গত বছর রবীন্দ্রনাথের মুক্তধারা নাটকের বয়স একশো পার হয়ে গিয়েছে। নাটকটি নানা কারণেই চর্চার যোগ্য এবং কিছু কিছু চর্চা হয়েছেও। আজকাল এই নাটকটি বোধহয় নতুন করে কেউ আর মঞ্চস্থ করেন না। অথচ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নাটকের গুরুত্ব বিপুল। মানুষের জীবন-জীবিকা হরণকারী একটি বাঁধের বিরুদ্ধে রাজবিদ্রোহই হল নাটকের প্রধান বিষয়। কিন্তু এর পাশাপাশি বৌদ্ধতত্ত্বের প্রয়োগ ও বিকাশের একটি দিকও নাটকটিতে রয়েছে। এই দিকটি নিয়ে কেউ বিশেষ চর্চা করেছেন কিনা তা আমার জানা নেই। রবীন্দ্রনাথের উপর বৌদ্ধতত্ত্বের প্রভাবের কথা আমরা জানি। তাঁর সাহিত্যের এক বড় অংশ গৌতম বুদ্ধ, সঙ্ঘ এবং বৌদ্ধদের উপর আধারিত। চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যে বুদ্ধশিষ্য আনন্দের সেই উক্তি তো অমর হয়ে থাকবে। সমাজের চোখে অশুচি এক চণ্ডালকন্যাকে আনন্দ বলছেন, ‘যে মানব আমি সেই মানব তুমি কন্যা।’ রবীন্দ্রনাথের বহু অমর সাহিত্যই বৌদ্ধ প্রভাবের উপর স্থাপিত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো রবীন্দ্রনাথই। তিনি শুধু বৌদ্ধতত্ত্বে প্রভাবিতই হননি, তাকে তাঁর সময়ে, সেই সময়ের রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছিলেন এবং বিকশিত করেছিলেন। মুক্তধারা নাটকে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। আমরা সেই দিকটিকে ধরেই মূলত আলোচনা করব এবং সেই সূত্রে প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ের রাজনীতিকরণের প্রসঙ্গটিও আসবে।

আমি প্রাথমিকভাবে এই নাটকের প্রতি আকৃষ্ট হই একটি গানের জন্যে। ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে/ আমার ভয়-ভাঙা এই নায়ে’ ইত্যাদি। বৌদ্ধতত্ত্বে মার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। দৈবিক বৌদ্ধ আলোচনায় মারকে দানব গোছের কিছু বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এই মারের দেখা বৌদ্ধতত্ত্বে প্রথম পাওয়া যায় গৌতমের বোধিপ্রাপ্তির ঠিক আগের মুহূর্তে। গৌতম যখন তাঁর দর্শন উপলব্ধির প্রায় নিকটবর্তী, একাগ্র চিত্তে ধ্যানে মগ্ন, তখন মারের আবির্ভাব ঘটে। কথিত আছে মার প্রথমেই গৌতমকে নৈরঞ্জনা নদীর তীরে যে জায়গাটিতে তিনি ধ্যান করছিলেন তা ছেড়ে চলে যেতে বলেন। কিন্তু গৌতম তা করতে অস্বীকার করেন। তখন ক্রুদ্ধ মার তার বিপুল বাহিনী নিয়ে গৌতমকে আক্রমণ করেন। এই বাহিনীতে কে নেই? মারের পঞ্চকন্যা, রাগ-দ্বেষ-অনুরাগ-হিংসা ইত্যাদি, এছাড়াও সংশয়, ভয়, চিন্তা, স্বার্থপরতা প্রভৃতি। কিন্তু গৌতমের কাছে সকলেই পরাজিত হয়। বোঝাই যাচ্ছে, সমস্তটাই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। একজন বিপ্লবী বা সংগ্রামী, প্রতিবাদী, নিদেন পক্ষে যে জন মনুষ্যত্বের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তার জীবনে বোধহয় সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই এটিই। এ লড়াই জিততে না পারলে কোনো লড়াই জেতা যায় না। সমসাময়িক রাজনীতির পরিভাষায় যদি মারের সঙ্গে সংগ্রামের তত্ত্বটিকে অনুবাদ করি তাহলে যা পাই তা হল, শাসকশ্রেণি শাসিতের ওপর রাজত্ব করে শুধু বলপ্রয়োগ দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়েও। বস্তুত, বলপ্রয়োগের জমিটিই তৈরি হয় শাসকশ্রেণির চিন্তাকে শাসিতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে, প্রতিষ্ঠা করে, চিন্তার আধিপত্য তৈরি করে। নইলে বলপ্রয়োগ করাই যেত না। মার বিপ্লবীর বা সংগ্রামী মানুষের মস্তিষ্কে শাসকশ্রেণির চিন্তার ব্যক্তিরূপ, যা দানবের চেহারায় ধরা দেয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুতরাং মারের বিরুদ্ধে জিততে পারা প্রতিটি বৌদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এছাড়া বৌদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। যেমন সম্ভব নয় একজন সংগ্রামী মানুষ হয়ে ওঠা। তাই মারের সঙ্গে লড়াই শেষ হয়েও হয় না। ফিরে ফিরে আসে একজন বৌদ্ধের জীবনে, সংগ্রামীর জীবনে। প্রকৃত সত্য হল, মারের সঙ্গে লড়াই প্রতিদিনের লড়াই, প্রায় প্রতি মুহূর্তের লড়াই। এ লড়াইয়ে যে হেরে যায় সে বহিরঙ্গে বৌদ্ধ বটে, সংগ্রামী বটে, কিন্তু মর্মবস্তুতে নয়।

