কাবেরী কর গুপ্ত
এই মে মাসেই শতবর্ষ পার করলেন ইংরেজ প্রকৃতিবিদ ও লেখক স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো।
জন্ম ১৯২৬ সালের ৮ মে। তাঁর এই সুদীর্ঘ জীবনকালে পৃথিবী জুড়ে ঘটে গেল কত কিছু—দিকে দিকে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল, গড়ে উঠল আধুনিক রাষ্ট্রশক্তি, মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল টেলিভিশনের আশ্চর্য দুনিয়া। এই সময়কালের মধ্যে মানবজাতিও বোধহয় হয়ে উঠল পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর প্রজাতি, প্রাণিজগতের একচ্ছত্র ‘নিয়ন্ত্রক’। সারাজীবনের কাজ ডেভিড অ্যাটেনবরোর নামকেও প্রকৃতির সঙ্গে একরকম সমার্থক করে তুলেছে। শতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাই বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকেই ভেসে এল শ্রদ্ধার্ঘ্য। সেই তালিকায় বিজ্ঞানী, সংরক্ষণবিদ থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র-নির্মাতা, রাজনীতিবিদ, সাধারণ মানুষ, কে নেই!
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
কারণটা সহজ। অ্যাটেনবরো কেবল একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব নন, তিনি নিজেই এক প্রতিষ্ঠান।
আমি নিজে অবশ্য ডেভিড অ্যাটেনবরোকে চিনেছি অনেক পরে। সাত-আটের দশকে আমরা যখন বেড়ে উঠছি, সে সময়ে আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল না। ভিডিও ক্যাসেট প্লেয়ার থাকারও প্রশ্ন নেই। পরে অনেককেই শুনেছি, তারা নাকি ছোটোবেলাতেই অ্যাটেনবরোর বিবিসি তথ্যচিত্রগুলো দেখে ফেলেছে। আমাদের এখানে সেসবের সুযোগ ছিল না।
দেরাদুনের ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ায় মাস্টার্স করতে এসে প্রথম ওঁর কাজের ব্যাপারে জানতে পারি। ইন্সটিটিউটের লাইব্রেরিতেই একদিন দেখলাম তাঁর কাজ। বিবিসি-প্রযোজিত দ্য লাইফ অফ বার্ডস। এখনও মনে আছে, কী অপার বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে দেখেছিলাম পুরো কাজটা!
অসাধারণ তার দৃশ্যগ্রহণ। কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ করে ভাষ্যপাঠের ওই কণ্ঠস্বরটা।
আমরা যারা পরবর্তীকালে বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করেছি, তাদের অনেকের কাছেই বন্যপ্রাণী দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে ডেভিড অ্যাটেনবরোর ওই কণ্ঠস্বরটা। তাঁর শান্ত, কৌতূহলী মন প্রভাব ফেলেছে তাঁর পরিবেশনায়। জ্ঞান তাঁর গভীর, কিন্তু ভাষ্যপাঠ শুনে কখনও মনে হয়নি, তিনি গ্রাম্ভারি অধ্যাপকের মত দর্শকের ক্লাস নিচ্ছেন, বরং ভাষ্যপাঠে মিশে থেকেছে প্রাণীজগত নিয়ে তাঁর নিজস্ব মুগ্ধতা। গড়পড়তা টেলিভিশন সঞ্চালকদের মত তিনি নিজেকে কখনও প্রাধান্য দেননি, প্রাধান্য পেয়েছে জীবজন্তুরাই।
