কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম: ২০ নভেম্বর, ১৯২১) বলতে ঠিক কী বোঝায় আজকের বাঙালি তা অনুমান করতে পারবেন না। তাঁর কখন জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে গেছে আমরা টেরও পাইনি। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমরা বিস্মরণপ্রিয় জাতি। মিডিয়া আমাদের দরজায় কড়া নাড়লে অন্তত আমরা ৪৮ ঘন্টার জন্য মনে রাখি, নাহলে রাখি না। কালীবাবু মিডিয়ার নট ছিলেন না, তিনি দীর্ঘকায় ও বহুকৌণিক। তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৮) ছবিতে শিশুদের জন্যে যে বিস্ময়ের বহুরূপ ধরেছিলেন, তা আজকের বাঙালির পক্ষে বিশ্বাস করা শক্ত। সুতরাং আমরা তাঁকে মনে রাখব কেন? মিলান কুন্দেরা যতই বলুন, বিস্মরণের বিরুদ্ধে শব্দ প্রতিরোধ হতে পারে, আমরা কলকাতায় থেকে বুঝি যে ইমেজের সে ক্ষমতা নেই। কপোত-কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষচূড়ে না হোক, যেন পায়রার খোপ হয়ে গেল জীবনে। সেইসঙ্গে অবাক লাগে, আমাদের প্রেম কীভাবে ফাঁকা হয়ে গেল দুজনের, শুধু নায়ক-নায়িকার। সেখানে বিভিন্ন কোরাস নেই। বাঙালির রান্নাঘর নেই, মেস ম্যানেজার নেই, ভবঘুরে ড্রাইভার নেই, পাড়ায় দাদা থাকলেও ডাকাত নেই; বৌদির আঁচল, চাটুজ্জেদের রোয়াক – কিছুই নেই। ফলে ছোট পরিবারের ছোট আখ্যানে নানা মুখের ছায়া পড়ে না। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বাঙালির মনের জানলা বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ভুলে গেছি, এমনকি উত্তমকুমারও তাঁর প্রকৃত অর্থে প্রথম ছবি বসু পরিবার (১৯৫২)-এ পার্শ্বচরিত্র।
অথচ কালীবাবু কী অসামান্য তৎপরতায় কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা হয়ে যেতে পেরেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি নাগরিক (১৯৫২)-এ। আর সত্যজিৎ রায়ের মণিহারা (১৯৬১) নির্মাণে কালীবাবুর শ্মশ্রুশোভিত মুখ দেখে কেউ বুঝতে পারেনি, নিম্ন মধ্যবিত্তের ঘুপচি ঘর থেকে এক লহমায় উনিশ শতকীয় বিত্তশালী ভদ্রলোকে কীভাবে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়া যায়। আসলে তাঁকে নির্মাণ করেছিল তাঁর সময়, তাঁর যৌবনের শিক্ষা। আমরা যারা অসময়ের মানুষ, তারা সেই রহস্য ধরতে পারি না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আশ্চর্য এই যে মহাত্মা গান্ধী যে সময়ে প্রথম সত্যাগ্রহ আন্দোলন করছেন, সেইসময় কালীঘাটে অ্যাডভোকেট বাবার পুত্র কালীর জন্ম। তিনি আসলে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অসহযোগের বার্তা রক্তে ধারণ করেই ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন। লেখাপড়া শুরু সত্যভামা ইনস্টিটিউশনে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি হলেন প্রথমবার, আর কালীবাবু ম্যাট্রিক পাশ করলেন। কলেজজীবন শুরু হল রিপন কলেজে। এমন মানুষ যে ভবিষ্যতে ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবেন তা বলাই বাহুল্য। তিনি যখন স্কুলছাত্র তখন থেকেই কালীবাবু নানা ছোট ছোট নাটকে অভিনয় করতেন। প্রথম মঞ্চে ওঠেন কারভালহোর চরিত্রে, নাটকের নাম কেদার রায়। এই চরিত্রে অভিনয় করে তিনি আমাদের কালীঘাট, লেক বাজার এলাকায় বিখ্যাত হয়ে যান। কলেজে