব সময় যে বিপন্ন ভাব নিয়ে থাকেন, কম্যুন অধিকর্তাদের সম্মুখে কৃষিবিভাগের বিশেষজ্ঞ ও অফিসারগণের অবস্থাও দেখলাম প্রায় সেই রকম। অথচ কম্যুনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সকলেই গায়েখাটা কৃষক। কম্যুন সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা আছে।

আজিকার চীনের ৭২ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই’র মাসিক বেতন ৫০০ ইয়ান অর্থাৎ আমাদের মুদ্রায় ১০০০ টাকা। এ ছাড়া সমগ্র চীন দেশে ৩৫০ ইয়ান অর্থ্যাৎ ৭০০ টাকার অধিক বেতন খুব কম লোকেই পেয়ে থাকেন। প্রাদেশিক গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নরদের বেতন মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। চীনের কোনো কোনো প্রদেশের প্রধান শাসনকর্তাকে মেয়র বলে। সাংহাই প্রদেশের শাসনভারও একজন মেয়রের হাতে। শুনেছি সাংহাই-এর বর্তমান মেয়র লেনিনের সহকর্মী ছিলেন এবং লেনিনের সহকর্মীদের মধ্যে চীন দেশে তিনিই একমাত্র জীবিত আছেন। তাঁর বেতনও ৩৫০ ইয়ান।

আমাদের দেশের সাথে এই সংখ্যাতত্ত্বের তুলনা করা নিস্প্রয়োজন। তবুও একটা উদাহরণ বলি। শুনেছি পিকিং-এ আমাদের যে রাষ্ট্রদূত আছেন, তিনি মাসে বেতন ও ভাতাসহ ৬০০০ টাকার ওপরে পেয়ে থাকেন। এ ছাড়া তাঁর আছে ফ্রি গাড়ি এবং অন্যান্য সুবিধা।

চীনের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের ছোটবড় সকল কর্মচারী, ছাত্র ও শিক্ষককে বছরে এক মাস করে কৃষক ও শ্রমিকদের সঙ্গে একসাথে কায়িক পরিশ্রম করতে হয়। এবং এই এক মাসের কাজ বনভোজনে যাবার মতো প্রমোদের জন্য বা উপদেশ খয়রাতের জন্য নয়। দেশের সাধারণ মানুষ ও তাঁদের কাজের সাথে সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা অর্জন ও কোনো কাজ যে ছোট কাজ নয়, সকলের মনে এ উপলব্ধি আনয়নের জন্যই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। চীনে এমন কোনো পদস্থ ব্যক্তি নেই যাঁকে কৃষক বা মজুরদের সাথে বছরে এক মাস কাজ করতে না হয়। চেয়ারম্যান মাও, লিউ শাও-চি, চৌ এন-লাই থেকে সকলেই এক মাসের জন্য কোনো না কোনো কম্যুনের কাজে যোগ দেন।

বিপ্লবের পর সমগ্র চীন জুড়ে নব গঠনের প্লাবন শুরু হয়েছে। আমার কাছে একটা জিনিস অবাক লেগেছে, যখন শুনলাম বিপ্লবোত্তর যুগে নির্মিত একটা রাস্তাও ভাঙ্গেনি, কোনো নদীর উপরকার কোনো ব্রিজ দুইবার নির্মাণ করতে হয়নি। বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একবার যে বাঁধ নির্মিত হয়েছে, জনসাধারণ তাকে আর কখনও অভিশাপের কারণ হিসেবে মনে করেনি। বিশাল বিশাল নদীতে চীনা জনসাধারণ বাঁধ দিয়ে বন্যা রোধ করেছে। কিন্তু ভাঙ্গছে না একবারও। হান নদীর উপর তিনতলা ব্রিজ নির্মিত হয়েছে। একতলা দিয়ে পার হয় ট্রেন, দোতলা দিয়ে অন্যান্য মানুষ আর তিনতলা দিয়ে যানবাহন, আশ্চর্য নয় যে এহেন ব্রিজও একবারও ভাঙ্গেনি?

স্বাধীনতা অর্জিত হবার পর আমাদের দেশে উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছেই কম। স্বাধীন হবার পর নির্মিত রাস্তা আর ব্রিজগুলো যে কতবার ভাঙ্গল! বন্যা নিন্ত্রণের জন্য নির্মিত বাঁধ ভেঙ্গে কত হাজার হাজার একর জমির ফসল নষ্ট হলো, কত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হলো! চীনে থাকার সময় আমার মনে বারবার একটা প্রশ্ন জেগেছে — এদের রাস্তা,ব্রিজ, বাঁধ একবারও ভাঙ্গে না, কিন্তু আমাদের দেশে এত ঘন ঘন ভাঙ্গনের কারণ কি? এর জন্যে দায়ী কে? আমাদের অদৃষ্ট, না দুর্নীতিতন্ত্র?

১৯৫৮ সালের পর কয়েক বছর চীনের আবাদ আশানুরূপ হয়নি। তবু ১৯৬২ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত চীনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কোথায়ও খাদ্যদ্রব্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি এক পয়সাও। অনাহারে থাকেনি একজন মানুষও। অনাহারে মৃত্যু কাকে বলে চীনের মানুষ তা ভুলে যাচ্ছে।

চীনের মানুষকে চেয়ারম্যান মাও সেতুঙ আর তাঁর সহকর্মীরা কি আশ্চর্যভাবে রূপান্তরিত করেছেন, না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না। আমি একদিন পিকিং-এর এক কাপড়ের দোকানে কি একটা যেন কিনতে গিয়েছিলাম। দোকানদার আমাকে একটা কাপড় দেখিয়ে বলল: আপনি এটা এখান থেকে না কিনে, ফেরার পথে হংকং থেকে কিনলে অনেক সস্তায় পাবেন। এ ধরনের কাপড় হংকংয়েদাম কম। মানুষ এত সৎ হতে পারে?

আরেক দিনের একটা ঘটনা বলি। পিকিং-এর ইউনিয়ন হাসপাতাল থেকে আমার বিদায় নেবার দিন ভোরবেলায় নার্স আমার সবকিছু গোছগাছ করে দিচ্ছে। বেরুবার সময় এক পাউন্ডের একটা নোট আমি তার হাতে গুঁজে দিলাম আমার শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসাবে। শান্ত মিষ্টি ব্যবহারের মেয়েটি কিন্তু ভীষণ খেপে উঠল। লজ্জায় এবং ক্ষোভে যেন তার মুখ রাঙা হয়ে গেল। সে বলল: মওলানা,তুমি এশিয়ার সকল মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। আমরা তোমাকে দেখতে পাওয়াকে পুণ্য বলে মনে করি। কিন্তু তুমি আমার এ ক্ষতি করতে চাও কেন? আমার নির্ধারিত কাজের জন্য তো আমি বেতন পাই। তার বেশি নেব কেমন করে? তুমি বখশিস দিয়ে আমার লোভ ধরাতে চাও কেন?

আমি তাকে বুঝাতে পারিনি বখশিশ দেওয়া বা নেওয়া আমাদের দেশে অন্যায় নয়। বরং এটাই আমাদের রীতি। চীনের যেখানেই গেছি, এই নার্সটির বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি শুনেছি বারবার।

Leave a Reply