বিমান বসুর সম্বন্ধে কিছু লিখতে বসা আমার কাছে ধৃষ্টতার সামিল। বামপন্থাকে আদর্শ মেনে যে জীবন উনি যাপন করে চলেছেন, তার ধারেকাছে পৌঁছনো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বামপন্থার বিশেষ কিছু জানি না, বুঝি না, কখনও কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করিনি। যতদিন পশ্চিমবঙ্গে ছিলাম, ভোট দেওয়ার কথাও ভাবিনি। নিতান্ত সুবিধেবাদী শ্রেণীর একজন হয়ে বেড়ে উঠেছিলাম।

আমি অনেক পরে, ধীরে ধীরে বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছি বিভিন্ন কারণে। অন্যান্য সমসাময়িক রাজনৈতিক দলগুলিকে দেখে, পাকা ও কাঁচা বিভিন্ন রঙের দল দেখে আমার ধারণা ধীরে ধীরে পোক্ত হয়েছে বামপন্থার পক্ষে। এর পিছনে বিমান বসু বা তাঁর জীবনচর্যার বিশেষ কোনও প্রভাব ছিল না কোনওদিনও। আজ ক’টি কথা লিখতে মনস্থ করেছি, অতিসাধারণ, সুবিধেবাদী, প্রিভিলেজড একজন প্রবাসী বাঙালি হিসেবে, যে শুধুই সিপিএম পার্টির একজন সমর্থক, যে পার্টিকে ভোট দেওয়ার ক্ষমতাও তার নেই।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যখন তাঁর অতীত জানতাম না, তখন তাঁকে জেনেছি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে। বিভিন্ন খবরের অনুষ্ঠানের মাঝে, অন্যান্য সিপিএম নেতাদের পাশাপাশি তাঁর বক্তব্য শুনতাম বিভিন্ন বিষয়ে, শুনতে শুনতে একটাই অনুভূতি হত- বড় উদ্ধত, বড় দুর্বিনীত।

তখন সিপিএম দল ক্ষমতায়। ক্ষমতার শেষদিকে। ক্ষমতার দম্ভ ফুটে বেরোত সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর ব্যবহারে। বেশ বিরক্তই হতাম। অনেকেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গিয়ে লাল চা সহযোগে তাঁর সাথে গল্পচ্ছলে প্রতিবেদন তৈরির মালমশলা জোগাড়ের গল্প লিখতেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সে অন্য সময় ছিল। আজকের মতন মিডিয়া সেই সময়ে ছিল না, মিডিয়ার ন্যারেটিভ বস্তুটাও সেই সময়ে প্রায় অপরিচিত ছিল। একটার জায়গায় তখন সদ্য সদ্য দশটা টিভি চ্যানেল হয়েছে, মানুষ তার প্রাথমিক ধারণা তৈরি করছে চ্যানেলের প্রচার করা খবর এবং টুকটাক জুড়ে দেওয়া বাইটসের মাধ্যমে।

আজ দশ বছর হয়ে গেছে সিপিএম দল ক্ষমতায় নেই। এবারের ভোটে কেউ আশাও করেনি যে, সে দল ক্ষমতায় ফিরবে। তবু আদর্শের টানে একগুচ্ছ নতুন মুখ যখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল ব্রিগেড থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের আলপথ ধরে, প্রথম বারের মত উঠে আসছিল মীনাক্ষী, সৃজন, প্রতিকুর, দীপ্সিতা, সবুজ, এদের মত ঝকঝকে মুখগুলো – অত্যন্ত স্বচ্ছ চিন্তার প্রতিফলন, কিন্তু অত্যন্ত পরিশীলিত ভাষা – যখন এদের পাশাপাশি শুনছিলাম মহাদেব ভুঞার গল্প, তাকাচ্ছিলাম শালকু সরেনের মায়ের নুয়ে পড়া, অথচ তীব্র ঋজু শিরদাঁড়ার দিকে, তখন বারে বারে কেবলই মনে হচ্ছিল, অঘটন কি একেবারেই ঘটবে না?

