মাননীয় সুমনবাবু,

প্রথমত, সাংবাদিক হিসাবে আপনি রাঘব বোয়াল; আমি চুনোপুঁটিও নই, ব্যাঙাচি। দ্বিতীয়ত, আপনার আমার দুজনেরই সাধারণ নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার কথা। আপনার ক্ষেত্রে তাঁরা দর্শক, আমার ক্ষেত্রে পাঠক। এই দুটো কারণে খোলা চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত। ভারতের সর্বাধিক টি আর পি সম্পন্ন বাংলা খবরের চ্যানেলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তার কাছে কয়েকটি কথা এই চিঠিতে নিবেদন করলাম। বিষয় আপনার নেওয়া আব্বাস সিদ্দিকির সাক্ষাৎকার। ইন্টারনেটের কল্যাণে দেখেছি ইউরোপ, আমেরিকায় চ্যানেল বা প্রকাশনাগুলোর বিভিন্ন এক্সক্লুসিভ, তদন্তমূলক প্রতিবেদন বা সাক্ষাৎকার নিয়ে অন্য চ্যানেল, কাগজ বা ওয়েবসাইট বিস্তর কাটা ছেঁড়া করে, কারণ এতে অসাংবাদিক পাঠক/দর্শকের স্বার্থও জড়িত। এখানে অন্যের এক্সক্লুসিভকে নিজের বলে প্রমাণ করার চেষ্টা ছাড়া ওসবের চল নেই। অনলাইন মিডিয়ার কল্যাণে ইংরেজি ভাষায় তবু ইদানীং কিছুটা শুরু হয়েছে, বাংলায় মোটেই চোখে পড়ে না। আপনার যেহেতু আন্তর্জাতিক রিপোর্টিঙের অভিজ্ঞতা আছে, সেহেতু ধরে নিচ্ছি এই চিঠি দেব দুর্বিপাকে চোখে পড়ে গেলে এটাকে তেমন প্রয়াস হিসাবেই দেখবেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সাক্ষাৎকারের সময় ধরে ধরে আলোচনা করা যাক।

১:৩১

আপনার প্রশ্ন: আব্বাস, আপনি থিওলজিতে মাস্টার্স করেছেন। তা সত্ত্বেও পীরজাদার পরিচয় নিয়ে রাজনীতিতে আসছেন। ধর্মগুরুর পরিচয় সরিয়ে রেখে রাজনীতিতে আসতে পারতেন তো? নাকি আপনি মনে করেন যে মুসলিমরা কোথায় ভোট দেবে সেটা ধর্মগুরুদের দ্বারা আজও নিয়ন্ত্রিত হয়? এখনো মুসলিমরা মসজিদের ইমামের কথাতেই চলেন এবং ভোটটাও দেন ইমামের নির্দেশে। তাই উচ্চশিক্ষিত আব্বাস সিদ্দিকি নয়, পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি পরিচয়টা অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রশ্নটার মানে কী? একজন পীরজাদা কী করে তাঁর ধর্মগুরুর পরিচয় সরিয়ে রেখে রাজনীতিতে আসতে পারেন? ‘পীরজাদা’ অর্থাৎ পীরের বাড়ির ছেলে। আব্বাস জন্মেছেন ফুরফুরা শরীফের পীরের পরিবারে। তাতে তাঁর যে কোন হাত ছিল না সে কথা নিশ্চয়ই আপনিও ভাল করে জানেন। এই পরিচয় তিনি সরিয়ে রাখতে পারেন কী করে? এফিডেভিট করে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম বদল করে? বড় হওয়ার পর তিনি ধর্মীয় প্রচারকেই নিজের পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। পেশা বা জীবনের লক্ষ্য বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে সুমন দে-র যতটা, আব্বাস সিদ্দিকিরও তো ততটাই। এই বাছাইকে প্রশ্ন করা যায় কোন যুক্তিতে? রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের অনেকেই কৃতী ছাত্র ছিলেন। পাশ করা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পি এইচ ডি-র ছড়াছড়ি তাঁদের মধ্যে। তাঁরা কেন ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, গবেষণা না করে গেরুয়া বসন ধারণ করলেন এ প্রশ্ন করার কি কোন মানে হয়? সন্দেহ হয়, আপনি আসলে জানতে চাইছিলেন আব্বাস কি ওঁর দাড়ি আর ফেজ টুপিটা বাদ দিয়ে রাজনীতিতে আসতে পারতেন না? নেহাত ভদ্রতায় বেধে যাওয়ায় প্রশ্নের ভাষা বদলে নিয়েছেন।

তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক আব্বাস পীরজাদা পরিচয় সরিয়ে রেখে রাজনীতিতে আসতে পারতেন। কিন্তু এত বছর ওয়াজে বসার পর সত্যিই যদি তিনি ওভাবে রাজনীতিতে আসতেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা প্রশ্ন করতেন না “আপনি যে পীরজাদা সে পরিচয় গোপন করছেন কেন?” ২০১৯-এ যোগেন্দ্র যাদব সম্পর্কে বিজেপি রটিয়েছিল তিনি আসলে মুসলমান, নাম সেলিম। সে ছিল অর্ধসত্য, কারণ যোগেন্দ্র মুসলমান না হলেও তাঁর বাবা ছোটবেলায় সত্যিই সেলিম নাম রেখেছিলেন। আব্বাসের বিরুদ্ধে সত্য গোপনের অভিযোগ করলে তো যথার্থ অভিযোগই হত এ ক্ষেত্রে। অভিযোগটা আপনার শো-তে আপনিও তুলতেন নির্ঘাত।

আপনার মত অভিজ্ঞ সাংবাদিক এমন অন্তঃসারশূন্য প্রশ্ন করলেন কেন?

এরপর আব্বাস বাবাসাহেব আম্বেদকরকে উদ্ধৃত করে বললেন যে অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়, আর ছিনিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে সঠিক পথ হল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী রাজনীতিতে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ। তিন মিনিটের মাথায় এই কথায় আপনি আপত্তি করে বসলেন। “আপনি তো ধর্মগুরু। রাজনীতিতে এলেন শুধু নয়, একেবারে কিং মেকার হতে চাইছেন। নিজেই বলছেন মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের চারটে পায়ার একটা হতে চান।” দেখালেন আব্বাসের সেই ভিডিও, যেখানে তিনি কথাটা বলেছেন। অতঃপর নাটকীয় ঢঙে অতিথিকে বললেন “ধর্ম কোথায়? এ তো নির্ভেজাল রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা!”

মানে মিনিট দুয়েক আগে আপনার আপত্তি ছিল আব্বাসের ধর্মগুরু পরিচয় নিয়ে, এরই মধ্যে সমস্যা হয়ে দাঁড়াল ধর্মীয় ভাবনার বদলে রাজনীতিবিদসুলভ কথাবার্তা! এ দেশে কি এমন কোন রাজনৈতিক দল আছে, যারা রাজনীতি করতে আসে আসনতলে মাটির ’পরে লুটিয়ে থাকবার জন্যে? এই সাক্ষাৎকার দেখতে দেখতে বারবারই মনে হয়েছে আপনি এমন একটা দেশে বসে কথা বলছেন, যে দেশ একেবারে কিশোর কুমারের স্বপ্নের দেশ। “যাঁহা গম ভি না হো, আঁসু ভি না হো। বস পেয়ার হি পেয়ার পলে”। আজকের ভারতে দাঁড়িয়ে একটা নতুন দল কিংমেকার হতে চাইছে দেখে আপনার বিস্ময় আমাকে বিস্মিত করল। মেরে ধরে কিং মেকার হতে চাইছে না, ভোটে জিতে হতে চাইছে। এতে আপত্তি কিসের সুমনবাবু? আব্বাস কাঁসিরামকে উদ্ধৃত করে যখন বললেন মজবুত সরকার নয়, মজবুর সরকার চাই, তাতে আপনার প্রতিক্রিয়া “এ তো মারাত্মক কথা!” অথচ আজকের দুনিয়ায় যখন বড় বড় রাষ্ট্রগুলো ক্রমশই দমনমূলক হয়ে উঠছে, তখন সারা পৃথিবী জুড়েই এই বিতর্ক চলছে যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল সরকারই নাগরিকের পক্ষে ভাল কিনা। আর আপনি কিনা সে তর্কে না গিয়ে ব্যাপারটাকে তুলনা করলেন ব্ল্যাকমেল করার সঙ্গে? অবশ্য আপনার তর্কবিমুখতা এখানেই শেষ নয়, শুরু।

