“বাদুড় জিনিসটা আমার মোটেই ধাতে সয় না।… বাদুড়ের চেহারাটাই আমার বরদাস্ত হয় না— না পাখি, না জানোয়ার, তার উপরে ওই যে মাথা নিচু করে পা দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়িয়ে ঝুলে থাকা, এইসব মিলিয়ে মনে হয় বাদুড় জীবটার অস্তিত্ব না থাকলেই বোধহয় ভাল ছিল।”
সত্যজিৎ রায়ের ‘বাদুড় বিভীষিকা’ গল্পের শুরুটাই এমন। ‘আতঙ্ক’বাদী গল্প এটি— ‘হরর স্টোরি’। আসলে বাদুড়ের সঙ্গে আমাদের একটা ভয় ও ঘেন্নার সম্পর্ক। লোকালয়ে বাদুড়ের অগ্রদূত হল চামচিকে। চামচিকের মধ্যে বাদুড়ের ছায়া পুরো মাত্রায় মেলে। বাদুড়ের মতোই অন্ধকার তাদের কাছে প্রিয়। কিছুকাল আগেও সন্ধ্যা নামলে চামচিকের কিচকিচানি শোনা যেত, ঘরেও ঢুকে পড়ত কখনও দু’-একটা, ফ্যানের ব্লেডের ধাক্কায় মরত-ও, এমনকী নাছোড় কোনও বাবাজি-কে আমি হাতপাখার বাড়ি মেরে কাত-ও করেছি।

“আদুড় বাদুড় চালতা বাদুড়
কলা বাদুড়ের বে’
টোপর মাথায় দে’।
দেখতে যাবে কে?
চামচিকেতে বাজনা বাজায়
খ্যাংরা কাঠি দে’।”
একেবারে ছোট্টবেলা থেকে মুখস্থ এই ছড়ার গোড়ার দু’ লাইনের মানেটা পরিষ্কার হয়েছে অনেক পরে, ছেলেকে শোনাতে গিয়ে। অর্থাৎ চালতা গাছে থাকা বাদুড়ের সঙ্গে বিয়ে হতে চলেছে কলা গাছের বাদুড়ের। বিয়ের ব্যান্ডপার্টির বাজনদার অন্য কোনও জন্তু বা পাখি নয়, চামচিকে!
(এই ‘বিয়ে’, ‘দিয়ে’-র কথ্য রূপের সঙ্গে শিশুদের সড়গড় হওয়াটা গুরুত্বের, এটি কিন্তু শীলিত নাগরিক বাগভঙ্গি নয়।)
ছেলে-ভোলানো ছড়ায় চাঁদ, ফুল, কদমতলা, হাতি, ঘোড়া, সোনামনির বে’— কী উজ্জ্বল! আবার পায়রার ঝাঁক, ছেলেময়ের দল, নদীতে হুটোপাটি, রুই-কাতলার ভেসে ওঠা, দাদার কলম ছোড়া— কতই-না রঙ! সেখানে বাদুড়ের বিয়েতে কী অন্ধকার! সামান্য মজা কেবল বাদুড়ের টোপরটিতে। এই বিবাহ-অভিযানে অন্য কোনও প্রাণী সঙ্গী নয়, শুধু চামচিকে!

