কুড়ি বছর পর আফগানিস্তানে ক্ষমতায় ফিরেছে তালিবান। এর ফলে কতটা সমস্যায় পড়তে পারে ভারত? নতুন করে কি অশান্ত হবে কাশ্মীর? নাগরিক ডট নেটের সঙ্গে কথা বললেন প্রতিরক্ষা ও সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং রাষ্ট্রপতি পুরস্কার বিজয়ী প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডো দীপাঞ্জন চক্রবর্তী

 

আফগানিস্তানে নতুন করে তালিবানের ক্ষমতা দখলকে কীভাবে দেখছেন? একটু নরমপন্থী কি এই তালিবান?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

দেখুন, আশির দশক থেকে নয়ের দশকের শেষ অবধি রাজ করেছে যে তালিবান, তার স্রষ্টা ছিল আমেরিকা। এটা অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। কেবল আফগানিস্তান নয়, গোটা পৃথিবীতেই আমেরিকা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এই ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। যেগুলো মানবতার জন্য ভয়ংকর। আফ্রিকাতেও এমন করেছে আমেরিকা, এশিয়াতেও করেছে। এটা নতুন কিছু নয়। ব্রিটিশরাও আগে তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে করেছে। আমেরিকাও করছে। আমি তো সরাসরি বলি, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদী দেশ হল আমেরিকা।

দ্বিতীয়ত, আগের তালিবানের সঙ্গে ২০২১ সালের তালিবানের কোনো পার্থক্য নেই। আমি সরাসরি বলতে চাই, যে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের চালিকাশক্তি ধর্মোন্মাদনা বা জেহাদের নামে মানুষ খুন, তার চরিত্র বদলাতে পারে না। তারা রক্তের স্বাদ পেয়েছে শুধু নয়, রক্তের মধ্য দিয়েই তাদের জন্ম এবং উত্থান। তালিবান ২.০ নিয়ে এই ‘বদলের’ কথা ১৫ই আগস্ট থেকে বহুবার শুনেছি। কিন্তু এটা হতে পারে না। অসম্ভব। মাঝেমধ্যে ওরা দু-একটা ভালো কথা বলবে। তারপরেই একদম উল্টো আচরণ করবে। কালকেও কাবুলে প্রচুর শিশু ও মহিলাকে হত্যা করেছে। কোনো বদল আমি দেখছি না।

ভারতের আফগানিস্তান নীতিকে কী ভাবে দেখছেন? এর মধ্যেই দোহাতে তালিবানের সঙ্গে বৈঠক করেছে ভারত। কাশ্মীরে কি নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে?

আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নই। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যদি কোনোভাবে জিহাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে আমি নিশ্চয় কথা বলতে পারি। গত ৩২ বছর আমার কাজ করার জায়গাই ছিল জিহাদ। বহু মানুষ জিহাদ নিয়ে কথা বলেন, যাঁরা কখনও কোনো জিহাদিকে দেখেননি। আমি দেখেছি। জিহাদিদের মোকাবিলা করেছি।

২০২১ সালের তালিবানের সঙ্গে একটা বিষয়ে আগের তালিবানের ফারাক রয়েছে। পুরনো আমলের তালিবান, অর্থাৎ মোল্লা ওমরের সময়ের তালিবানরা বিশুদ্ধ জিহাদের নামে লড়েছে। তারা ধর্মের জন্য লড়েছে। কিন্তু হাল আমলের তালিবান যা কিছু করছে, সবই জিহাদের নামে, কিন্তু এর পিছনে একটা বাণিজ্যিক বুদ্ধি কাজ করছে। তালিবানরা অধিকাংশই অত্যন্ত ধর্মান্ধ, কুসংস্কারচ্ছন্ন, সভ্য জগতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাদের লিডারশিপ খুব ইন্টারেস্টিংলি বিজনেসগুলো ডিল করছে। যার জন্য তালিবানরা দোহাতে ভারতের সঙ্গে কথা বলল। ২৭ জুলাই তারা চীনে গিয়ে চীনের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ছবিও তুলল। এটাও একটা নতুন বিষয়। আগে তালিবানরা কিছুতেই ছবি তুলতে রাজি হত না। ওরা বিশ্বাস করত, ছবি তোলার অর্থ আত্মাকে কেড়ে নেওয়া। এখন দেখছি চিনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সার দিয়ে ছবি তুলছে। একটা তথাকথিত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, যারা ধর্মে বিশ্বাস করে না, তাদের সঙ্গে ছবি তুলছে।