বৌদ্ধ তত্ত্ববিশারদরা এ নিয়ে বহু চর্চা করেছেন। আমি রিস ডেভিসের একটি অসাধারণ কাব্যময় অনুবাদ শোনাই। গৌতমের অন্যতম ঘনিষ্ঠ শিষ্য সারিপুত্ত বিরচিত ‘নিদ্দেশ’ ভাষ্যের একটি কবিতা পালি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন ডেভিস এবং পালি বুক সোসাইটির সদস্যরা। কবিতাটি সোমাকে নিয়ে। সোমা ছিলেন রাজা বিম্বিসারের রাজপুরোহিতের কন্যা। বৌদ্ধ সঙ্ঘে যোগদানের পর তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন আচার্যের স্তরে উন্নীত হয়েছিলেন। একদিন তিনি যখন বনমধ্যে নির্জনে বসে ধ্যান করছিলেন তখন মারের সঙ্গে তাঁকে বোঝাপড়া করতে হয়। মার তাঁর সামনে এসে তাঁর উদ্দেশে বলেন, অর্হত্বপ্রাপ্তি নারীদের কম্ম নয়, যারা দুই আঙুলে ভাত টিপে না দেখলে বলতে পারে না তা সিদ্ধ হয়েছে কিনা।

The vantage ground the sages may attain, is hard to reach.
With her two-finger test, women cannot achieve those distant heights.

নারী বুদ্ধিবৃত্তিগতভাবে পুরুষের সমকক্ষ নয়, নিম্নশ্রেণির – একথা মনুরও অনেক আগে থেকে ভারতের ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় শাসকশ্রেণি প্রচার করে আসছে। মনু এই মতকে প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা দেন। মার যখন একথা সোমাকে শোনাচ্ছেন তখন তার উত্তরে সোমা বললেন, আমাদের মেয়েদের প্রকৃতি কীভাবে অর্হত্ব অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যাঁদের হৃদয় দৃঢ়, জ্ঞানের বিস্তারে অর্হত্বের পথে সত্যের শীতল উচ্চতায় পৌঁছনোর জন্য যখন চরণ অপ্রতিরোধ্য? প্রশান্তির ’পরে অপার প্রেমের প্রতিটি হস্তক্ষেপ যখন ফলদায়ী আর জ্ঞান ও বিনয় অবিদ্যার গাঢ় কুয়াশা ভেদ করতে সমর্থ? এগুলো বোঝো আর নিজেকে বোঝো, হে মৃত্যু! আর এখান থেকে সরে পড়ো!

How should our women’s nature hinder us
Whose hearts are firmly set, whose feet mount up
Unfaltering to those cool heights of Truth,
In growing knowledge of the Arhat way?
On every hand the love of pleasure yields,
Borne down by knowledge and the sense of Law,
And the thick gloom of ignorance is rent
In twain. Know this, O Evil One! and know
Thyself, O death! found out and worsted!

