“যা গেছে তা গেছে”। এখন ভবিষ্যতে কী হতে পারে তা আলোচনা করা যাক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছেন “অশান্তিতে তৃণমূল জড়িত আছে প্রমাণ দিতে পারলে দল ব্যবস্থা নেবে।”১ অশান্তির ভিডিও ফুটেজ থাকলে দেখাতে বলেছেন। যেন বিভিন্ন চ্যানেলের ক্যামেরায় ধরা পড়া ফুটেজগুলো যথেষ্ট নয়, সোশাল মিডিয়ায় যেগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলোও পর্যাপ্ত নয়। এর বাইরেও কিছু থাকলে তা দলকে দেখাতে হবে এবং ব্যবস্থাও দলই নেবে। প্রশাসনের কোনো দায়দায়িত্ব নেই, নির্বাচনের অসদুপায় অবলম্বন করা যেন আইনত অপরাধ নয়। অথবা হয়ত বুঝিয়েই দিলেন, দলই প্রশাসন। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনের আগে অতীতের রিগিংয়ের জন্য যে ক্ষমা চাওয়া হয়েছিল তা যেমন লোক দেখানো ছিল, এই প্রতিশ্রুতিও তেমনই।

অতএব অদূর ভবিষ্যতে আর যা-ই হোক, এসব যারা করেছে তাদের শাস্তি-টাস্তি হবে না। অবশ্য বাংলার সরলমতি খ্যাতিমানরা, যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “ভিশনে” বিশ্বাস করেন, তাঁরা বাদে আর কেউ নির্বাচনের দিন গুন্ডামি করলে কারো শাস্তি হবে এরকম আশাও করেন বলে মনে হয় না। বাংলায় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের আমলে শুরু হয়েছিল যেন তেন প্রকারেণ জেতার জন্যে বাহুবল প্রয়োগ, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। এখানে কমবেশির প্রশ্ন তুললে চলবে না, কারণ বাঙালির মাত্রাজ্ঞান নেই। এখানে কারো কাছে ইন্দিরা গান্ধী ফ্যাসিবাদী, কারো কাছে জ্যোতি বসু ফ্যাসিবাদী, কারো কাছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ফ্যাসিবাদী, আবার কারো কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্যাসিবাদী। আবার সরকার বাঁচাতে গেলেও ফ্যাসিবাদের দোহাই দিতে হয়। তাই আপাতত মাত্রা বাদ দিয়েই নির্বাচনী প্রহসন ও তার ফলাফল নিয়ে কথা বলা যাক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার পরিণাম কী হয়, তা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন ১৯৭৭ সালে। তাঁর দল কংগ্রেস তারপর থেকে ক্রমশ দুর্বল হতে হতে এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় অবলুপ্ত। একমাত্র ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী পক্ষে ছিল, কিন্তু সে জয়ের কৃতিত্ব সম্পূর্ণত তৃণমূল কংগ্রেসের। সেই তুলনায় সিপিএমের ক্ষয় দ্রুততর। পঞ্চায়েত নির্বাচনে মারামারি কাটাকাটি দিয়ে শুরু করে নির্বাচনী জোরজুলুম বাম আমলে শেষমেশ যতদূর পৌঁছেছিল, তার প্রতিক্রিয়ায় মাত্র দশ বছরের মধ্যে বিধানসভায় শূন্য হয়ে যাওয়ার কথা হয়ত নয়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সাতাত্তরের সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি ছিল। প্রত্যাশা যত বেশি হয়, পূরণ না হলে হতাশা তত তীব্র হয়। তাছাড়া ৩৪ বছরের সরকার তো আর একটা কারণে পদচ্যুত হয় না। কিন্তু তৃণমূল সরকারের আমলে প্রথম নির্বাচনের সময় থেকেই জোরজুলুম সম্পর্কে সাধারণ্যে যে উদাসীনতা, তার পিছনে অবশ্যই আগের আমলের শেষ দিকের অভিজ্ঞতা সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে যে প্রজন্ম বাহাত্তর বা সাতাত্তর — কোনোটাই দেখেনি, তাদের মধ্যে। স্রেফ ইতিহাস দেখলে মনে হতে বাধ্য, একই পরিণাম একদিন তৃণমূল কংগ্রেসেরও হবে। কিন্তু সেভাবে ভাবলে ভুল হবে। সালটা ২০২১।