বাদুড় একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। পাখি নয়। কিন্তু উড়তে পারে। অনেকটা লালমোহন গাঙ্গুলিমশাই যেমন খেচরের উদাহরণ পেশ করেছিলেন : বেলুন, তেমনটি। বিদঘুটে প্রাণী সন্দেহ নেই। দিনের বেলায় ভালোই নাকি দেখতে পায়। তবু রাতেই এদের কারবার। মানুষের সঙ্গে এদের কোনও ঘনিষ্ঠতা, কোনও সংযোগ কোনও কালে ছিল বলে শোনা যায় না। ‘পোষা বাদুড়’ কথাটা অচেনা। এই বিরাগ কেবল নিশাচর বলে যে, তা নয়। একটা গা-ঘিনঘিনে ব্যাপার আছে বাদুড়ের মধ্যে। দাঁতে-মুখে একটা হিংস্র ভাব, তার ওপর আবার মুখ দিয়ে মলত্যাগ করে! নিশাচর খেচরদের মধ্যে পেঁচা-ও বাদুড়ের সঙ্গে সমোচ্চারিত। জীবনানন্দের কবিতায় তো বাদুড় আর পেঁচা প্রায় নিশীথিনী-সম!
পেঁচাকে কিন্তু দেবতার পাশে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি আমাদের একটা আলাদা দরদ আছে বইকী! একবার আমার দিদির বাড়ির উঠোনে বেশ বড় সাইজের এক পাটকিলে পেঁচা চলে আসে। বেচারা ওড়ার ক্ষমতা হারিয়েছিল। দিদি কোলে করে নিয়ে এসে নিজের ঘরের মেঝেয় বেশ মোলায়েম একটি বিছানা করে তাকে রেখে দেয়। এত আহ্লাদে ব্যাপারস্যাপার শুনে আমরা তো আঁতকে উঠেছিলাম! নিয়ম করে তাকে আঙুর-আপেল-কিসমিস এ-সব দেওয়া হত, সঙ্গে ভিটামিন ড্রপ, হোমিও ওষুধ ইত্যাদিও। লক্ষ্মী শিশুর মতো ছিল সে। হপ্তাখানেক বাদে এক পূর্ণিমার রাতে উড়ানের ট্রায়ালে শূন্যে ছুড়ে দিতেই সে ডানা মেলে উড়তে-উড়তে আকাশরেখায় হারিয়ে যায়।

প্রায় আড়াই-তিন দশক আগে, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন জ্যোতিবাবু একবার বিরোধীদের সম্পর্কে বলেছিলেন— ‘ওরা অন্ধকারের জীব।’ তখন ভোরে উঠে পুব দিকের জানালা বন্ধ করে আবার আমি ঘুমিয়ে পড়তুম। অনেক বেলা-য় প্রায়ান্ধকার ঘরে আমায় ঘুম থেকে তুলতে গিয়ে মা এই বিশেষণটি আমায় ছুড়ে দিতেন। তো সেই থেকে ‘অন্ধকারের জীব’, এই শব্দবন্ধের সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেছি।

এই জীবেদের নিয়ে ক’টি সমীকরণ হাজির করছি।
১) উন্নত চামচিকে = বাদুড়।
২) উন্নত বাদুড় = ভ্যাম্পায়ার।
অতএব,
৩) ভ্যাম্পায়ার = উন্নততর চামচিকে।
আবার আমরা জানি,
৪) ‘মনুষ্যত্ব’প্রাপ্ত ভ্যাম্পায়ার = ড্রাকুলা
অনুসারী আরও কয়েকটি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। উল্লেখ্য, নিশাচর মাত্রেই অন্ধকারের জীব নয়। রাতবিরেতে ‘নেশাচর’ মানুষও থাকেন। একদা চার যুবক মধ্যরাতে কলকাতাকে শাসন করত। তারা ছিল আবার আলোর সন্ধানী!

ফিরে যাই আমাদের কিশোরবেলায়। বিকেলে ছাদে উঠে ঘুড়ি উড়োতে-উড়োতে সন্ধে নামত। কর্পোরেশনের লাইটম্যান রাস্তার আলো জ্বেলে দিয়ে গেল। তখন ছিল বাল্বের আলো। এ-বাড়ি সে-বাড়ি থেকে শাঁখ বাজছে। আশপাশের কোনও কিশোরীর হয়তো হারমোনিয়াম নিয়ে গলা সাধা শুরু। পশ্চিম দিকে হাওড়া ব্রিজের চুড়ো অন্ধকারে ক্রমশ আবছা।
তখনই, ঠিক তখনই— অন্ধকারের দূত হয়ে পালে-পালে বাদুড় পশ্চিম থেকে পুবের পানে উড়ে চলত। নিত্য সাঁঝে। তখন সত্যিই বাদুড়ের ডানায় ভর দিয়ে সন্ধে নামত কলকাতায়। ততদিনে জেনে গেছি যে ওদের মধ্যে এক ধরণের র‌্যাডার-সিস্টেম আছে, শব্দোত্তর তরঙ্গ পাঠিয়ে বুঝে নেয় সামনে ওড়ার পথে কোনও বাধা আছে কিনা। আমাদের পুব দিকে বেশ খানিকটা গেলে-পরে মানিকতলা খালপোল পেরোলে তখন শুরু হয়ে যেত গাছপালার এলাকা। জনবসতের অনুপাতে গাছপালা নেহাত কম ছিল না। বেশির ভাগই ঠিকাপ্রজা অঞ্চল, দোতলা-র অনুমতি ছিল না। কাজেই বাদুড়ের র‌্যাডার-সিস্টেমে অল ক্লিয়ার। শুধু এগিয়ে চলা। কাকুরগাছি, ফুলবাগান, নারকেলডাঙা, বেলেঘাটা এ-সব অঞ্চল পেরোলে বাড়িঘরদোর ক্রমে ফিকে হতে থাকে। তারপর তো ধু-ধু ক্ষেত ও জলাভূমি। ভেড়ি অঞ্চল।

