অরিজিৎ মুখোপাধ্যায়

কলকাতা শহরতলি। আমরা যখন ছোট, তখনও এই অঞ্চলটা কলকাতার পিনকোড পায়নি, কিন্তু আদিগঙ্গার দক্ষিণে বাকি “অ্যাডেড এরিয়া”-গুলোর মত ১১৪ নম্বর ওয়ার্ডও কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যেই এসে গেছিলো। অনেক পরে দক্ষিণ ২৪ পরগণার পিনকোড বদলে এই পূর্ব পুটিয়ারি এলাকাটা হয়ে যায় কলকাতা ৭০০০৯৩। পুটিয়ারি নামেরও একটা ইতিহাস আছে। বলা হয় সাবর্ণ রায়চৌধুরি তাঁর নিজের মেয়ে পুঁটুরাণীর বিয়েতে এই পুরো এলাকাটা যৌতুক দিয়েছিলেন – সেই পুঁটুরাণী থেকে আস্তে আস্তে এর নাম হয়ে গেছিলো পুঁটিয়ারি, পরে পুটিয়ারি। পশ্চিমে কুঁদঘাট বাজার, পূর্বে বাঁশদ্রোণী প্লেস। কুঁদ্ঘাট বাজারের পশ্চিমে পুটিয়ারির বাকি অংশ – পশ্চিম পুটিয়ারি।

আমাদের বাড়ি যখন তৈরী হয়, তখন এই অরবিন্দ পার্ক নামেও কিছু ছিলো না। ধু ধু ফাঁকা মাঠ আর বাঁশবাগানের পাশে আমাদের বাড়ি, আশেপাশে আরও গোটা দুই বাড়ি, আর একটু দূরে একটা মসজিদ। আমার জন্ম ১৯৭২ সালে – যখন মাঠেঘাটে খেলতে শুরু করি, তখনও চেহারাটা এমনই – ফাঁকা মাঠ, বাঁশাবাগান, পুকুর…খুব কম বাড়িতেই ইলেকট্রিকের আলো ছিলো। ৭২-৭৭ সালের অনেক ঘটনা ঘটেছিলো এসব অঞ্চলেও – বাঁশপবাগানের ওপার থেকে দুমদুম গুলির আওয়াজ, পুলিশের বুটের আওয়াজ – এসব গল্প শুনতাম, আবছা মনে আছে সেসবের কিছু কিছু। তারপর সাতাত্তর সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করে এলাকাটা। নতুন নতুন বাড়ি তৈরী হয়, মাটির রাস্তা বদলে গিয়ে বড় রাস্তায় পিচ পড়ে, রাস্তায় আলো লাগে, বাড়ি বাড়ি ইলেক্ট্রিসিটি পৌঁছয়, একদম ভিতরের দিকে – আনন্দপল্লী, দীনেশপল্লীর রাস্তা পাকা হয়, পাকা ড্রেন তৈরী হয়…বদলায় অনেক কিছু। হ্যাঁ, লোডশেডিং হত তখনও – সেটা বন্ধ হতে কিছুদিন সময় লাগে। ডক্টর শঙ্কর সেনের আমলে রাজ্যের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার খোলনলচে বদলানোর সাথে সাথে সেই লোডশেডিং এর দিনগুলোও শেষ হয়ে যায়।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

খারাপ ছিলো না এই এলাকাটা মোটের ওপর।

তারপর ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল হয়। আর তার পরের পুরসভা নির্বাচনে ওয়ার্ডেও পালাবদল ঘটে। এই ২০২১ সালে দাঁড়িয়ে মনে হয় ১১৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা থেমে রয়েছে সেই বছর ছয়েক আগেই, আর অনেক এলাকায় সময়টা যেন পিছিয়ে গেছে। পরিকল্পনাহীনভাবে এবং আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে সরু রাস্তার ওপর জি+৪ বাড়ি উঠে গেছে, পুকুরের পাড় বাঁধাই হয়েছে উন্নয়নের নাম করে – যেখানে পরিবেশবিদরা বলেন ন্যাচারাল ওয়াটারবডির চারদিক বাঁধানো আসলে ক্ষতিকর। আর এই তথাকথিত উন্নয়ন থাবা বসিয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।

উদাহরণ হিসেবে বলি – পঞ্চাশ বছরে যে রাস্তায় জল জমতে দেখিনি, আজ ২০২১ সালে সেই রাস্তায় জল তো জমছেই, বরং ড্রেন আর রাস্তার জল মিশে ঘরে ঢুকছে। কেন? কারণ পরিকল্পনাবিহীন কাজকর্ম। গত ছয় বছরে বড় রাস্তার নীচের আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন পরিষ্কার হতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না – বাকি কলকাতার মতই। কাজেই জল বেরোনোর সেই পথ বদ্ধ হয়ে গেছে – রাস্তায় জল জমেছে স্বাভাবিকভাবে। সেই অবস্থার সমাধান না করেই বিভিন্ন এলাকায় নতুন পাইপলাইন বসানোর কাজ হয়েছে। গত ছয় বছরে অন্ততঃ চারবার বিভিন্ন এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি হয়েছে নিয়ম করে – রাস্তার সেই ক্ষতের দাগ এখনো জলজ্যান্ত রয়ে গেছে। কিন্তু সেই কাজের গাফিলতির জন্যে জমা জল বড়জোর কুড়ি ফুট সরে গিয়ে জমেছে – এর বেশি কিছুই হয়নি। ওদিকে, বিধানসভা ভোটের মুখে কিছুটা রাস্তায় আন্ডারগ্রাউন্ড ড্রেন হওয়ার পরে বাকি জায়গার ড্রেনের সাথে যোগাযোগটাও রাখা হয়নি – জল বেরিয়ে যাবেটাই বা কোথায়?