পড়াকালীন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, পারিবারিক চাপে কালীবাবু ঔপনিবেশিক বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। কাজটা ভালো লাগেনি বলে বাবা তাঁকে একবছরের মধ্যে কলকাতায় ফিরিয়ে আনেন। তারপর টুকরো-টাকরা কাজ করতে করতে কালীবাবুর পরিচয় হয় শ্রীরঙ্গমের পুরোধাপুরুষ শিশির ভাদুড়ীর ভাই বিশ্বনাথ ভাদুড়ীর সঙ্গে। কিন্তু কালীবাবুর প্রকৃত অভিনয় জীবন শুরু হয় স্টার থিয়েটারে। পৌরোহিত্য করেছিলেন মহেন্দ্র গুপ্ত। সেখানে কালীবাবু অভিনীত প্রথম নাটক শতবর্ষ আগে, দ্বিতীয় নাটক টিপু সুলতান। ভারত স্বাধীন হল আর কালীবাবুও নিয়তির প্ররোচনায় ছায়াছবির জগতে প্রবেশ করলেন। সে বছর তিনি বার্মার পথে ও তাঁতিনীর বিচার ছবিদুটিতে অভিনয় করেন।
আরো পড়ুন প্রদীপ মুখোপাধ্যায়: জন অরণ্যে মাটির মানুষ
স্বাধীনতার পরেও দেশবিভাগের যন্ত্রণা, গরিবের হাহাকার অব্যাহত রয়ে গেল। স্বভাবতই তরুণ কালী বন্দ্যোপাধ্যায় ঝুঁকে পড়েছিলেন বামপন্থার দিকে। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা আইপিটিএ হয়ে উঠল তাঁর দিবারাত্রির স্বপ্ন। কালী বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রাম থেকে শহরে, সর্বত্র আইপিটিএ প্রযোজিত নাটকগুলিতে চলাচল করতে শুরু করলেন। এই সময়েই তাঁর পরিচয় ঋত্বিক ঘটক ও উৎপল দত্তের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব সারা জীবনেও মলিন হবে না। খুব নাম হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘বিসর্জন’ নাটকে অভিনয়ের সময়। সেখানে উৎপল, ঋত্বিক, কালী – সকলে একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। এবং এখানেই কালীবাবু এক নারীর নয়নে শ্রাবণ মেঘের ছায়া নামতে দেখলেন। তিনি প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায় – কালীবাবুর সহমর্মী ও পরবর্তীকালে সহধর্মিণী হবেন। আইপিটিএ-তে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ঋত্বিক ঘটকের নাগরিক ছবিতে যুক্ত হলেন। একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভিভাবক হিসেবে কালীবাবুর অসহায়তা ও যন্ত্রণাতে যে তীব্রতা ছিল, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা দাবি করে। তারপরেই কালীবাবুর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবিতে। সেখানে তিনি ঘরছাড়া নায়ক। একটি মোটরগাড়ির চালক হিসেবে কালীবাবুর চরিত্রে যে দিব্যোন্মাদনা ফুটে ওঠে তা সত্যজিৎ থেকে জর্জ সাদুল— সবাইকেই অভিভূত করে। টুকরো টুকরো নানা মুহূর্ত— জগদ্দলকে পাশে রেখে বিমল বিড়ি ধরাচ্ছে, অথবা গাড়িটির সামনে লাজুক নতুন বরের মতো ছবি তোলাচ্ছে নিজের আর জীবনের অসমাপ্ত মধুযামিনীতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে কোনো প্রতারিতা যুবতীর মায়াময় চোখের দিকে তাকিয়ে— এসব দৃশ্য মনে ভেসে উঠলে মনে হয় এ-ই তো সেই দেশ যেখানে ভরতের নাট্যশাস্ত্র লেখা হয়েছিল। এই অভিনয় করার জন্য পদ্ম পুরস্কার পাওয়া যায় না, কালীবাবুও পাননি।
