বন সংরক্ষণ বিধি ২০২২ নিয়ে লিখছেন সুশান্ত ঝা। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

এভাবে বন অধিকার আইন ২০০৬-এর মাধ্যমে জঙ্গলে বসবাসকারী আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের বহুমাত্রিক অধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আদিবাসী এবং অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের প্রতি ঐতিহাসিক অবিচার দূর করার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এই আইনে তাদের বনভূমি এবং সম্পদের উপর কাঙ্ক্ষিত পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়নি। তবে এই নতুন আইন প্রথমবার তাদের কিছুটা আইনি অধিকার দেয়। ১৮৭৮ সালের পর প্রথমবার তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা দখলকারী হিসাবে চিহ্নিত না হয়ে বনভূমির বৈধ অধিকারী হিসাবে স্বীকৃত হয়েছিল। একথা সত্য, যে পরবর্তী সরকার ও তাদের প্রশাসনিক যন্ত্রের আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে এই আইন এখনো তার ঘোষিত উদ্দেশ্য অনুযায়ী বাস্তবায়িত হয়নি। একে কেন্দ্র করে অনেক দুর্নীতিও হয়েছে। কিন্তু তাহলেও গত ১৬ বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিশেষ করে আদিবাসীরা, কিছুটা হলেও এই আইনের সুবিধা নিতে সক্ষম হয়েছেন। তাছাড়া এই আইন ব্যবহার করে মানুষ বেশ কিছু জায়গায় বেদান্তসহ বড় বড় কোম্পানির বনভূমি ধ্বংস করে জমির দখল নেওয়া রুখে দিতে সক্ষম হয়েছেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল গ্রামসভার ভূমিকা। গ্রামসভাগুলো বনভূমি ও বনজ সম্পদের উপর আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত অধিকার নির্ধারণের জন্য বাধ্যতামূলক। এই অধিকার সংরক্ষিত জঙ্গল, এমনকি অভয়ারণ্যসহ দেশের সব ধরনের বনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এতে এমন বিধানও রয়েছে যে কোনো বনভূমি বনবহির্ভূত কার্যকলাপের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার জন্য সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমতি দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রামসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এর ফলে বনভূমিতে আগে যা হত, তার বিপরীতে নির্বিচার জঙ্গল ধ্বংস করে বড় কর্পোরেটদের কাজের প্রকল্পগুলোকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সরকারি অনুমতি দেওয়া কিছুটা হলেও থমকে গেছে।

তাহলেও যেহেতু এই আইন প্রণীত হয়েছিল সরকারের সদিচ্ছায় নয়, জনমতের তথা আন্দোলনের চাপে, তাই কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষাকারী ভারত সরকার বনের ব্যাপারে এই আইন অনুযায়ী কাজ করার পরিবর্তে নানা টালবাহানা করতে থাকে। এই অবস্থায় সরকারি টালবাহানা ও বনবাসীদের উচ্ছেদ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন জাতীয় সড়ক অবরোধের ডাক দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ৩ আগস্ট ২০০৯ তারিখে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করেছিল যে বনাঞ্চলের জমি বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করার অনুমোদনের জন্য গ্রামসভার সম্মতিপত্র বাধ্যতামূলক।

