২০২৪ সালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে দেশে ৮০-২০ খেলা ততই গতি পাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের গত বিধানসভা নির্বাচন যোগী আদিত্যনাথ যখন এই ৮০-২০ স্লোগানের উপর ভর করে জিতে নিয়েছিলেন তখন থেকেই বোঝা গেছিল যে আগামী লোকসভাতেও এটিই হয়ে উঠতে চলেছে বিজেপির তুরুপের তাস। ভারতের জনসখ্যার ৮০ শতাংশকে হিন্দু বলে ভেবে নেওয়া ও প্রচার করা বিজেপির রাজনীতির একটি দিক। অন্যদিকে প্রায় ২০% মানুষ, যাঁরা ইসলাম ধর্মের প্রতি আস্থাশীল, তাঁদের একটি সমসত্ত্ব ও অখণ্ড জনগোষ্ঠী হিসাবে দেখানো এবং তাঁদের হিন্দুবিরোধী ও ভারতবিরোধী বলে দেগে দেওয়া বিজেপির রাজনীতির অন্য দিক। এই রাজনীতির ফলে যা ঘটে তা হল, ভারতের জনগণ এই মেরুকরণের খেলায় এমনই বুঁদ হয়ে থাকে যে হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে শ্রমিক, কৃষক সমেত সাধারণ মানুষের উপর বৃহৎ পুঁজির বহুমুখী আক্রমণ নামিয়ে আনা সরকারের পক্ষে সহজ হয়। পাশাপাশি বিজেপির রাজনৈতিক আধিপত্যও অক্ষুণ্ণ থাকে।

এসব খুবই সহজ সত্য। দেশের রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষ এসব জানেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, দেশের আমজনতার মধ্যে কেন এই মেরুকরণের বীজ সহজেই পোঁতা যায়? শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বড়লোক-গরীব, শ্রমিক-বুর্জোয়া নির্বিশেষে মানুষের এক বৃহদংশ খুব সহজেই এই মেরুকরণের রাজনীতির শিকার, ভাবনার শিকার। এর কারণ কী? কারণ আমাদের ইতিহাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ ও ঐতিহাসিকদের পক্ষপাতপূর্ণ প্রচারের ফলে মানুষের মধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্বের শিকড় অত্যন্ত গভীরে চারিয়ে গেছে। সুতরাং ইতিহাস এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের ব্যাখ্যা, ইতিহাসের আলোচনা অবশ্য চিরকালই রাজনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। ইতিহাস, অর্থাৎ কোথা থেকে কী হয়েছিল, এর ব্যাখ্যা দিয়েই সমস্ত যুদ্ধরত শ্রেণি, জাতি, বর্গ তাদের নিজ নিজ বর্তমান রাজনীতির সারবত্তা প্রমাণ করেছে, প্রতিষ্ঠা করেছে। বর্তমানে এই বিষয়টি আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পশ্চিমবঙ্গ দিবস?

যেমন ধরুন, অতি সম্প্রতি এক অদ্ভুত ঘটনা দেখা গেল। কেন্দ্রীয় সরকার ২০ জুন দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসাবে পালন করার জন্যে সমস্ত রাজ্যের রাজ্যপালকে নির্দেশ পাঠাল। সেই নির্দেশে বলে দেওয়া হল, অনুষ্ঠানের প্রতিবেদন এবং ছবি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে হবে। তার মানে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বাধ্যতামূলকভাবে সব রাজ্যের রাজ্যপালকে এই দিনটি পালন করতে হবে। তা করাও হল। আমাদের রাজ্যে রাজ্যপালের পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোরও চলল। কিন্তু হঠাৎ এই উদ্ভট নির্দেশের কারণ কী? স্বাধীনোত্তর ভারতে যখন কখনোই এমন কোনো দিবস উদযাপন করা হয়নি, তখন হঠাৎ করে এই উদ্যোগ কেন? আসলে এই উদ্যোগ হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি, এর পিছনে একটি সুচিন্তিত রাজনীতি আছে, উদ্দেশ্য আছে। তা হল দেশভাগের তিক্ত স্মৃতি উস্কে দিয়ে মুসলমানবিরোধী হাওয়া তোলার চেষ্টা। বিজেপি সমস্ত কিছুতেই এই কাজ চালিয়ে যায় তাদের মেরুকরণের সামগ্রিক রাজনীতির অংশ হিসাবে। তারা দেখাতে চায়, ভারত ভাগ করে পাকিস্তান গঠন ছিল একটি ‘মুসলমান-পরিকল্পনা’। অখণ্ড বাংলাকে পাকিস্তানে যুক্ত করা ছিল সেই পরিকল্পনার অংশ। সুতরাং ১৯৪৭ সালের ২০ জুন যখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় বাংলা ভাগের পক্ষে বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়, তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ভোট দিয়ে বাংলা ভাগের পক্ষে মত দেন। তার ফলেই সমগ্র বাংলা পাকিস্তানে যায়নি এবং হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পশ্চিমবঙ্গ, যা ভারতের সাথে যুক্ত হয়। এই হল বিজেপির কথা।