৭:৩৬

আপনি: আব্বাস, আপনি বিজেপির ভোট কাটুয়া। এক নম্বর সম্ভাবনা, তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোট আপনার ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট কেটে দেবে। আর এই ভাগাভাগিতে বিজেপি প্রার্থীরা বেরিয়ে যাবে।

পরপর তিনটে বাক্য। কোনটাই প্রশ্ন নয়, ঘোষণা। তাই লিখতে গিয়ে জিজ্ঞাসার চিহ্নের প্রয়োজন হল না।

আব্বাস, আপনি কি আসলে বিজেপির ভোট কাটুয়া? তৃণমূল কংগ্রেসের সংখ্যালঘু ভোট কি আপনার দল টেনে নেবে আর সেই ফাঁকে বিজেপি প্রার্থীরা জিতে যাবে?

এভাবেও প্রশ্নগুলো করা যেত। আপনি করেননি। স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, সাংবাদিক সুমনকে সরিয়ে এখানে কি ব্যক্তি সুমন ঢুকে পড়লেন? এমন এক ব্যক্তি, যাঁর অনেককিছু এসে যায় কোন দল নির্বাচনে জিতল আর কোন দল হারল তা দিয়ে। সাংবাদিকের কিন্তু ব্যক্তিগত চাহিদা স্টুডিওর বাইরে রেখে আসার কথা।

১০:৩৩

আব্বাস: কোন জায়গায় আপনি দেখতে পাচ্ছেন বা কে বলছে যে আমি আইডেন্টিটি পলিটিক্স… মুসলিম ধর্ম লিয়ে আমি পার্টি করছি?

আপনি: আপনার সমাবেশ দেখুন, যেখানে আপনি ভাষণ দিচ্ছেন, আপনার সামনে ব্রিগেডের যে মাথার… তারা… আপনি কি জেনারেল… আপনি তো আপনার সম্প্রদায়কেই অ্যাড্রেস করছেন? আপনি সংখ্যাগুরুকে তো অ্যাড্রেস করছেন না।

এই কথাগুলো আপনি যখন বলছেন, তার আগেই আপনার অতিথি বলে দিয়েছেন তাঁর পার্টির মুখগুলো কেবল মুসলমান নয়। তাঁর ‘প্রেসিডেন্ট’ শিমুল সোরেন আদিবাসী। যাক সে কথা। সুমনবাবু, আপনি যে ব্রিগেডের কথা উল্লেখ করেছেন সেখানে কেবল ফেজ পরা মাথা আর দাড়িওলা মুখগুলোই খেয়াল করেছিলেন? আব্বাসের বক্তৃতা শোনেননি? সে বক্তৃতায় কি কেবল মুসলমানদের অ্যাড্রেস করা হয়েছিল? তখন না শুনে থাকলেও সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে অন্তত শুনে নেওয়া উচিৎ ছিল। প্রবীণ সাংবাদিকরা তো একেই হোমওয়ার্ক বলেন শুনেছি। আপনি শোনেননি?

