সায়ালি পারাটে

ছবি সিরসাম (৩২) যখন তাঁর বিয়ের পরে একটা অনুষ্ঠানের জন্য হন্যে হয়ে শাল কাঠ খুঁজছিলেন, তখন মনে করেছিলেন যে খুঁজে পাওয়া কঠিন হচ্ছে কারণ উনি ভোপালের মত একটা শহরে চলে গিয়েছিলেন। গোন্ড উপজাতির মানুষ ছবি বললেন ‘আমাদের সমাজে ওই কাঠের আলাদা গুরুত্ব আছে। কিন্তু শহরে ও জিনিস পাওয়া খুব শক্ত।’ মধ্যপ্রদেশের পনধুর্না জেলায় তাঁর গ্রাম পেনধোনি। সেখানে শাল কাঠ সহজেই পাওয়া যায়। ছবি বললেন ‘বিশেষ করে বিয়েসাদিতে শাল কাঠ খুব দরকার। আমাদের মধ্যে ওসব অনুষ্ঠান শাল ছাড়া হয় না।’ কিন্তু সিরসাম যে ভাবছিলেন শহরে আছেন বলেই শালগাছের সন্ধান পাচ্ছেন না, সে ধারণা ভুল।

মধ্যপ্রদেশ জুড়ে গ্রামগুলো থেকে শালগাছ উধাও হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধি, আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যাওয়া আর পোকামাকড় বেড়ে যাওয়ার কারণে এ ঘটনা ঘটছে। সুন্দিয়া বাঈ ধুরভে (৬০) জানালেন হরদা জেলার ঝাল্লার গ্রামে মাত্র একখানা শালগাছ পড়ে আছে। সুন্দিয়া বাঈ নিজের উঠোন থেকে ঘুঁটে তুলছিলেন যখন তাঁর বউমা জিজ্ঞেস করলেন ‘আম্মা, শাল কাঠ ছাড়া কি বিয়ে হবে?’ সুন্দিয়া উত্তরে বললেন ‘কেমন করে হবে? শাল কাঠ থাকতেই হবে। ওটা ছাড়া বিয়ে হতে পারে না। গোন্ডদের বিয়েতে প্রথমে মানুষ শালগাছের কাছে যায়, গাছটার পুজো করে আর তার একটা ডাল কেটে বাড়ি নিয়ে আসে। সেটাকে বিয়ের মণ্ডপের মাঝখানে রাখা হয়।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সুন্দিয়া বাঈয়ের নিজের বয়স ঠিক মনে নেই। কিন্তু তাঁর মত ভালো করে গোন্ড বিয়ের আচার অনুষ্ঠান কেউ জানে না। তিনি এই প্রতিবেদককে বললেন ‘আগে এত শালগাছ ছিল আমাদের এখানে যে গুনে শেষ করা যেত না। এখন মোটে একটা পড়ে আছে।’ তবে সুন্দিয়া জানেন না এত গাছ কী করে উধাও হয়ে গেল। তিনি বললেন ‘হয়ত আমরা বড্ড বেশি গাছ কেটেছি।’

অরণ্যের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ

রিপোর্ট বলছে, মধ্যপ্রদেশে ডিন্ডোরি আর অমরকন্টকের মত অঞ্চলে শাল হার্টউড বোরার নামে একরকমের কীটের আক্রমণে হাজার হাজার শালগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ৩০%-৩৫% শালগাছ ক্ষতিগ্রস্ত। বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বলছে তাপমাত্রা, তুলনামূলক আর্দ্রতা আর বৃষ্টিপাতের মত জলবায়ু সংক্রান্ত কারণে এই কীট ছড়িয়ে পড়ছে। উচ্চ তাপমাত্রায় এই কীটের সক্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাটির আর্দ্রতা কমে গিয়ে গাছ আরও দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে তার বিপদ বাড়ে। হরদা জেলা সাতপুরা রেঞ্জ আর নর্মদা উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে। এই অঞ্চল সেগুন কাঠের জন্য বিখ্যাত। শাল বরাবরই এখানে তুলনায় বিরল ছিল। শালগাছ বরং পূর্ব মধ্যপ্রদেশে প্রচুর, অর্থাৎ রেওয়া, উমরিয়া, অনুপ্পুর, বালঘাট, মণ্ডলা, ডিন্ডোরি আর জব্বলপুরে। এই এলাকা ওই রাজ্যের মোট অরণ্যাঞ্চলের চার শতাংশের বেশি।