ইতিহাসের ছাত্র বা গবেষক না হয়েও যাঁরা কিছুমাত্র খোঁজখবর রাখেন তাঁরাই জানেন যে, সেই সময়ে অখণ্ড বাংলার প্রতি বিপুল অংশের মানুষের সমর্থন ছিল। এই সমর্থনের ভিত্তিভূমি ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন। তখন থেকেই বাংলার বিপুল অংশের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ বাংলা ভাগ করার যে কোনো চক্রান্তের বিরুদ্ধে ছিলেন। এমনকি, ভারত ভাগ হলেও বাংলা ভাগ হবে না এবং স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারতের পাশাপাশি এক স্বাধীন অখণ্ড বাংলা গড়ে তুলতে হবে – এই মতামতও ছিল বেশ জোরদার। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি সর্বশক্তি দিয়ে ভারত ভাগ এবং বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে সওয়াল করে। ভারত ভাগ অবধারিত হলেও বাংলা ভাগ হবে না এবং অখণ্ড বাংলা আলাদা থাকবে, নাকি ভারতে যোগ দেবে, তা গণভোটের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হোক – এই দাবি কমিউনিস্ট পার্টি উত্থাপন করে।

“হিন্দু এবং মুসলমানের সম্মিলিত বঙ্গভূমি ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত থাকিবে কিংবা তাহার বাহিরে থাকিবে ইহার মীমাংসা করিবে সম্মিলিত বঙ্গের গণভোট। বৃহৎ বঙ্গের আইনসভায় সর্ব্বসাধারণের ভোটের অধিকার থাকিবে এবং বিভিন্ন দল নিজ নিজ সমর্থকদের সংখ্যার অনুপাতে প্রতিনিধি পাঠাইতে পারিবে।”

(স্বাধীন ভারতে স্বাধীন বাংলা – বাঙালী জাতির স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার কি এবং কোন্ পথে/ ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রদেশিক সম্মেলনের জন্যে খসড়া প্রস্তাব/ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭)।