অবশ্য আপনি সম্ভবত এই সাক্ষাৎকারের জন্য কোন হোমওয়ার্ক বা গবেষণার প্রয়োজন বোধ করেননি। কারণ আব্বাস যে ভোটে দাঁড়াবেন না, দাঁড়ানোর কোন পরিকল্পনা নেই, সে তথ্য আমাদের মত ব্যাঙাচিদের জানা থাকলেও আপনার জানা ছিল না। গত ৫ই মার্চ এমনকি নাগরিক ডট নেটেও অধ্যাপক রবিউল ইসলাম লিখে দিয়েছেন আব্বাস সম্ভবত ভোটে দাঁড়াবেন না।

গবেষণার অভাব সামগ্রিকভাবে এই সাক্ষাৎকারের কতটা ক্ষতি করেছে দেখুন।

৩৪:৫৯

আপনি: দিল্লী দাঙ্গার পর আপনি বললেন আমি আল্লার কাছে দুয়া করি, উনি যেন ভারতবর্ষে এমন মারণ ভাইরাস পাঠান, যাতে দেশের দশ, বিশ, পঞ্চাশ কোটি মানুষ মরে যায়। [ভিডিও দেখানো হয়] দেখুন আব্বাস, আমি দিল্লী দাঙ্গা কভার করেছি। সমস্ত ডিটেলস মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। এই চ্যানেলেই। কিন্তু আপনাকে বলি, দাঙ্গা এক পক্ষ করে, কোনদিন বিষয়টা এমন নয়। সব থেকে বড় কথা কোন অন্যায় হলে দোষীদের শাস্তি আপনি দাবি করতে পারেন। কঠোর শাস্তি দাবি করতে পারেন। কিন্তু মানুষের মৃত্যু কামনা করবেন? দেশের পঞ্চাশ কোটি মানুষের মৃত্যু কামনা করছেন আপনি?

এখানে আব্বাসকে একেবারে পেড়ে ফেলার সুযোগ ছিল, কিন্তু পারা গেল না। কারণ তিনি বললেন তাঁর ওয়াজের ভিডিও কাটছাঁট করে আপলোড করে তাঁকে সমাজের কাছে খারাপ করার প্রচেষ্টা চলে। অস্বীকার করলেন না যে কথাগুলো তাঁরই বলা, কিন্তু বললেন একটা মোক্ষম কথা। “এর আগের পরের হিসসাটা জানলে মনে হয় একটা জায়গা ঠিক হতে পারে।” দুঃখের বিষয় আপনি সাক্ষাৎকার নিতে বসে পড়েছেন স্রেফ কতকগুলো ভাইরাল ক্লিপের ভরসায়। যদি আপনার রিসার্চ টিমকে দিয়ে গোটা বক্তৃতাটা খুঁজে বার করাতেন, তাহলে আব্বাসকে চুপ করিয়ে দেওয়া যেত। তিনি যে ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক তা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করে দেওয়া যেত। নাকি সে ঝুঁকি আপনি নেননি, কারণ ফল হত ঠিক উল্টো? সন্দেহের কারণ, একটা দক্ষিণপন্থী বাংলা ওয়েবসাইটে গিয়ে ঐ ক্লিপের আগের এবং পরের সামান্য অংশ শুনতে পেলাম, সবটা নয়।  লিঙ্ক এখানে পাবেন।

এখানে আব্বাস বলেছেন ঐ ভাইরাসে তিনি নিজে মরে গেলেও ক্ষতি নেই। আপনি ভালই জানেন এই কথাটা সাধারণত কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ বলে না। রথযাত্রার সময়কার লালকৃষ্ণ আদবানি বা ২০০২-এর নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন। তাই কি আপনার আশঙ্কা ছিল গোটা বক্তব্য দেখালে দর্শকদের সামনে আব্বাসের সাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি দাঁড় করানো শক্ত হয়ে যেতে পারে?

আপনার এই মনোলগপ্রতিম প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা কিছুটা দীর্ঘ না করে উপায় নেই। কারণ আপনি নিজের দিল্লী দাঙ্গা কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন দাঙ্গা কখনো এক পক্ষ করে না। এই কথা শোনার পর জানতে ইচ্ছা করে আপনি ঠিক কোন দাঙ্গা কভার করে এসেছেন দিল্লীতে? কারণ ২০২০-র গোড়ার যে দাঙ্গা, সেই দাঙ্গা যে রীতিমত সংগঠিত ছিল এবং সে কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন একটা বিশেষ দলের নেতা এবং মন্ত্রীরা, তা দেশী বিদেশী বহু সংবাদমাধ্যম বিস্তারিভাবে রিপোর্ট করেছে। আপনি ব্যস্ত লোক, সময়ের অভাব থাকলে অন্তত এই ভিডিও দুটো দেখে নেবেন।

