গত ২১ মে, ২০২২ (শনিবার) কলকাতার ন্যাশনাল মাইম ইনস্টিটিউটে হাতিবাগান সঙ্ঘারাম নাট্যদলের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রদত্ত এই বক্তৃতা পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত রূপে প্রকাশ করা হচ্ছে। আলোচনার বিষয় ছিল ‘আলো-অন্ধকারে আমাদের সময় – কী করণীয়, কী স্মরণীয়’। মূলত সংবাদমাধ্যম সম্পর্কিত এই বক্তৃতার আজ শেষাংশ।

পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আমি শুধু বিজ্ঞাপনের কথা বলেছি, পেড নিউজের মধ্যে ঢুকিনি। কারণ সেটা আবার নিজেই একটা আলাদা বিষয়। এ নিয়ে বিশিষ্ট সাংবাদিক পি সাইনাথের দারুণ কাজ আছে। এমনিতে আজকাল সংবাদমাধ্যমকে টাকা দিয়ে আপনি করাতে পারবেন না এমন কাজ নেই। ২০১৮ সালে কোবরাপোস্ট একটা স্টিং অপারেশন করেছিল। তাতে কোবরাপোস্টের প্রতিনিধিরা একটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রতিনিধি সেজে ভারতের অনেকগুলো বড় বড় মিডিয়া হাউসের কর্তাদের কাছে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব ছিল, আমরা টাকা দেব, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত খবর করতে হবে এবং ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা হয় এমন খবর করতে হবে, নানারকম ইভেন্টের আয়োজন করতে হবে। দুটো মাত্র মিডিয়া হাউস রাজি হয়নি – পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান আর ত্রিপুরার দৈনিক সংবাদ।

এই অন্ধকারের মধ্যে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। কেন নেমে এল এই অন্ধকার? ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার চেয়েও ঘন এই অন্ধকার কেন আটকাতে পারল না সংবাদমাধ্যম? দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান তো শুধু ভারতে হয়নি। পৃথিবীর দুটো প্রাচীন গণতন্ত্র – ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র – দু জায়গাতেই ঘোর দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে গত এক দশকে। সেখানে মিডিয়ার এ অবস্থা হয়নি তো।

ইন্টারনেটে ইংল্যান্ডের কাগজগুলো পড়ে দেখুন, রোজ তুলোধোনা করছে বরিস জনসনকে। সরকার তাদের কিচ্ছুটি করতে পারে না। মাসখানেক আগেই দেখলাম আইটিভির একজন সাংবাদিক মুখোমুখি বসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর লাইভ সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভদ্রমহিলার বয়স আমাদের নাভিকা কুমারের মতই হবে। কিন্তু তিনি এমন সব প্রশ্ন করছিলেন, যে জনসনবাবু পালাতে পথ পাচ্ছিলেন না। একবার আমতা আমতা করে বলার চেষ্টা করলেন, আমার পক্ষে যা যা করা সম্ভব আমি করছি। মহিলা সটান বলে দিলেন, না, করছেন না। তারপর তথ্যপ্রমাণও দিয়ে দিলেন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্ক টাইমস তাদের ‘ওপিনিয়ন’ নামে যে বিভাগটা আছে তাতে ‘ট্রাম্প’স লাইজ’ শিরোনামে পুরো পাতা জুড়ে একটা লেখা ছেপেছিল। কী ছিল সেই লেখায়? কিচ্ছু না। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যত মিথ্যে কথা বলেছেন তার তালিকা, সঙ্গে সত্যিটা কী – সেইটা। আমরা কি স্বপ্নেও ভাবতে পারি ভারতের কোনো কাগজে ‘মোদী’জ লাইজ’ বলে একটা পাতা বেরোবে? যে দু-একটা কাগজ এখনো ধারাবাহিকভাবে সরকারবিরোধী খবর করে – ধরুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বেঙ্গালুরুর ডেকান হেরাল্ড, কি কলকাতার টেলিগ্রাফ – তারাও পেরে উঠবে না। আবার দেখা যায় এরাও নিজের রাজ্যের সরকারের ব্যাপারে অনেকসময় নরম। কারণ সকলেরই ক্ষমতার সীমা আছে। কদিন পরপরই দেখবেন খবর হয় – এনডিটিভির প্রণয় রায়, রাধিকা রায়ের পাসপোর্ট সিজ করা হয়েছে। বা দ্য ওয়্যারের অফিসে ইডির রেড, অথবা নিউজক্লিকের কর্ণধারকে টানা ছ ঘন্টা জেরা। তাছাড়া অবাধ্য সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের নামে কথায় কথায় মানহানির মামলা, থানায় ডেকে পাঠিয়ে হয়রানি – এসব চলতেই থাকে। উপরন্তু যে মানিকজোড় ক্রমশ ভারতের সব শিল্পের দখল নিচ্ছেন, তাঁদের অন্য জোড়টি, গৌতম আদানি, তিনিও মৃদুমন্দ গতিতে মিডিয়া জগতে ঢুকে পড়ছেন। কুইন্টের মাইনরিটি স্টেক কিনেছেন সদ্য। সুতরাং বিকল্প সংবাদমাধ্যমও যে আমাদের সময়ের আলো হয়ে বেশিদিন টিকতে পারবে, এমন ভরসা করা যায় না।

