অর্ক মুখার্জি

নতুন সরকার স্কুলশিক্ষকদের ‘প্রাইভেট টিউশন’ করা বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষায় বহুকাল ধরে লেখাপড়ার সহায়ক হিসাবে গৃহশিক্ষকতা বা প্রাইভেট টিউশন অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাবে, এই প্রাইভেট টিউশন ব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা জড়িয়ে আছেন এবং বহুদিন ধরে বহু ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষা বৈতরণী পার করিয়ে বিস্তর নাম করেছেন। অথচ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই শিক্ষক শিক্ষিকাদের টিউশন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাম আমলে ২০০৫ সালে এই নিয়ে সরকারের তরফ থেকে যে মেমো জারি করা হয়েছিল (Memo No S/18 dated 14.01.2005), তাতে স্পষ্টভাবে বলা ছিল

No teacher shall engage himself in any sort of private tuition for personal gain within or outside premises and working hours of the institution, excepting participation in a coaching or special camp organized by the institution for further development of students for scholastic and co-scholastic activities.

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অর্থাৎ কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে স্কুলের ভিতরে বা বাইরে, কাজের সময়ের মধ্যে বা বাইরে কোনোরকম গৃহশিক্ষতায় যুক্ত থাকতে পারবেন না। ব্যতিক্রম হল স্কুল আয়োজিত বিশেষ কোচিং বা প্রশিক্ষণ শিবির।

বাম আমলে এই নিয়ম চালু হলেও কড়াভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। প্রথম কদিন সরকারি স্কুলের মাস্টাররা প্রাইভেট টিউশন বন্ধ রাখলেও, পরে আবার যে কে সেই। ২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনের ২৮ নাম্বার ধারা বলবৎ হয় । সেখানেও বলা হয়েছে

No teacher shall engage himself of herself in private tuition or private teaching activity.

পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার Memo No. 189-SE (LAW)1A-01/09 dated 14.02.2011 এবং GO No. 214–SE/S/10M-01/08 dated 08.03.2018 জারি করে এই আইনি অবস্থান ফের পরিষ্কার করে।

নিন্দুকদের মতে, বাম আমলে নিয়ম চালু করা হলেও বাম শিক্ষক সংগঠনের প্রভাবেই এ ব্যাপারে কড়া হওয়া যায়নি। সেইসময় অনেক বাম শিক্ষক সংগঠনের সদস্য বুক ফুলিয়ে টিউশন করে গেছেন নিয়মের তোয়াক্কা না করে। তবে বাম আমলে স্কুলশিক্ষার মান তৃণমূল আমলের চেয়ে অনেক উন্নত ছিল এবং শিক্ষাব্যবস্থা স্কুলকেন্দ্রিকই ছিল। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে স্কুলশিক্ষা। স্কুলগুলোতে পড়াশোনার মানের ক্রমাগত অবনতি হয়েছে নানা কারণে। এর পিছনে সুনির্দিষ্ট পরিচালনার অভাব, পরিকাঠামোর অভাব, পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব, অপরিকল্পিত দীর্ঘ ছুটি, নিয়মিত সামঞ্জস্যপূর্ণ পঠনপাঠনের অভাব কাজ করেছে। এই ধারাবাহিক অবহেলার ফলে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে এবং স্কুলের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার অভিমুখ দ্রুত বদলাতে শুরু করে। স্কুলের পড়াশোনা তৃণমূল সরকারের এই ফাউলে লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে যায় এবং স্রেফ স্কুলের পঠনপাঠনের উপর নির্ভর করে লেখাপড়া চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ধরন পাল্টাতে শুরু করে এবং প্রাইভেট টিউশনই আসল হয়ে ওঠে।