এই দো-তরফা দাঙ্গার পর একটা বছর কেটে গেছে। এই এক বছরে দিল্লী পুলিশ কীভাবে একটা ধর্মের লোককেই ষড়যন্ত্রী বলে খাড়া করার চেষ্টা করেছে, ক্ষতিগ্রস্তদের এফ আই আর নেয়নি, যারা দাঙ্গার শিকার তাদেরই অভিযুক্ত করেছে তা জানতে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার এই প্রবন্ধটাও আপনাকে সাহায্য করবে লিঙ্ক এখানে পাবেন।  এটা পড়া থাকলে হয়ত আপনি পরম বিশ্বাসে “আইন আছে, আইনে তার ব্যবস্থা হবে” বলতেন না। এই আলোচনায় আপনি নজরুলকে উদ্ধৃত করেছেন “কাণ্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।” আব্বাস যখন বলেছেন “আদালতের ওপরেও বিচার আছে, আমি মহান স্রষ্টার কাছেও বিচার দিতে [চাইতে] পারি,” আপনি মানতে চাননি। না চাইতেই পারেন, তবে আমার মনে পড়ল, আপনার প্রিয় কবি নজরুল অন্য একটা কবিতায় লিখেছিলেন “প্রার্থনা করো — যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটী মুখের গ্রাস, / যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!” পাঁচ জনের মৃত্যু চাওয়াও যখন অন্যায় বলছেন, তখন নজরুলকেও কি সাম্প্রদায়িক বলা উচিৎ এই উচ্চারণের জন্য?

দাঙ্গা কখনো এক পক্ষ করে না, এই যে ঐতিহাসিক মন্তব্যটা আপনি করেছেন, তা শুনতে রীতিমত ভাল। তবে কথাটা কোন শিখ নেতার সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় যেন বলে ফেলবেন না। ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গার পুঙ্খানুপুঙ্খ সবে দাড়িগোঁফ গজানো শিখরাও জানে। তাদের মেজাজ আব্বাসের মত শরীফ না-ও হতে পারে।

এ পর্যন্ত দেখে মনে করেছিলাম ভারতের আইনব্যবস্থা যে সকলের প্রতি সমান সদয় নয় (সংবিধানে যা-ই লেখা থাক) তা আপনি জানেন না। আবার বলি, বারবার মনে হয়েছে দেশটা আপনার চোখে একেবারে কিশোর কুমারের “আ চল কে তুঝে” গানের স্বপ্নরাজ্য, বা এক কথায় রামরাজ্য। কিন্তু নুসরত জাহান সম্বন্ধে আব্বাসের মন্তব্যের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে আলোচনায় দেখলাম মোটেই তা নয়। আপনি ভাল করেই জানেন এ দেশে পুলিশি অত্যাচার বেশি চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর, আইনি হেফাজতে সবচেয়ে বেশি মরেন সংখ্যালঘুরা। তাহলে বারবার আব্বাসকে আইনের বরাভয় দেখাচ্ছিলেন কোন যুক্তিতে?

একমাত্র নুসরতকে গাছে বেঁধে পেটানোর প্রশ্নেই আব্বাস ফ্যাসাদে পড়েছিলেন। নিজের মন্তব্যের সপক্ষে তিনি কোন যুক্তি দিতে পারেননি, বলেছেন তিনি আইন জানতেন না। কিন্তু আলোচনা যেই নুসরতের মন্দিরে যাওয়ার দিকে ঘুরেছে, তখনই আব্বাস কী বলছেন তার চেয়ে আপনি তাঁকে দিয়ে কী বলাতে চাইছেন তার গুরুত্ব বেশি হয়ে গেছে।