কংগ্রেস কী চেয়েছিল? জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস প্রথমত চেয়েছিল স্বাধীন অখণ্ড ভারত। কিন্তু সেই ভারতে মুসলমানদের নিজস্ব অধিকারগুলি মানতে তারা অস্বীকার করেছিল। মুসলিম লীগের কোনো দাবিই তারা মানেনি। এর ফলস্বরূপ ১৯৪০ থেকে মুসলিম লীগ স্বতন্ত্র পাকিস্তানের দাবি উত্থাপন করতে শুরু করে এবং খুব দ্রুত তা মুসলমানদের এক বড় অংশের মধ্যে, বিশেষ করে মুসলমান বুর্জোয়া, অভিজাত ও উচ্চশ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করতে থাকে। আজকের বিজেপির যারা পূর্বসূরি, সেই হিন্দু মহাসভা প্রথম থেকেই ভারত ভাগ চেয়ে এসেছে। এমনকি কংগ্রেসের মধ্যেও যারা কট্টর হিন্দুত্বপন্থী, তারাও ভারত ভাগের পক্ষে থেকেছে। মুসলিম লীগ চাইছিল স্বতন্ত্র পাকিস্তান এবং অখণ্ড বাংলা। তারা চাইছিল অখণ্ড বাঙলাকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে। হিন্দু মহাসভা লীগের এই মনোভাবকে পুঁজি করে বাংলায় হিন্দু মধ্যবিত্তদের মধ্যে বাংলা ভাগের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালায়। কংগ্রেস, লীগ এবং মহাসভার এক শ্রেণির নেতৃত্বের কারসাজি ও চক্রান্তে ১৯৪৬ সালের অগাস্টে কলকাতার দাঙ্গা সংঘটিত হবার পর মহাসভার এই প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও লীগের প্রদেশিক নেতারা, তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী হোসেন সুরাবর্দী খান, কংগ্রেসের প্রাদেশিক কিছু নেতা, শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশঙ্কর রায় প্রমুখ যৌথভাবে ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল প্ল্যান’ নামে অখণ্ড বাংলার পক্ষে একটি পরিকল্পনা গঠন করেন। মহাত্মা গান্ধী এবং মহম্মদ আলি জিন্নাও প্রাথমিকভাবে এর পক্ষে ছিলেন। কিন্তু খুব দ্রুত পটপরিবর্তন হয়ে যায়। কংগ্রেস নেতৃত্ব, বিশেষ করে বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু প্রমুখ এই পরিকল্পনা খারিজ করে দেন। ১৯৪৭ সালের জুন মাসের শুরুতেই ইংরেজ শাসকরা, কংগ্রেস এবং লীগ বাংলা ভাগের ব্যাপারে সহমত হয়, ৩ জুন তা ঘোষিত হয়ে যায়। এরপর ২০ জুন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে তা পাস করানো হয়। শরৎ বসু, কিরণশঙ্কররা যদিও বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। সুতরাং ২০ জুন দিনটি সেই হিসাবে ছিল চক্রান্তকারীদের বিজয়ী হবার দিন।

বিজেপি এখন এই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস বলে প্রচার করতে জোর কদমে নেমে পড়েছে। আসলে এর পিছনে আছে আগামীদিনে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণার প্রেক্ষাপট রচনার তাগিদ। পাকিস্তান থেকে আলাদা এবং পাকিস্তানের বিরোধী আরেক ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনা, যা আসলে ভারতীয় প্রেক্ষাপটের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র, তার দিকে এগিয়ে যাবার এক মতাদর্শগত ভূমি তৈরি করাই তাদের লক্ষ্য।

 

ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার স্পষ্টই বলেছেন, নবগোপালই দ্বিজাতিতত্ত্বকে জিন্নার অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন

 

দেশভাগ চেয়েছিল কারা?

বাংলা ভাগের সঙ্গে ভারত ভাগের প্রশ্নটি খুবই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমাদের দেশের গোটা শিক্ষাব্যবস্থাতেই খুব জোর দিয়ে একথা শেখানো হয়, যে মহম্মদ আলি জিন্না হলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের জনক এবং মুসলিম লীগের ভারত ভাগ ও স্বতন্ত্র পাকিস্তানের দাবির পক্ষে প্রায় সব মুসলমান দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু এই শিক্ষা আসলে উদ্দেশ্যমূলক এবং মিথ্যা। জিন্নার অনেক আগে হিন্দুত্ববাদী নেতারাই দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করেছিলেন এবং এই অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, যে একটি দেশে এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রে বসবাস করতে পারবেন না। দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রথম প্রচারক ছিলেন তাঁরাই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণার উপর দাঁড়িয়েই কালে কালে ভারত ভাগের ধারণা গতি পায় এবং যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ নির্দিষ্টভাবে এই পরিকল্পনা করে তখন হিন্দু ও মুসলমান নেতৃত্বের একাংশ তাতে সম্মত হয়, জনগণের একাংশের মধ্যেও এই ভাবনা অনুমোদন লাভ করে। বাংলায় নবগোপাল মিত্র এবং রাজনারায়ণ বসুই ছিলেন দ্বিজাতিতত্ত্বের পথিকৃৎ। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার স্পষ্টই বলেছেন, নবগোপালই দ্বিজাতিতত্ত্বকে জিন্নার অর্ধশতাব্দীরও বেশি আগে ব্যক্ত করে গিয়েছিলেন। (“Nabha Gopal forestalled Jinnah’s theory of two nations by more than half a century”; History of the Freedom Movement in India/ Vol I)

