আর মাত্র কয়েকটা দিন। আগামী মঙ্গলবারই আমরা পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফল জেনে যাব। তৃণমূলের দাপট থাকবে না গেরুয়া শিবির নিজেদের সমর্থন বাড়াতে পারবে? নাকি অনেক হিসাব উল্টে বাম-কংগ্রেস তাদের হারানো জমির পুনরুদ্ধার করতে পারবে, এই নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। এরই মধ্যে এবিপি আনন্দ-সি ভোটারের জনমত সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে। সেই সমীক্ষা সব দল খারিজ করে দিলেও, ওই চ্যানেলের জনপ্রিয়তার কারণেই জনপরিসরে ওই সমীক্ষা নিয়ে আলোচনা চলছে, চলবেও। ফলে সমাক্ষাটি নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলতেই হয়।
পঞ্চায়েত নির্বাচনে একেবারে স্থানীয় ইস্যু, এমনকি পঞ্চায়েত সদস্যের ব্যবহার, কাজ কিংবা কোনো গোষ্ঠীদ্বন্দ্বই ফলের হিসাব বদলে দিতে পারে। এমন নির্বাচনে আসন সংখ্যা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করা অবিমৃশ্যকারিতা হয়ে যাবে। সি ভোটার তাদের সমীক্ষায় জেলা পরিষদ স্তরে আসন সংখ্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে। কুড়িটি জেলা পরিষদের ১৫টিতে তৃণমূলের নিশ্চিত জয় এবং পাঁচটিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখিয়েছে। এর মধ্যে কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও পূর্ব মেদিনীপুরে তাদের লড়াই মূলত বিজেপির বিরুদ্ধে, মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস-বাম জোটের বিরুদ্ধে। আপাতদৃষ্টিতে এই হিসাব নির্ভুল, কিন্তু প্রশ্ন ফলের বাস্তবতা নিয়ে। জেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকৃত বাস্তবতা প্রকাশ করে না। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার কার্যকারিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তর হল পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েত। গ্রামবাংলার আসল চিত্র বোঝা যাবে ওই দুই স্তরের ফল দেখে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
২০০৮ সালে ১৭টির মধ্যে ১৩টি জেলা পরিষদ বামেরা জিতেছিল। তৃণমূল কংগ্রেস দখল করেছিল পূর্ব মেদিনীপুর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা। কংগ্রেস জেতে মালদা এবং উত্তর দিনাজপুর। তৎকালীন শাসক দল বামফ্রন্ট গ্রাম পঞ্চায়েতে ৬৪.৪% আসন এবং পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে ৬২.৩% আসন জিতেছিল। পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে বামফ্রন্ট মোট আসনের ৫৬.০১% জিতেছিল, ২০০৩ সালের (৭৪.০৫%) তুলনায় তা অনেক কম। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে বামেদের আসন সংখ্যা ২০০৩ সালের ৬৫.৭৫% থেকে কমে নেমে এসেছিল ৫২.৩০ শতাংশে। দুই ২৪ পরগনা, নদিয়া, হাওড়া এবং পূর্ব মেদিনীপুরে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৫ শতাংশের বেশি আসন। দক্ষিণবঙ্গের বেশকিছু জায়গায় গ্রাম পঞ্চায়েত এবং পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে বামফ্রন্ট কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একদা সর্বশক্তিমান বামেদের পতনের সেই সূত্রপাত।
২০২৩ সালে ২০০৮ সালের ফলের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা এখনই দেখা যাচ্ছে না, তবে সমীক্ষার প্রবণতা বলছে শাসক দলের প্রতি সমর্থন কমেছে। এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস বিব্রত। ভোটারদের ২৫% বলেছেন, পঞ্চায়েতে ভোট দেওয়ার সময়ে তাঁদের কাছে অগ্রাধিকার পেতে পারে দুর্নীতির প্রসঙ্গ। বিরোধীরাও প্রচারে দুর্নীতিকেই মূল ইস্যু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জনমত সমীক্ষায় এর আগে প্রতিবার মূল বিষয় হিসাবে এসেছে বেকারত্ব, এবার ২১% মানুষ বলেছেন কাজের অভাব মূল ইস্যু। পরিষেবা ছাপিয়ে দুর্নীতি এবং বেকারত্বের মত নেতিবাচক ইস্যু উপরে উঠে আসা শাসক দলের পক্ষে অশনি সংকেত।
একাধিক সরকারি এবং বেসরকারি রিপোর্ট বা সমীক্ষায় উঠে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের আর্থিক দুর্দশা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কথা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্প বন্ধের জন্য বিজেপিকে দায়ী করলেও গ্রামের মানুষ একে রাজ্যের শাসক দলের অজুহাত বলেই ভাবছেন। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ১০০ দিনের কাজে আর্থিক বঞ্চনার অভিযোগ তৃণমূলকে কোনো বাড়তি সুযোগ দেবে না বলে মনে করছেন ৪০% মানুষ।