৫২:৪৪

আব্বাস: আর এই যে মন্দিরে যাবে, মসজিদে যাবে। এটাকে আমি আপনাদের চ্যানেলের মাধ্যমে আবার জানাচ্ছি… যদি কোন মুসলমান মন্দিরে যায়, সে ঠাকুরকে অপমান করছে। হিন্দু ভায়েদের সজাগ হওয়া দরকার। আর যদি কোন হিন্দু ভাই মসজিদে যায়, সে ইসলামকে অপমান করছে। মুসলিম ভায়েদের সজাগ হওয়া দরকার।

আপনি: কেন বলছেন? এ তো আপনি বিভাজনের কথা বলছেন।

আব্বাস: এটা বিভাজন নয়…

আপনি: আমরা যে রাজ্যে আছি সেই রাজ্যে কাজি নজরুল ইসলাম তিন হাজার গান লিখেছেন। তার মধ্যে একটা বড় অংশ শ্যামাসঙ্গীত। এরপরে তো আপনি বলবেন যে অন্যায় করেছেন, ওনাকেও গাছে বেঁধে পেটানো উচিৎ। যে কেন তিনি শ্যামাসঙ্গীত লিখলেন?

আব্বাস: না, আপনি কথাটা আবার তুলছেন, আমি তো সেটা ক্লিয়ার করে লিইছি। তা কাজি নজরুল রাজনীতির নেতা নয়। আপনি যখন একটা মসজিদে যাচ্ছেন, আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনি কি নমাজকে বিশ্বাস করেন?

আপনি: কিন্তু আমি বলছি আজমির শরীফে প্রচুর হিন্দু যান…

এখানে আব্বাসের প্রথম উক্তি শুনে যে কোন উদার মনের মানুষ লাফিয়ে উঠবেন, মন বিদ্রোহ করবে। কিন্তু তিনি যখন কাজি নজরুল সম্বন্ধে বলছেন উনি তো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তখন বোধ হচ্ছে আব্বাসের আপত্তি আসলে রাজনৈতিক নেতার মন্দির-মসজিদে যাওয়া নিয়ে। সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যখন আজমির শরীফের প্রসঙ্গে তিনি বলছেন “আজমির শরীফে যাওয়া হচ্ছে সুলতান-এ-হিন্দ গরীব নওয়াজকে শ্রদ্ধা জানানো। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই যাচ্ছে, আমাদের কাছেও [ফুরফুরা শরীফে] আসে। কিন্তু ধর্মীয় পাঠ… আমি একটা ঠাকুরের কাছে যাচ্ছি। আপনি বলুন, আমি ঠাকুরটাকে কি বিশ্বাস করি? আমি মূর্তির পূজাতে বিশ্বাসী তো নই। আমি যখন মূর্তি পূজারীর কাছে যাচ্ছি, তখন শুধুমাত্র ড্রামা। কী? হিন্দু ভায়েদের ভোট লিবার জন্যে হিন্দু ভায়েদের ধর্মকে ড্রামা করছি ভোট লিবার জন্যে। এটাকে আমি ঘৃণা করি। এটা বলতে চাইছি।”

Secularism কথাটা আমরা যাদের থেকে পেয়েছি, সেই ইউরোপীয়রাও এই উত্তরে সন্তুষ্ট হতেন কারণ তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণার মূলে ছিল গির্জার আর রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ। অথচ এই উত্তরের পরে আপনি প্রায় গায়ের জোরে বলছেন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোয় নাকি এই কথা বলা যায় না। মানে সাক্ষাৎকারের শুরুতে দাবি করেছিলেন ধর্মীয় পরিচয় সরিয়ে রেখে রাজনীতিতে আসা উচিৎ। আর এখন রাজনীতিবিদদের মন্দির মসজিদে যাওয়ার অধিকার নিয়ে লড়ে গেলেন। যুক্তি খুঁজে না পেয়ে একটা অদ্ভুত উদাহরণ দিলেন — মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এমন জেলা মুর্শিদাবাদ থেকে হিন্দু অধীর চৌধুরী আর প্রণব মুখার্জি নির্বাচিত হন। যেন আব্বাস বলেছেন হিন্দু প্রার্থীদের মুসলমান ভোটারের ভোট চাওয়া উচিৎ নয়। আব্বাস যখন কিছুতেই পিছু হটলেন না, বললেন সাধারণ মানুষের অন্য ধর্মস্থানে যাওয়া, অন্য সময়ে যাওয়া আর রাজনীতির কারবারির নির্বাচনের সময় যাওয়া এক নয়, তখন একটা চরম হাস্যকর মন্তব্য করলেন। “আমার তো ভয় লাগছিল যে আমি কোনদিন ফুরফুরা শরীফে গেলে আমায় মারবেন কিনা।” প্রত্যাশিত উত্তর না পাওয়ার হতাশা ছাড়াও এখানে যা ছিল তা সেই গবেষণার অভাব। ফুরফুরা শরীফের ইতিহাস, ভারতের সুফিদের ইতিহাস জানা থাকলে এই আশঙ্কা আপনার কখনোই হত না সুমনবাবু।