তাহলে কী স্মরণীয়? কী করণীয়?

প্রথমেই আমাদের মধ্যে গেড়ে বসে থাকা একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণাকে সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। আমরা ছোট থেকে শুনে এসেছি যে আইনসভা (মানে সংসদ, বিধানসভা, বিধান পরিষদ ইত্যাদি), প্রশাসন (মানে পুলিস, আমলা প্রমুখ), বিচারব্যবস্থার (মানে আদালত) পর সংবাদমাধ্যম হল গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। খবরের কাগজ হল “people’s Parliament always in session” – এরকমও বলা হয়েছে। এখন বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে, যে এগুলো একদম ভুল। আসলে সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ নয়, গণতন্ত্রই সংবাদমাধ্যমের একমাত্র স্তম্ভ। গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে সংবাদমাধ্যম শক্তিশালী হয়, গণতন্ত্র ধসে পড়লে সংবাদমাধ্যমও ধসে পড়ে।

ইংল্যান্ড, আমেরিকার সাংবাদিকরা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছেন কারণ বাম, মধ্য, ডান যে-ই ক্ষমতায় আসুক; ওখানকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো এত শক্তিশালী, যে একটা স্তরের বেশি বেয়াদপি করা যায় না। আপনার দেশের রাজনীতি নীতিহীনতা, দুর্নীতি আর মানুষ-মারা আদর্শের স্বর্গরাজ্য হয়ে যাবে আর সংবাদমাধ্যম একা কুম্ভ হয়ে গণতন্ত্রের গড় রক্ষা করবে – এ হয় না। আপনার সমাজ সংখ্যালঘুর রক্ত চাইবে আর টিভি চ্যানেলগুলো রেডিও রোয়ান্ডা হয়ে উঠবে না – এ অসম্ভব।

আমেরিকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দেখুন আর ভারতের বিরোধী শক্তিগুলোকে দেখুন। আমেরিকার ডেমোক্র্যাট নেতারা রাহুল গান্ধীর মত ট্রাম্পের সাথে লড়াই করতে করতে আচমকা ইউরোপে ছুটি কাটাতে চলে যেতেন না। ওখানে আমাদের এখানকার মত ঘোষিত মার্কসবাদীদের সংখ্যা এবং শক্তি – দুটোই নগণ্য। কিন্তু ডেমোক্র্যাট দলের বামপন্থী বার্নি স্যান্ডার্স, আলেক্সান্দ্রা ওকাসিও কর্তেজরা যে লড়াই দিয়েছিলেন, এখনো দিচ্ছেন, তার ফলে ট্রাম্পপন্থী লোকেরা তো বটেই, এমনকি ডেমোক্র্যাটদের ভিতরের দক্ষিণপন্থীরাও কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। অসংখ্য দলে বিভক্ত ভারতের বামপন্থীদের তো তার চেয়ে অনেক বেশি জোরদার লড়াই দেওয়ার কথা। কিন্তু পারছেন কই? বুলডোজারের সামনে সিপিএমের বৃন্দা কারাতের সঙ্গে নকশাল নেতা রবি রাইও দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। যেখানে সম্ভব সেখানেই স্বৈরাচারী শাসকের বুলডোজারের সামনে যদি ওঁরা ওইরকম ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে কিছুটা লড়াই হতে পারে। কিন্তু এ দেশের কমিউনিস্টদের অনেকটা সময় এবং উদ্যম নষ্ট হয় কে কার চেয়ে বেশি কমিউনিস্ট তার চুলচেরা হিসাব করতে গিয়ে।

