অর্ক মুখার্জি
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, ২০২১ সালে ভরতপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীকে জেতা, অধুনা বহিষ্কৃত বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই সাক্ষাতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ফলাফল আন্দাজ করে পক্ষে বিপক্ষে নানা কথা হচ্ছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, সেলিম এই সাক্ষাতের সপক্ষে এমন কিছু যুক্তি দিচ্ছেন, যেগুলোকে যুক্তির থেকেও কুযুক্তি বা নিজেকে আড়াল করার সুকৌশলী রাজনৈতিক ভাষ্য বলে মনে হচ্ছে। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তিনি একাধিক বার সাংসদ হয়েছেন, সুবক্তাও বটে। এহেন লোককে যখন নিজের কাজের সাফাই দিতে দুর্বল যুক্তি বা এলোমেলো কথার শরণাপন্ন হতে হয়, তখন বুঝতে হয়, যে ভাষ্য তৈরি করা হচ্ছে তা আসলে রাজনৈতিক আদর্শচ্যুতি ঢাকতে মিথ্যা কথার জাল বোনা।
সেলিম বলেছেন, বিয়েবাড়িতে খেতে গেলে অনেকেই অনেকের সঙ্গে সেলফি তোলে। কিন্তু সেলফি তোলা মানেই দুজনের প্রেম আছে বা সুসম্পর্ক আছে, তা নয়। বিয়েবাড়িতে গিয়ে সেলফি তোলা, আর একটা বামপন্থী দলের রাজ্য সম্পাদক হয়ে এমন একজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা যার সাম্প্রদায়িক অতীত সুস্পষ্ট, দুটোর মধ্যে যে আকাশপাতাল ফারাক তা বলতে হচ্ছে এটাই আশ্চর্যের। দুটোর মধ্যে পার্থক্য বামপন্থী ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ আর দক্ষিণপন্থী দলের ধর্মকে সামনে রেখে রাজনীতি করার সমান।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
হুমায়ুন কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি, আবার তৃণমূল – এই করে বেড়িয়েছেন সারাজীবন। অতি সম্প্রতি নিজের দল গড়েছেন। অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলে ছিলেন। সুতরাং তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের সক্রিয় সদস্য ও নেতা হিসাবে নিজের আগের দলের উদ্দেশে গ্রামের রাজনীতিতে যাকে গা গরম করা কথাবার্তা বলা হয়, সেসব বলে বেড়িয়েছেন। কখনো কখনো একধাপ এগিয়ে বিপক্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত আক্রমণও করেছেন। কিছুদিন ধরে দেখা যাচ্ছিল, তিনি তৃণমূলের বিরুদ্ধেও নানা বক্তব্য রাখছেন এবং মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ বানানোর কথা ঘোষণা করছেন। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে বিজেপি থেকে তৃণমূলে ফিরে তিনি ভরতপুর বিধানসভা থেকে প্রার্থী হন এবং মোট ভোটের প্রায় ৫১.৬০ % পেয়ে প্রথমবারের জন্য তৃণমূল টিকিটে বিধায়ক হন। তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী, বেলডাঙায় বাবরি মসজিদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হিন্দু-মুসলিম ঐক্য বিঘ্নিত করতে পারে এবং তৃণমূল এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সমর্থন করে না। তাই তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের সময়ে তৃণমূলের তখনকার বিধায়ক এই লোকটাই মুর্শিদাবাদ জেলায় যে ৭০% মানুষ মুসলমান আর ৩০% হিন্দু, সেকথা উল্লেখ করে যে মন্তব্য করেছিল, তাকে ব্যবহার করে বিশেষ করে ওই জেলায় লোকসভা ভোটে তীব্র মেরুকরণ হয়েছিল।
কোনো সন্দেহ নেই, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২, অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভেঙে কেবল একটা ধর্মীয় ইমারত ভেঙে ফেলা হয়নি। ঘটনাটা ভারতের সংবিধানের উপর, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের বিশ্বাসের উপর, আজান এবং শাঁখের সুরের সমন্বয়ের উপর আঘাত। সেদিন মিথ্যে হয়ে গিয়েছিল সব ধর্মের সহাবস্থান এবং একে অপরকে রক্ষা করার ধর্মনিরপেক্ষতার শপথ। কিন্তু হুমায়ুনের এই বাবরি গড়ার আহ্বান সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। ভোট বৈতরণী পার হতে, মুসলমানদের মধ্যে ৩৪ বছর আগের সেই ঘটনাকে ঘিরে যে বেদনা রয়েছে, তাকেই উনি ব্যবহার করতে চাইছেন।
