গত ২১ মে, ২০২২ (শনিবার) কলকাতার ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটে হাতিবাগান সঙ্ঘারাম নাট্যদলের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রদত্ত এই বক্তৃতা পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপে প্রকাশ করা হচ্ছে। আলোচনার বিষয় ছিল ‘আলো-অন্ধকারে আমাদের সময় – কী করণীয়, কী স্মরণীয়’। আজ দ্বিতীয় অংশ।

পড়ুন প্রথম পর্ব

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কতকগুলো টাকার অঙ্ক না বললে আপনাদের বিশ্বাস না-ও হতে পারে যে সরকারি বিজ্ঞাপন এত বড় ব্যাপার। তাই কয়েকটা অঙ্ক বলি। প্রায়ই দেখবেন কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে বিজ্ঞাপন থাকে। ওরকম একটা বিজ্ঞাপনের দর বড় কাগজগুলোতে উনিশ বিশ। ২০২০ সালে আমি তেমন একটা কাগজেই কাজ করতাম। সেখানে ওই বিজ্ঞাপনের দাম ছিল এক কোটি টাকা। আধ পাতার বিজ্ঞাপন হলে পঞ্চাশ লাখ। এবার মনে করে দেখুন, গত লোকসভা নির্বাচনের সময়ে প্রত্যেক দফায় কতবার আপনার বাড়ির কাগজটার পাতা জুড়ে মোদীজিকে দেখেছেন, তারপর হিসাব করুন কত টাকার বিজ্ঞাপন একেকটা কাগজ বিজেপির থেকে পেয়েছে। এ তো গেল নির্বাচনের সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের বিজ্ঞাপনের কথা। ওগুলো তাও কোট আনকোট সরকারি বিজ্ঞাপন নয়। গত এক দশকে সরকারের বিজ্ঞাপন দেওয়ার বহর কীভাবে বেড়েছে তার একটা ধারণা দিই। এগুলো সবই অতিমারীর আগের হিসাব। পরেরগুলো আসতে এখনো সময় লাগবে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে একজন তথ্যের অধিকার আইন (মানে রাইট টু ইনফরমেশন অ্যাক্ট) অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন সরকার সংবাদমাধ্যমে কত টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছে। উত্তরে সরকার জানায় এপ্রিল ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৭ পর্যন্ত অঙ্কটা ছিল ৩,৭৫৫ কোটি টাকা। ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের ভাগে ১,৬৫৬ কোটি আর ছাপা কাগজে বা পত্রিকায় ১,৬৯৮ কোটি। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দিল্লি সরকার, মানে আম আদমি পার্টির সরকার। তারা শুধু ২০১৫ সালেই ৫২৬ কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়েছিল।

তা এতগুলো টাকার বিজ্ঞাপনের মায়া ত্যাগ করে কোন সংবাদমাধ্যম সরকারের বিরুদ্ধে যায় এমন খবর করবে? পশ্চিমবঙ্গের কথা বেশি বলব না। কারণ এখান থেকে আবার বাড়ি ফিরতে হবে তো, বিপ্লব মন্ডল করে দিলে মুশকিল। গতবছর একসঙ্গে চারটে রাজ্য আর একটা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, মানে পুদুচেরিতে, ভোট হয়েছিল। তার মধ্যে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়ায় এক নম্বরে ছিল আমাদের রাজ্য। প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা খরচ করেছিল এই রাজ্যের দলগুলো। প্রায় ১ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকা খরচ করে শীর্ষে ছিল তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের মত বা তার চেয়েও বেশি করে কীভাবে সোশাল মিডিয়া ভোটারদের প্রভাবিত করে তা নিয়ে একটা আলাদা আলোচনা করা যায়, তার মধ্যে যাচ্ছি না।