এভাবেই বৌদ্ধ সাহিত্যে বারবার মারের সঙ্গে লড়াইয়ের আখ্যান ফিরে ফিরে আসে নতুনভাবে প্রতিটি বৌদ্ধের জীবনে, সংগ্রামে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালের সংগ্রামী চেতনায় মারকে ফিরিয়ে আনলেন বৌদ্ধ আন্দোলন ও সাহিত্যের ধারাবাহিকতায়। রবীন্দ্রনাথের বহু লেখায় নাম না করে মারের সঙ্গে সংগ্রামের দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। মারের নাম আলাদা করে করতে হয়নি, কারণ রবীন্দ্রনাথ এত দৃঢ়ভাবে এই বৌদ্ধতত্ত্বে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, যে আসল লড়াই নিজের ভিতরে থাকা শাসকশ্রেণির চিন্তার বিরুদ্ধে। মাও সে তুং যেভাবে বলেছিলেন একবার – বাইরে বেরোলে আমাদের মুখে ধুলো জমে, বাড়ি ফিরে সবাই তা ধুয়ে ফেলতে ব্যস্ত হয়। কিন্তু আমাদের চিন্তায় যে শাসকশ্রেণির চিন্তার ধুলো জমে তা কি আমরা নিয়মিত সাফ করি? প্রথাগত মার্কসবাদীরা যখন লড়াইয়ের এই প্রধান ক্ষেত্রটিকে অবহেলা করে বহিরঙ্গে কমিউনিস্ট হয়ে ওঠার সাধনায় ব্রতী হয়েছেন, তখন রবীন্দ্রদর্শনেই আমরা এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সফল ধারাবাহিকতা দেখতে পাই। মুক্তধারা নাটকটি একদিকে রাজদ্রোহ এবং অন্যদিকে শাসকশ্রেণির রাজনীতির অন্য একটি দিক – প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করা, এবং তার বিরুদ্ধে জনতার সংগ্রামের পৃষ্ঠভূমিতে লেখা একটি আখ্যান।

আরো পড়ুন চর্চার অভাবের সুযোগে রবীন্দ্রনাথ আরএসএস হেফাজতে

মুক্তধারা নাটকে এক রাজা আছে। তার অধীন দুটি গ্রামের কথা আছে – উত্তরকূট আর শিবতরাই। গ্রামদুটির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব আছে, আছে এক যন্ত্রী। নাম তার বিভূতি। মুক্তধারা নামের এক প্রবল ঝরনাকে সে বিরাট এক যন্ত্র তৈরি করে বাঁধ দিয়ে বেঁধেছে। ফলে পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে শিবতরাইয়ে, কিন্তু এর ফলে লাভ হচ্ছে উত্তরকূটের। তাই উত্তরকূটের কামারের ছেলে বিভূতিকে নিয়ে উত্তরকূটের মানুষের উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। অন্যদিকে রাজার কাছে বিভূতি উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। ফলে রাজামশাই তাকে কৌলিন্য প্রদান করে একেবারে রাজ অমাত্য করে ফেলেছেন। ‘বৈশ্যের ছেলেকে’ এভাবে একেবারে ‘ক্ষত্রিয় বানিয়ে তোলা’-য় উত্তরকূটের জনসমাজের আভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনও আছে, কিন্তু সেখানকার লোকেরা তা নিজেদের মধ্যেই রাখতে চায়, বাইরে আনতে চায় না।

উত্তরকূটের গ্রামে আছে এক জাগ্রত দেবতার মন্দির – ভৈরব, অর্থাৎ শিব। ঘটনার দিন অমাবস্যা, ভৈরবমন্দির প্রাঙ্গণে সেদিন আরতি হবে। রাজা রণজিৎ সেখানে চলেছেন, বিভূতির যন্ত্রকীর্তিকে পুরস্কৃত করা হবে। উত্তরকূটের সমস্ত লোক উৎসব করতে যাচ্ছে মন্দিরে। এদিকে শিবতরাইয়ের মানুষের মনে উৎকণ্ঠা। তাঁদের দুর্দিন সমাগত। তারাও ভৈরবের কাছে বিধান চায়। রাজার কাছে যখন বিধান মেলে না তখন তো অন্য পথ ধরতেই হয়। সে পথের খোঁজ তো সাধারণ মানুষের সচরাচর জানা থাকে না। সুতরাং পথের খোঁজ চলে। ভৈরব ভাঙনের দেবতা, প্রলয়ের দেবতা। সারা জীবন ভাঙনের জয়গান গাওয়া কবির কলমে তাই নাটকে বারবার ফিরে আসে ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীদলের গান