প্রথমবার তাঁর ছবি দেখার পর আমি বাকি কাজগুলো নিয়মিত দেখে গিয়েছি। একটার পর একটা সিরিজ—লাইফ অন আর্থ, দ্য লিভিং প্ল্যানেট, দ্য ট্রায়ালস অফ লাইফ, দ্য লাইফ অফ ম্যামালস। আমাদের গোটা প্রজন্মের কাছে এই তথ্যচিত্রগুলো কেবলমাত্র বিনোদন ছিল না, আমাদের সার্বিক পড়াশোনার মধ্যেও তা ঢুকে গিয়েছিল।
সাধারণ মানুষ বন্যপ্রাণীদের যেভাবে দেখে, অ্যাটেনবরো সেই দেখার চোখটা বদলে দিতে পেরেছিলেন। তাঁর ছবির সৌজন্যে কোটি-কোটি মানুষ জানতে পেরেছে, জীবজন্তু মানে কেবল বনচর প্রাণী নয়, তাদেরও নিজস্ব সমাজব্যবস্থা আছে, যোগাযোগের ভাষা আছে, প্রেম নিবেদনের রীতিনীতি আছে, যাতায়াতের নির্দিষ্ট পথ আছে, এমনকি প্রত্যেক প্রাণীর আলাদা রক্ষাকৌশলও আছে। পাঠ্যবইতে লেখা কয়েকটা প্রজাতি-নামের বাইরেও বিশ্বপ্রকৃতির ব্যাপ্তি যে বিশাল, সেটা ডেভিড অ্যাটেনবরোই শিখিয়েছিলেন।
কিন্তু যত নিজের বয়স বেড়েছে, বনে-জঙ্গলে ঘুরে ফিল্ডওয়ার্ক করেছি, তত আরেকটা প্রশ্নও মনে জেগেছে।
এই তথ্যচিত্রগুলো বানানো হয়েছে কীভাবে?
যখন ছাত্রী ছিলাম, তখন এসব বিষয়ে মাথা ঘামাতাম না। তথ্যচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, কিন্তু তা বানানোর পিছনে যে পরিশ্রম, তা বোঝার ক্ষমতাও ছিল না। পর্দায় কয়েক সেকেন্ডের যে ফুটেজে আমরা দেখে ফেলছি, পাহাড়ের খাড়াই বরাবর তুষারচিতাবাঘের সাবধানী পদচারণা, বার্ড অফ প্যারাডাইসের প্রেম নিবেদন কিংবা ডোরাকাটা বাঘের জঙ্গল-পরিদর্শন, সেই ফুটেজ পেতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
তুষারচিতাবাঘের দৃশ্যগুলোর কথাই ধরা যাক। এই দৃশ্যগুলোই বিবিসির তথ্যচিত্রগুলোকে বিখ্যাত করেছে। এরকম সব মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে নির্মাতারা দীর্ঘদিন পড়ে থেকেছেন হিমালয় বা পাকিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে। তাপমাত্রা সেখানে হিমাঙ্কের অনেক নিচে। তুষারচিতাবাঘের ক্ষেত্রে এই পরিশ্রম আরও বেশি। তারা স্বভাব-লাজুক, মাসের পর মাস পেরিয়ে যাবে তবু তারা ধরা দেবে না। ফলে, পর্দায় কয়েক মিনিটের যে সাবলীল ফুটেজ আমরা দেখছি, তা এককথায় অবিশ্বাস্য ধৈর্য আর অধ্যবসায়ের ফল।
তবে একথাও মনে রাখতে হবে, এ ধরনের কাজ কেবলই বিদেশি নির্মাতাদের একার কৃতিত্ব নয়।
