পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তৃণমূলের ‘দুশ্চিন্তা’ কি উত্তরবঙ্গ নিয়েই? রাজ্যের শাসক দলের অন্দরে কান পাতলে তেমনই শোনা যাচ্ছে। বস্তুত নিয়োগ দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগে জেরবার হলেও দক্ষিণবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় ভাল ফল করা নিয়ে তৃণমূল আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু উত্তরবঙ্গ নিয়ে তা বলা যাবে না। অন্তত তিনটি জেলায় প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছে জোড়াফুল শিবির। তবে বাকি তিনটি জেলা নিয়ে উদ্বেগ তুলনামূলকভাবে কম।

তৃণমূল শিবিরের মতে, কোচবিহার এবং আলিপুরদুয়ার জেলায় লড়াই অত্যন্ত কঠিন। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব যেমন আছে, তেমনই বিজেপি এই দুই জেলায় বেশ শক্তিশালী। জলপাইগুড়িতে আগের তুলনায় গেরুয়া শিবির কিছুটা দুর্বল হলেও ব্যবধান খুব বেশি নয়। তবে দুই দিনাজপুর এবং মালদহের মুসলিম ভোট গত বিধানসভার মত এবারও তাঁদের পক্ষেই আসবে বলে মত তৃণমূল শিবিরের।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি জিতেছিল ৭৭টি আসনে। পরে উপনির্বাচনে দুটি আসন তারা হারায়। এই ৭৫টি আসনের মধ্যে বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গের। বিধানসভার ফলাফল অনুযায়ী বিজেপি আধিপত্য দেখাতে পেরেছিল কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়িতে। গত বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারের নটি আসনের মধ্যে বিজেপি বিজয়ী হয় সাতটিতে। আলিপুরদুয়ারের পাঁচটি বিধানসভা আসনেই তারা জেতে। জলপাইগুড়ি জেলায় সাতটি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল চারটি। এই তিন জেলাতেই গ্রামাঞ্চলে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট তৃণমূলের থেকে বেশি।

কোচবিহার জেলায় তৃণমূলের প্রধান সমস্যা তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। একদিকে আদি তৃণমূল, অন্যদিকে উদয়ন গুহ সহ অন্য দল থেকে আসা নেতারা। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে নিশীথ প্রামাণিক বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় জেলার রাজনৈতিক চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। দাপুটে যুবনেতা নিশীথ তৃণমূলের সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন। সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশীথের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ, কিন্তু তাঁর প্রভাব অস্বীকার করার জায়গা নেই।

বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় বিরাট ধাক্কা খেয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু একুশে বিজেপির পালে যে হাওয়া ছিল, তা কি এখনও আছে? পঞ্চায়েত ভোটের দোরগোড়ায় এসে এই নিয়েই চিন্তায় গেরুয়া শিবির। জেলার গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোতে এবার মোট আসন ২,৫০৭। গত বিধানসভায় বিজেপি হাজার দেড়েক আসনে এগিয়ে ছিল। এবারও জেলা পরিষদ দখল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী গেরুয়া শিবির। কিন্তু গত দুবছরে তৃণমূলের সংগঠন আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী হয়েছে। উপনির্বাচনে বিপুল জয় পেয়েছেন উদয়ন। এবারও নির্বাচনের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোচবিহার জেলায় ১২৮টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে পাঁচটি গ্রাম পঞ্চায়েত চলে এসেছে তৃণমূলের দখলে। জেলার ২,৫০৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত আসনের মধ্যে ১৫৭টি আসনে প্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। একই কারণে পঞ্চায়েত সমিতির ৩৮৩টি আসনের মধ্যে ১৭টি আসনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না‌। একইভাবে জেলা পরিষদের ৩৪টি আসনের মধ্যে একটি আসনে ভোট হচ্ছে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোচবিহার নিয়ে রীতিমত চাপে রয়েছে শাসক দল।

