আশ্চর্য এই যে সদ্যপ্রয়াত অনীক দত্ত মেঘনাদবধ রহস্য (২০১৭) নামে একটি ছবি করেছিলেন। তবে আখ্যানের এই অংশে তার উপস্থিতি ছবিটার কারণে নয়। বরং ‘সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি/বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে’— মাইকেল মধুসূদন দত্তের এই অমর উচ্চারণ অনীকের মত এক বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালকের জীবনে সত্যি হয়ে যাওয়ার জন্যে। কী করে যে এমন হল তা বোঝা দায়। আমি এমন বলব না যে অনীক একজন মহৎ পরিচালক। বাঙালি ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদার, অজয় কর, তরুণ মজুমদার, এমনকি তপন সিংহকেও দেখেছে। অনীক সেই পর্যায়ের পরিচালক নন। হয়ত তিনি তা হতেও চাননি। তিনি অনেকটা কাজী নজরুল ইসলামের মত ‘পরোয়া করি না বাঁচি বা না-বাঁচি/যুগের হুজুগ কেটে গেলে’। কিন্তু অনীক এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন সাধিত করেছেন। তিনি সামগ্রিকভাবে বাঙালি বুদ্ধিজীবীর নিরাবরণ, কঙ্কালসার চেহারা ইতিহাসের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। যে বাঙালি চলচ্চিত্রকাররা তাঁর মৃত্যুতে একের পর এক শোকপ্রকাশ করছিলেন, তাঁদের দেখে আমার হাসি পাচ্ছিল। করুণা হচ্ছিল। আসলে ওঁরা মিডিয়ায় বাইট দিতে চান, খবরের কাগজে নিজের ছবি ছাপাতে চান।

ভাবুন, আধা প্রবাসী অনীক— খানিকটা মুম্বইয়ের, খানিকটা কলকাতার, খানিকটা বিজ্ঞাপন চিত্র নির্মাতা, খানিকটা চলচ্চিত্র নির্মাতা— যখন প্রথম ছবিটা করলেন তখন মমতা ব্যানার্জির আধিপত্য পশ্চিমবঙ্গে সুপ্রতিষ্ঠিত। তবু তিনি করতে পেরেছিলেন ভূতের ভবিষ্যৎ (২০১২)। কী আশ্চর্য সাহস! আমি অনীককে অনেক সোনালী সন্ধ্যায় আড্ডা মারতে মারতে বলেছি ‘প্রোমোটারের নাম গণেশ আর মস্তানের নাম কার্তিক করার কথা কী করে তোমার মাথায় এল? শরৎচন্দ্রের পরে এ এক অবিশ্বাস্য দুঃসাহস। ‘রামের সুমতি’-তে এমন নামের দুটো রুই মাছ ছিল পুকুরে।’’ অনীক হেসে বলেছিলেন ‘খুব একটা ভেবেচিন্তে যে দিয়েছিলাম তা নয়। পরে বুঝেছি একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।’ কিন্তু বাড়াবাড়ি যে হয়নি, বরং বাঙালিজীবনের অমোঘ সত্য তুলে ধরা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী দেড় দশকের ইতিহাস প্রমাণ করেছে। ছবিটা বস্তুত সময়ের গায়ে একটা আঁচড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অনীক সবাক ছিলেন, রবীন্দ্রনাথের রামকানাইয়ের মত খানিকটা নির্বোধও ছিলেন। অন্য সব চলচ্চিত্রকার খানিকটা দুধ আর খানিকটা তামাক খেয়ে বিবেকের পাঁচিলে বসে থাকতেন কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের সময়ে। অনীক সেই দলে ভেড়েননি, তিনি সরাসরি প্রশ্ন তুলেছিলেন— চলচ্চিত্র উৎসবে নন্দনে কেন মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ঝুলবে? উনি কি চলচ্চিত্রকার? এই প্রশ্ন করার জন্য আর কোনো শিল্পীকে কিন্তু পাওয়া যায়নি। আমাদের মত কিছু তুচ্ছ মশামাছির কথা আলাদা। যেসব বিখ্যাত মানুষের নাম কাগজে বেরোয় বা টিভিতে যাঁদের দেখা যায়, তাঁদের বাকশক্তি গত দেড় দশকে কোথায় গচ্ছিত ছিল জানি না। নাটক, সিনেমা, কবিতা, গান— সব জগতের লোকেরাই যেন রিপ ভ্যান উইঙ্কলের মত ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ এবছর মে-জুনের গরমে তাঁরা জেগে উঠেছেন। সেই সমস্ত কথা তাঁরা এখন বলতে পারছেন, যা ২০১১ সাল থেকে বলতে পারছিলেন না।