জয় ভৈরব, জয় শংকর,
জয় জয় জয় প্রলংকর,
শংকর শংকর।

ভাঙন কিন্তু সত্যিই আসে। প্রলয় আসে। কারণ মহা শক্তিশালীরও ভেদ্য গোড়ালি থাকে, যন্ত্রেরও ছিদ্র থাকে। অমিত শক্তিশালী রাজশক্তিরও দুর্বলতা থাকে। অথচ…

বিভূতি। যন্ত্রের জোরে দেবতার পদ নিজেই নেব এই কথা প্রমাণ করবার ভার আমার উপর। যুবরাজকে বোলো আমার এই বাঁধযন্ত্রের মুঠো একটুও আলগা করতে পারা যায় এমন পথ খোলা রাখি নি।
দূত। ভাঙনের যিনি দেবতা তিনি সব সময় বড়ো পথ দিয়ে চলাচল করেন না। তাঁর জন্যে যে-সব ছিদ্রপথ থাকে সে কারও চোখে পড়ে না।
বিভূতি। (চমকিয়া) ছিদ্র? সে আবার কী? ছিদ্রের কথা তুমি কী জান?
দূত। আমি কি জানি? যাঁর জানবার দরকার তিনি জেনে নেবেন।

উত্তরকূটের যুবরাজ কিন্তু মুক্তধারাকে এভাবে বাঁধ দিয়ে বাঁধা সমর্থন করেননি। তিনি চেষ্টা করেছেন রণজিৎ যাতে এই কাজ থেকে নিবৃত্ত হন। কিন্তু রাজা তাতে কান দেননি, ফলে দ্বন্দ্ব পেকে উঠেছে। হতে পারে তিনি উত্তরকূটের যুবরাজ, কিন্তু শিবতরাইয়ের মানুষও তো তাঁরই। তারা পানের জল পাবে না, চাষের জল পাবে না, এ কেমন করে হতে পারে? বিশেষত, যন্ত্রের এই আস্ফালন যেখানে শুধু যন্ত্রেরই জয়গান গাইবার জন্যে, মানুষের মঙ্গলের জন্যে নয়।

দূত। সেই খেত শুকিয়ে মারাই কি তোমার বাঁধ বাঁধার উদ্দেশ্য ছিল না?
বিভূতি। বালি-পাথর-জলের ষড়যন্ত্র ভেদ করে মানুষের বুদ্ধি হবে জয়ী এই ছিল উদ্দেশ্য। কোন্‌ চাষির কোন্‌ ভুট্টার খেত মারা যাবে সে-কথা ভাববার সময় ছিল না।

যা স্বাভাবিক ছিল তাই হল, যুবরাজ বন্দি হলেন। তাঁর বন্দি হওয়ার সংবাদ শিবতরাইয়ের প্রজাদের ক্ষুব্ধ ও উদ্বেল করে তুলল। শিবতরাই থেকে অনেক যুবককে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাঁধের কাজের জন্য। কিন্তু বাঁধের পর বাঁধ ভেঙেছে, জলের তোড়ে আর মাটি চাপা পড়ে বহু ছেলে হারিয়ে গেছে বিভূতির চরম সাফল্যের বিনিময়ে। আজও সন্তানহারা মা রাস্তায় রাস্তায় ছেলেকে খুঁজে ফেরে। শিবতরাইয়ের মানুষের ঘামে, শ্রমে, জীবনের বিনিময়ে হয়েছে এমন উন্নয়ন, তৈরি হয়েছে এমন এক সভ্যতা যা আজ তাদেরই চাষের, পানের জল কেড়ে নিতে উদ্যত। তারই প্রতিবাদ করে কিনা যুবরাজ যাবে জেলে! শিবতরাই থেকে প্রজারা দলে দলে রাজার কাছে দরবার করতে আসতে লাগল। তারা গুরু বলে মেনে চলত এক বৈরাগীকে, নাম তাঁর ধনঞ্জয়। এই ধনঞ্জয়ের সঙ্গে শিবতরাইয়ের গ্রামবাসীদের কথোপকথনকালেই আমরা ধনঞ্জয়ের গলায় শুনি, ‘আমি মারের সাগর পাড়ি দেব বিষম ঝড়ের বায়ে/ আমার ভয়-ভাঙা এই নায়ে।’