পরবর্তীকালে এই নীতি লঙ্ঘন করে সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে বেদান্ত অ্যালুমিনিয়াম প্রোজেক্টের আকরিক সংগ্রহের খনির জন্য ওড়িশার নিয়মগিরির পাহাড়ি জঙ্গল এলাকা থেকে ডোঙ্গোরিয়া কোন্ধ আদিবাসীদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়। এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই পটভূমিতে ১৮ এপ্রিল ২০১৩ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দেয়, যা বেদান্ত রায় নামে খ্যাত। এই রায় গ্রামসভার মাধ্যমে বনভূমির উপর এই সম্প্রদায়গুলির গোষ্ঠীগত অধিকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। এই রায় স্পষ্টভাবে বলেছে, যে FRA 2006 সমস্ত ধরনের বনভূমির জন্য প্রযোজ্য এবং গ্রামসভার সম্মতি ব্যতীত বনবহির্ভূত উদ্দেশ্যে কোনো বনভূমিই হস্তান্তর করা যাবে না। সেই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ডোঙ্গোরিয়া কোন্ধ উপজাতি ও নিয়মগিরি পর্বতশ্রেণীর পরম্পরাগত বনবাসীদের গ্রামসভার মাধ্যমে বনভূমির উপর তাদের অধিকার প্রয়োগ করার অনুমতি দিয়েছিল। সেই অনুসারে ১২টি গ্রামে গ্রামসভা আহ্বান করা হয়েছিল এবং ওড়িশা সরকার ও বেদান্ত কর্তৃপক্ষের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মানুষ প্রতিটি গ্রামসভায় সর্বসম্মতিক্রমে বেদান্তের মতো বৃহৎ বহুজাতিক কোম্পানির প্রস্তাবিত খনি প্রকল্পে অসম্মতি জানিয়েছিলেন। এভাবেই নিয়মগিরির মানুষ বন অধিকার আইন থেকে পাওয়া গ্রামসভার ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদের বন ও জীবিকা বাঁচাতে পেরেছিল।

স্বভাবতই দেশের কোটি কোটি আদিবাসী ও পরম্পরাগত বনবাসী বন অধিকার আইন ২০০৬-কে বন ও বনজ সম্পদের উপর তাদের অধিকারের সুরক্ষা আইন হিসাবে বিবেচনা করলেও কর্পোরেটরা একে তাদের প্রতিবন্ধকতা বলেই মনে করে। বিশেষ করে নিয়মগিরির অভিজ্ঞতার পর তাদের শঙ্কা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই সংস্থাগুলো, যারা বন এলাকায় খনি, কারখানা, বড় নদী বাঁধ ইত্যাদির জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে মরিয়া, তারা গ্রামসভাগুলোর ক্ষমতায়নকারী বন অধিকার আইন ২০০৬ এবং বন সংরক্ষণ বিধিগুলো বাতিল বা অন্তত সংশোধন করতে চায়। কর্পোরেটদের স্বার্থরক্ষাকারী নরেন্দ্র মোদী সরকার সে কারণেই বন অধিকার আইন ২০০৬ এবং গ্রামসভার অধিকার দুর্বল বা নিঃশেষ করতে চায়।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর তারা বড় কর্পোরেটদের স্বার্থে বন অধিকার আইন ২০০৬ সংশোধন করতে চাইলেও আদিবাসী বনবাসীদের প্রতিরোধের ভয়ে তা করতে পারেনি। তাই তারা ঘুরিয়ে পিছন দরজা দিয়ে বন অধিকার আইনকে দুর্বল ও অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার বিজ্ঞাপিত বন সংরক্ষণ বিধি ২০২২ এই ষড়যন্ত্রেরই ফল।

এই বিধি বন অধিকার আইন ২০০৬ প্রণয়নের মাধ্যমে জনস্বার্থে যে সব ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হয়েছিল তা বাতিল করে দেবে। নতুন এই বন সংরক্ষণ বিধিতে দুটো বিশেষ বিপজ্জনক বিধান রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকার গ্রামসভার অনুমতি না নিয়ে এবং আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের বন সম্পর্কিত অধিকার উপেক্ষা করে বনবহির্ভূত উদ্দেশ্যে যে কোনো বনভূমি অধিগ্রহণ ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, কোনোরকম ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন ছাড়াই সেই বনভূমিতে বসবাসকারী ও জীবিকা নির্বাহকারী লোকেদের উচ্ছেদ করতে পারবে, সম্পূর্ণ বন ধ্বংসের অনুমতি দিতে পারবে। এতে লাভবান হবে কেবলমাত্র কর্পোরেটরা। একে দেশের কোটি কোটি আদিবাসী ও পরম্পরাগত বনবাসীদের বন অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলা যেতে পারে। এতে পরিষ্কার, যে কেন্দ্রের বিজেপি-আরএসএস সরকার আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের কাছ থেকে জমি ও বন কেড়ে নিতে চায় শুধুমাত্র কর্পোরেটদের লাভবান করার জন্য।