আর যে আঞ্চলিক দলগুলো আছে, তাদের মধ্যে লালুপ্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ছাড়া প্রায় সকলেই কখনো না কখনো বিজেপির সাথে ঘর করেছে, ক্ষমতায় থাকাকালীন চরম দুর্নীতির ইতিহাসও আছে। তাছাড়া তাদের নেতা-নেত্রীদের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ যতখানি, আরএসএসের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নামার আগ্রহ ততখানি নয়। বরং রামনবমী পালন, মন্দির বানানো, বিভিন্ন পুজোর আয়োজনে বিজেপির চেয়ে বেশি বিজেপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় তারা বেশি স্বচ্ছন্দ। সংখ্যালঘুদের ত্রাতার অভিনয় করে ক্ষমতায় এসে দাঙ্গাবাজদের দলের টিকিটে উপনির্বাচনে দাঁড় করাতে তাদের কোথাও বাধে না। ফলে অবাধে মসজিদের কুয়ো থেকে শিবলিঙ্গ উদ্ধার চলছে। গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আমাদের চোখের সামনে ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে। সে ইতিহাস অবশ্য পড়বে না আমাদের ছেলেমেয়েরা। তারা পড়বে হলদিঘাটের যুদ্ধে রাণাপ্রতাপের সেনাবাহিনী আকবরের বাহিনীকে হারিয়ে দিয়েছিল। তারা ভগৎ সিং পড়বে না, পড়বে আরএসএসের প্রথম সঙ্ঘচালক কেশব বলিরাম হেড়গেওয়ারের বক্তৃতা।

এমতাবস্থায় সাংবাদিকতার অন্ধকার কাটানো অসম্ভব। সে অন্ধকার কাটবে তখনই, যখন ভারত আবার গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ হবে।

কী করে হবে সেটা? মোডাস অপারেন্ডি যদি আমার জানা থাকত, তাহলে আমি আজ এখানে এসে আপনাদের সামনে এতক্ষণ ধরে বক্তৃতা দিতাম না। কাজটা করতে নেমে পড়তাম। কিন্তু আমি জীবনে একদিনও সক্রিয় রাজনীতি করিনি, আর এই কাজটা রাজনীতির লোকেদেরই কাজ। তাঁদেরই করতে হবে। এখানে আমি রাজনীতি বলতে দলীয় রাজনীতির কথা বলছি, সরকার পরিবর্তনের কথা বলছি। কিন্তু আমার ধারণা, যে অন্ধকারে ভারতবর্ষ প্রবেশ করেছে তার থেকে মুক্তি স্রেফ সরকার পরিবর্তন হলেই হবে না। সেই কারণেই আমরা যারা দলীয় রাজনীতির বাইরের লোক, তাদেরও সেতুবন্ধনে কাঠবিড়ালির ভূমিকা নিতে হবে বলে আমার মনে হয়।

তার জন্যে প্রথমেই আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক করে তোলা মানে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়া নয়। সে কেউ প্রয়োজন বোধ করলে যোগ দিতেই পারেন। কিন্তু যেটা অবশ্যই করা দরকার সেটা হল কাজকর্মে, জীবনচর্যায় রাজনৈতিক হওয়া। এই ব্যাপারটায় অন্তত এই মুহূর্তে ভারতের ফ্যাসিবাদীরা বামপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

একটা উদাহরণ দিই, তাহলেই বোঝা যাবে কথাটা। এই কিছুদিন আগে সোশাল মিডিয়া তোলপাড় হয়ে গেল একজন রেডিও জকির একটা মন্তব্য নিয়ে। তা উনি যে চ্যানেলের বিতর্কসভায় গিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন, সেই চ্যানেলটা আমি দেখি না। কারণ ওটা যে খবরের চ্যানেল নয়, ফ্যাসিবাদীদের প্রোপাগান্ডা চ্যানেল সেটা অনেকদিন আগেই পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং তারাও এটা গোপন করার চেষ্টা করে না। কিন্তু একটা লেখার জন্য আমার ওই ক্লিপটা, যেখানে ওই ভদ্রমহিলা বিতর্কিত কথাগুলো বলেছেন, সেটা দেখার দরকার পড়েছিল। ওই কয়েক মিনিটের ক্লিপে আমার দুজনকে চোখে পড়ল যাঁরা ঘোষিত ফ্যাসিবিরোধী। একজন নামকরা অধ্যাপক, আরেকজন বিখ্যাত সাহিত্যিক। তা আমি যদি ফ্যাসিবাদীদের প্ল্যাটফর্মকে বয়কট করার মত সামান্য কাজটুকুও করতে না পারি, তাহলে আমি কিসের ফ্যাসিবিরোধী? ওঁরা তো তবু দলীয় রাজনীতির বাইরের লোক। তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম ইত্যাদি যেসব দল ঘোষিত আরএসএস বিরোধী – অবশ্য, তৃণমূল সম্পর্কে না জেনে ওই শব্দটা প্রয়োগ করা হয়ত আমার উচিত হচ্ছে না।। কারণ গত বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে রাহুল কাঁওয়ালকে বলেছিলেন তাঁর বিজেপিকে নিয়ে সমস্যা, তিনি সঙ্ঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছেন না। কারণ তারা ভোটে লড়ে না (এই ভিডিওতে ১৩ মিনিট ১১ সেকেন্ড থেকে)। যা-ই হোক, কথা হচ্ছে বিজেপিবিরোধী দলের প্রতিনিধিরাই বা ওই চ্যানেলে কী প্রত্যাশা নিয়ে যান? কেন বয়কট করতে পারেন না? আমাদের মত সাধারণ মানুষ তো ওঁদের দিকেই তাকিয়ে থাকে। ওঁরা কিন্তু বুঝতেই পারছেন না, যে এই বয়কটটা একটা দরকারি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তই যদি না নেওয়া যায়, তাহলে গণতন্ত্রকে কী করে বাঁচাব আর ফ্যাসিবাদকে কী করে হারাব? লক্ষ করে দেখবেন, কোনো বিজেপি নেতা তো বটেই, দলীয় রাজনীতির বাইরের কোনো দক্ষিণপন্থীও রবীশ কুমারের শোতে যায় না, ওয়্যার বা নিউজক্লিকে লেখে না।

আরো পড়ুন হলোকস্ট অনুসারী কার্টুন দেখে বিরোধীরা কিছু বুঝছেন না?

আসলে গত তিরিশ বছরে আমাদের সকলেরই যে সত্তাটা সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে সেটা হল ক্রেতা সত্তা। ফলে আমাদের চিন্তাভাবনাও হয়ে গেছে ব্র্যান্ড নির্ভর। কোনটা রাজনীতি আর কোনটা স্রেফ দলাদলি সেটা ভুলে গেছি। আমাদের মধ্যে এক ধরনের অরাজনৈতিক পার্টিজানশিপ তৈরি হয়েছে, যা আসলে হয়ত ব্র্যান্ড নির্ভরতা। আমরা ভাবছি একটা মতাদর্শ মানে একটা ব্র্যান্ড। আর ব্র্যান্ডেড জিনিসের তো একটাই এক্সক্লুসিভ বিক্রেতা থাকে। ফ্যাসিবাদ ব্র্যান্ডের বিক্রেতা হল বিজেপি, মার্কসবাদ ব্র্যান্ডের বিক্রেতা সিপিএম – এরকম আর কি। আমাদের রাজ্যে তো ব্র্যান্ড বুদ্ধ, ব্র্যান্ড মমতা – এই শব্দবন্ধগুলো অনেকদিন ধরেই চালু। এগুলো আমাদের অবচেতনেও কাজ করে। তো ব্র্যান্ড চেনা হয়ে গেলে আমরা কী করছি? কে কোন দলের সমর্থক আর আমি কোন দলের সমর্থক – তা দিয়ে আমার প্রতিক্রিয়া ঠিক করছি এবং আমার ক্রিয়া বলে আর কিছু থাকছে না।

