রাজদীপ বিশ্বাস রুদ্র

২৫ ডিসেম্বরের সকাল, আগ্রার রাজপথে জড়ো হয়েছেন কপালে গেরুয়া তিলক, হাতে গেরুয়া ঝান্ডা, মারমুখী কয়েকজন যুবক। একজনের হাতে একটি সান্টা পুতুল। সেইটিকে উঁচিয়ে ধরে তিনি মাঝেমাঝেই ডাক ছাড়ছেন — সান্টা ক্লজ মুর্দাবাদ, সান্টা ক্লজ দুর হটো! বাকিরা গলা মেলাচ্ছেন। ব্যাপারটা কী? না এই যুবকরা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দলের সদস্য। তাঁরা ভারতে ক্রিসমাস উদযাপনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন! হাঁকডাঁক শেষে তাঁরা পুতুলটিতে আগুন ধরিয়ে দিলেন।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আপাত হাস্যকর এই ভাইরাল দৃশ্যটি যে আসলে হাস্যকর নয়, তা বোঝা গেল আরেকটু বেলা বাড়তে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন কর্তৃক হরিয়ানার দেড়শো বছরের পুরনো গির্জায় হামলা চালানোর খবর এল। একইরকম ঘটনার খবর এলো অসমের শিলচর থেকে। দুই বিজেপি শাসিত রাজ্যেই কার্যত পুলিশের নীরব সম্মতিতে গির্জায় গির্জায় ভাঙচুর চলল।

ভারতে সংখ্যালঘুর ধর্মাচরণের অধিকারের উপর সংখ্যাগুরুর আক্রমণের এই নব সংযোজনগুলিতে কেউই বোধহয় খুব একটা অবাক হননি। ২০১৪ সালের পর থেকেই ক্রিসমাস উদযাপনের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির নরম গরম হুমকি প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা মোটামুটি সবারই। এমনকি “খ্রিস্টে ও কৃষ্ণে” তফাত না করা পার্কস্ট্রিটপ্রেমী বাঙালিরও এই অভিজ্ঞতা হয়ে গিয়েছে গত বছর। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে উজ্জীবিত হিন্দুত্ববাদীরা সেবার পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি জায়গায় পোস্টার সেঁটেছিল, ক্রিসমাস উদযাপন করলে ফল ভুগতে হবে। অবশ্য নির্বাচনী ভরাডুবির পর বাংলায় হিন্দুত্ববাদী শিবির হীনবল এবং সেইজন্যই হয়ত এবার তুলসীপুজোর নরম আব্দার ছাড়া সেভাবে কোনো ফতোয়া আসেনি। তবে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে যে এরা আবার মাথা তুলবেন তাতে সংশয় নেই।

ভারতে হিন্দু বনাম মুসলমান সাম্প্রদায়িক হিংসা দেখেই যারা অভ্যস্ত, তারা ভাবতে পারে এবারের ২৫ ডিসেম্বরের ঘটনাগুলো হয়ত একটু “এক্সট্রিম” বা ব্যতিক্রমী। আসলে কিন্তু তা নয়। হিন্দুত্ববাদীরা, বলা ভাল সংঘ পরিবার, কেবল মুসলমানবিদ্বেষী নয়; তাদের আদর্শ যে কোনো ধর্মীয় ফ্যাসিস্টের মতই পরধর্মবিদ্বেষী। সংঘের খ্রিস্টান বিরোধিতাও নতুন কিছু নয়। সংঘের তাত্ত্বিক গুরু গোলওয়ালকরের স্পষ্ট নিদান ছিল ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরোধিতায় সময় নষ্ট না করে মুসলমান, খ্রিস্টান এবং কমিউনিস্ট নিকেশে মনোনিবেশ করার। এই নীতিরই অতীত দৃষ্টান্ত গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইন্স ও তাঁর শিশুপুত্রদের হত্যা, এই নীতিরই সর্বশেষ দৃষ্টান্ত এবারের ২৫ ডিসেম্বরের ঘটনা। ভুলে গেলে চলবে না, গ্রাহাম হত্যার অন্যতম অভিযুক্ত, তৎকালীন বজরং দল নেতা প্রতাপচন্দ্র সারঙ্গী বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজের ছাড়পত্র পুনর্নবীকরণে কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তিও তাদের বৃহত্তর খ্রিস্টান বিরোধিতারই অঙ্গ সম্ভবত।

তবে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই ঘটনাগুলোর সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হল নাগরিক সমাজের একাংশের নীরবতা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে যারা সরব, তাদের অনেকেই কিন্তু গির্জাগুলোর উপরে আক্রমণে নীরব, ত্রিপুরায় মুসলমানদের উপর আক্রমণেও তারা মুখ খোলেনি। বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচার নিয়ে মুখ খোলা নিশ্চয়ই ন্যায়সঙ্গত এবং যৌক্তিক। কিন্তু স্বদেশের সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে নীরব থেকে অন্য দেশের সংখ্যালঘুর জন্য সরব হওয়া কি দ্বিচারিতা নয়?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.