একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। একটা মেয়ের গল্প। মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র মেয়ে। বাবা-মার উচ্চাশা না থাকলেও কিছু প্রত্যাশা রয়েই যায়। মেয়েটির বাবা হাইস্কুলের শিক্ষক। বাবাকে দেখেই তার স্কুলশিক্ষিকার চাকরি করার ইচ্ছে হয়েছিল। বাবা-মাও তার স্বপ্নকে পূরণ করতে চেষ্টা করেছেন সর্বস্ব দিয়ে। সেই মত উচ্চমাধ্যমিকে ভালো নম্বর পেয়ে পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর। সময়টা চলতি শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষ, দ্বিতীয় দশকের শুরু। আশেপাশে চেনা পরিচিতদের মধ্যে উচ্চ থেকে মধ্য মেধার অনেকেই দু-তিনবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দিয়ে কোনো না কোনো স্কুলের স্থায়ী শিক্ষক হয়েছে। মেয়েটিকেও ওই জায়গায় পৌঁছতে হবে, সেজন্য লক্ষ টাকায় বি এড করা আবশ্যিক। বাবা মেয়ের উত্তরণের জন্য পয়সা খরচ করতে কার্পণ্য করলেন না। অতঃপর অপেক্ষা শুরু। সবই তো হল, কিন্তু পরীক্ষা কবে হবে? যা-ও বা ২০১৬ সালে হল, সে পরীক্ষায় কারা পাস করল সে রহস্যের সমাধান ফেলুদা আর ব্যোমকেশ মিলেও করতে পারবে না।

প্রশ্নটা ঠিক এইখানে। ওই মেয়েটির দোষ কোথায়? আমার দোষ কোথায়? আমাদের দোষ কী? নব্বইয়ের দশকে জন্মানো? জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করা, নাকি মাস্টারির চাকরি করতে চাওয়া? নাকি ওসব নয়, আসলে পরিবর্তনের নেশায় বুঁদ হয়ে মমতা ব্যানার্জিকে ক্ষমতায় আনতে চাওয়াই আমাদের দোষ ছিল? কোন দোষে, কার দোষে আমরা হীনমন্যতায় ভুগছি, অপমানিত হচ্ছি, সমাজের চোখ এড়াতে ঘরের এক কোণে নিজেকে নির্বাসন দিচ্ছি?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মমতা ব্যানার্জির রাজত্বকালে আজ পর্যন্ত দুবার স্কুল সার্ভিস কমিশনের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা হয়েছে – ২০১২ এবং ২০১৬ সালে। ক্ষমতায় আসীন হয়েই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু ২০১১ সালে বলেছিলেন, এসএসসি কি দুর্গাপুজো, যে প্রতি বছর করতে হবে? ঠিক কথা। এসএসসি সময় মত না হলেও চলে, করোনার অজুহাতে স্কুল বন্ধ থাকলেও কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু ভোট যথাসময়ে হতেই হবে। আপনি মরে গিয়েও পৌরসভা বা পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোটদান করতে পারেন, কিন্তু বেঁচে থেকে পড়াশোনা করেও চাকরি পাবেন না। নিদেনপক্ষে পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে যাচাই করার সুযোগটাও পাবেন না।

তবে আমি অবাক হই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কাজকর্ম দেখে। গণআন্দোলনের ধারায় পুষ্ট, বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী কোনো দল, কোনো সংগঠনকে দেখলাম না এই বিষয়ে কোনো বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে। পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, অন্যায়, অপশাসনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান প্রমাণ হয় ভোটের আগে একটা নবান্ন অভিযান কি আইন অমান্য, কিছু বিক্ষিপ্ত মিছিল দিয়ে। জনসংযোগ কোথায়? কোথায় উঁচু থেকে নীচুতলার মানুষের মধ্যে মতের মেলবন্ধন ঘটানোর প্রয়াস? এই ফাঁকটার সুযোগ শাসকগোষ্ঠী খুব ভালো করে নিতে জানে। একদিকে শিক্ষকসহ সরকারী কর্মী এবং ডাক্তারদের গণশত্রুতে পরিণত করা, আর অন্যদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্পের নাম করে নতুন নিয়োগ থেকে ডিএ বৃদ্ধি, সবকিছুই আটকে রেখে সরকার রাজ্য চালাচ্ছে। জনগণকে সূক্ষ্মভাবে দুটো বিপরীত পক্ষে দাঁড় করিয়ে দিতে এই সরকারের জুড়ি মেলা ভার। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ জনমুখী প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গের সব মহিলার প্রয়োজন নেই। যাদের প্রয়োজন, তাদের চিহ্নিত করে প্রদান করলে খরচ অনেকটা কমে। কিন্তু সরকার তা করবে না।