তারপর ধরুন কুঁদ্ঘাট বাজার। সেই বাজার ২০১১ সালেও যা দেখেছি, আজও একই রয়ে গেছে। কুঁদঘাটে মেট্রো স্টেশন হয়েছে, আদিগঙ্গার ওপরের পুরনো ব্রিজের পাশেই নতুন ব্রিজ হয়েছে – মানে আগের চেয়ে ডবল চওড়া – কিন্তু ব্রিজের পরের রাস্তাটুকুর পরিবর্তন হয়নি কোনো। মানে ক্লাসিক বটলনেক যাকে বলে, আজকের অবস্থা তাই – চওড়া ব্রিজ পেরিয়েই তার অর্ধেক চওড়া রাস্তা। পুরসভা বলুন বা বিধায়ক – যিনি আদিগঙ্গার ওপর একগুচ্ছ ব্রিজ তৈরীর কৃতিত্ব নিয়ে থাকেন – কেউই এই বাস্তবিক দিকটা ভেবে উঠতে পারেননি – যে ব্রিজটা চওড়া করার পর তার পাশের রাস্তাগুলোর কথাও ভাবতে হবে। রাস্তায় গাড়ি বেড়েছে, মানুষ বেড়েছে – কুঁদঘাট ব্রিজ পেরিয়ে এপারে বাজারের মুখটায় প্রায়শই যানজট লেগে থাকে। আর বাজারটাও রয়ে গেছে সেই ২০১১ সালেই। এর আগের আমলে পরিকল্পনা হয়েছিলো যে কুঁদঘাট বাজারের পরিবর্তে সুপারমার্কেট তৈরী হবে – সুবিধা হত দোকানদারদেরও, মানুষেরও। হয়নি। সময় দাঁড়িয়ে রয়েছে কুঁদঘাট বাজারে।

ফলাও ঘোষণা হয়েছিলো – গার্ডেনরীচের জল সরবরাহ করা হবে এই এলাকায়। আজও সেই ঘোষণা সেইখানেই রয়ে গেছে। এখনো এই এলাকায় অনেক মানুষকে পানীয় জল কিনে খেতে হয়। কিছুটা গার্ডেনরীচের জল, বাকিটা আঞ্চলিক পাম্পিং স্টেশনের জল মিলেমিশে আসে কর্পোরেশনের জলের কলে। আর শুধু এক একটা ওয়ার্ডে কমপক্ষে চল্লিশটা জলের কারখানা গজিয়ে উঠেছে অলিতেগলিতে – সেই জল বোতলে ভরে পৌঁছে যাচ্ছে বাজারে। আদৌ সেই জল পরিস্রুত কিনা কোনও নিশ্চয়তা নেই তার।

প্রতিটা জায়গায় দেখি পরিকল্পনার অভাব, চিন্তাভাবনার অভাব। যেন, কয়েকটা বড় বড় হ্যালোজেন আলো লাগিয়ে দিলেই আর রাস্তার ধারের বাউন্ডারিটুকু নীলসাদা রঙ করে দিলেই দুমদাম করে জীবনযাত্রার সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটে যাবে। পুরসভার আসল স্টেকহোল্ডার যাঁরা – মানে নাগরিক – তাঁদের সাথে পুরসভার যোগাযোগ শূন্য। কাউন্সিলরকে বিশেষ কেউ চোখে দেখেছে বলে শোনা যায় না। আমফান আর করোনার সময়ে গোটা অঞ্চল জুড়ে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখেছি শুধু কয়েকটা অল্পবয়সী ছেলেমেয়েকে, সঙ্গে পাকাচুলের গুটিকয়েক লোককে – যাদের আমরা চিনি রেড ভলান্টিয়ার নামে – যারা সরকারের দায়িত্বগুলো নিজেরা ঘাড়ে নিয়ে চলেছে গত কুড়ি মাস ধরে।

এই বছরের পুরসভা নির্বাচন এই ওয়ার্ডের মানুষের কাছে এই থেমে যাওয়া সময়কে ফের চালিয়ে দেওয়ার নির্বাচন। শুধু কথায় বা নীলসাদা রঙে নয়, এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, জল সরবরাহ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবেতেই থেমে যাওয়া ঘড়িকে ফের চালিয়ে দেওয়ার নির্বাচন, যাতে ২০২১ সালকে পিছনে ফেলে আমরা ফের এগোতে পারি।

প্যান্ডেমিকের কুড়ি মাস কেটেছে বিভীষিকার মত। এই ওয়ার্ডের থেমে যাওয়া সময় ২০২২ এ আবার চলতে শুরু করবে – এইটুকুই আশা করতে পারি দক্ষিণ শহরতলির এই ওয়ার্ডের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে।

~ পাঠকের চিঠি হিসেবে লেখাটি প্রকাশিত। লেখক পেশায় বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মরত। লেখার বানান ও বয়ান অপরিবর্তিত। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.