তালিবানের উৎপত্তি কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে। রাশিয়া আফগানিস্তানের উপরে কমিউনিজম চাপাতে চেয়েছিল। সেই তালিবান এখন কমিউনিস্ট চীনের হাত ধরছে।

আসলে এখন পৃথিবীটা অনেক বদলে গিয়েছে। এখন জিহাদ বা কমিউনিজম সবকিছুর নেপথ্যেই টাকা। সেই ২৭ জুলাই তালিবান বলেছিল, আমরা ক্ষমতায় এলে চিনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করব। নেপথ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ।

আফগানিস্তানে তালিবানের প্রত্যাবর্তনে ভারতের কী সমস্যা হতে পারে?

দেখুন, ভারতের সমস্যা যেটা বাড়ল, সেটা হল আমরা চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে গেলাম। আবারও বলি, আমি আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নই। আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের যে অংশটা সামরিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত, আমি সেটা নিয়ে কথা বলতে পারি। দেখুন, নেপালের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই খারাপ হয়ে গিয়েছে। নেপাল মোটামুটি চীনের কব্জায় এসে গিয়েছে। বাংলাদেশে যতদিন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, ততদিন তারা মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, ভারতের পাশেই আছে। তবে সার্বিকভাবে দেখলে বাংলাদেশে মৌলবাদ ভালভাবে মাথা চাড়া দিচ্ছে। অন্য দিকে, মায়ানমারের জুন্টা সরকার মৌলবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় বড় বড় সমুদ্রবন্দর তৈরি করছে চীন। যেখানে রীতিমত সামরিক পোশাক পরে চীনা সেনাবাহিনীকে দেখা যাচ্ছে। তারা বন্দর পাহারা দিচ্ছে। পাকিস্তানের কথা ছেড়েই দিলাম।

তার মানে, বাংলাদেশ বাদে চারদিকে এমন একটা রাষ্ট্রও পাওয়া যাচ্ছে না যারা বলবে ভারতের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ব। এই যে তালিবানের উত্থান হল, তার বহুমুখী প্রভাব পড়বে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছে একটা পরিকল্পনা জমা পড়েছে। তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে তারা অরুণাচল প্রদেশ ‘রিগেইন’ করবে। খেয়াল করুন, ‘ক্যাপচার’ নয়, ‘রিগেইন’। সেই লক্ষ্যে নানা কিছু হচ্ছে। বাংলাদেশে অশান্তি হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় গোলমাল হচ্ছে। মায়ানমারে গোলমাল হচ্ছে। চীনের লক্ষ্যটা হল, পূর্ব সীমান্তে ভারতকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখা। তার সঙ্গেই পশ্চিম প্রান্তে আফগানিস্তানে তালিবানের উত্থান হল, জম্মু-কাশ্মীরে নিশ্চিতভাবে এর প্রভাব পড়বে। এটা ভারতের জন্য সাঁড়াশি চাপের মতো হল।

এটা কি ভারতের বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতা মনে হয়?

আর্ন্তজাতিক বিশেষজ্ঞ না হওয়ায় খুব বেশি কিছু বলা আমার শোভা পায় না। তবে একটা কথা বলব, জাতীয় নিরাপত্তা কিন্তু আমাদের সরকার ঠিক ভাবে রক্ষা করতে পারেনি। এর জন্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার দায়ী, না বিদেশ মন্ত্রক দায়ী, নাকি পিএমও দায়ী — সেটা তো বিশেষজ্ঞরা বলবেন। তবে গত ৬-৭ বছরে ভারত যে ‘বড় ভাই’ অ্যাপ্রোচ নিয়ে এগিয়েছে, তা কিন্তু ব্যুমেরাং হয়েছে। ছোট রাষ্ট্রগুলো চীনের সাহায্য চাইছে, চীন সেই সুযোগ নিচ্ছে।