এখানে ‘মার’ কথাটি দ্ব্যর্থবোধক। একটি সংকীর্ণ অর্থে, অন্যটি বৃহৎ অর্থে। সংকীর্ণ অর্থে মার বলতে শারীরিক অত্যাচার, রাষ্ট্রশক্তির আক্রমণ বোঝাচ্ছে। গৌতম বুদ্ধের সময়কার বৌদ্ধতত্ত্বে আমরা মারকে কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির শারীরিক আক্রমণ বা অত্যাচার অর্থে প্রযুক্ত হতে দেখিনি। সেখানে প্রচলিত জীবনের প্রতি, সমাজে প্রাধান্যকারী চিন্তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ বা মোহ অর্থেই আমরা মারকে বুঝেছিলাম। গৌতমের সময়ে রাজশক্তি ছিল শ্রামাণ্যপন্থার পক্ষে অনুকূল। ব্রাহ্মণ-শ্রমণ দ্বন্দ্বে কৌলিন্যহীন পরিবার থেকে উঠে আসা রাজা বিম্বিসার গৌতমের আগে থেকেই শ্রমণদের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সময়কার পরিস্থিতি তা নয়। দেশ ব্রিটিশদের পদানত এবং বিংশ শতকের শুরু থেকেই ভারতে স্বাধীনতার লড়াই ক্রমে ক্রমে বেড়ে ওঠার প্রতিটি পর্যায়ে তীব্রভাবে দমনপীড়নের শিকার। ১৩২৮ সালের পৌষ সংক্রান্তির সময়ে মুক্তধারা লেখা হয়েছে। ইংরিজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী সময়টা ১৯২২ সালের শুরুর দিক। দেশে তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে। এর আগে ১৯১৯ সালে ঘটে গেছে কুখ্যাত জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড। তার প্রতিবাদে সেবছরই রবীন্দ্রনাথ ১৯১৫ সালে পাওয়া নাইটহুড ত্যাগ করেছেন। সব মিলিয়ে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়। মুক্তধারা নাটকটি ১৩২৯ বঙ্গাব্দের বৈশাখে প্রথমে প্রবাসী পত্রিকায় এবং অনতিবিলম্বে বই আকারে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ১৯২২ সালের এপ্রিল-মে মাসে। কিন্তু তার আগেই শান্তিনিকেতনে নাটকটি বোধহয় প্রথম অভিনয় করার কথা ছিল বসন্তোৎসব উপলক্ষে। কিন্তু ইতিমধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ঘটে গেছে চৌরিচৌরার ঘটনা, অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহৃত হয়েছে। ১০ মার্চ মহাত্মা গান্ধীর গ্রেপ্তারের খবর শান্তিনিকেতনে পৌঁছনো মাত্র নাটক বন্ধ হয়ে যায়।

এই আবহে রবীন্দ্রনাথ মারকে শুধুমাত্র আড়াই হাজার বছর আগেকার চরিত্রায়নে ধরে রাখলেন না। তাকে নিজের সময়ে প্রয়োগ করলেন, যদিও ব্যাপকার্থে তার মর্মবস্তু ধরে রাখলেন। এখানেই রবীন্দ্রনাথের বিশিষ্টতা, তাঁর দার্শনিক-রাজনৈতিক সৃষ্টিশীলতা। তত্ত্ব মুখস্থ করা আমাদের কমিউনিস্ট নেতারা যদি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কণামাত্র শিক্ষাও গ্রহণ করতেন, তবে বোধহয় ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের আজ এই চেহারা হত না।

ধনঞ্জয়ের সঙ্গে শিবতরাইয়ের দুজন গ্রামবাসীর কথোপকথন দেখুন

ধনঞ্জয়। একেবারে মুখ চুন যে! কেন রে, কি হয়েছে?
১। প্রভু, রাজশ্যালক চণ্ডপালের মার তো সহ্য হয় না। সে আমাদের যুবরাজকেই মানে না, সেইটেতেই আরো অসহ্য হয়।
ধনঞ্জয়। ওরে, আজও মারকে জিততে পারলি নে? আজও লাগে?
২। রাজার দেউড়িতে ধরে নিয়ে মার! বড়ো অপমান!