একবার বন সংরক্ষণ বিধি ২০২২ কার্যকর হলে বনে বসবাসকারী কোটি কোটি আদিবাসী ও পরম্পরাগত বনবাসী সমস্ত অধিকার হারিয়ে আবার ২০০৬ সালের জঙ্গল অধিকার আইন প্রণয়নের আগেকার অনিশ্চিত জীবনে ফিরে যাবেন। নতুন বিধির সুযোগে জঙ্গলে আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বাড়বে এবং আদিবাসী বনবাসীদের উপর তাদের শোষণ, নির্যাতন বৃদ্ধি পাবে।

আরো পড়ুন প্রথম পর্ব

মনে রাখা দরকার, ২০০৬ সালে বন অধিকার আইন প্রণয়নের পর তৎকালীন সরকার এই আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮০-র কিছু সংশোধন করেছিল। কিন্তু এবার সরকার বন (সংরক্ষণ) আইন ১৯৮০-র অধীনে বন সংরণের ক্ষেত্রে বন অধিকার আইন ২০০৬-এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা কিছু এখনো অবশিষ্ট আছে তা উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৬ মার্চ ২০১৭ তারিখে আরএসএস-বিজেপি সরকারের বন ও পরিবেশ বিভাগ, কর্পোরেট চাপে বন সংরক্ষণ বিধিগুলো সংশোধন করেছিল এবং সেগুলোকে বন পারমিট নিয়মে রূপান্তরিত করেছিল। কিন্তু তাহলেও সেখানে আগের মতই গ্রামসভার অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা বজায় রেখেছিল। কিন্তু নতুন বন সংরক্ষণ বিধি অনুসারে সেই নিয়ম মেনে চলার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের অধিকার রক্ষা বা গ্রামসভার মাধ্যমে তাদের মতামত সংগ্রহের কোনো প্রয়োজন নেই। যা আবশ্যিক তা হল জঙ্গল কাটা বাবদ ক্ষতিপূরণের অর্থ (NPV) এবং বাধ্যতামূলক নতুন বনসৃজনের অর্থ কেন্দ্রীয় কোষাগারে জমা করা।

ব্যবসায়িক কেন্দ্রীয় সরকার, যারা বন সাফাইয়ের ব্যবসা সহজতর করার জন্য এই নতুন বন বিধি নিয়ে এসেছে, যাদের কাছে টাকাটাই সব। মানুষ কিছু নয়। তবে FRA লঙ্ঘনের অভিযোগ এড়াতে এই বিধিতে একটা চালাকির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এই বিধির ৯ নং ধারার উপধারা ৬(বি)/২-তে বলা হয়েছে, বনবহির্ভূত কাজের জন্য কোনো জঙ্গলের জমি হস্তান্তরের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পর রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকার, যেমনটা প্রযোজ্য, দেখবে যাতে বন অধিকার আইন ২০০৬ অনুযায়ী অধিকারগুলোর নিষ্পত্তি সহ বিভিন্ন আইন বা বিধির নিদানগুলোর পূর্তি হয় এবং মানা (compliance) হয়। একথা অর্থহীন। কেন্দ্রীয় সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে জঙ্গলের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের FRA 2006 অনুযায়ী প্রাপ্য অধিকারের কথা ভাবা হল না, গ্রামসভার মাধ্যমে তাদের মতামত জানা হল না, তার আগেই ক্ষতিপূরণের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা নিয়ে জঙ্গলের জমি হস্তান্তরের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হল। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই ২০০৬ সালের আইন মানল না, সেখানে রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সরকারকে ওই আইন মেনে কাজ করতে বলা হাস্যকর। এ স্রেফ ভাঁওতা। জঙ্গল থেকে আদিবাসী ও অন্যান্য পরম্পরাগত বনবাসীদের যেনতেনপ্রকারেণ উচ্ছেদের দায়িত্ব রাজ্য সরকার বা আঞ্চলিক সরকারের উপর দেওয়া।

লেখক কৃষক সংগঠন এআইকেএমএসের সর্বভারতীয় সহ সভাপতি ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি। মতামত ব্যক্তিগত। মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.