ভাই পরমানন্দের কথা অনেকেই বলেছেন। বাবাসাহেব আম্বেদকর তাঁর পাকিস্তান অর দ্য পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া বইতে এবং কমরেড সামসুল ইসলাম তাঁর মুসলিমস আগেনস্ট পার্টিশন অফ ইন্ডিয়া বইতে পরমানন্দের দ্য হিন্দু ন্যাশনাল মুভমেন্ট শীর্ষক পুস্তিকার কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে তিনি পরিষ্কারভাবেই হিন্দু এবং মুসলমানদের আলাদা ইতিহাস, আলাদা সংস্কৃতি প্রভৃতি নিয়ে কথা বলেছেন এবং ইতিহাসে দুই সম্প্রদায়ের জাতীয় নায়করাও যে আলাদা সে কথা বলেছেন। সামসুল দেখিয়েছেন, যে আশ্চর্যজনকভাবে পরমানন্দের সেই সমস্ত কথাগুলিই জিন্না পরবর্তীকালে অবিকৃত রূপে গ্রহণ করেছিলেন। পরমানন্দ লিখেছিলেন “In history, the Hindu revere the memory of Prithvi Raj, Pratap, Shivaji and Beragi Bir, who fought for the honour and freedom of this land (against the Muslims), while the Mahomedans look upon the invaders of India like Muhammad Bin Qasim and rulers like Aurangzeb as their national heroes.”

তারপরেই এই কথা লুফে নিয়ে জিন্না বলেন “The Hindus and Muslims belong to two different religious philosophies, social customs, and literature[s]….It is quite clear that Hindus and Mussalmans derive their inspiration from different sources of history. They have different epics, their heroes are different, and different episode[s].” (সামসুলের বইতে উদ্ধৃত)

একইভাবে লালা লাজপত রায় পরিষ্কারভাবেই ধর্মের ভিত্তিতে পাঞ্জাব ভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। সাভারকর এবং গোলওয়ালকরের মত হিন্দু মহাসভার নেতারা তো অত্যন্ত জোরের সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রচার করেছেন। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ করার তিন বছর আগে আমেদাবাদে মহাসভার ১৯তম বৈঠকে সভাপতির ভাষণে সাভারকর বলেন “as it is, there are two antagonistic nations living side by side in India, several infantile politicians commit the serious mistake in supposing that India is already welded into a harmonious nation, or that it could be welded thus for the mere wish to do so…Late us bravely face unpleasant facts as they are. India cannot be assumed today to be a unitarian and homogenous nation, but on the contrary there are two nations in the main: the Hindus and the Muslims, in India.”

সুতরাং দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা জিন্না এবং তাঁর সহযোগী মুসলিম লীগের কিছু নেতার একচেটিয়া ছিল না। বস্তুত, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে হিন্দুত্ববাদী নেতারাই প্রকৃত প্রস্তাবে ছিলেন এই তত্ত্বের উদ্গাতা। হিন্দু মহাসভার নেতারা খোলাখুলিই ভারত ভাগের পক্ষে ছিলেন। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসচর্চায় কখনই এই দিকটি আলোচিত হয় না এবং প্রকৃত ঘটনা মানুষকে জানতে দেওয়া হয় না। অন্যদিকে মুসলমানদের এক বড় অংশ ভারত ভাগের বিপক্ষে ছিলেন। এই সত্যও প্রায়শই চেপে যাওয়া হয়। অথচ ঘটনা হল, যদিও মুসলিম লীগ নিজেদের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি বলে দাবি করত, বাস্তবে তারা মূলত প্রতিনিধিত্ব করত মুসলমান অভিজাততন্ত্রের। লীগের দাবির প্রতি কংগ্রেসের উদাসীনতা, অবজ্ঞা এবং নাছোড়বান্দা মনোভাব এবং মহাসভার মুসলমানদের প্রতি শত্রুতা ধীরে ধীরে সাধারণ মুসলমান সমাজকে লীগের দিকে ঠেলে দেয়।