আপনার সাথে কোনো বিষয়ে আমার তর্ক হলে আমি আপনার যুক্তিগুলো মন দিয়ে শুনছি না, বোঝার চেষ্টা করছি না। যুক্তিগুলো খণ্ডন করে আপনাকে হারানোর চেষ্টা করছি না। আমি চট করে আপনার ফেসবুক প্রোফাইল দেখে জেনে নিচ্ছি কোন বিষয়ে আপনার কী প্রতিক্রিয়া ছিল, তা থেকে ঠিক করে নিচ্ছি আপনি কোন দলের লোক। তারপর আপনি আমার পছন্দের ব্র্যান্ডের লোক হলে আপনি অন্যায় বললেও একমত হয়ে যাচ্ছি, নাহলে ন্যায্য কথা বললেও ঝগড়া করছি। এয়ারটেল ভাল, না ভোডাফোন ভাল? এই নিয়ে যদি দুজন ঝগড়া করে, গালাগালির পর্যায়ে চলে যায়, আপনি দেখে হাসবেন তো? অথচ এটা কিন্তু সেই জিনিসই হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ ঠিক এটাই চায়।

অর্থাৎ ফ্যাসিবাদ আর বাইরে নেই, আপনার ভেতরে আমার ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। এটাকে বার করতে হলে যেখানে সম্ভব সেখানেই ফ্যাসিবাদীদের সংস্রব ত্যাগ করতে হবে। কোনো ছোঁয়াচে রোগ হলে আমরা সকলের থেকে সরে থাকি দুটো কারণে। এক, যাতে রোগটা আরও ছড়াতে না পারে। দুই, যাতে আমার নিজের সংক্রমণ বেড়ে না যায়। আমাদের মারাত্মক ছোঁয়াচে ঘৃণার রোগ হয়েছে। এই রোগ তাড়াতেও আমাদের আগে ফ্যাসিবাদীদের সঙ্গে সমস্তরকম সম্ভাব্য সম্পর্ক ত্যাগ করতে হবে বলে আমার মনে হয়। কাউকে হয়ত বন্ধু ত্যাগ করতে হবে, কাউকে কোনো আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক তুলে দিতে হবে। কিন্তু কাজটা করতেই হবে। আমরা যে যার মত গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলব আর এত বড় বিপদ থেকে দেশটা বেঁচে যাবে, আমরা আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলব – এরকম ভাবনা অনৈতিহাসিক।

একবার আমারই কাছাকাছি বয়সের কয়েকজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বাঙালি সাহিত্যিকের সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ হয়েছিল। তাঁরা হিন্দি আগ্রাসন আটকাতে হবে বলে দিনরাত ফেসবুকে পোস্ট করতেন। অথচ নিজেদের ছেলেমেয়েকে বাংলা বই পড়ান না। সেদিনের আড্ডায় বললেনও “বাংলার চেয়ে হিন্দি পড়লে যদি বেশি লাভ হয়, তাহলে সন্তানকে আমি হিন্দিই পড়াব। বাংলা কেন পড়াব?”

এরকম ভণ্ডামি করে কোনোদিন ফ্যাসিবাদীদের হারানো যায়নি। কেবল প্রতিক্রিয়া দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে গণতন্ত্র রক্ষা হয়নি। ক্রিয়া দরকার। কীরকম ক্রিয়া? আমি ডাক দিলে তো এক হাজার লোক জড়ো হবে না, যে একটা মিছিল কি মিটিং করব? কিন্তু মিছিল, মিটিংয়ে যেতে তো পারব। অন্তত সেটুকু করি। যদি আমি লিখলে পাঁচজন লোক পড়ে, তাহলে একটু লিখি। যদি বললে আপনাদের মত কিছু লোক শোনে, তাহলে একটু বলি। যে কবিকে আমরা ঠাকুর বানিয়ে শিকেয় তুলে ভুলে গেছি এবং যাঁর জন্মদিনে আমরা কোনো কেলেঙ্কারি করতেই বাকি রাখি না, সেই কবি লিখেছিলেন

কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যারবি।
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল, সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।”

এই মাটির প্রদীপের কাজটা আমরা করতে পারি। ভীষণ ক্লান্তিকর, হতাশায় ডুবিয়ে দেওয়ার মত কাজ কিন্তু। কারণ চারপাশের অন্ধকার এত গাঢ়, রাতটা এত দীর্ঘ যে মাঝে মাঝে মনে হবে একটা অন্ধকার অট্টালিকায় আপনি একা প্রদীপ হয়ে জ্বলছেন। এই হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্যে একটু আশার বাণী আমি শোনাতে পারি আগাথা ক্রিস্টির লেখা থেকে। দ্য পেল হর্স উপন্যাসের এক জায়গায় কয়েকটা চরিত্র ‘ইভিল’-এর ধরন ধারণ নিয়ে আলোচনা করছিল। সেখানে একটা চরিত্র বলে, যে হিটলারের মত লোকেরা ইভিল হলেও নিশ্চয়ই তাদের বিরাট ব্যক্তিত্ব ছিল। পরে যখন অপরাধী ধরা পড়ে, দেখা যায় লোকটা নেহাত ফালতু। তখন এক পুলিস অফিসার বলেন “Evil is not something superhuman, it’s something less than human. Your criminal is someone who wants to be important, but who never will be important, because he’ll always be less than a man.”

সাংবাদিক পরিচয়ে এতগুলো কথা বললাম। ফলে কেউ এই প্রশ্নটা তুলতেই পারেন, যে আমার তো নিরপেক্ষ হওয়ার কথা। আমি পক্ষ নিচ্ছি কেন? সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ হওয়া উচিত, এই ধারণাটাকেও বাতিল করা দরকার। এ দেশে কথাটা খোলাখুলি বলা হয় না এখনো, সবরকম পক্ষপাতদুষ্ট কাজ নিরপেক্ষতার ভান বজায় রেখে করা হয়। কিন্তু সেই ১৯৪২ সালে আমেরিকায় হাচিন্স কমিশন বলে একটা কমিশন তৈরি করা হয়েছিল। তার কাজ ছিল আধুনিক গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নির্ধারণ করা। ১৯৪৭ সালে সেই কমিশন রিপোর্ট দেয়। সেই রিপোর্টে “factually accurate but substantially untrue” প্রতিবেদন লেখার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। কথাটা কেমন পরস্পরবিরোধী মনে হচ্ছে না? ঘটনা হিসাবে নিখুঁত হলে আবার অসত্য হবে কী করে?

২০২০ সালের অগাস্ট মাসে আমেরিকান প্রেস ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর টম রোজেনস্টিয়েল ট্রাম্পের আমলে উত্তর-সত্যের (post truth) মোকাবিলা কীভাবে করতে হবে সেটা বলতে গিয়ে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বলেছেন ধরুন, আমি নিও নাজিদের বলা একগাদা কথা রিপোর্ট করেছি, যেটা ঘটনা হিসাবে নিখুঁত। মানে তারা সত্যিই এই কথাগুলো বলেছে। কিন্তু যা বলেছে, সেগুলো ডাহা মিথ্যে। তার মানে আমি কী করলাম? আমি মিথ্যে কথাগুলোকে নিখুঁতভাবে রিপোর্ট করলাম। আমি যদি রিপোর্টে না বলি যে এগুলো সব মিথ্যে কথা, তাহলে তো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো হবে না। অথচ সত্য উদ্ঘাটন করাই তো সাংবাদিকের কাজ।

আমি মাস দুয়েক আগে অল্টনিউজের কর্ণধার প্রতীক সিনহার সাক্ষাৎকার নিলাম। উনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, সমাজে ঘৃণার এমন চাষ হয়েছে যে স্রেফ কোনটা ভুয়ো খবর আর সত্যিটা কী, সেটা বলে দিয়ে কাজ মিটছে না। কারণ আমরা ফেক নিউজ থেকে হেট স্পীচের স্তরে পৌঁছে গেছি।

সুতরাং সাংবাদিককে এখন পক্ষ নিতেই হবে। প্রাইম টাইম নিউজে যারা ঘৃণা ছড়ায় তারা মিথ্যার পক্ষ নিয়েছে, আমি সত্যের পক্ষ নিলাম।

মতামত ব্যক্তিগত

<<পড়ুন প্রথম পর্ব

<<পড়ুন দ্বিতীয় পর্ব

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.