মার এখানে রাজশক্তির একেবারে শারীরিক মার। কিন্তু মারকে অস্বীকার করার মধ্যে শাসককে অস্বীকার করার প্রতিজ্ঞা। শাসক শুধু মেরেই শাসন করে না, মারার ভয় দেখিয়েও শাসন করে। এই ভয়ের কাছে যে বশীভূত হয়, মার যার লাগে, সে শাসকের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। আইনের ভয়, গ্রেফতারের ভয়, জেলখানার ভয়, হত্যার ভয় – এইসব ভয়ই তো শাসকের সম্বল। যেভাবে গৌতম আর তাঁর শিষ্যরা প্রচলিত জীবনের প্রতি মোহকে, অনিশ্চিত সংগ্রামে ঝাঁপানোর দ্বিধাকে, জয়-পরাজয়ের সংশয়কে, সঙ্ঘজীবনে প্রবেশের কাঠিন্যকে – সব মিলিয়ে এক ভয়কে, মার যার চরিত্রায়ন – ফুৎকারে অস্বীকার করেছেন, একইসঙ্গে সেই ব্যাপক অর্থেও রবীন্দ্রনাথ মারকে প্রয়োগ করেছেন।

দেখ বাবা, আমি মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে বোঝা-পড়া করতে চলেছি। বলতে চাই, ‘মার আমায় বাজে কি না তুমি নিজে বাজিয়ে নাও।’ যে ডরে কিংবা ডর দেখায় তার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে এগোতে পারব না।

এবার যা করবার তা সারো, সারো—
আমিই হারি, কিংবা তুমিই হার।
হাটে ঘাটে বাটে করি খেলা
কেবল হেসে খেলে গেছে বেলা—
দেখি কেমনে কাঁদাতে পার।

সকলে। শাবাশ, ঠাকুর, তাই সই
                            – দেখি কেমনে কাঁদাতে পার।

সুতরাং শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই একইসঙ্গে শারীরিক এবং মনস্তাত্ত্বিক। গৌতমের সময়ে যা ছিল মূলত দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক, তাকে সমসাময়িক রাজনীতিতে শারীরিক-মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে প্রয়োগ করে রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধতত্ত্বের মারবিরোধী সংগ্রামের এক বিকশিত রূপের জন্ম দিলেন।

মুক্তধারা নাটকের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল শাসকের হাত থেকে প্রকৃতি ও বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষার সংগ্রাম এবং মানুষের জীবন ও জীবিকার সংগ্রামের আন্তঃসম্পর্ককে অনুধাবন করা; ফলত প্রকৃতি রক্ষার সংগ্রামকে রাষ্ট্রবিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামের স্তরে উন্নীত করা। তা করা হয়েছে আজ থেকে একশো বছর আগেই। মানবসভ্যতার এগিয়ে চলার অর্থ কী? সঠিক উন্নয়ন ভাবনাই বা কী? এই সমস্ত প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথকে ভাবিয়েছে এবং তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়েও এই প্রশ্নগুলির রাজনৈতিক চরিত্র অনুধাবন করতে তাঁর ভুল হয়নি। একদিকে প্রকৃতিকে জয় করা এবং তাকে মানুষের দাসে পরিণত করতে চাওয়ার মধ্যে যে ঔদ্ধত্য আছে, আমাদের দেশের আধুনিক ইতিহাসে বোধহয় একমাত্র রবীন্দ্রনাথই তাকে প্রকৃত প্রস্তাবে শাসকের ঔদ্ধত্য বলে চিনে নিতে পেরেছিলেন। প্রকৃতির উপর যথেচ্ছ ছড়ি ঘোরানোর মধ্যে বিজয়ের যে বিকৃত আনন্দ আছে তা যে শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সব মানুষের নয়, তা বুঝতে রবীন্দ্রনাথের অসুবিধা হয়নি। সুতরাং এই নাটকে পাশাপাশি চলছে প্রকৃতি শাসনকারী এবং চাষের জল তথা পিপাসার জল হরণকারী দৈত্যাকৃতি যন্ত্রকে সর্বশক্তি দিয়ে রক্ষা করার রাজদর্প, আর সেই যন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দিয়ে বাঁধ ভাঙার বিদ্রোহী উচ্ছ্বাস।