আচার অনুষ্ঠানে অসুবিধা

সুন্দিয়া বাঈ বললেন তিনি ছোটবেলা থেকে যত বিয়েতে উপস্থিত থেকেছেন সবেতে শাল কাঠ ছিল ‘ওটা আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনের, আচার অনুষ্ঠানের অঙ্গ। এখন মোটে একটা গাছ পড়ে আছে।’ উনি প্রতিদিন ওই গাছটার কাছে যান। বললেন ‘যদি এই শেষ গাছটা মরে যায়, তাহলে আমাদের জঙ্গলের গভীরে যেতে হবে বিয়ের জন্যে শাল কাঠ আনতে।’

একটা গোন্ড বিয়েতে সাধারণত ৪-৫ ফুট লম্বা শালগাছের ডাল দরকার হয়। সুন্দিয়া বাঈ মনে করছেন, শিগগির একটা ছোট ডাল দিয়েই কাজ চালাতে বাধ্য হবেন ওঁরা।

হরদার গুথানিয়া গ্রামে গোন্ড বিয়ে পরিচালনা করেন যে ভুমকারা, তাঁদেরই একজন রামবিকাশ ইরপাচে (৪০)। তিনি বললেন ‘যখন একটা মণ্ডপ তৈরি হয় তাতে সবচেয়ে জরুরি কাঠ হল শাল। সেটাকে ঠিক মাঝখানে রাখতে হয়।’ আগে পুরো মণ্ডপটাই তৈরি হত শালকাঠ দিয়ে। ‘এখন শাল কাঠ পাওয়া খুব শক্ত হয়ে গেছে। মইনি বা মহুয়া ব্যবহার করা হয়, কিন্তু শালগাছের একটা ছোট ডাল অন্তত আনতেই হবে…নিদেনপক্ষে ঠেকনা দেওয়ার জন্যে।’

জাদকাহু গ্রামের সরপঞ্চ বিনোদ কদম (৩০) বললেন যে তাঁদের এলাকার একমাত্র শালগাছটা বসতি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। তিনি বললেন ‘বিয়ের জন্যে তো বটেই, পুজোআচ্চার জন্যেও এই গাছটা দরকারি।’ কারণ শালগাছের ছাল পুড়িয়ে নানা ধরনের পুজোয় কর্পূরের মত করে ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে জলবসন্ত হলে আরতিও পড়ে। বিনোদের কথা অনুযায়ী ‘২০০০ সালের পর থেকে এই গাছের সংখ্যা খুব কমে গেছে। আমরা চেষ্টা করি শালগাছ পুঁততে, কিন্তু এর বীজ আর চারা পাওয়া যায় না।’ বিনোদ আরও বললেন যে ঝড়ের ফলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ‘আগে এত ঘনঘন ঝড় হত না। গত পাঁচ বছরে ঝড় অনেক বেড়ে গেছে। শালগাছ দুর্বল আর বাঁকানো যায়। তাই সহজেই ভেঙে যায়।’

সমীক্ষায় দেখা গেছে যে শালগাছের নিচের মাটির আর্দ্রতা জঙ্গলের বেশি স্বাস্থ্যবান এলাকাগুলোর চেয়ে কম, ফলে ঝড়ের পরে আবার উঠে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ফুল ধরার চক্রও বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং বীজের গুণমানের অবনতি হয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হলে চারাগুলো ভালো করে শিকড় ছড়ানোর আগেই শুকিয়ে যায়।

আরো পড়ুন বিপন্ন হিমালয়, বিপন্ন ভারতবর্ষ

ওয়াইল্ড রুটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা শিরীষ কুমার চৌরিয়া বললেন তাপমাত্রা হঠাৎ হঠাৎ বদলালে গাছ আর বীজ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ‘নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে অভ্যস্ত প্রজাতির গাছ চরম গরম বা ঠান্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না।’ এই কারণেই এই প্রজাতির গাছগুলো মধ্যভারতে বিপুল পরিমাণে জন্মাত, কারণ ওখানে জলবায়ু তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যযুক্ত।