নিঃসন্দেহে কলকাতার এই পূর্বভাগেই ছিল বাদুড়দের নিত্যগমন। কিন্তু পশ্চিমের কোত্থেকে তারা আসত? কেউ বলত গঙ্গার ওপার থেকে। অনেক বছর পরে আমার মনে হয়েছে, গঙ্গার ধার ধরে গাছপালার দঙ্গল, মালগাড়ির লাইনের গা ঘেঁষে, যেটি পরবর্তীতে চক্ররেলের লাইন হয়ে ওঠে সে-সবই ছিল এদের ডেরা। আমার দিদি পড়ত বেথুন স্কুলে। স্কুলের চৌহদ্দিতে গাছপালা নেহাত কম ছিল না। সেখানেও থাকত প্রচুর বাদুড়। দিদির কাছে বর্ণনা শুনতাম, কেমন করে ‘হেটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ’ হয়ে তারা ঝুলে থাকে গাছে! রাস্তার ও-পারে ‘আজাদ হিন্দ্ বাগ’, জনপরিচিতি ‘হেদুয়া’ নামে, গাছপালা সেখানেও, অতএব বাদুড়জনের ডেরা।
সন্ধে হওয়ার মুখে ছাদ থেকে নেমে আসতাম। সকালে মাঝেমধ্যে ছাদে মিলত দু’টো-একটা গোটা সুপুরি, খোসাসুদ্ধ, যেন গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা। শুনতাম,উড়ন্ত বাদুড়দের পা বা মুখ থেকে ফসকে-পড়া এগুলি। এর মধ্যে কিছু-কিছু আমরা তুলে রাখতাম হরলিক্সের শিশিতে। এ-ভাবে প্রায় দু’ শিশি সুপুরি জমিয়েছিলাম মনে আছে। বিভিন্ন খাতে সেই ভাণ্ডার খরচ হয়েছে। রোমাঞ্চকর, যখন এই লেখা চলাকালীন বাড়ির এক কোনায় এত বছর বাদেও পেয়ে যাই সে-র’ম একটি শিশি যাতে এখনও গোটা-পাঁচেক সুপুরি রয়ে গেছে, সেই খোসাসুদ্ধ! উত্তর কলকাতার গেরস্তবাড়িতে যে কিছুই ফেলার জো নেই!
এখনও রয়ে গেছে গোটাকয় সুপুরি।
সুপুরি
সুপুরি – আদুড় বাদুড়