আসলে ঘন্টা খানেকের সাক্ষাৎকারে বারবার প্রকাশ হয়ে পড়ছিল এই সত্য, যে প্রকৃত বাঙালি ভদ্রলোকের মতই দাড়ি আর টুপি পরা কোন গেঁয়ো মুসলমানের সাথে মুখোমুখি বসে রাজনীতি নিয়ে আলাপচারিতার সুযোগ আপনার চট করে হয় না। কিন্তু আপনি একে শহুরে ভদ্রলোক, তায় সাংবাদিক। সুতরাং সামনের লোকটির চেয়ে সব বিষয়েই এগিয়ে, তাই প্রস্তুতি বা গবেষণা নিষ্প্রয়োজন। বহু আগে থেকেই কিছু ধারণাজাত প্রশ্ন তৈরি আছে। সেগুলোর উত্তরে লোকটা এক আধটা আলটপকা সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করবেই। অমনি চ্যানেলের টি আর পি এবং সাংবাদিক হিসাবে আপনার খ্যাতি আরো বেড়ে যাবে। লোকে বলবে “কেমন আব্বাসের মুখোশ খুলে দিল!” বিস্তর টানাটানি করেও যখন খুলে হাতে চলে আসার মত কিছু পাওয়া যায় না, তখন হতাশ লাগে বই কি।

দু মাস বয়সী একটা দল, যাদের জনপ্রিয়তা এখনো পরীক্ষিত নয়, যাদের কোন প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই, তাদের অধিনায়কের সাক্ষাৎকার আপনি যেভাবে নিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে অনেক লোকের হাততালি কুড়িয়েছে। আমি যা-ই বলি না কেন। তবে সাংবাদিকতার ছাত্র হিসাবে বলতে পারি, সাংবাদিকের আসল পরীক্ষা দুর্বল অবস্থানে থাকা কাউকে কড়া প্রশ্ন করা দিয়ে হয় না। হয় ক্ষমতার বিন্যাসে মজবুত অবস্থানের লোককে কতটা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, তা দিয়ে। আব্বাসের সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষেও আপনি দেশের সংবিধানের আওতার মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে, ইত্যাদি একগাদা জ্ঞান বিতরণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে যোগী আদিত্যনাথ এসেছিলেন, হয়ত আবার আসবেন। আপনি তাঁর সাক্ষাৎকার নেবেন বলে অপেক্ষা করে আছি। তাঁকেও স্টুডিও ছেড়ে যাওয়ার আগে সাংবিধানিক দায়দায়িত্ব, মৌলবাদকে দূরে রাখার কথা মনে করিয়ে দেবেন দয়া করে। তাতে সাংবাদিক, অসাংবাদিক সকলেরই উপকার হবে।

আমাদের শুভেচ্ছা থাকবে।

শ্রদ্ধান্তে

জনৈক ব্যাঙাচি।

এবিপি আনন্দে আব্বাস সিদ্দিকির সাক্ষাৎকার।ছবিতে আব্বাস ও সাংবাদিক সুমন দে। চিত্র ঋণ :এবিপি আনন্দ।

5 মন্তব্য

Leave a Reply