তাপমাত্রা হঠাৎ বেড়ে গেলে ফুল ধরার চক্র বদলে যায় এবং বীজের গুণমান পড়ে যায়, ফলে অঙ্কুরোদ্গমের উপর প্রভাব পড়ে। বৃষ্টিপাতের পর আবার দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া এবং প্রচণ্ড গরম মিলে প্রায়ই ছোট গাছকে মেরে ফেলে। এমনকি পরিণত গাছেরও ক্ষতি হয়, নতুন পাতা অস্বাভাবিক গরমের গ্রীষ্মে পুড়ে যায়। আবার অন্যদিকে, খুব কম বৃষ্টিপাত খরার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। পাশাপাশি বেশি বৃষ্টিপাত হলে জল জমে যায় এবং মাটির আর্দ্রতা বেড়ে যায়। তাতে আবার ছত্রাকের সংক্রমণ এবং গাছের অন্যান্য রোগ দেখা দেয়। এতরকম চাপের সম্মিলিত ফল হিসাবে গাছের আয়ু ক্রমশ কমে যায়, যা জীববৈচিত্র্য আর বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি বিপদ।

উপরি ক্ষতি

গোন্ড আর কোরকু সমাজের জন্যে শালগাছের অবলুপ্তি অবশ্য কেবল বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি নয়। এর ফলে তাঁদের বিয়ের যেসব আচার অনুষ্ঠান, যার মাধ্যমে পরিবারগুলো নিজেদের আনন্দ ভাগ করে নেয় এবং ঐতিহ্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে যায়, সেগুলোকে বিপন্ন করছে।

শোভা সালামে (৬৪) ব্যাখ্যা করলেন যে শালগাছের চারা বাড়িতে পোঁতা হয় কারও বিয়ের পর। তাঁর কথায় ‘ওই গাছ শিকড় গেড়ে ফেললে তবে বিয়ে সম্পূর্ণ হল বলে ধরা যায়।’

গোন্ড বিয়েতে কনে প্রথমে শালগাছকে শ্রদ্ধা জানায়। গাছের একটা শাখা বাড়িতে আনা হয় এবং মণ্ডপের মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হয়। লোককথা অনুযায়ী, শাল হল দেবত্বের চিহ্ন এবং উৎসবের সূচনার প্রতীক। রামবিকাশ হরদা জেলায় বিয়ে পরিচালনা করেন। তিনি বললেন যেদিন মণ্ডপ তৈরি হয় সেদিনই মাঝখানে শাল কাঠ পুঁতে দেওয়া হয়। ‘ওই মণ্ডপেই বর কনে বসে এবং বিয়ের পাক ঘোরে।’ অর্ধেক পাক ঘোরা হয় বরের বাড়িতে আর অর্ধেক কনের বাড়িতে। আচার অনুষ্ঠান মিটে গেলে ওই ডালই তুলে বাড়ির উঠোনে পুঁতে দেওয়া হয়।

গুথানিয়া গ্রামের কোরকু সমাজের রামনারায়ণ কাজলে (৪০) বললেন, গোন্ড আর কোরকু পরিবারের আচার প্রায় একই। ‘বিয়ের সময়ে প্রথমে পরিবারের বাইরের দুজন লোক শালগাছের পুজো করে। তারপর সেটা থেকে কাটা হয়। কেটে যখন বাড়ি নিয়ে আসা হয়, তখন মণ্ডপের মাঝখানে পোঁতার আগে আবার পুজো করা হয়।’

বিয়ের আগের কয়েকদিন মহিলারা ওই শালকে ঘিরে নাচগান করেন, তার গায়ে হলুদ লাগান। ওটা প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এক প্রতীকী সূচনা। মনে করা হয়, গাছটা যত দ্রুত বাড়বে এবং যত স্বাস্থ্যবান হবে, পরিবারও তত দ্রুত বাড়বে এবং সুখে থাকবে। গাছটা ততদিন উঠোনে থাকে যতদিন না পরিবার সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে করা হয় এবং সন্তান জন্মায়, জীবনে স্থিরতা আসে।

জঙ্গল এবং গ্রাম থেকে শালগাছ ক্রমশ উধাও হয়ে যাচ্ছে। বয়স্করা বলছেন, বিয়ে থা হয়ত চলতে থাকবে, কিন্তু শালগাছকে ঘিরে যেসব আচার অনুষ্ঠান গড়ে উঠেছিল ধীরে ধীরে, সেগুলো চালিয়ে যাওয়া ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.