বিজ্ঞাপন দিয়ে মিডিয়াকে কিনে নেওয়ার কাজটা কিন্তু শুধু সরকার করে না, কর্পোরেটও করে। আর আমাদের দেশে তো ক্রমশ যাহা কর্পোরেট তাহাই সরকার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে কোনো কাগজ যেমন সরকারের সমালোচনার মধ্যে যায় না, চ্যানেলগুলো যেমন দিনরাত প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীদের গুণগান করতে ব্যস্ত থাকে, তেমনি শিল্পপতিদের কুকীর্তিও প্রকাশ করা যায় না। শুধু তা-ই নয়, কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত কোথাও আপনি কারোর সমালোচনা করতে পারবেন না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। এখন তো আইপিএলের দেখাদেখি অনেকগুলো খেলাতেই ওরকম আলো ঝলমলে লিগ হয়। আমার ডিপার্টমেন্টের এক জুনিয়রকে সেরকম একটা লিগ কভার করতে পাঠানো হয়েছিল। সে সেখান থেকে একটা কপি ফাইল করল, যে এখানে বাজনা তো প্রচুর, কিন্তু খাজনা নেই। মানে লোকে সেভাবে খেলা দেখতে আসছে না, গ্যালারি রোজই খালি থাকছে। এই কপি পাতায় বসে যাওয়ার পর ফেলে দিতে হয়েছিল। কারণ আমার কাছে উপরতলা থেকে ফোন এল, ওই লিগ কাগজকে কোটি পাঁচেক দিয়েছে। অতএব তাদের খামতি-টামতি লেখা যাবে না।

মানে বুঝতেই পারছেন, টাকা দিয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ করা যদি রাজনীতিতে একবার চালু হয়ে যায়, তাহলে সব ক্ষেত্রেই সেটা চলে। অগণতান্ত্রিকতা, অসহিষ্ণুতাও তাই এখন আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বত্র। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতা নেত্রী নয়, বিরাট কোহলি পর্যন্ত অপ্রিয় প্রশ্ন শুনলে রেগে যান। আজকাল খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকার নেওয়া মানে হচ্ছে, আগে থাকতে প্রশ্নগুলো দলের মিডিয়া ম্যানেজারের কাছে জমা দিতে হবে। তিনি যে প্রশ্নগুলো করতে অনুমতি দেবেন কেবল সেগুলোই জিজ্ঞেস করা যাবে। মানে ফিক্সড ইন্টারভিউ ব্যাপারটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে।

এই যে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ – এটাই আজকের সাংবাদিকতার অভিনব অন্ধকার। আগে কি এমন হত না, যে কোনো সাংবাদিক কোনো শিল্পপতির থেকে ঘুষ নিয়ে তাঁর সম্পর্কে বা তাঁর ব্যবসা সম্পর্কে ভাল ভাল কথা লিখলেন, বা লেখা উচিত এমন কোনো খবর লিখলেন না? বিলক্ষণ হত। রাজনৈতিক নেতারা, প্রশাসনের মাথারা, মন্ত্রীরা, অভিনেতারা – অনেকেই এ কাজ করাতেন। অনেকসময় ঘুষ দিয়েও করাতে হত না এগুলো, স্রেফ প্রভাব খাটিয়ে বা সাংবাদিকের সাথে খাতিরের জোরে করানো হত। কিন্তু সেগুলো চুপিচুপি করা, কোনো কোনো সাংবাদিক করতেন। কাজটার পেশাগত স্বীকৃতি ছিল না। এখন কিন্তু আর সাংবাদিক একা একা দুর্নীতি করতে পারেন না। এখন তাঁর কাগজ বা তাঁর চ্যানেল সরাসরি নির্দেশ নেয় ক্ষমতাশালীদের কাছ থেকে। দরাদরিও করে। ফলে কোনো সাংবাদিক সৎ সাংবাদিকতা করতে গেলে একলা হয়ে যাবেন। চুপচাপ ঘাড় নীচু করে কর্তৃপক্ষ যা বলছেন তাই করে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। অন্যথায় চাকরি চলে যাবে, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাণও যেতে পারে।