অ্যাটেনবরোর তথ্যচিত্রগুলোর ক্ষেত্রে যে বিষয়টা প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়, তা হল স্থানীয় সহযোগিতা। ভারত, পাকিস্তান বা নেপালে যখনই বিবিসি কাজ করতে আসে, সেখানে তাদের সঙ্গে জুড়ে থাকেন স্থানীয় বিজ্ঞানী, বন্যপ্রাণী-গবেষক, আলোকচিত্রী, বনদপ্তরের কর্মী, গাইড, ট্র্যাকার, এমন অনেকেই। বিদেশি চিত্র-নির্মাতা, তিনি যত দক্ষই হোন না কেন, স্থানীয় ক্ষেত্রগবেষকদের সমতুল্য কখনোই হতে পারেন না। স্থানীয়, অভিজ্ঞ গবেষক তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্রসমীক্ষার জায়গাটি হাতের তালুর মতই চিনবেন, তেমনটাই স্বাভাবিক।
লাদাখের তুষারচিতাবাঘ, কর্ণাটকের হাতি, মধ্যভারতের বাঘ কি পশ্চিমঘাটের হর্নবিল, স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা ছাড়া ভারতের ঘন জঙ্গলের মধ্যে এসব প্রাণীদের চিত্রগ্রহণ সম্ভব ছিল না। এহেন জনপ্রিয় দৃশ্যগুলোর সঙ্গে বরাবরই জড়িয়ে থেকেছে অজস্র জীববিদ, ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট, গাড়িচালক, গাইড ও সংরক্ষণ কর্মীদের পরিশ্রম, কিন্তু তাঁরা কখনোই প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি, তাঁদের নাম জানতে পারেনি দর্শক।
এই গোটা প্রক্রিয়াটার একটা আভাস পেয়েছিলাম অনেক বছর আগে। অ্যাটেনবরো তখন দ্য লাইফ অফ ম্যামালস বানাচ্ছেন, লরিসদের উপর কাজ করতে চেয়ে তাঁর অফিস থেকে আমার কাছে একটা ইমেল এল। স্বাভাবিকভাবেই, প্রথমটায় খুব উত্তেজিত ছিলাম। অ্যাটেনবরোর কাজে পরোক্ষভাবে হলেও একটা অবদান রাখতে পারব—উত্তেজনাই তো স্বাভাবিক।
আমি জবাবে তাঁদের লিখলাম, জঙ্গলে লরিসদের দেখতে পাওয়া ভয়ানক কঠিন। তারা নিশাচর প্রাণী, গাছের আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে থাকে যে খুব অভিজ্ঞ ক্ষেত্রগবেষকদের চোখেও অনেক সময়ে পড়ে না। এটা লেখার পরে আর কথা এগোয়নি। অনেক পরে, যখন আমি শহুরে লরিসদের নিয়ে কাজ করছি, অ্যাটেনবরোর অফিস থেকে আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, কিন্তু সেবারও বিশেষ কিছু এগোয়নি।
খুব কম আদানপ্রদানই হয়েছিল, নিট ফলও শূন্য। কিন্তু বন্যপ্রাণীদের উপর ছবি বানানো যে কত কঠিন, তা এই একটা ঘটনাতেই পরিষ্কার। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে প্রাণীটিকে খুঁজে বার করা।
আজকের দিনে অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তি এসে গিয়েছে। এখন জীবজন্তুর ডামি তৈরি করে তার মধ্যে ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা যায়, জঙ্গলের অনেক গভীরে গাছের সঙ্গে ট্র্যাপ ক্যামেরা বেঁধে রাখা যায়, থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম আছে, ড্রোন আছে, নানা মডেলের হাই-স্পিড ক্যামেরাও বাজারে সহজলভ্য। তার ফলে, বন্যপ্রাণীর উপর তথ্যচিত্র নির্মাণের ভাষাটাই আজ বদলে গিয়েছে। কে কত ভালো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে, দৃষ্টিটা সেদিকে।
বিবিসির ন্যাচারাল হিস্ট্রি ইউনিট এ বিষয়ে একেবারে অগ্রগণ্য।
প্রযুক্তি-মুখর চিত্রগ্রহণের সুবাদে এখন অণুজীবের সাবলীল আদানপ্রদান থেকে পোকার ধীরলয় ওড়াউড়ি, কিংবা গভীর সমুদ্রের অন্ধকারে প্রাণীজগতের চলাচল, সবই দর্শক পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন। খালি চোখে যা ধরা পড়ে না, অত্যাধুনিক ম্যাক্রো লেন্স এসে গিয়ে তাও স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে। ঘন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা প্রাণীদের খুঁজে বের করার জন্য রয়েছে থার্মাল ক্যামেরা। উপর থেকে ছবি তোলার জন্য আগে হেলিকপ্টার ছাড়া গত্যন্তর ছিল না, এখন ড্রোন এসে গিয়ে সে কাজ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।
যে সিনেম্যাটিক গুরুত্ব একসময়ে হাতি বা সিংহের মত রাজকীয় প্রাণীদের জন্যই বরাদ্দ ছিল, সে গুরুত্ব এখন পাচ্ছে মাকড়সা, ছত্রাক বা অণুজীবের মত ক্ষুদ্র প্রাণীরাও। ফলে, নিখুঁত খুঁটিনাটি নিয়ে এখন যেসব দৃশ্য তৈরি হচ্ছে, তার বেশিরভাগটাই উঠে আসছে আমাদের অজানা জগতটা থেকে। একথা বলাই যায়, অ্যাটেনবরোর তথ্যচিত্রের ফলে বন্যপ্রাণীর ধারণা আরও বেশি বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু এই তাঁর সৃষ্টির যে ম্যাজিক এতবছর ধরে আমাদের মুগ্ধ করছে, সে ম্যাজিকও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়।
বন্যপ্রাণীদের নিয়ে তৈরি ছবি আসলে অনাবিল প্রকৃতির জানলা, নির্মাতারা এমন একটা দাবি বরাবরই করে থাকেন। কিন্তু বাস্তব অনেক বেশি জটিল। বহু দৃশ্যই দীর্ঘ পরিকল্পনা, সম্পাদনা ও প্রযুক্তির মিশেল। কিছু দৃশ্য তোলা হয় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। ছবির প্রয়োজনে অনেক সময়েই এমন প্রাণীদেরই ব্যবহার করা হয়, মানুষের প্রতি যাদের বিশেষ ভয়ডর নেই। জঙ্গলের মধ্যে, অনেক দূর থেকে ভেসে আসা শব্দ ক্যামেরার পক্ষে ধরা সম্ভব হয় না, ফলে স্টুডিওতে শব্দও তৈরি করে নিতে হয়।
এর মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি বলছি, এই ছবিগুলো দর্শকের সঙ্গে প্রতারণা করছে। ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলো খুবই সাধারণ কৌশল। বরং, একথা বলতে পারি, এই ধরনের তথ্যচিত্র আসলে সচেতনভাবে নির্মিত কিছু বয়ান। আর পাঁচটা তথ্যচিত্রের মতই এখানেও প্রযোজক-নির্মাতা মিলে ঠিক করে নেন, কী দেখাবেন, কী বাদ দেবেন, আর কীভাবে গল্পটা বলবেন।
বৃহত্তর প্রশ্নটা এখানেই।
অ্যাটেনবরোর তথ্যচিত্র তাহলে কোন প্রকৃতিকে চিনতে শিখিয়েছে আমাদের?