তবে আমার এই বাদুড়স্মৃতিতে তখনকার পূর্ব কলকাতা মাখামাখি হয়ে আছে। না-বললেই নয়। আমাদের কাছের একটি পল্লি : বাদুড়বাগান। এমনতরো নাম বহুদিন হল নিরর্থক হয়ে গেছে। আমাদের যেতে হবে আরও অনেকটা পুবে, বাদুড়েরা যে-দিক পানে যেত। মানিকতলা, নারকেলডাঙা, বেলেঘাটা-ছোঁয়া যে-‘সার্কুলার ক্যানেল’, তারও পুবে। ১৯৭২-এ বিধাননগরে কংগ্রেস অধিবেশনের পর থেকেই সল্টলেক ব্যাপারটা ধীরে-ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করে। এসপ্ল্যানেড থেকে ধু-ধু সল্টলেকের দু’টি মাত্র বাস, সরকারি, একতলা— এল্ ১৪এ এবং এল্ ১৪বি। এল্ মানে লিমিটেড স্টপ। ভাড়া পাঁচ পয়সা বেশি। বেঙ্গল কেমিক্যাল— নগরপারের শেষ সীমায় পৌঁছতে একমাত্র ভরসা সরকারি একতলা ১৪ নং, ভায়া মানিকতলা, কাকুরগাছি। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস তখন চিন্তারও অগম্য। বেলেঘাটা অঞ্চল ভেদ করে জোড়ামন্দির অব্দি যেত আরেকটি সরকারি একতলা, ৩৫ নং, বৌবাজার ধরে শেয়ালদা হয়ে। মনে করিয়ে দিই, তখন শেয়ালদা ফ্লাইওভার কল্পনাতেও নেই।
জীবনে প্রথম পাহাড়ে চড়ার রোমাঞ্চ মিলেছিল এই পূর্ব কলকাতায়, বছর-দশেক বয়সে। ‘পাহাড়’টি ছিল কলকাতার আগেকার ‘ধাপা’— কাদাপাড়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড, যেখানে তৈরি হয়েছে আজকের সজ্জিত বিনোদন-চবুতরা : স্বভূমি।
সার্কুলার ক্যানেলের ওপার’টা নিয়ে পড়া যাক। প্রাচীন বাড়ি, দোতলা কী তিনতলা, মাঝেমধ্যেই দাঁড়িয়ে। কিন্তু বেশির ভাগই টালির কিম্বা খোলা-খাপরার চালের অথবা পাকা ছাদের একতলা, সার-সার। জমিদারদের জমিতে ঠিকাপ্রজা আইনে বাড়ির দোতলা করা যেত না। বস্তি অঞ্চলও কম নেই। কাঁচা মাটির ঘরও চোখে পড়ত। তদানীন্তন নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের বহু কিছু সেখানে অমিল। খাস কলকাতার মতো ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী ছিল না। বিদ্যুৎ-সংযোগ তখনও আসেনি অনেক ঘরেই। আবার এরই মধ্যে বিস্তীর্ণ কিছু এলাকা ‘ক্যালকাটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট’ (সিআইটি)-এর করা উন্নয়নের স্বাক্ষর এখনও বহন করছে। তবে হ্যাঁ, বলতে বাধা নেই, সে-সব হয়েছিল সম্পন্নের সপক্ষে। বেলেঘাটার কথা বলতে পারি। সেখানে জমিদার বলতে পরিচিত তিনটি পরিবার— নস্কর, সরকার ও বোস। ভেড়ি অঞ্চলে এদেরই মাইলের পর মাইল। আর ছিল রানী রাসমনিদের অমিত ভূসম্পত্তি।
আমার বড়মাসি থাকতেন বেলেঘাটার রাসমণি-বাগান অঞ্চলে। সামনে খোলা মাঠ, অন্য পাশে আস্ত দিঘি, গাছপালা যথেষ্টই। কিছুটা দূরে কলকাতা কর্পোরেশনের নিজস্ব ন্যারো গেজ রেল লাইন। সকাল থেকে ভোঁ বাজাতে-বাজাতে জঞ্জাল-ভর্তি ওপেন রেকের ‘মালগাড়ি’ মুন্সিবাজারের দিক থেকে ধাপা অব্দি দৌড়ে জঞ্জাল ফেলে আসত। বেলা পর্যন্ত চলত এই আসা-যাওয়া। প্রাচীন কালে এই প্রকার আরেকটি রেলব্যবস্থা ছিল সার্কুলার (এপিসি/এজেসি) রোড বরাবর। যার লাইনের এক চিলতে অবশেষ দেখা যেত ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ’-এর পাশে।
তো, যা বলতে যাচ্ছিলাম— পরপর দু’-তিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বড়মাসি খুবই অবসন্ন বোধ করছিলেন। ওনার চোখে পড়ে, হাতে-পায়ে জোড়ায়-জোড়ায় ক’টি জমাট রক্তবিন্দু। সন্দেহ একটা হচ্ছিলই। এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখেন হাতে চামচিকের মতো কিছু বসে! উড়ে পালাতেই দেখা যায় হাতে একজোড়া সুচ ফোটানোর টাটকা রক্তক্ষত!