না, রাজনীতির লড়াইয়ে, বাইনারির লড়াইয়ে সিপিএম জেতে নি। কিন্তু হয়তো জেতাটাই শেষ কথা ছিল না, লড়াইয়ে অংশ নেওয়াটাও একটা বড় ব্যাপার। নতুন প্রজন্মের এতগুলো মুখকে আবার বাম রাজনীতির দিকে ফিরিয়ে আনা, এ বারের ভোটের প্রেক্ষিতে যথেষ্ট না হলেও, আরেকটা নতুন যাত্রার শুরু তো বলা যেতেই পারে।

আমি বাম রাজনীতির প্রতি আরও অনুরক্ত হয়েছি এদের দেখে। আমি নিতান্তই একজন সুবিধেবাদী মানুষ, যার সমর্থনে বা অসমর্থনে, রাজ্যের রাজনীতিতে ৭% থেকে ৪%এ নেমে যাওয়া একটা দলের কিছুই এসে যায় না।

কিন্তু দল মানে তো শুধু এই মাটি কামড়ে পড়ে থাকা লোকগুলোই নয়, দল মানে তো শুধু এই একগুচ্ছ তরুণ ঝকঝকে মুখ নয়, দল মানে তো দলের নেতৃত্বও। সেই নেতৃত্বের আসনে বসে সূর্যকান্ত মিশ্র আর বিমান বসু একের পর এক এমন আগোছালো মন্তব্য করে গেছেন ভোটের আগে ও পরে, বার বার বিব্রত হতে হয়েছে কর্মী সমর্থকদের। এই সিরিজের শেষ সংযোজন বিমানবাবুর গত সোমবারের (২৬ জুলাই) বক্তব্য।

ন্যারেটিভের খেলায় বাজারি মিডিয়ার দল এমনিতেই আজকাল বেশ পোক্ত হয়ে উঠেছে।বামফ্রন্টের নেতৃস্থানীয়রা যে তার সাথে ঠিকঠাক পাল্লা দিয়ে উঠতে পারছেন না, তা আরো একবার প্রমাণিত হয়ে গেল বিমানবাবুর বক্তব্যে। সময় বদলেছে, সময়ের সাথে সাথে বক্তব্যের ধরণেও যে পরিবর্তন আনা দরকার, খুবই দুঃখ লাগে যখন দেখি সুর্যকান্তবাবু বা বিমানবাবু তার ধারকাছ দিয়েও যেতে পারেন না। ওঁদের অবদান, ওঁদের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বুঝতে পারি, ওঁরা এমন একটা বয়েসে এসে পৌঁছেছেন, এই বয়েসে নতুন দুনিয়াদারির হালচালে রপ্ত হতে সময় লাগে। আমার বাবাকে আমি গত কুড়ি বছরে এটিএম কার্ড ব্যবহার করা অভ্যেস করাতে পারি নি।

আমার বাবার এটিএম কার্ড ব্যবহার করতে না পারায় কারও বিশেষ কোনও ক্ষতি হয় না। কিন্তু বামফ্রন্টের চেয়ারম্যানের একটি বেফাঁস মন্তব্যের ফল অনেকখানি হয়। মহুয়া দাসের ‘মুসলিম গার্ল’ জাতীয় মন্তব্যের পরে যেরকম প্রকাশ্য ও ছুপা তৃণমূলীরা অ্যাপোলজিয়া নামিয়েছিলেন, বিমান বোসের এই খোলাখুলি মন্তব্যের পর দেখলাম এই ধরণের জাস্টিফিকেশন আসছে এমন সব জায়গা থেকে, যাঁরা সমর্থক এবং পার্টিকর্মী হিসেবে স্পষ্টতই বিব্রত। চুলচেরা বিচার হচ্ছে সোশাল মিডিয়ায়, বিমানবাবু কী বলেছিলেন আর তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন – এই নিয়ে।