মানুষের রাগের উদ্গীরণ কোথাও না কোথাও হবেই, কারণ সেটা প্রাকৃতিক নিয়ম। নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকারের বারংবার অপহরণ দেখে ক্ষুব্ধ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ জানাবেন, সেসব দিন বহুকাল চলে গেছে। তার একটা বড় কারণ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই। পৃথিবীর কোনোকালের কোনো আন্দোলন আক্ষরিক অর্থে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। আন্দোলন গড়ে তুলতে হয় এবং গড়ে তোলার দায়িত্ব বিরোধী শক্তির। এ রাজ্যের বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে কংগ্রেস বাম আমল থেকেই নিষ্ক্রিয়; সিপিএম ও তার সঙ্গীদের যদি আন্দোলন কীভাবে গড়ে তোলা যায় তা মনে থাকত, তাহলে সারদা, নারদ, এস সি পরীক্ষার মত ইস্যুগুলো থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনের জেরে রাজ্য একদিনের জন্যেও অচল হল না — এমনটা হত না। উপরন্তু নির্বাচন ছাড়া অন্য সময়ে শাসক দলের হিংসার অভিমুখ বাম দলগুলোর কর্মী, সমর্থক আর ক্ষেত্র বিশেষে কংগ্রেসের কর্মী, সমর্থকদের দিকে যতটা থাকে, বিজেপির দিকে ততটা থাকে না। যেখানে থাকে সেখানে প্রায়ই দেখা যায় বিজেপির লোকেরা কিছুদিন আগেই তৃণমূলে ছিলেন, অথবা উল্টোটা। উপরন্তু, অর্থবল এবং কেন্দ্রীয় ক্ষমতা হাতে থাকার ফলে বিজেপি বাহুবলের দিক থেকেও কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। ফলে আগামীদিনে বাম, কংগ্রেসই আরও শক্তিহীন, আরও নির্জীব হয়ে পড়লে দোষ দেওয়া যাবে না। হাতে রইল বিজেপি।

বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে ভাল ফল করার পরেও প্রধান বিরোধী দল বলতে যা বোঝায়, গত সাত মাসে বিজেপি তা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং তৃণমূলী নেতা, কর্মীতে নির্বাচনের আগে ফুলে ফেঁপে ওঠা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি ওঁদের প্রস্থানে গ্যাস বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেছে। কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচার পর্বে তারা যে নিষ্প্রভ ছিল, তা-ও সমস্ত সংবাদমাধ্যম এক বাক্যে স্বীকার করছে। গতকালের তাণ্ডব প্রতিরোধের চেষ্টাতেও যে বামেরা এবং কংগ্রেস বেশি সক্রিয় ছিল, বেশিরভাগ মানুষই তা মানছেন। তৎসত্ত্বেও বুথফেরত সমীক্ষার ফল বলছে, গোটা পনেরো আসন নিয়ে কর্পোরেশনে প্রধান বিরোধী দল হবে (একমাত্র বিরোধীও হতে পারে) বিজেপিই। স্রেফ হিন্দিভাষীরা ভোট দিচ্ছে, এই স্তোকবাক্যে নিজেদের সন্তুষ্ট না করলে মেনে নিতে হবে, যে ভোটাররা এখনো ভোট দিতে পারছেন তাঁরা বাম বা কংগ্রেসের চেয়েও বেশি আন্দোলনবিমুখ বিজেপিকেই বিরোধী হিসাবে দেখতে চাইছেন। কেন চাইছেন?

বিধানসভায় বিজেপি হারল, কারণ বাংলার মানুষ সাম্প্রদায়িকতাকে হারিয়ে দিলেন, ফ্যাসিবাদকে হারিয়ে দিলেন — এ কথা যদি বিশ্বাস করে থাকি, তাহলে এখন কেবল যারা সাম্প্রদায়িক তারাই ওদের ভোট দিচ্ছে — এই অতি সরলীকরণ কিন্তু চলবে না। মানতে হবে, যে যতই অন্তর্দ্বন্দ্বে এবং দলত্যাগে বিজেপি শক্তিহীন হয়ে গিয়ে থাক, যতই রাজ্যের মানুষের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে তাদের অনাগ্রহ থাক, প্রচারে যতই ঢিলে দিক, আগামীদিনেও তারাই বিরোধী ভোটগুলো পাবে। কারণ তারা কেন্দ্রের শাসক দল। সাধারণ ভোটার জানেন বিজেপির আর কিছু না থাক অর্থবল আছে। তাছাড়া রাজ্য নির্বাচন কমিশন পরিচালিত পৌর নির্বাচন বা পঞ্চায়েত নির্বাচনে যা-ই ঘটুক না কেন, আগামী লোকসভা নির্বাচন কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে হওয়া নিশ্চিত করা বিজেপির হাতে। নরেন্দ্র মোদী এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন, যে ভারতের নির্বাচন কমিশনারকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর তলব করতে পারে এবং তিনি গিয়ে সুবোধ বালকের মত দেখা করে আসতে পারেন। যে মানুষ ভোট দিতে পারলেন না বলে রুষ্ট হলেন, তিনি যে লোকসভা নির্বাচনে “আর যাকেই হোক, তৃণমূলকে ভোট দেব না” ঠিক করে বুথে যাবেন না — এ গ্যারান্টি কি কেউ দিতে পারেন? সেক্ষেত্রে দু-এক শতাংশ আদর্শের প্রতি এখনো অচল নিষ্ঠায় অথবা স্মৃতিমেদুরতায় ভোগা লোক ছাড়া বাকিরা যে বিজেপিকেই ভোট দেবেন, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই সম্ভাবনার কথা বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও বিলক্ষণ জানেন। তাই বাংলা দখলে এ বছরের শুরুতে সম্পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে থাকলেও, বাংলার রাজধানী দখল করতে তাঁদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ দেখা যায়নি। ভাবছেন একটা কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারে দিল্লির বিজেপি নেতৃত্বের গুরুত্ব না দেওয়াই স্বাভাবিক? তাহলে স্মরণ করিয়ে দিই, গত বছর এই সময়ে হায়দরাবাদ কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচারে অমিত শাহ, জেপি নাড্ডা, যোগী আদিত্যনাথ — সকলেই গিয়েছিলেন।৩ অর্থাৎ যে নির্বাচন তৃণমূল অমনিই জিতত, তার পিছনে বিজেপি শক্তি খরচ করল না। অন্যদিকে শুধু জয়ে আশ মেটে না বলে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল যে তাণ্ডব চালাল, তাতে বিধানসভায় তৃণমূলে যাওয়া বেশকিছু ভোট বিজেপিতে ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হল। এমনিতেই ইদানীং রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেন, ভারতীয় ভোটাররা বিচক্ষণ হয়ে উঠেছেন। বিধানসভায় কে রাজ্য চালানোর পক্ষে যোগ্যতম তা ভেবে ভোট দেন, লোকসভায় অন্য কেউ দেশ চালানোর পক্ষে যোগ্যতম মনে হলে তাকেই ভোট দেন। এই বিশ্লেষণ যদি সত্যি হয়, তাহলেও ২০২১ বিধানসভার চেহারা দেখে ২০২৪ লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কেমন হবে তা আন্দাজ করা চলে না। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত ভোটারদের সামনে থাকবে ইতিমধ্যে হওয়া নির্বাচনগুলোর স্মৃতি। সামনেই রাজ্যের আরও অনেকগুলো পৌরসভার নির্বাচন। সেখানেও গণতন্ত্রের এরকম উৎসবই চলবে আশা করা যায়। ফলে সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষের সম্প্রসারণ আরও চমৎকার হবে। দরিদ্রতম ভোটারকে মূর্খ মনে করার মূর্খামি যদি না করি, তাহলে বুঝব, সে লোকসভা নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময়ে এ কথা মনে রেখেই ভোট দেবে, যে এই নির্বাচনে বিজেপিকে ভোট দিলেও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার যেমন ছিল তেমনই থাকবে।

অতএব ২০২৪-এর রাজ্যওয়াড়ি ফলাফলে যদি দেখা যায় বিজেপির উত্তর ভারতের ঘাটতি পশ্চিমবঙ্গ কিছুটা পুষিয়ে দিয়েছে, ফলাফলটা দেখতে অনেকটা ২০১৯-এর মতই লাগছে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সেই ফলাফলের পর এ রাজ্যের বিজেপি বিরোধীরা কী করবেন? রামের ভোট কেন বামে ফিরল না তা নিয়ে চেঁচাবেন? নাকি মানুষ কেন এতকিছুর পরেও বিজেপিকে ভোট দেয় তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করবেন?

তথ্যসূত্র

১। আনন্দবাজার পত্রিকা
২। দ্য হিন্দু
৩। দ্য প্রিন্ট

Leave a Reply