নগরায়নের এতটা আগ্রাসী দাপট তখনও শুরু হয়নি। প্রোমোটার, রিয়েল এস্টেট এ-জাতীয় শব্দরাজি বিলকুল অজানা। গ্রাম ও মহানগরের মধ্যবর্তী এলাকা। নগরোপান্ত। হিন্দুপ্রধান। উদ্বাস্তুর সংখ্যাও যথেষ্ট। বেলেঘাটায় তো এখনও ধীবর সম্প্রদায়ের মানুষজন বেশ ভালো সংখ্যায়। জলা ও ভেড়ির কারণে তারা পুরুষানুক্রমিক বাসিন্দা। কিছু মসজিদও নজর কাড়ে, কিছু আবার পরিত্যক্ত। অর্থাৎ একসময়কার মুসলিম নিবেশের প্রমাণ। বেশ কিছু বড়সড় ওয়াকফ সম্পত্তি এখনও দেখা যায়। যেমন ওল্ড বালিগঞ্জের জমিজমার প্রায় পুরোটাই একদা ছিল মুসলিমদের।
তবে কলকাতার তখনকার শিল্পাঞ্চল বলতে এই পূর্ব কলকাতাকে আনতেই হবে। সার্কুলার ক্যানেলের ধারে ছিল ছোটখাটো অসংখ্য কারখানা। লেদ মেশিনও চলত অনেক। বসতি অঞ্চলেও ব্যাটারি, বাল্ব, খেলনা ইত্যাদি তৈরির কুটির-উদ্যোগ কম ছিল না। মহিলারা অনেকেই সে-সব কারখানায় কাজ করতেন। এ-ছাড়া সেলাইয়ের কাজ, ঠোঙা বানানো বা ঘুঁটে দেওয়া— এ-সব তো চলতই। আরও অসহায়েরা ‘সম্পন্ন’ উত্তর/মধ্য কলকাতায় ঠিকে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। পুরুষেরা কোনও কারখানায় কাজের শেষে সন্ধ্যায় ফুটপাথে কোনও পসরা নিয়ে বসতেন— বাচ্চাদের জামা, নয়তো হাওয়াই চপ্পল, কেউ হয়তো সায়া-ব্লাউজ, কেউ-বা পাজামার দড়ি। তখন কিন্তু ভ্যানরিকশা বা অটো বা ফুটপাথের গুমটি ছিল না। কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্যও ছিল অনেক কম।
সে-সব কারখানা আর নেই। আশি-র দশকের মাঝামাঝি থেকে বেশ দ্রুত গতিতে এর বিলোপ ঘটতে থাকে। ততদিনে জমি-হাঙরদের দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে। রাজনীতির পতাকার তলায় কারবারিরা বুক ফুলিয়ে তাদের অস্তিত্ব জাহির করছে।

১০

যে-রকম দেখেছি, বলার চেষ্টা করলাম। জানি না, এতে সমাজ বা বর্গের কোনও পরিচয় উঠে এল কিনা।
আরও বলার, এই অঞ্চলে খুবই তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব’ এবং ‘সশস্ত্র কৃষিবিপ্লব’— সত্তরের দুই আহ্বান-ই।
রাত নামলে এতদ্ অঞ্চলে শুরু হয়ে যেত বাদুড়ের আঁধারবিলাস।

১১

তবে বাদুড় মানেই কি কেবল আতঙ্ক আর ঘেন্নাপিত্তি? একে ঘিরে কি কোনও মজাই নেই? কে বলল নেই! আমার এক তুখোড় বন্ধু ঘরভর্তি ডাক্তারদের সামনে প্রস্তাব রেখেছিল বাদুড় দিয়ে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করানোর, তাতে নাকি প্রায় নিখরচায় করা যাবে! এমন চমকপ্রদ তত্ত্বে ‘উচ্ছ্বসিত’ ডাক্তারবাবুরা সুদীর্ঘ অট্টহাস্যে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়েছিলেন।

১২

ভারতীয় চলচ্চিত্রে, স্মরণীয় একটি হাড়-হিম-করা খুনের দৃশ্যে আবহস্তোত্র হিসেবে এই ক’টি আপাত-খ্যাপাটে ছত্র ব্যবহৃত হয়েছিল। ঘাতকেরা সব হাজির, হন্যমান-ও প্রস্তুত!
আজ অতিমারীর এই দুঃসময়ে বাদুড়জন ঘাতকরূপে চিহ্নিত হোক বা না-হোক, ইঁদুরবর্গ মরবার জন্য তৈরি থাকুক!

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply