আগেও বলেছি, কঙ্গো বা উগান্ডা আর পশ্চিম আফ্রিকার পরিস্থিতি হুবহু এক নয়। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোতে ঔপনিবেশিক যুগের পরেও বারবার বড় বড় সংঘর্ষের ইতিহাস আছে। এখনো সেখানে নয়ের দশকে শুরু হওয়া সংঘাত চলছে, বিশেষ করে দেশের পূর্ব ভাগে। অর্থাৎ দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি এবং তানজানিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায়। শতাধিক সশস্ত্র দল আছে কঙ্গোতে। মহামারীর একমাত্র কারণ না হলেও, প্রতিকূল পরিস্থিতির জন্য এই হিংসার বাতাবরণ অনেকাংশে দায়ী তো বটেই। গণহত্যা, গণধর্ষণ ইত্যাদি নানা ধরনের যৌন হিংসা ছাড়াও রয়েছে ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও বাসস্থানের অভাব, সীমাহীন দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনুপস্থিতি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবদার করেছিল— সম্ভাব্য ইবোলা রোগীর সংস্পর্শে আসা আপাতত সুস্থ আমেরিকানদের পৃথকীকরণ (quarantine) কেনিয়ায় করবে। কেনিয়ার এক আদালত সেই প্রস্তাবে আপাতত স্থগিতাদেশ দিয়েছে। একথা সর্বজনবিদিত যে অন্য দেশের প্রতি সহযোগিতার হাত না বাড়ালেও, নিজেদের প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশের উপর নানা দাবি চাপিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা নেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এই যেমন, ৫০ শয্যার উপর্যুক্ত প্রস্তাবিত quarantine facility-তে (যা বিমানবাহিনীর একটা ঘাঁটির মধ্যে) থাকাকালীন যদি কারও মধ্যে ইবোলার লক্ষণ দেখা যায়, তাদের আমেরিকা বাদে অন্য কোনো দেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কেনিয়ার জজসাহেব এই মামাবাড়ির আবদারে বরফ জল ঢেলে দিয়েছেন। সে দেশের সরকার কিন্তু মার্কিন প্রস্তাবে রাজি ছিল, তবে তাদের দাবি ছিল, ওখানে সব দেশের মানুষকেই পরিষেবা দিতে হবে। সেই দাবি মার্কিন সরকার মানবে কিনা জানি না। কেনিয়ার চিকিৎসক ইউনিয়ন ও অন্যান্য সংস্থাগুলো এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। সেখানকার কাতিবা ইনস্টিটিউটের মামলাতেই আদালতের স্থগিতাদেশ।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার পরিষ্কার জানিয়েছে, তারা অন্য দেশে ইবোলা কবলিত আমেরিকানদের আমেরিকার মাটিতে চিকিৎসার অনুমতি দেবে না। বরং কিছু মার্কিন স্বাস্থ্যকর্মীকে কেনিয়ায় পাঠানো হয়েছে, যাতে ওখানেই একটা হেস্তনেস্ত করা যায়। না হলে অন্য দেশে চালান করা হবে সেই হতভাগ্য আমেরিকান রোগীদের। কিছু মার্কিন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এই প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের পদক্ষেপ মার্কিন ডাক্তার, নার্সদের ইবোলা মোকাবিলায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করবে। তাতে অবশ্য ট্রাম্প সরকারের কিছু এসে যায় না। সব ব্যাপারে সমস্ত দেশের সঙ্গে অসহযোগিতাই এদের নীতি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে মার্কিন সেক্রেটারি অফ স্টেট মার্কো রুবিও ৩ জুন এই পদক্ষেপের একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন যে পুরোটাই একটু ভুল বোঝাবুঝি। কোনো মার্কিন নাগরিকের ইবোলা হয়েছে নিশ্চিত জানা গেলে অবশ্যই আমেরিকাতেই চিকিৎসা পাবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কঙ্গোতে ইবোলা চিকিৎসা প্রদানকারী এক মার্কিন চিকিৎসক অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে এবং আরও পাঁচজনকে জার্মানিতে নিয়ে যাওয়া হয়। আরও এক ব্যক্তিকে পাঠানো হয় চেক প্রজাতন্ত্রে। আদালতের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও কেনিয়া সরকার সেই quarantine facility প্রতিষ্ঠার কাজে এগোচ্ছিল। তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করেন এবং সেই প্রতিবাদ দমনে সরকারি পদক্ষেপের ফলে সেখানে এখন অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি, যার পরিণামে দুজন প্রাণ হারিয়েছেন।
যে কোনো দেশ বা অঞ্চলের স্বাবলম্বী হয়ে বিপর্যয় মোকাবিলা করার সক্ষমতা অবশ্যকাম্য। কিন্তু ঐতিহাসিক, মানবিক এবং বাস্তবসম্মত কারণেই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। সুতরাং মহামারীর আবহে এবং অন্য সময়ে বিপর্যস্ত দেশ ও অঞ্চলের পাশে দাঁড়ানো আমেরিকা সহ উন্নত দেশগুলোর নৈতিক দায়িত্ব, দয়ার দান নয়। তাছাড়া সংক্রামক রোগব্যাধি যে কাঁটাতারের তোয়াক্কা করে না, এ তো আমরা সবাই জানি। বছর পাঁচেক আগে করোনা অতিমারীর সময়ে সারা পৃথিবী সেটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। অথচ উপরের উদাহরণ থেকে পরিষ্কার যে বিপন্ন দেশের পাশে দাঁড়ানোর বদলে (বা ছলে) উন্নততর দেশগুলো পারলে তাদের আরও বিপদে ফেলতে পিছপা নয়।
খানিকটা নিজেদের সুরক্ষার তাগিদ থেকেই আমেরিকার সেন্টার্স ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) ও অন্যান্য সংস্থা আগের কিছু মহামারীর ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় থেকে শুরু করে চিকিৎসাব্যবস্থা পর্যন্ত সবকিছুতে, বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষাতেও, অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করত। দুর্ভাগ্যজনক হল, ট্রাম্প সরকার USAID-কে কেবল বিকল করেনি, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তদুপরি CDC-র বাজেট বরাদ্দ কমাতে কমাতে ওই সংস্থার কোমর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, ইবোলা মহামারীর মত বিপদ থেকে যেসব শিক্ষা সব দেশেরই নেওয়া উচিত তার অন্যতম হল, মার্কিন সাহায্যের উপর নির্ভরতা কমানো। ধনী দেশ তো বটেই, উচ্চমধ্যবিত্ত, এমনকি সম্ভব হলে নিম্নবিত্ত দেশগুলোকেও পরিকল্পিতভাবে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতামূলক বিশ্বস্বাস্থ্যের নকশা তৈরি করতে হবে।
চলতি মহামারী কতদূর ছড়াবে বা কবে শেষ হবে তা বলা কঠিন। একাধিক সূত্র বলছে, সীমিত সাহায্য এসে পৌঁছলেও বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। বেশকিছু মানুষের প্রাণ চলে গেছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