 

১৯৪০ সালে লাহোরে লীগ ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ করার দেড় মাসের মধ্যে দিল্লিতে পাকিস্তান গঠনের বিরোধিতা করে মুসলমানদের একটি বৃহৎ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তার নাম ছিল ‘আজাদ মুসলিম কনফারেন্স’।

 

অথচ ১৯৪০ সালে লাহোরে লীগ ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ করার দেড় মাসের মধ্যে দিল্লিতে পাকিস্তান গঠনের বিরোধিতা করে মুসলমানদের একটি বৃহৎ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তার নাম ছিল ‘আজাদ মুসলিম কনফারেন্স’। তৎকালীন সিন্ধ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী (প্রিমিয়ার) আল্লা বকশ ছিলেন ওই সম্মেলনের মূল হোতা। তিনি লীগের ভারত ভাগের পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্যে সারা দেশের এক ডজনেরও বেশি গণভিত্তিসম্পন্ন মুসলমান সংগঠনকে একত্রিত করে এই সম্মেলন করেন। সম্মেলনে যোগদানকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, সারা ভারত জমিয়াতুল উলেমা, সারা ভারত মুমিন সম্মেলন, সারা ভারত মজলিস-ই-আহরার, খুদা-ই-খিদমতগার, বেঙ্গল কৃষক প্রজা পার্টি, অঞ্জুমন-ই-ওয়াতন, বালুচিস্তান ইত্যাদি। গোটা দেশ থেকে ১,৪০০ প্রতিনিধি এই সম্মেলনে হাজির হয়ে পাকিস্তান গঠনের পরিকল্পনাকে খারিজ করে দেন। কমরেড সামসুল লিখেছেন, এমনকি পাকিস্তানপন্থী ব্রিটিশ মিডিয়াও লিখতে বাধ্য হয়েছিল, মুসলিম লীগ যেখানে মূলত প্রতিনিধিত্ব করত মুসলিম অভিজাত সম্প্রদায়ের, আজাদ মুসলিম সম্মেলন বিপুলভাবে মুসলমান খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি। কিন্তু আল্লা বকশের আন্দোলন সফল হতে পারেনি। ১৯৪৩ সালের ১৪ মে আল্লা বকশ লীগের ভাড়াটে খুনিদের হাতে শহিদ হয়ে যান।

আরো পড়ুন দাঙ্গা থেকে দেশভাগ: বর্তমানকে বুঝতে ইতিহাস পাঠ

আল্লা বকশের মত সেইসময় অনেক মুসলমান বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদ স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ বহুধার্মিক, বহুভাষিক ও বহুজাতিভিত্তিক দেশ গঠনের পক্ষে থেকেছেন, কাজ করেছেন, এমনকি শহিদও হয়েছেন। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসচর্চায় এঁরা কখনোই গুরুত্ব পাননি। জনসাধারণ এঁদের নামই শোনেনি বলা যায়। শিবলি নোমানি, হসরত মোহানি, মুখতার আহমেদ আনসারি, আশফাকুল্লা খানের মত কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার শহিদ, খান আবদুল গফ্ফর খান প্রমুখ মুসলমান সম্প্রদায়ের অগ্রণী মানুষ ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ এবং পাকিস্তান গঠনের পক্ষে ছিলেন না। সাহিত্য, শিল্পের জগতেও এই প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। কবি শামিম কারহানির একটি কবিতা কমরেড সামসুল উদ্ধৃত করেছেন। পাকিস্তান (পবিত্র ভূমি) -এর ধারণাকে বিদ্রুপ করে লেখা এই কবিতাটি নিম্নরূপ:

“হম কো বতলাও তো কেয়া মতলব হ্যায় পাকিস্তান কা?/জিস জগহ ইস ওয়াক্ত মুসলিম হ্যায়, নাজিস হ্যায় কিয়া বজহ/নশ-এ-তোহমত সে তেরে, চিশতী কা সিনা চাক হ্যায়/ জলদ বতলা কেয়া জমিন আজমের কি না-পাক হ্যায়?”