বিভূতি। ও কী শুনি? ও কিসের শব্দ?
ধনঞ্জয়। অন্ধকারের বুকের ভিতর খিল্ খিল্ করে হেসে উঠল যে।
বিভূতি। আঃ থামো-না, শব্দটা কোন্‌ দিকে বলো তো।
নেপথ্যে। জয় হোক, ভৈরব।
বিভূতি। এ তো স্পষ্টই জলস্রোতের শব্দ!
ধনঞ্জয়। নাচ-আরম্ভের প্রথম ডমরুধ্বনি।
বিভূতি। শব্দ বেড়ে উঠছে যে, বেড়ে উঠছে।
কঙ্কর। এ যেন—
নরসিং। বোধ হচ্ছে যেন—
বিভূতি। হাঁ, হাঁ, সন্দেহ নেই। মুক্তধারা ছুটেছে। বাঁধ কে ভাঙলে? কে ভাঙলে? তার নিস্তার নেই।

[কঙ্কর নরসিং ও বিভূতির দ্রুত প্রস্থান

রণজিৎ। মন্ত্রী, এ কী কাণ্ড?
ধনঞ্জয়। বাঁধ-ভাঙার উৎসবে ডাক পড়েছে।

বন্দিশিবিরে ধরে রাখা যায়নি যুবরাজ অভিজিৎকে। বন্দিশিবির সংলগ্ন পাকশালায় ধরে গেল আগুন। আগুনের লেলিহান শিখা বাঁধ ভাঙার মহোৎসবকে বিজয়ে পরিণত করল। আগুনের সুযোগে বন্দিদের মুক্ত করল রাজপ্রহরী উদ্ধব। বিদ্রোহের আগুন যখন লাগে, তখন তা রাজ অলিন্দেও ছড়ায়। অভিজিৎ জানতেন বাঁধের দুর্বল গ্রন্থির সন্ধান। বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে গিয়ে তিনি রাতের আঁধারের সুযোগে হাজির হলেন সেই দুর্বল জায়গায়, তারপরে সজোরে আঘাত করে দুর্বল গ্রন্থি ভেঙে ফেলতে সময় লাগল না। মুহূর্তে মুক্তধারার তীব্র জলপ্রবাহ তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আত্মাহুতি দিয়ে তিনি বিদ্রোহকে সফল করলেন। অভিজিতের মুক্তিদাতা হিসাবে পাঠকের চৈতন্যে ধরা দেয় আগুন, যা কিনা প্রকৃতির এক প্রলয়রূপ। প্রকৃতিকে ধ্বংসের জন্যে রাজ অহঙ্কারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্যে তো সর্বদাই এগিয়ে আসে প্রকৃতি নিজেই। আমাদের মনে পড়তে পারে, মার যখন গৌতমকে শেষ আক্রমণ করছেন, তাঁকে তাঁর আসন ত্যাগ করতে বলছেন, বলছেন এই স্থানে তোমার কোনো অধিকার নেই, তখন গৌতম সেই ভূমিকে, সেই মহাপ্রকৃতিকেই সাক্ষী হিসাবে আমন্ত্রণ জানালেন। সেইসময় গৌতমের যোগমুদ্রাকে তাই বলা হয় ভূমিস্পর্শ মুদ্রা। দক্ষিণ হাত কোলে কিন্তু বাম হাতের মধ্যমা ভূমি স্পর্শ করে থাকে সে মুদ্রায়। মারের বাহিনীর নির্ধারক পরাজয় হয়েছিল গৌতমের সমর্থনে পৃথিবী এগিয়ে আসায়। আর ধনঞ্জয়ের মুখে আমরা শুনি আগুনেরই জয়গান –

আগুন, আমার ভাই,
              আমি তোমারি জয় গাই।
তোমার       শিকল-ভাঙা এমন রাঙা
                    মূর্তি দেখি নাই।
                    দু-হাত তুলে আকাশ পানে
                    মেতেছ আজ কিসের গানে?
এ কী      আনন্দময় নৃত্য অভয়;     
                    বলিহারি যাই।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.