স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গণআন্দোলনের এত বড় জয় এর আগে এই দেশ কখনও কি দেখেছে? এক-আধটি উদাহরণ ছাড়া, সম্ভবত, না। চটজলদি কয়েকটি বড় গণ-আন্দোলনের্র সাফল্যের কথা মনে পড়ছে বটে, তবে তাদের প্রভাব এবং গুরুত্ব এত ব্যপক ও সর্বভারতীয় নয়। বাংলা-বিহার সংযুক্তির বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, একটি উপনির্বাচন যেমন কার্যত ‘ফাইনাল ম্যাচে’ পরিণত হয়েছিল, তার তুলনা মেলা ভার। শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ওই আন্দোলন ছিল এই নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের দাবি আদায়ের সংগ্রাম। হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করে দক্ষিণ ভারতে যে অসামান্য গণআন্দোলন হয়েছিল, তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জরুরি অবস্থা বিরোধী ঐতিহাসিক গণআন্দোলন অবশ্যই স্মরণীয়।

তিনটি কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে গত এক বছর ধরে যে আন্দোলনের আঁচে আমরা পুড়লাম, অবশেষে তা সাফল্যের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। অমিত ক্ষমতাশালী প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদী জাতির উদ্দেশে ভাষণে কৃষি আইন প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করলেন। তাঁর এই আত্মসমর্পণকে গৌরবান্বিত করার হাস্যকর প্রচেষ্টায় লেগে পড়েছেন শীর্ষ বিজেপি নেতার৷ অমিত শাহ টুইট করেছেন, ‘আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের মতো কাজ করেছেন প্রধানমন্ত্রী’। জেপি নড্ডার দাবি, ‘কৃষকের স্বার্থের উন্নতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর যে অন্য কোনো স্বার্থ নেই, তা ফের প্রমাণিত হল।” সংবাদসংস্থা এএনআই-এর পাঠানো ভিডিয়োতে যোগী আদিত্যনাথকে সামান্য বিমর্ষ মনে হল। ওঁর মতে, “কৃষি আইন আসলে কৃষকের রোজগার বাড়াত। কৃষকদের তা বুঝিয়ে ওঠা যায়নি।” একই কথা অবশ্য প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আসলে গল্পটা হচ্ছে নতিস্বীকারের। কৃষকদের আন্দেলনের সামনে একটা প্রবল পরাক্রমশালী সরকার পিছিয়ে গেল। হেরে গেল। এই পরাজয়ের ফলাফল নিয়ে সহস্র রকমের আলোচনা হবে, বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে এর ফলাফল কী হতে পারে, সে নিয়ে নানাবিধ বিশ্লেষণ চলবে, কিন্তু সবচেয়ে বড় কথাটা হল, শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা দেখিয়ে দিল, গণআন্দোলনই সেই অমোঘ হাতিয়ার, যা সেটলড ফ্যাক্টকে আনসেটলড করে দিতে পারে। অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। দেখিয়ে দিল, ভোট সত্য, ভোটে জেতার জন্য জোটের প্রয়োজনীয়তাও হয়তো সত্য, নানাবিধ সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ, জাতপাত সবই সত্য, কিন্তু এই সব কিছুর উপরে সত্য গণআন্দোলন, বিপন্ন মানুষের মরীয়া একটানা লড়াই। গত এক বছর আন্দোলনটা তাঁরা করেছিলেন, যাঁদের কাছে কৃষি আইন রদ কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে জরুরি ছিল না, বেঁচে থাকার জন্য জরুরি ছিল। রাজনীতি-বিলাস থেকে নয়, বিবেকের তাড়নায় নয়, তাঁরা লড়েছিলেন কারণ না লড়ে উপায় ছিল না, তাই। শেষ অবধি জয় হল এই মরিয়া, নাছোড় জীবনস্পৃহার।

কেন মোদী পিছু হটলেন, তা নিয়ে চুম্বকে কয়েকটা কারণকে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন। পূর্ব উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি ক্রমশ হারানো জমি পুনরুদ্ধার করছে। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে বিপুল প্রভাব আন্দোলনকারী কৃষকদের। নির্বাচনের আগে এক পা পিছু হটা ছাড়া বিজেপির উপায় ছিল না। কৃষকরা হুমকি দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়া হবে৷ আগামী ২২ নভেম্বর লখনৌতে মহাপঞ্চায়েত ডেকেছিকেন তাঁরা। সবমিলিয়ে বিজেপির রক্তচাপ বাড়ছিল। যদিও এখনও ওই রাজ্যের বিজেপি এগিয়ে রয়েছে। ব্যবধান কমছে, তবে তা পর্যাপ্ত নয়।

পাঞ্জাবে বিজেপির বাজি ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত না নিলে ক্যাপ্টেনের পক্ষেও বিজেপির হাত ধরা সম্ভব ছিল না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরেই তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অমরিন্দর। আপ-আকালি-কংগ্রেসের দাপটের মাঝে বিজেপির সম্মানরক্ষার লড়াই একটু আলো দেখতে পারে এই সিদ্ধান্তে।

সংসদের বাদল অধিবেশন পুরোপুরি ভেস্তে গিয়েছে। কৃষি আইন নিয়ে তুমুল বিক্ষোভ দেখিয়েছেন বিরোধীরা। শীতকালীন অধিবেশনেও একই রকম গোলমালের সম্ভাবনা ছিল। অধিবেশন চলাকালীন প্রতিদিন সংসদ অভিমুখে ট্র্যাক্টর মার্চ করার কর্মসূচি নিয়েছিলেন কৃষকরা। তা নিয়ে রীতিমতো ত্রাহি ত্রাহি রব পড়ে গিয়েছিল প্রশাসনের অন্দরে। অন্যদিকে, আগামী ২৬ নভেম্বর নিয়েও চাপ বাড়ছিল। ওইদিন গোটা রাজধানী ঘেরাও করে বিরাট বিক্ষোভের কর্মসূচি নিয়েছিলেন কৃষকরা। তা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছিল প্রশাসন। এদিনের ঘোষণার পর আপাতত শান্তিকল্যাণ।

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্কে দেশবাসীর অবিশ্বাস কতখানি তীব্র হতে পারে, তা-ও দেখলাম আমরা। যিনি নিজের বিশ্বের জনপ্রিয়তম নেতা বলে দাবি করেন, সেই নরেন্দ্র মোদীর মৌখিক ঘোষণা বিশ্বাস করতে পারছেন না কৃষকরা। তাঁরা জানিয়েছেন, সংসদে আইন রদ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আসলে শেষ অবধি জিতে গেল এই মাটি কামড়ে থাকা জেদ। স্মারকলিপি দিয়ে গণআন্দোলন হয় না, গণআন্দোলনের জন্য সবচেয়ে জরুরি এই নাছোড়, একরোখা মানসিকতা। দিল্লি সীমান্তে এক বছর ধরে রাকেশ টিকায়েত, হান্নান মোল্লারা যা দেখাতে পারলেন। এই নাছোড় লড়াইয়ের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭০০ শহীদ কৃষককে শেষ শ্রদ্ধা জানানো গেল।

পশ্চিমবঙ্গের কি কিছু শেখার আছে? শহীদ বাদল শেখদের শেষ শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কিছু শেখা যায় না?

Leave a Reply