আমরা কেউ শিক্ষক নিয়োগের নতুন বিজ্ঞাপন চেয়ে মাসের পর মাস ডেপুটেশন দিচ্ছি এসএসসি অফিসে, কেউ এই গরমেও ৪০০ দিন ধরে স্বচ্ছ নিয়োগ চেয়ে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে বসে আছে। শারীরশিক্ষা, কর্মশিক্ষার হবু শিক্ষকরা কালীঘাট অভিযান করে পুলিশের লাঠির আদর খাচ্ছে। দু-একজন হতাশা, বিষাদ, অনিশ্চয়তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। আমরা কলেজ স্ট্রিটে জমায়েত করছি আর লালবাজারে দিন কাটাচ্ছি। অসংখ্য কোর্ট কেস। সর্বত্র রাজ্য সরকারের মুখ পুড়ছে, সিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। একজন বিচারপতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে “যুদ্ধ ঘোষণা” করেছেন। দৃপ্ত কন্ঠে জানাচ্ছেন, আমার মাথায় বন্দুক ঠেকালেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চলবে। তিনি মাননীয় অভিজিৎ গাঙ্গুলি। একের পর এক দুর্নীতিবিরোধী রায় দিচ্ছেন আর ডিভিশন বেঞ্চ সপ্তাহের পর সপ্তাহ স্থগিতাদেশ দিয়ে যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গবাসী সব দেখছে। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের অঙ্ক কষছে, অথচ কেউ পথে নেমে প্রতিবাদ করছে না। শুধু চাকরি চাইতে চাইতে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি শরীরে, মননে। আমাদের মধ্যে কেউ বিএ বা এমএ-বিএড করে দোকানে কাজ করছে। কেউ অটো চালাচ্ছে, জামাকাপড় বিক্রি করছে, কেউ বা কাঁধে সবজি তুলে নিচ্ছে। কোনো কাজ ছোট নয় মানলাম। কিন্তু এত টাকা খরচ করে এতগুলো বছর ধরে এত পড়াশোনা করলাম কি এইসব করার জন্যে? এ প্রশ্ন থেকেই যায়। আরও প্রশ্ন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও রাজ্য আমায় আমার পছন্দসই কাজ করার সুযোগ দেবে না কেন? যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পর্যন্ত দেবে না কেন? আমার সসম্মানে বাঁচার অধিকারটুকুই বা থাকবে না কেন?

আমি জানি না পাঁচশো কিংবা হাজার টাকায় কারোর সংসার চলে কিনা। কিন্তু কোনো পরিবারের ছেলে বা মেয়ে যদি সরকারি স্কুল কলেজে শিক্ষাগ্রহণ করে সরকারি স্কুলেই কাজ পায়, তাহলে সেই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও সম্মান বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি পাঁচশো টাকা দিয়েই খালাস। কী হবে চাকরি দিয়ে? তিনি ক্লাবগুলোকে টাকা দিচ্ছেন, রাজ্যের মানুষের প্রতিবাদ কিনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম্য অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীরা। কোনো স্কুলে ১৩০০ ছাত্র, আটজন শিক্ষক। কোনো স্কুলে ৯০০ জন ছাত্রের জন্যে তিনজন স্থায়ী শিক্ষক, কোথাও আবার গোটা স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক। শিক্ষক নেই, পরিকাঠামো নেই, স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আলিপুর দুয়ার থেকে নদীয়া সর্বত্র পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে সুষ্ঠু পঠনপাঠন চেয়ে। তবে রাজ্য সরকারের এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সে বিশ্বমানের মেলা প্রাঙ্গণ উদ্বোধনে ব্যস্ত। দুর্গাপুজোর একমাস আগে থেকে কী কী করা হবে, কবে শঙ্খ বাজানো হবে – সেই পরিকল্পনায় ব্যস্ত। বিরোধী দলগুলো টিভিতে বাইট দিতে মত্ত।

কেউ কেউ আবার বাংলা মাধ্যম ও বাংলা ভাষা নিয়ে খুবই আবেগপ্রবণ। বাংলাতেই মনপ্রাণ বেশি ডুবে থাকে। তর্কের আসর বসে বাংলা বনাম ইংরেজি-হিন্দির। কিন্তু বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো পুনরুদ্ধার করতে কেউ কিছু করে না। আমরা সবাই জানি, বুঝি আস্তে আস্তে শিক্ষা বেসরকারিকরণের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সকলে বেশ আছে কাবাব, তন্দুরে, সপ্তাহান্তের শখের ভ্রমণে। সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রায় চার লক্ষ শূন্য পদ আছে। ছ বছর হল কোনো পরীক্ষা হয় না, আট বছর ধরে একটা আপার প্রাইমারি নিয়োগ আটকে আছে। পাস করে মেধা তালিকায় নামও পাওয়া যায় না। তারপরেও ঘটা করে বইমেলা হয়, বছর বছর ভোট হয়। আদালতে দুর্নীতির মামলায় নাম জড়ানো নেতারা ভিকট্রি সাইন দেখিয়ে ছবি তোলেন। অধিকাংশ মানুষ সব দেখে, শুনে, বুঝেও ঢেঁকুর তুলে ঘুমোতে যান।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

শিক্ষক দিবসের প্রশ্ন: শিক্ষকদের বাঁচাবে কে?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.