(বলো তো আমাকে পাকিস্তানের অর্থ কী?/যেখানে এখন মুসলমানরা আছে তা কি কুয়াশাচ্ছন্ন?/তোমার শবযাত্রার কলঙ্কে চিশতির বক্ষ বিদীর্ণ হচ্ছে/ জলদি বলো, আজমীরের ভূমি কি অপবিত্র?)

বিষাক্ত প্রচার

প্রাচীন গ্রীক ট্র্যাজেডির রচয়িতা এস্কাইলাসের একটি উক্তি খুবই বিখ্যাত। “In war, truth is the first casualty” (যুদ্ধের প্রথম শিকার হল সত্য)। আর মাও সে তুং একবার বলেছিলেন, “রাজনীতি হল রক্তপাতহীন যুদ্ধ, এবং যুদ্ধ হল রক্তপাতযুক্ত রাজনীতি।” সুতরাং রাজনীতি যদি যুদ্ধই হয় তবে সে যুদ্ধেরও প্রথম শিকার হবে সত্য, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ভিত্তিই যে মিথ্যা প্রচার তা আমরা সর্বদাই উপলব্ধি করে থাকি। প্রথম থেকেই হিন্দুত্ববাদীরা একথা বলে আসছে, যে মুসলমানরাই হল হিন্দুদের প্রধান শত্রু। সাভারকর যখন রাজনৈতিক হিন্দুত্বের কারবার শুরু করলেন তখন শুধু হিন্দু সম্প্রদায়েরই নয়, ভারতভূমির শত্রু হিসাবেও মুসলমানদের চিহ্নিত করা শুরু হল। স্বাধীনোত্তর ভারতে যখন গোলওয়ালকরের কুখ্যাত গ্রন্থ বাঞ্চ অফ থটস প্রকাশিত হয় তখন এই বিষাক্ত প্রচার আরও তীব্র হয়ে ওঠে। গোলওয়ালকর তাতে মন্তব্য করেন, ভারতের মধ্যে থাকা মুসলমানরা ভারতের শত্রু। তারা আসলে পাকিস্তানের চর বিশেষ।

“Within the country there are so many Muslim pockets, i.e., so many ‘miniature Pakistans’… Such ‘pockets’ have verily become the centres of a widespread network of pro-Pakistani elements in this land…”

ওই বইতেই অন্যত্র লিখছেন “Right from Delhi to Rampur and Lucknow, the Muslims are busy hatching a dangerous plot, piling up arms and mobilizing their men and probably biding their time to strike from within when Pakistan decides upon an armed conflict with our country.”

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, যেসব মুসলমান অসাম্প্রদায়িক মানুষ দেশভাগের পরও ভারতে থেকে গেলেন এবং অন্যদের থেকে যেতে অনুপ্রাণিত করলেন শুধুমাত্র এই কারণে, যে কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রে তাঁরা থাকবেন না, তাঁদেরই পাকিস্তানের চর বলে লাগাতার ভিত্তিহীন প্রচার এই আরএসএস এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো চালিয়ে এল। আর এই প্রচারের বিষ দেশের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে তাদের সহায়ক হল ইতিহাসের বিকৃতি। অথচ এর বিরুদ্ধে শক্তিশালী পালটা প্রচারের প্রয়োজনীয়তা দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি কোনোদিনই অনুভব করল না। আজ যখন এই ভিত্তিহীন প্রচার সহস্র গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, দেশের কোণে কোণে মুসলমানদের প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে ফ্যাসিবাদীরা তাদের ঘুঁটি সাজাচ্ছে (উত্তরাখণ্ডে নাজি কায়দায় মুসলমানদের দোকানপাট চিহ্নিত করে তাঁদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, মসজিদে ঢুকে সেনাবাহিনী “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য করছে বলে অভিযোগ উঠছে), তখন প্রকৃত ইতিহাসকে জনগণের কাছে প্রতিনিয়ত তুলে ধরা কিন্তু বামপন্থী তথা কমিউনিস্টদের দায়িত্ব। ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রধান রঙ্গমঞ্চ হতে যাচ্ছে ইতিহাস। এ সত্য এখনো না বুঝলে আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.