আসল কাজটি মিডিয়া করে গেছে। ঝাপটা এসে পড়েছে রাস্তায় নেমে যে বাম কর্মী সমর্থকরা লড়ে যাচ্ছিলেন ও যাচ্ছেন, তাঁদের মনোবলে। পর পর কিছুদিন তিক্ত পরিহাসের সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁদের, যতদিন না পরের নজর-ঘোরানো ইস্যুটি এসে আলোচনার গতিমুখ বদলে দেয়।

এভাবে আর কতদিন? কেন চলবে এভাবে? কেন নেতৃস্থানীয় একজন দুজন বার বার অসাবধানী বক্তব্য রাখবেন আর তার ভাব সম্প্রসারণের দায় নিতে হবে বিব্রত কর্মী-সমর্থকদের?

কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্র অন্য পার্টির থেকে আলাদা। আমি অনভিজ্ঞ, পার্টির সদস্য বা কর্মী নই, হওয়ার যোগ্যতাও নেই আমার, তবু জানলাম সাধারণ সমর্থক হিসেবে আমার মতামত পার্টির নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য একটি দুটি ইমেল আইডি আছে।

আমি ইমেল করিনি। কারণ, প্রথমত, ইমেল পাওয়ার পরে সংশোধনের প্রক্রিয়াটি কীভাবে হয়, আদৌ হয় কিনা, সেটা আমার কাছে স্বচ্ছ নয়। দ্বিতীয়ত, যাঁদের কাছে ইমেল পাঠাব, পার্টির কার্যপ্রক্রিয়া সম্বন্ধে আমার থেকে তাঁদের জ্ঞান অনেক, অনেক বেশি। আর তৃতীয়ত, আমি সিপিএম পার্টিকে তার নেতৃত্বদের মধ্যে দিয়ে চিনিনি। আমি পার্টিটাকে চিনেছি – চিনেছি বলা ভুল, বরং চেনার চেষ্টা করছি, চিনে চলেছি তার কাজ দিয়ে, তার আদর্শ দিয়ে, তার অবস্থান দিয়ে আর তার মাঠে-ঘাটে-কারখানায়-গ্রামে-বন্দরে প্রতিনিয়ত লড়ে যাওয়া, মরে গিয়েও ফুরিয়ে না যাওয়া অসংখ্য কমরেডের মধ্যে দিয়ে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি এই একটা দলের ওপরেই আজও ভরসা রাখতে পারি। নেতৃত্বের আনাড়ি মিডিয়া হ্যান্ডলিং আর তার পরে ভাব সম্প্রসারণের মোড়কে তার অনর্থক অ্যাপোলজিয়া আমার ভরসাকে টলাতে পারবে না। অন্তত, এখনও পারে নি।

পরিবর্তন দরকার। সিপিএমকে কী করিতে হইবে, তাই নিয়ে অনলাইন এবং অফলাইনের বিভিন্ন পত্রিকায়, চ্যানেলে অনবরত আলোচনা চলেছে গত তিন মাসে। ভোটের ফলপ্রকাশের পরে, আলোচনায় টেবিল চাপড়েছেন বা সোশাল মিডিয়ায় ধোঁয়া উড়িয়েছেন যাঁরা, তাঁরা অনেকেই এমনিতেও সিপিএমকে ভোট দিতেন না, অমনিতেও দিতেন না। তাঁদের এই ধরণের আলোচনা গত দশ বছর ধরে শুনে এসেছি, এখন আর নতুন করে গায়ে লাগে না। একজন দূরতম নিষ্ক্রিয় সমর্থক হিসেবে চাই, সিপিএম নিজেই ঠিক করুক, সিপিএমে কী ধরণের পরিবর্তনের আশু প্রয়োজন।

এইটুকুই।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.