চাপ রয়েছে আলিপুরদুয়ার নিয়েও। মূলত চা বাগানে ঘেরা এই জেলা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। একসময় এই এলাকা ছিল বামপন্থী দল আরএসপির দুর্গ। সময় বদলেছে। বামেরা এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তি, কংগ্রেসও দুর্বল। আদিবাসী বিকাশ পরিষদের হয়ে দাপিয়ে রাজনীতি করে আসা জন বার্লা বিজেপির সাংসদ। ছোট্ট জেলা, মাত্র পাঁচটি বিধানসভার আসন। ২০২১ সালে একটিতেও জিততে পারেনি তৃণমূল, সবকটি আসনেই পদ্ম ফুটেছিল। তারপরেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। এই জেলাতেও তৃণমূলের বড় সমস্যা গোষ্ঠী কোন্দল। একঝাঁক পুরনো নেতা টিকিট পাননি, রয়েছেন অনেক নির্দল প্রার্থী। তুলনায় বিজেপি অনেকটাই সংহত সাংগঠনিক অবস্থায় রয়েছে। আলিপুরদুয়ার জেলা পরিষদ দখল নিয়ে নিশ্চিত বিজেপি নেতারা। যদিও জেলাস্তরের তৃণমূল নেতৃত্ব বলছেন, গত দুই বছরে হাওয়া অনেকটাই বদলে গিয়েছে।

জলপাইগুড়ি জেলা এক সময়ে বামপন্থীদের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ছিল। ২০১৩ সালেও এই জেলা পরিষদ দখল করেছিল বামফ্রন্ট, কিন্তু তারপর থেকে ক্রমশ পায়ের তলার জমি হারাতে থাকে সিপিএম। সদস্য ভাঙিয়ে জেলা পরিষদ দখল করে তৃণমূল। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে উত্থান হয় বিজেপির। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং একুশের বিধানসভা নির্বাচনেও বড় সাফল্য পায় গেরুয়া শিবির। কিন্তু তারপর থেকেই বিজেপির সংগঠনে ভাটার টান। একদিকে তৃণমূলের তৎপরতা, অন্যদিকে জেলার বেশ কিছু ব্লকে বাম ও কংগ্রেসের সক্রিয়তার জেরে শক্তি কমেছে বিজেপির। বিশেষ করে বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে চিন্তায় গেরুয়া শিবির। জলপাইগুড়ি জেলাতেও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে তৃণমূলে। কিন্তু নির্বাচনের আগে তারা কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। জেলা পরিষদের ১৭টি আসনে নতুন মুখ এনেছে তারা। তৃণমূলের আশা, এই জেলায় বিজেপির ভোটের বড় অংশই বামে ফিরবে। ফলে ভোট কাটাকাটিতে সুবিধা হবে তাদের।

প্রয়াত কংগ্রেস নেতা এবিএ গনিখান চৌধুরীর জেলা মালদহ নিয়ে তৃণমূল অনেকটাই নিশ্চিন্ত। এই জেলা একসময় কংগ্রেসের খাসতালুক ছিল। তবে গত পাঁচ বছরে অনেককিছু বদলে গিয়েছে। মালদহ জেলা পরিষদ তৃণমূলের দখলে তো বটেই, জেলার ১৫টি পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে ১৪টিই তাদের হাতে। একটির দখল রয়েছে বিজেপির। যদিও ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে মালদহে দুটি পঞ্চায়েত সমিতি দখল করেছিল বিজেপি। হবিবপুর ও বামনগোলা পঞ্চায়েত সমিতিতে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বোর্ড গঠন করেছিল। তবে শেষমেশ দলবদলের ফলে বামনগোলা পঞ্চায়েত সমিতি তৃণমূলের হাতে যায়।

গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে মালদহ জেলা পরিষদের ৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস, ছটি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। একটি কংগ্রেসের দখলে ছিল, একটি আসনে নির্বাচন হয়নি। মালদহ জেলায় মোট গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যা ১৪৬। গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলার অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। উত্তর মালদহের কিছু গ্রাম পঞ্চায়েতের দখল বিজেপি নিয়েছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে একটি আসন জেতে কংগ্রেস, অন্যটি বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনে জেলায় তৃণমূল জেতে দশটি আসন, বিজেপি চারটি। সুজাপুরের মত বহু দশকের দুর্গেও হারতে হয় কংগ্রেসকে।