আরো পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

আর সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে যে একতা ছিল, সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে। আগে একজন সাংবাদিককে কেউ আক্রমণ করলে শুধু তাঁর সংস্থা নয়, সমস্ত সংস্থার সাংবাদিক পাশে দাঁড়াত। কারণ প্রতিযোগিতা ছিল খবর করা নিয়ে, ক্ষমতাশালীর প্রিয়পাত্র হওয়া নিয়ে নয়। এখন সাংবাদিক হয়ে গেছেন গৌণ, খবর করা নিয়ে প্রতিযোগিতাও স্তিমিত। কারণ প্রতিযোগিতাটা এখন সরকার আর বিরাট পুঁজিওলা লোকেদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার। সেই প্রতিযোগিতা তো মিডিয়া হাউসগুলোর মধ্যে, সাংবাদিক সেখানে বোড়ে মাত্র। সাংবাদিককে দরকারই নেই, দরকার ম্যানেজার। সেই কারণে অতিমারীর অজুহাতে গোটা দেশের অসংখ্য বড় কাগজ অনেকগুলো সংস্করণ বন্ধ করে দিয়েছে, কাগজ আর চ্যানেলগুলো প্রচুর সাংবাদিক ছাঁটাই করেছে। মালিকদের দরকার বাধ্য লোক। তারা অযোগ্য হলেও কোনো অসুবিধা নেই, বরং সুবিধা। কারণ সাধারণত অযোগ্য লোকের পোষ মানার তাগিদ বেশি হয়। এর মধ্যে যোগ্য লোক যাঁরা টিকে আছেন, তাঁদের নিজেদের যোগ্যতা জোর করে ভুলে টিকে থাকতে হচ্ছে। আপনি হয়ত সকালের কাগজে একগুচ্ছ ভুল দেখে বা টিভির খবরে ভুলভাল, হাস্যকর আলোচনা দেখে মন খারাপ করছেন। ভাবছেন ছি ছি! এই কাগজটা কোথায় ছিল, কোথায় নামল! ভুল করছেন, কোত্থাও নামেনি। আপনি সকালে যেটা হাতে পাচ্ছেন সেটা আসলে একটা রসিদ। কার রসিদ? যে বা যারা নিজের পছন্দের খবর ছাপাতে টাকা দিয়েছে তাদের রসিদ। মানে বিরাট বিরাট স্পনসর এসে পড়ার আগের যুগে পাড়ার দুর্গাপুজোর সুভেনির হত না? সেই জিনিস। আপনি মাস গেলে কাগজওলাকে টাকা দিলেন মানে আসলে কাগজে যারা বিজ্ঞাপন দেয় তাদের আপনি ভর্তুকি দিলেন। টিভির পর্দায় যা দেখছেন তা-ও ইলেকট্রনিক রসিদ। জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, খবর হচ্ছে সেটাই যেটা কেউ একজন চায় না প্রকাশিত হোক। বাকি সব হচ্ছে পাবলিক রিলেশন।

তা পাবলিক রিলেশন তো আর পাবলিকের স্বার্থে করা হয় না। পাবলিককে সম্মোহিত করে রাখার জন্য করা হয়। সেটাই করা হচ্ছে। আপনার দরকার চাকরি, আপনাকে আমি পড়াচ্ছি অমুক নেতার তমুকের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের রসালো কাহিনি। তাঁরা পয়লা বৈশাখে ছাদে নাচ করলেন, গরমের ছুটিতে কাশ্মীর বেড়াতে গেলেন। আপনি দেখছেন সবজি মাছ মাংস সবকিছুর আগুন দাম, ২০১৪ সালে যে দামে দুটো গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যেত এখন সে দামে একটা পাওয়া যাচ্ছে। আমি আপনাকে দেখাচ্ছি কী? না তাজমহল কি আসলে তেজো মহালয় ছিল? কারণ ওটা করার জন্যই আমার কাগজ বা আমার চ্যানেল বিজ্ঞাপন, এবং পেড নিউজ, অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ঘুষ, পাচ্ছে। সরকারের অকর্মণ্যতা নিয়ে খবর করতে গেলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