এরকম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিসের আলোচনা? সেলিম দাবি করছেন, তিনি নাকি মন বুঝতে গিয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে রাজনীতি করা লোকের মন বুঝে একটা কমিউনিস্ট পার্টির রাজ্য সম্পাদক কী করবেন? নাকি সেলিম তৃণমূলের অনুপ্রেরণায় দুয়ারে সরকারের মত হোটেলের রুমে গিয়ে মন বোঝা কর্মসূচি চালু করলেন? বামপন্থা একটা আদর্শ। কোনো আদর্শ বহন করা দায়িত্বের কাজ— রাজনৈতিক দায়িত্ব। বামপন্থীরা পরম্পরাগতভাবে সেই আদর্শ বহন করে চলেছে। দল পরিচালনার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকতে পারে, সাংগঠনিক দুর্বলতা তো আছেই, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে আদর্শে বিসর্জন দিয়ে আসন লাভ করলেও বা ক্ষমতা দখল করলেও বামপন্থার মৃত্যু হয়, পড়ে থাকে কেবল খোলস। সেলিমের মত নেতাদের মনে রাখা উচিত, এখনো প্রচুর কর্মী বা সমর্থক আছেন যাঁদের কাছে শূন্য হওয়া লজ্জার নয়, বরং চ্যালেঞ্জের। কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে শান দিয়ে আসা লোকের সংস্পর্শ হতাশার এবং যন্ত্রণার। কারণ তাঁদের আদর্শ ছাড়া হারাবার কিছু নেই।
হুমায়ুন নিজে দাবি করছেন, আসাদুদ্দিন ওয়েসির মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীনের সঙ্গে জোট করে লড়বেন। হুমায়ুন ২০২১ সাল থেকে ভরতপুরের বিধায়ক। এখন পর্যন্ত বিধানসভায় উপস্থিতির হার ৮২ %, কিন্তু বিধানসভায় কোনোদিন কোনো প্রশ্ন বা প্রস্তাব পেশ করেননি। অথচ ভরতপুরে গঙ্গাতীরে অবস্থিত গ্রামগুলো ধারাবাহিক ক্ষতির সম্মুখীন। জমি, ঘরবাড়ি নদীর ভাঙনে তলিয়ে যাওয়া স্থায়ী সমস্যা। পরিস্থিতি ভয়াবহ। অথচ বিধায়ক সাহেব বিধানসভায় সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি বা প্রস্তাব দেননি। ফসল ফলানোর পর সংরক্ষণের সমস্যা, পাকা সেচব্যবস্থার অভাবে কৃষকদের আয় দিন দিন অনিশ্চিত হওয়াও তাঁর কেন্দ্রের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। বর্ষাকালে জল জমা, গ্রামীণ রাস্তা, সেতু, নিকাশি ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ নিয়েও স্থানীয় স্তরে অভিযোগ আছে। গ্রামীণ স্কুলগুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষা পরিকাঠামোর অভাব শিক্ষালাভের স্বাভাবিক অধিকার খর্ব করছে, স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং উন্নত রোগনির্ণয়ের ব্যবস্থা না থাকায় বড় জেলা হাসপাতাল বা কলকাতার হাসপাতালে রোগী রেফার করার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অথচ পুরো একটা মেয়াদ কাটিয়ে ফেলা বিধায়ক মশাই এসব বিষয়ে উদাসীন। এমন একজন কী করে কোনো বাম দলের সম্ভাব্য জোট সঙ্গী হিসাবে বিবেচিত হতে পারেন?
আরো পড়ুন দ্যাট লিডার, দিস ম্যান: মহাশূন্যের দুটি বিন্দু
সংবাদমাধ্যমে সুপরিচিত, অসম্ভব বাকপটু এবং রসবোধসম্পন্ন তরুণ তুর্কি নেতা শতরূপ ঘোষ রাজ্য সম্পাদককে সমালোচনা থেকে আগলে রাখতে তেরিয়া হয়ে বলেছেন, যাবতীয় নীতি নৈতিকতার দায় সিপিএমের নয়। কমিউনিস্ট আদর্শে চালিত কোনো দলের নেতা যদি বলেন সব নৈতিকতার দায় তাঁদের নয়, তাহলে আর কিছু বলার থাকতে পারে না। এই নেতারা যেসব প্রয়াত নেতাকে আজও কথায় কথায় স্মরণ করেন, তাঁদের অন্যতম বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি একবার বলেছিলেন, এই রাজ্যে দাঙ্গা করতে এলে মাথা ভেঙে দেব। বুদ্ধবাবু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত ছিলেন না। কিন্তু নৈতিকতার দায় নিয়েই রাজনীতি করতেন। সে কারণেই পাম এভিনিউয়ে দু কামরার ফ্ল্যাটে থাকতেন বহুবছর মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং প্রায় দশ বছর প্রশাসনিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকার পরেও।
সেলিম অভিজ্ঞ মানুষ, জনতার পালস ভালো বোঝেন। অথচ ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তখনকার বাম ঘরানার প্রচার পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজের ছবি দেওয়া ফ্লেক্স লাগিয়ে প্রচার করেছিলেন এবং হেরেছিলেন। আশা করি এবারে বুঝবেন, হুমায়ুনের মত লোকের সঙ্গে আলোচনা বামপন্থী রাজনীতিতে কোনো নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে না, বরং দলে বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে এবং বামপন্থায় বিশ্বাসী দলীয় বৃত্তের বাইরে থাকা বহু মানুষের সমর্থন হারানোর সম্ভাবনার জন্ম দেয়। ভোটে আজ হারলে কাল জেতা সম্ভব, জেতার জন্য লড়াই করার সমর্থক তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আদর্শ হারালে কেবল ক্ষমতালোভীরা দলে পড়ে থাকবে। সেই দল ক্ষমতায় এলেও বামপন্থার প্রসারে তার ভূমিকা শূন্য হিসাবেই গণ্য হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








গাধার মত মমতাকে SIR-বিরোধিতার spaceটা না ছেড়ে যাদেরকে এতদিন অতি-বাম বলতেন তাদের হাত ধরুন। SIR এ নাম বাদ না গেলে আপনি বেঁচে গেলেন এমনটা নয়। SIR আসলে NRC র জন্য তথ্য সংগ্রহের অছিলা। NRC তে ওরা দেড় / দু’কোটি বাদ দেবে। এই SIR ও NRC বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হোন ১৪ ফেব্রুয়ারি কোলকাতার রামলীলা ময়দানে মিছিলে যোগ দিন।