বাম আমলের মতই সরকারি স্কুলের মাস্টাররা তৃণমূল আমলেও টিউশনের বৃত্তে সক্রিয় ছিলেন এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে তাঁরা অতি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এরকম অভিযোগ আছে যে অমুক শিক্ষক বা শিক্ষিকার কাছে পড়লে কেবল লেখাপড়া ভালো হবে তা নয়, বিশেষ স্নেহের ফল স্কুল প্রোজেক্ট বা প্র্যাকটিকাল পরীক্ষার নম্বরে বা স্কুলের পরীক্ষার খাতাতেও পাওয়া যাবে। অনেক জায়গায় এই বিশেষ ধরনের স্বজনপোষণ চরমে উঠেছিল। এছাড়াও অভিযোগ ছিল, বহু শিক্ষক শিক্ষিকা বাড়িতে ব্যাচের পর ব্যাচ পড়ান, স্কুলে এসে পড়ানোর ন্যূনতম চেষ্টা করেন না। স্কুলটা তাঁদের কাছে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা। তৃণমূল সরকারের শেষ পর্বে, অর্থাৎ ২০২১-২৬, স্কুলশিক্ষার অবস্থা সবচেয়ে করুণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সামান্য কিছু স্কুল বাদে অধিকাংশ স্কুলের ছাত্রছাত্রীর মূল ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রাইভেট টিউশন। অনেক স্কুলের শিক্ষক আবার নিজের প্রাইভেট ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে বাজার মজবুত করছিলেন।

আরো পড়ুন এসএসসি: শুধু পরীক্ষার্থী নয়, হারছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা

প্রাইভেট টিউশন স্কুলশিক্ষকদের দ্বিতীয় আয়ের পথ, কিন্তু শিক্ষিত বেকার যুবক যুবতীদের আয়ের প্রধান পথ। আজকের পশ্চিমবঙ্গে সসম্মানে রোজগারের যে দু-একটা পথ শিক্ষিত বেকারদের সামনে অবশিষ্ট আছে, তার অন্যতম হল প্রাইভেট টিউশন। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বা উঠতি মফস্বলে এটাই একমাত্র বিকল্প। অন্যদিকে ক্রমাগত সরকারি অবহেলায় স্কুলগুলোর পঠনপাঠনের যা হাল, তাতে ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট টিউশন না নিয়ে উপায় নেই। অথচ স্কুলশিক্ষকদের কাছে পড়লে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যাবে— এই ইঙ্গিত পাচ্ছে ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকরা। ফলে শিক্ষিত যুবক যুবতীদের এই কাজটাও কমে যাচ্ছে।

এই জাঁকিয়ে বসা ব্যবস্থার ইট খসাতে হলে প্রথমে সবল করতে হবে স্কুলের পড়াশোনাকে। নিয়মিত ক্লাসের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শিক্ষক, লেখাপড়ার উপর প্রশাসনিক নজরদারি, ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থে স্কুল চালানোর দায়িত্ব নতুন সরকারকে নিতে হবে। বহু স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকের অভাব আছে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে স্থানীয় বেকার শিক্ষিত যুবক যুবতীদের নামমাত্র সাম্মানিক দিয়ে একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস ‘ম্যানেজ’ করা হচ্ছে । মানে যেনতেনপ্রকারেণ সিলেবাস শেষ করা এবং শুধুমাত্র প্র্যাকটিকাল ক্লাস করানোর ব্যবস্থা। মানে ছাত্রছাত্রীরা কতটা শিখল বা জানল, তার দায়িত্ব স্কুল নিচ্ছে না। এই অবস্থায় হঠাৎ সরকারি নিয়মের দোহাই দিয়ে স্কুলশিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশন বন্ধ করে দিলে ছাত্রছাত্রীদের লাভের বদলে ক্ষতিই হবে।

সরকারি স্কুলশিক্ষার আমূল সংস্কার করে স্কুলনির্ভর পঠনপাঠন ফের চালু করাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। কাজটা সময়সাপেক্ষ। আপাতত শিক্ষকের অভাব পূর্ণ করতে অস্থায়ী শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করে স্কুলে যেন সব বিষয়ে নিয়মিত ক্লাস হয় তা নিশ্চিত করা উচিত। এতে বেশকিছু শিক্ষিত বেকারের আয়ের পথও খুলবে।

প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরশীল ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে হঠাৎ করে ওই সুবিধা কেড়ে নিলে তারা অথৈ জলে পড়বে। স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনলে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের উপর নির্ভরতা বাড়বে। তবে তাতে শিক্ষক শিক্ষিকাদেরও কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়বে। সেক্ষেত্রে উপরি আয়ের জন্য ব্যাচ পড়ানো ছাড়তে হবে। স্কুলে ঠিক করে লেখাপড়া হলে প্রাইভেট পড়ার সার্বজনীন ব্যাকুলতাও উধাও হবে। প্রাইভেট টিউশন হয়ে উঠেছে সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা। সেটাকে পরিপূরক ব্যবস্থা করে ফেলা যাবে। স্কুলশিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষিত বেকারদের অন্যায় প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না। কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার আগে ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থের কথা চিন্তা করা উচিত এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.