একুশের নির্বাচনে রাজ্যের মুসলিম ভোট এককাট্টা হয়ে গিয়েছিল তৃণমূলের ঝুলিতে। তৃণমূল পেয়েছিল ৮৯% সংখ্যালঘু ভোট। বিরোধী বাম-কংগ্রেস শিবিরের দাবি, গত দুবছরে রাজ্য রাজনীতিতে বেশ কিছু বদল এসেছে। সংখ্যালঘু ভোটের একাংশ তৃণমূলের থেকে সরে গিয়েছে। এই দাবি কতখানি সঠিক, মালদহ এবং দুই দিনাজপুরের পঞ্চায়েত নির্বাচন তা প্রমাণ করবে। কংগ্রেস এখনো জেলার বিরাট অংশে শক্তিশালী। সুজাপুর এবং সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূলের একাংশ কংগ্রেসে যোগ দিয়েছে। তবু সাংগঠনিকভাবে এখনো অনেকটা এগিয়ে শাসক দল। অন্যদিকে বিজেপির সংগঠন মূলত জেলার উত্তরাংশে। মালদহ উত্তর লোকসভার সাতটি বিধানসভা আসনের চারটিই গেরুয়া শিবিরের দখলে। তবে কেবল এই হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের ফলাফলের উপর নির্ভর করে যে জেলা পরিষদ দখল করা কঠিন, তা মানছেন বিজেপির জেলার নেতারাও।

আরো পড়ুন দার্জিলিং পাহাড়ে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সমীকরণ জটিল

মালদহের মত উত্তর দিনাজপুরও ছিল কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর খাসতালুকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাংসদ ছিলেন তাঁর স্ত্রী দীপা। তারপর রায়গঞ্জ থেকে লোকসভায় যান সিপিএমের মহম্মদ সেলিম। এই জেলায় কিছু পকেটে কংগ্রেস এবং সিপিএমের সংগঠন শক্তিশালী, তবে খাতায় কলমে জেলার প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। রায়গঞ্জের সাংসদ পদ বিজেপির দখলে। কিন্তু একুশের নির্বাচনে জেলায় নটির মধ্যে মাত্র দুটি কেন্দ্রে বিজেপি জিতেছিল। তবে জিতলেও বিজেপি ধরে রাখতে পারেনি সেই দুই বিধায়ককে। তাঁরা তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন।

উত্তর দিনাজপুরে ভাল ফল করার ব্যাপারে মোটের উপর নিশ্চিত তৃণমূল, তবে কাঁটা সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। দলীয় বিধায়ক এবং অত্যন্ত সিনিয়র নেতা আব্দুল করিম চৌধুরীর সঙ্গে জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়ালের দ্বন্দ্ব অব্যাহত। অভিষেক ব্যানার্জির হস্তক্ষেপেও সুরাহা হয়নি। বরং ভোটের মুখে তা আরও বেড়েছে। করিম সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির উদ্দেশে সতর্কবাণী দিয়েছেন।

দক্ষিণ দিনাজপুর বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের জেলা। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে কিছু আসনে জয়লাভ করেছিল তাঁর দল। তার রেশ ধরে ২০১৯ সালে প্রবল মোদী হাওয়া এবং গেরুয়া ঝড়ে ভর করে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে জয়ী হন সুকান্ত। এরপর ২০২১ সালেও বিধানসভার ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটিতে তারা জেতে। কিন্তু তারপর থেকেই সংগঠনে ভাটার টান। ২০২২ সালের পৌর নির্বাচনে জেলায় জোর ধাক্কা খায় বিজেপি। তাদের পিছনে ফেলে দেয় বামফ্রন্ট। বালুরঘাট ও গঙ্গারামপুর দুই পৌরসভার একটি আসনেও জেতেনি বিজেপি। এমনকি সুকান্তর বাড়ির ওয়ার্ডেও পর্যদুস্ত হতে হয় বিজেপিকে। এবার পঞ্চায়েত ভোটেও সব আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি গেরুয়া শিবির। তাদের সমস্যা বাড়িয়ে উত্থান হচ্ছে বামপন্থীদেরও। এক সময় বাম দুর্গ হিসাবে পরিচিত ছিল দক্ষিণ দিনাজপুর। বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি বালুরঘাট পৌর নির্বাচনে দুই আসনে বামেদের জয়লাভ উজ্জীবিত করেছে সিপিএমকে। তার প্রভাব পড়েছে পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন পর্বেও। প্রায় ৯০% আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বামেরা। কংগ্রেসও অনেক আসনে প্রার্থী দিয়েছে। তবে সাংগঠনিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে থাকা তৃণমূল জেলা পরিষদ দখলের বিষয়ে নিশ্চিত।

তবে রাজ্যের বাকি অংশের মত উত্তরবঙ্গেও নির্বাচনের আগে ভোটারদের ভাবাচ্ছে একটিই প্রশ্ন – ভোটটা আদৌ দেওয়া যাবে তো? চোপড়া থেকে দিনহাটা – উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসায় মৃতের সংখ্যা কিন্তু বেড়েই চলেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.