ওই একই সমীক্ষায় ৫২% মানুষ বলেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তৃণমূলের থেকে মুখ ফেরাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গে ২০১৯ সালের আগে পর্যন্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের ভোটের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ধর্ম দ্বারা নির্ধারিত হয়নি। সিএসডিএস সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০৮ সাল থেকে দক্ষিণবঙ্গে ধারাবাহিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি মুসলিম ভোটারদের সমর্থন বেড়েছে। ২০০৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জির দলের সমর্থন ২২% থেকে বেড়ে ৭৯% হয়েছে।
এই প্রবণতা প্রথম বদলায় বালিগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনে। তবে বালিগঞ্জ একেবারেই কলকাতা শহরের মধ্যেকার আসন। কিন্তু তারপর মুর্শিদাবাদ জেলার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত সাগরদীঘি উপনির্বাচনে ৪৭.৩৫% ভোট পেয়ে জেতেন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস। বায়রন তৃণমূলে যোগ দিলেও মুসলমান ভোট যে তৃণমূলের কাছ থেকে সরছে তা এখন পরিষ্কার।
এবারের প্রাক-নির্বাচনী হিংসায় মারা যাওয়া ১১ জনের মধ্যে আটজন মুসলমান সম্প্রদায়ের। ডোমকল, চোপড়া এবং ভাঙড় – যে এলাকাগুলো থেকে বিরোধী দল এবং শাসক দলের মধ্যে সংঘর্ষের খবর আসছে, সেখানেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। এটাও পরিষ্কার যে অন্তত পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিন্দুত্ব কোনো বড় প্রভাব ফেলতে পারবে না। তাহলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ভোট কোন দিকে যেতে চলেছে?
আরো পড়ুন পঞ্চায়েত নির্বাচন ও বাঙালি মুসলমান: যে যেখানে দাঁড়িয়ে
স্বাভাবিক যুক্তি কংগ্রেস-বাম জোটের দিকে বললেও সি ভোটারের সমীক্ষা অনুযায়ী, একমাত্র মুর্শিদাবাদ ছাড়া অন্য কোনো জেলায় তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ জোট নয়। অথচ দক্ষিণবঙ্গে নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির প্রভাব যে কমছে তা স্পষ্ট। কিন্তু এই ভোট কোনদিকে যাবে তা সি ভোটারের সমীক্ষা থেকে স্পষ্ট নয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে ৪৯% মানুষ জেলা পরিষদ পাল্টাতে চান, ৪৪% চান না এবং ৭% কিছু বলতে চাননি। সম্ভাব্য আসনসংখ্যায় যদিও এই সংখ্যার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
আবার একই সমীক্ষা বলছে, ৫২% মানুষ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর ‘নো ভোট টু মমতা’ স্লোগানে বিশ্বাস করছেন না। এর একটা ব্যাখ্যা ওই সমীক্ষার মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে, যে ৫৬% মানুষ সিবিআই-ইডির তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে খুশি হলেও ৫৩% মানুষ মনে করেন মূল পাণ্ডার কিছুই হবে না, তদন্ত চিটফান্ড কেসের মতই ধামাচাপা পড়ে যাবে। তাহলে কি বাম-কংগ্রেসের অভিযোগ অনুযায়ী উপরতলায় তৃণমূল-বিজেপি বোঝাপড়ার সম্ভাবনার কথা একটা অংশের মানুষ বিশ্বাস করছেন?
সমীক্ষার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ফলাফলে কিন্তু তার প্রতিফলন নেই। বামপন্থীদের পক্ষে এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ এত প্রচার, এত মামলা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন এ রাজ্যে বিজেপিই তৃণমূলের মূল প্রতিপক্ষ, সেক্ষেত্রে বামেদের মেনে নিতে হবে যে ভাবমূর্তি তৈরি করার খেলায় তারা পরাজিত। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
অধীর চৌধুরীর কাছে মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের পুনরুত্থান স্বস্তিদায়ক হলেও রাজ্যের বাকি অংশ, বিশেষত দক্ষিণবঙ্গে, ভগ্নদশা ভাবিয়ে তোলার মত। বিজেপির কাছে পঞ্চায়েত ভোট লোকসভার রিহার্সাল। লোকসভায় ৪২টি আসনের ৪০টি গ্রাম ও আধা-শহর এলাকার উপর নির্ভরশীল। শেষ কয়েকটি পৌর নির্বাচনে বামেদের ভোট বেড়েছে। গ্রামেও এই প্রবণতা বজায় থাকলে ২০২৪ সালের ভোটে বিজেপির এ রাজ্যের অর্ধেক আসন পাওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।
তৃণমূলের কাছে এই নির্বাচন অগ্নিপরীক্ষা। শুধু লোকসভার ফল নয়, এর সঙ্গে জুড়ে আছে অভিষেক ব্যানার্জির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও।
~মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