দেখুন, আমি বিশ্বাস করি না, যে, এখনকার দিনে ভারত হোক, চীন হোক বা পাকিস্তান, কেউ পুরোদস্তুর যুদ্ধ চাইবে। কনভেনশনাল ওয়র সম্ভব নয়। প্রক্সি ওয়র দিয়েই চলবে। প্রক্সি ওয়র কিন্তু অর্থনীতির ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট। চীন এই ছায়াযুদ্ধ চালাবে। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল, মায়ানমার — এরা চিনের সাহায্যে এই ছায়াযুদ্ধে অংশ নেবে। তাতে আমাদের সমস্যা বাড়বে।

আরেকটা অসুবিধা হল, ভারত কোনোকিছুকেই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তুলতে পারবে না। চীন ভেটো দিয়ে দেবে। এটাও আমাদের একটা ব্যর্থতা।

ভারত সরকারের ‘আগ্রাসন’ কি বড় কোনও সমস্যা ডেকে আনছে?

যখন ৩৭০ রদ হয়েছিল, আমার মনে আছে, সংসদ ভবন আলো দিয়ে সাজানো হয়েছিল। আমি সেদিন একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্যানেলে ছিলাম। আমি বলেছিলাম, ৩৭০ রদ হওয়া উচিত। কিন্তু যদি এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ রাজনৈতিক খেলা খেলতে যায়, বা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর চাপ তৈরি করতে চায়, সেটা কিন্তু ব্যুমেরাং হবে। আমার কাছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের তথ্য আছে। ২০২১ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট অবধি কাশ্মীরে ১০৭ জন সন্ত্রাসবাদীকে খতম করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ জন খোদ কাশ্মীরের ছেলে। বাকিরা পাকিস্তানের। কাশ্মীরের ২০-২৫ বছরের ইতিহাসে এমন হয়নি।

আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। একজন কুখ্যাত জঙ্গি নেতাকে আমরা খতম করেছিলাম। নিরাপত্তার কারণে তাঁর নাম বলতে পারব না। আমি ছিলাম মিশনের নেতৃত্বে। আমার হাতেই তাঁর মৃত্যু হয়। আমাদের কাছে খবর ছিল, তিনি খুব বড় জঙ্গি নেতা। একাধিক লেয়ারে তাঁর নিরাপত্তা। আমরা সেই সব পেরিয়ে তাঁকে খতম করি। তাঁর সঙ্গে ৭-৮ জন ছিল। তাদের তিনজন মারা যায়। বাকিরা আহত হয়, ধরা পড়ে। তা ওই জঙ্গী নেতা ছিলেন পাকিস্তানের বাসিন্দা। ভাওয়ালপুরের লোক। আমি খেয়াল করলাম, তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে একজনও কাশ্মীরী নেই, এমনকি একজন পাকিস্তানিও নেই। সাতজনই সুদান, সোমালিয়া, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইনের লোক।

পরে আমি একটা সেমিনারে বলেছিলাম, কাশ্মীরের এই বিচ্ছিন্নতার লড়াই সফল হবে না, কারণ এর সঙ্গে মাটির মানুষদের যোগ নেই। একটা বিদেশি লোক লড়ছে। যাদের জন্য লড়ছে, তাদের সে ভরসা করতে পারছে না। তাহলে এর কী ভবিষ্যৎ আছে?

এই অবস্থাটা কিন্তু বদলেছে। জঙ্গি বলে যাদের মারা হচ্ছে, তাদের ৮০-৯০ শতাংশ কাশ্মীরের ছেলে। এর কারণ কী, সেটা ভাবতে হবে। ৩৭০ রদের পর যে সামাজিক, প্রশাসনিক, পুলিশের চাপ, তা কি কাশ্মীরের ছেলেদের জেহাদে ঠেলে দিচ্ছে? এটা সরকারকে ভাবতেই হবে। নাহলে সমস্যা বাড়বে বই কমবে না।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.