এর সঙ্গে আরও একটা বিপদ আছে। বিরাট বিপদ। কমলে কামিনী জানেন তো? ওই যে চণ্ডীমঙ্গলে ছিল? একজন মহিলা পদ্মফুলের উপর বসে আস্ত আস্ত হাতি গিলে ফেলছে? ওইভাবে পদ্মফুলের উপর বসে মুকেশ আম্বানি একের পর এক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে গিলে ফেলছেন। এমন প্রায় কোনো সংবাদমাধ্যমের নাম আপনি ভেবে উঠতে পারবেন না, যেখানে তাঁর অন্তত কিছুটা অংশীদারিত্ব নেই। নিজেদের হাতে তৈরি সিএনএন-আইবিএন ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল রাজদীপ সরদেশাই আর তাঁর স্ত্রী সাগরিকা ঘোষকে। কারণ রাঘব বহলের থেকে ওটা কিনে নিয়েছিল রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ। ওই নেটওয়ার্ক এইট্টিন গ্রুপের যত চ্যানেল, যত ওয়েবসাইট সবই এখন মুকেশের সম্পত্তি। তাছাড়াও অজস্র সংবাদমাধ্যমে তিনি নানা মাত্রায় আছেন। এমনকি SEBI (মানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়া)-র রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, সম্ভবত এনডিটিভিরও ৫২% শেয়ার এখন মুকেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মহেন্দ্র নাহাতার। ভারতীয় মিডিয়া ইতিমধ্যেই অভিজাততন্ত্রে পরিণত হয়েছে, ক্রমশ আক্ষরিক অর্থে মনোপলির দিকে এগোচ্ছে। এইসব কারণে, লক্ষ করুন, আমি যে অসমসাহসী সাংবাদিকদের নাম করলাম প্রথম দিকে, তাঁরা কেউ আপনাদের জানা কোনো সংবাদমাধ্যমের কর্মী নন। কেউ স্থানীয় কাগজের কর্মচারী, কারোর একটা ইউটিউব চ্যানেল আছে, কেউ শুধু একটা ফেসবুক পেজ চালান। নির্ভীক সাংবাদিকতা আজকের ভারতে এই মানুষগুলোই করছেন।

কী করে পারছেন? এর উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আজকের আলোচনার বিষয়ের দ্বিতীয় অংশটার উত্তর। কী করণীয়?

এই মুহূর্তে ভারতে সত্যিকারের সাংবাদিকতা বলতে যা বোঝায়, কয়েকটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে সেটা করার একমাত্র জায়গা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বিকল্প সংবাদমাধ্যম (alternative media)। কয়েকটা নাম আমরা সবাই জানি – দ্য ওয়্যার, নিউজক্লিক, নিউজলন্ড্রি, কুইন্ট ইত্যাদি। এরা অনেকেই স্থানীয় স্তরের যে লড়াকু সাংবাদিকরা এতদিন বিভিন্ন বড় সংবাদমাধ্যমে নামমাত্র পারিশ্রমিকে দারুণ কাজ করতেন, তাদের কিছুটা বেশি টাকা দিয়ে খবর কেনে। সরকারবিরোধী, কর্পোরেটবিরোধী খবর এরা করে উঠতে পারে কারণ এই ওয়েবসাইটগুলো চলে মূলত সাবস্ক্রাইবারদের টাকায়, বিজ্ঞাপনের টাকায় নয়। বাংলায় কিন্তু এই ব্যাপারটা এখনো সেভাবে চালু হয়নি। না হওয়ার জন্য আপনি, আমি সবাই খানিকটা দায়ী। হয়নি বলে পশ্চিমবঙ্গে যে নিউজ সাইটগুলো আছে, তার অনেকগুলোই কনটেন্টের দিক থেকে বিকল্প নয়।

তৃতীয় এবং শেষ পর্ব >>

মতামত ব্যক্তিগত

2 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.