একই সময়ে কালীবাবু কিন্তু বিশ্বরূপায় আরোগ্য নিকেতন ও ক্ষুধা নাটকে অভিনয় করেন। স্বভাবতই তাঁর কলানৈপুণ্য বাঙালির আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে একথাও স্মরণ রাখা উচিত, কালীবাবুর আসল খ্যাতির শুরু পঞ্চাশ দশকের বরযাত্রী ছবি থেকে, গনশার চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে। ঋত্বিক ঘটকের বাড়ি থেকে পালিয়ে-তে তিনি বহুরূপীর ভূমিকায় কাঞ্চন নামক একটি শিশুকে শুধু মুগ্ধ করেননি, প্রায় স্বাক্ষরিত করে দিয়েছিলেন নিজের অভিনয়। এই একই অভিনয়রীতি সম্প্রসারিতরূপে দেখা যায় নীল আকাশের নীচে (১৯৫৯) ছবিতে, যেখানে তিনি চীনে ফেরিওয়ালা লু ওয়াং-এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কী মর্মস্পর্শী এই চীনা নাগরিকের ভূমিকা! ভারত-চীন মৈত্রীর অন্যতম সুফল ওই ছবিতে কালীবাবুর অনবদ্য উপস্থিতি। একইরকম জোরালো তপন সিংহের কাবুলিওয়ালা (১৯৫৭) ছবিতে তাঁর পদশব্দ। কিন্তু আমাদের এবার মনোযোগ দিতে হবে সত্যজিতের সঙ্গে তাঁর তুলনারহিত সহযোগিতার দিকে। পরশ পাথর (১৯৫৮) ছবিতে তুলসী চক্রবর্তীর সহকারী হিসাবে প্রিয়তোষ হেনরি বিশ্বাসের ভূমিকায় কালীবাবু যেন এক চীনে কলমের আঁচড়। আমার মনে হয়, তোতলা গণেশের ভূমিকায় সত্যেন বসুর বরযাত্রী ছবিতে তিনি যেমন হাসিয়েছিলেন, বাঙালি তেমন চওড়া হাসি বহুদিন ভুলে গেছে। আর এই মানুষই কী অবিশ্বাস্য সংযমে রূপ দিয়েছিলেন মণিহারায় পাট ব্যবসায়ী ফণীভূষণের চরিত্রে! যখন বাদশা (১৯৬৩) ছবিটি এল, তারপর থেকে বাঙালি শিশু ছেলেধরার ভূমিকায় কালীবাবু ছাড়া আর কাউকে ভাবতে শেখেনি।
অবশ্য শুধু বাংলা ছবি কেন, হৃষীকেশ মুখার্জীর হিন্দি ছবি বাওয়ার্চি (১৯৭২)-তেও তিনি অসামান্য হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। হৃষীকেশবাবু তাঁর অল্প বয়সের বন্ধু ছিলেন। সবসে বড়া সুখ (১৯৭২) ছবিতেও তাঁর অভিনয় সফল হয়েছিল। তবুও কালীবাবু বাংলায় থেকে গেলেন, বাঙালির মত নাটক আর চলচ্চিত্রের হাতছানিতে। তিনি বোধহয় ভুল করেছিলেন।
কত ছবির কথা আমি বলব, কত নাটকের কথা আমি বলব! কেউ কি ভুলতে পারবে, রঙমহলে তাঁর আলিবাবা চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়? এমনকি পরবর্তী জীবনে তরুণ মজুমদারের দাদার কীর্তি (১৯৮০) ছবিতে সরস্বতীর বাবার চরিত্রে কালীবাবুর অভিনয়— সে যে কী নির্মল মুহূর্ত! যখন আমরা তপন সিংহের আরোহী (১৯৬৪) বা আটাত্তর দিন পরে (১৯৭১) ছবিতে তাঁর অসামান্য অভিনয় দেখি, তখন বুঝতে পারি যে সরস্বতী তাঁকে প্রতি রক্তবিন্দুতে আশীর্বাদ করেছেন।
এই যে চাষিটি পড়তে শিখছে, জীবনের বড় উঠোনে দাঁড়াতে চাইছে— তপন সিংহের আরোহীর সেই উদ্যোগই বৃথা হয়ে যেত যদি কালীবাবু না থাকতেন। কেরী সাহেবের মুন্সী (১৯৬১) কিংবা হাঁসুলীবাঁকের উপকথা (১৯৬২), দিনান্তের আলো (১৯৬৫) কিংবা জোড়াদিঘির চৌধুরী পরিবার (১৯৬৬) বা হারমোনিয়াম (১৯৭৬)— যেখানেই কালীবাবু দেখা দিয়েছেন, সেখানেই তিনি মহারথীর মত বাংলা ছবির দুনিয়াকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন। আজ সত্যিই অবাক লাগে, কালীবাবুর উত্তরাধিকার আমরা বহন করার উপযুক্ত হলাম না কেন? উত্তর হয়ত নানাবিধ। হয়ত টেলিভিশনের হানাদারি আর দু পয়সার লোভ এবং হঠাৎ বাবুদের দৌরাত্ম্যে অভিনয় নিজেই পার্শ্বচরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এখানে বিশ্বায়নে শুধু দুজন। একাকী রাজত্ব করার মত পরিসর কালী বন্দ্যোপাধ্যায়দের হাতে আর থাকল না।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