বিংশ শতকের সংরক্ষণ নীতি ছিল, প্রকৃতিকে বাঁচাতে গেলে মানুষকে সেখান থেকে সরিয়ে রাখতে হবে। সেই নীতি অনুযায়ী, অরণ্যে মানুষের কোনো জায়গা নেই। এশিয়া আর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই নীতিতেই বন সংরক্ষণ হয়েছে, আর তাতে জমি আর প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার হারিয়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ।
তথ্যচিত্রগুলোতেও মোটামুটি এই দর্শনটাই মেনে চলা হয়েছে। পর্দায় বাঘের দৃপ্ত পদচারণা ভেসে উঠেছে, কিন্তু জঙ্গল-নির্ভর মানুষের সেখানে জায়গা হয়নি। এসেছে হাতির পালও, কিন্তু জঙ্গল-ঘেঁষা জমিতে চাষবাস, মানুষের উচ্ছেদ বা হাতি-মানুষ সংঘর্ষের কথা অনুচ্চারিতই থেকেছে।
ডেভিড অ্যাটেনবরোর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য সময়ের সঙ্গে বদলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অনেক বেশি মন দিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য-ধ্বংস, শিল্পক্ষেত্রের ব্যবহার এবং পরিবেশের উপর অর্থনৈতিক প্রভাবের মত বিষয়ে। কাজের মূলসুরটিও বদলেছে। লাইফ অন আর্থ-এর অ্যাটেনবরো প্রকৃতিকে উদযাপন করতেন, আজকের অ্যাটেনবরো বিশ্ব সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে সতর্কতার কথা বলেন।
এই পরিবর্তন তাঁর একার নয়। সংরক্ষণের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। বন্যপ্রাণ-সংরক্ষণের সঙ্গে যে সামাজিক ন্যায়বিচার, আদিবাসী অধিকার, জীবনধারণ এবং রাষ্ট্রনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্নকেও জুড়ে নিতে হবে, সেটা আজ সংরক্ষণবিদরা স্বীকার করছেন। তাঁদের সংখ্যাও বাড়ছে।
আরো পড়ুন এত গরম কেন – কবে প্রশ্ন হয়ে উঠবে নির্বাচনী রাজনীতিতে?
তাহলে, শতবর্ষীয় ডেভিড অ্যাটেনবরোকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব?
আমার কাছে, তিনি কেবল একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা নন। বন্যপ্রাণীদের উপর অমন তথ্যচিত্র অনেকেই বানিয়েছেন। বরং, তিনি আরও বেশি যেটা শিখিয়েছেন, তা হল, প্রকৃতির প্রতি যত্নশীল হতে হবে।
তাঁর ছবি দেখে আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি, পৃথিবীতে পোকা, সরীসৃপ, পাখি, স্তন্যপায়ী থেকে বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমি, সকলেরই গুরুত্ব রয়েছে। একথা জোর দিয়ে বলা যায়, প্রাণীজগত নিয়ে মানুষের স্বাভাবিক কৌতূহল ও উদ্বেগকে তিনি নির্দিষ্ট খাতে চালনা করতে পেরেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিবেশ বা সংরক্ষণকে পেশা করে তুলতে চেয়েছে কেবল তাঁর ছবিগুলোর সৌজন্যে।
সেই অবদান সত্যিই উদযাপনের দাবি রাখে।
কিন্তু একই সঙ্গে, আজ তাঁর শতবর্ষে, সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন করার প্রয়োজন—সংরক্ষণ আসলে কাদের কথা বলছে? কারা সেখানে বাদ পড়ছে? অ্যাটেনবরো আমাদের প্রকৃতিপাঠ শিখিয়েছেন। এই মুহূর্তে নিছক আর প্রকৃতিপাঠ নয়, বরং প্রকৃতি, মানুষ ও ক্ষমতার জটিল সমীকরণটিকে বারবার খুঁড়ে দেখাই হয়ে উঠুক আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
ডেভিড অ্যাটেনবরো আজ একশো পেরোলেন, এই একশো বছর বয়সেও তিনি প্রাসঙ্গিক থেকে যাচ্ছেন। কারণটা সহজ, পৃথিবীর প্রাণ-সৌন্দর্যকে তিনি যেভাবে ধরেছেন, তেমনভাবে খুব কম মানুষই ধরতে পেরেছেন। আমরা যারা লাইব্রেরি, ক্লাসরুম বা ফিল্ড স্টেশনে তাঁর ছবিগুলো একটানা বসে দেখেছি, তাদের পক্ষে সে প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া কোনোদিনই সম্ভব নয়। আমাদের মনে গেঁথে গিয়েছে সেইসব ছবি, তাঁর ভাষ্যপাঠ।
তিনি যে আমাদের মনোযোগী হতে শেখান।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