আরো পড়ুন এ বাঁচা কেমন বাঁচা? হাসাতে হাসাতে প্রশ্ন তুলে দিল ভূত তেরিকি

আসলে সৃষ্টির মূল উৎস যে আবেগ এবং অজানা চিন্তার বিচ্ছুরণ, তা আমরা ভুলে গিয়েছিলাম। আমাদের মনে হয়েছিল নুন, চিনি বা কাপড়ের ব্যবসা যেভাবে হয় সেভাবেই শিল্পের ব্যবসাও চলে। শিল্প-টিল্প করলে স্ত্রী-সন্তানের জন্যে কিছু করা যায়, আখের গোছানো যায়, মাঝে মাঝে বিদেশ যাওয়া যায়, কাগজে ছবি-টবি বেরোয়, ক্যামেরার সামনে দু-চার কথা বলা যায়— এইটুকুই। বাঙালি বুদ্ধিজীবীর এহেন অধঃপতন কেউ দেখেনি। ফলে অনীককে আমার আজ অসম্ভব শ্রদ্ধা হয়। তিনি তো সেভাবে রাজনীতির ভিতরকার মানুষ ছিলেন না; খুব যে সমাজ বদলের চিন্তা করতেন তাও নয়। অথচ সমকালের এমন সমালোচনা করেছেন নিজের দুটি ছবিতে, যে মনে হয়েছে আমাদের সময়েও অন্তত একজন ‘না’ বলার লোক আছেন। বলার ভঙ্গিটা ঠাট্টা হলেও। একদা বাঙালি খবরের কাগজে রূপদর্শী বা নীলকণ্ঠের লেখা পেত। দীপ্তেন সান্যাল, গৌরকিশোর ঘোষরা বুদ্ধিদীপ্ত বিদ্রুপে প্রতিষ্ঠানের বারোটা বাজাতেন। সেই প্রজাতি ক্রমশ লুপ্ত হয়ে যায়। অনীক কত বড় শিল্পী তা জানি না, কিন্তু তিনি এমন একজন যাঁর সত্য বলার সাহস ছিল।

সচরাচর বলা হয়, অনীক সত্যজিতের ভক্ত এবং তাঁর আঙ্গিকেই ছবি করতেন। আমার তা মনে হয় না। তিনি সত্যজিতের ভক্ত নিঃসন্দেহে। তাঁর সঙ্গে সত্যজিৎকে নিয়ে আমার অনেক কথা হয়েছে, এমনকি তিনি অপরাজিত (২০২২) ছবিতে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ছবিটা দেখলেই বুঝবেন, অনীকের ব্যর্থতা এইখানে যে তিনি পথের পাঁচালী নির্মাণের কাহিনি বলেছেন, অথচ দর্শক গদগদ হল জিতু কামালকে হুবহু সত্যজিতের মত দেখাচ্ছে কিনা তাই নিয়ে। ছবিটা আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারেনি। ছবিটায় কিছু তথ্য বিভ্রাটও ঘটেছে। অনীকের ওই ছবি যে সিনেমা হিসাবে খুব ভালো তা নয়, তবে সত্যজিতের জন্মশতবর্ষে বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা কেবল ‘মানিকদা’-র সঙ্গে কে চা সিঙাড়া খেয়েছে আর কে চৌরঙ্গী রোডে পায়চারি করত সেই গপ্পো বলাকেই কর্তব্য বলে স্থির করেছিলেন। তার চেয়ে অনীকের ১৯৫৫ সালের মুহূর্তগুলিকে উদ্ধার করার প্রয়াস প্রশংসনীয়।

বরুণবাবুর বন্ধু (২০১৯) আর মেঘনাদবধ রহস্যও দেখেছি। সবই যে আমার ভালো লেগেছে তা নয়। বরং অনীক বড় বেশি কথার আশ্রয় নেন বলেন বলে মনে হয়। তাঁর সিনেমায়, সত্যজিতের বিপরীতে, সংলাপের এত বেশি গুরুত্ব যে অনেক সময় আমরা সংলাপ শোনার জন্যই ভূতের ভবিষ্যতের দ্বারস্থ হই। এটা একেবারেই সত্যজিতের ঘরানা নয়। তিনি মৌনতাকে বাঙ্ময় করে তুলতেন। আমি সত্যজিতের সঙ্গে অনীকের তুলনা করতে চাই না। সত্যজিতের প্রতি সরাসরি বা পরোক্ষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপন বাঙালি হিসাবে তাঁর কর্তব্য ছিল। কিন্তু বাঙালি যখন নিজের কর্তব্য ভুলে শিল্প সাহিত্যে দাসবংশীয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন আমাদের বন্ধু অনীক, সামান্য অনীক দত্ত, ভূতের ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়ে যে নাড়া দিয়ে গেছেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আজ নিজেদের বড়ই ছোট মনে হয়। অনীক দত্তের শ্মশানযাত্রায় আমরা যারা গুচ্ছ গুচ্ছ বাইট দিলাম, তারা যদি অনীকের মত মুখর থাকতাম তাঁর জীবদ্দশায়, পশ্চিমবঙ্গের গত ১৪-১৫ বছরের সর্বনাশের প্রহরে, তাহলে কিছু কাজের কাজ হত। আমরা উত্তর সম্পাদকীয় লিখেছি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর অর্থহীন বাংলাকে সাবল্টার্ন স্বীকৃতি দিয়েছি। কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতির ভগ্নপ্রায় বাড়িটিকে শনাক্ত করতে পারিনি, যা অনীক করেছিলেন। অনীক কিন্তু বাঙালি সংস্কৃতিকে, তার লুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যকে ভালোবেসেছিলেন।

সেই ভালোবাসা নিয়ে আমি আর অনীক বহু সন্ধ্যায়, বহু দুপুরে মুখর হয়েছি। মমতার রাজনৈতিক পতন আর অনীকের পতন ইতিহাসের কোন আশ্চর্য পরিহাসে পরপর ঘটল, তা আমি জানি না। কিন্তু বারবার মনে পড়ছে সুবর্ণরেখা (১৯৬৫) ছবিতে বিজন ভট্টাচার্যের সংলাপ ‘দ্যাখলা, আমরা এক্কেবারে পরাজিত। আত্মহত্যা করার ক্ষমতা পর্যন্ত আমাদের নাই।’ অনীক কি প্রমাণ করলেন, কারও কারও সেই ক্ষমতা আজও আছে?

আসলে অনীক যে আমাদের বন্ধু, তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ছিলেন বরুণবাবুর বন্ধু। তাঁর কাছে বিখ্যাত, ক্ষমতাবান বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার চাইতে নাতির সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। অনীক সেই ইতিহাসের অংশ যা বাঙালি ভুলে গেছে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.