স্মৃতির ঝুলি হাতড়ে বর্তমানের সঙ্গে মিল আছে এমন ঘটনা যত বেশি খুঁজে পাওয়া যায়, তত বোঝা যায় বয়স বাড়ছে। আর বয়স যত বাড়ে, অল্পবয়সীদের মৃত্যু তত বেশি দাগা দেয়। অন্যের জায়গা দখল করে বসে আছি – এমন অনুভূতি হয়, বিশেষত যদি সে মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু না হয়। যেমন গাজায় আল জাজিরার চারজন সাংবাদিককে ইজরায়েলি সেনাবাহিনির হত্যা করার খবর পেয়ে মনে পড়ল ২০০৩ সালের কথা।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সাংবাদিকতা সংক্রান্ত কোনো একটা বিষয়ে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন কলকাতার আমেরিকান সেন্টারের এক আধিকারিক। যদি স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে, তাহলে লোকটির নাম উইলিয়াম হার্কেনরাইডার। সাংবাদিকতা সম্পর্কে প্রচুর ভাল ভাল কথা বললেন সাহেব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে বাকস্বাধীনতার স্বর্গরাজ্য, সেখানে সাংবাদিকরা দারুণ সম্মানিত – সেকথা মনে করিয়ে দিতেও ভুললেন না। কিন্তু ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, খুঁতখুঁতে লোক তেমন স্বর্গে গেলেও খুঁতখুঁত করে। ফলে প্রশ্নোত্তর পর্বে আমার মনে পড়ে গেল মাজন দানার কথা। হার্কেনরাইডারের আমাদের ক্লাসরুমে শুভাগমনের কয়েকদিন আগেই, রয়টার্স সংবাদসংস্থার ওই পুরস্কারপ্রাপ্ত প্যালেস্তিনীয় আলোকচিত্রী, বাগদাদের আবু ঘ্রাইব কারাগারের বাইরে এক মার্কিন সৈনিকের গুলিতে নিহত হন। জিজ্ঞেস না করে পারলাম না ‘সাংবাদিকদের যখন এতই সম্মান করা হয় আপনাদের দেশে, তাহলে দানাকে মরতে হল কেন?’ তদ্দিনে মার্কিন সেনাবাহিনি একেবারে পেশাদারি কায়দায় জানিয়ে দিয়েছে – ব্যাপারটা ‘টেরিবল ট্র্যাজেডি’, তবে সৈনিকটির দোষ নেই। দানা এমনভাবে ক্যামেরা বাগিয়ে ধরে ছবি তুলছিলেন যে সে বেচারি ভেবেছে ওটা রকেট লঞ্চার। তাই প্রাণভয়ে চারটে গুলি মেরে দিয়েছে নিরস্ত্র লোকটার বুকে। হার্কেনরাইডার উত্তরে সেকথাই বলবেন জানা ছিল। তাই আগে থেকেই জিজ্ঞেস করলাম ‘মার্কিন সৈন্যরা কি এতই সোজা সরল (naive) যে ক্যামেরা আর রকেট লঞ্চারের তফাত বোঝে না?’ দুঁদে মার্কিন আধিকারিক তাতে বেজায় ভদ্রতা করে যা বলেছিলেন তার নির্যাস হল, ‘কমব্যাট সিচুয়েশন’ একেবারে অন্য ব্যাপার। তিনি নিজে বা আমি, কখনো ওই জায়গায় যাইনি। গেলে মানুষের মনের অবস্থা কেমন হয় তা বোঝা আমাদের কম্ম নয়। তবে সে অবস্থায় ক্যামেরা আর রকেট লঞ্চারের তফাত করা খুব শক্ত। অতএব অমন হয়ে যেতেই পারে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই যে এক সাংবাদিকের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী না করলেও ট্র্যাজেডি বলে স্বীকার করা এবং যা হোক একটা অজুহাত দেওয়া – এসব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইজরায়েলের মত দেশের না করলেও চলে। কিন্তু ২২ বছর আগে দানার ব্যাপারে ওরকম করার কারণ, তিনি ছিলেন রয়টার্সের প্রতিনিধি। বাকস্বাধীনতার পরাকাষ্ঠা পশ্চিমি দেশগুলোর সংবাদমাধ্যম বলে কথা। তাদের সাংবাদিক প্যালেস্তিনীয় হলে তার জীবনের কিছুটা দাম দিতেই হয়। কিন্তু আল জাজিরার মালিক কাতার সরকারের কোম্পানি কাতার মিডিয়া কর্পোরেশন। তার সদর দফতর কাতারের রাজধানী দোহায়, তাদের উচ্চপদস্থ সাংবাদিকদের মধ্যে সাহেব, মেম কম। চ্যানেলের নামটা পর্যন্ত আরবি। ৯/১১ পরবর্তী দুনিয়ায় মুসলমানবিদ্বেষের চাষ চলার সময়ে আমরা ভারতের কালা আদমিরা পর্যন্ত জনশ্রুতি থেকে শিখেছিলাম – আল জাজিরা হল সন্ত্রাসবাদী সংস্থা আল কায়দার মুখপত্র। যদিও ‘আল’ হল ইংরিজির ‘দ্য’ আর ‘জাজিরা’ কথাটার অর্থ দ্বীপ বা উপদ্বীপ, কাতার দেশটা যেখানে অবস্থিত। সেই আল জাজিরার সাংবাদিকদের খুন করলে অত কৈফিয়ত দিতে লাগে না। তাই আনাস আল শরীফ, মহম্মদ ক্রইকহ, ইব্রাহিম জাহের, মহম্মদ নওফল, মোয়ামেন আলিওয়ার মৃত্যুকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সেনাবাহিনি ট্র্যাজেডি বলেনি। এও বলেনি যে ভুল করে মেরে ফেলা হয়েছে। বলেছে আনাস তো হামাসের লোক, তাই ওদের মেরে ফেলাই দরকার ছিল। কায়দাটা চেনা চেনা লাগছে না? মার্কিন দেশের ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ইয়ান উইলিয়ামস আল জাজিরাকে বলেছেন, এ জিনিস মার্কিন দেশে চলে আসছে সেই ম্যাককার্থির আমল থেকে। কোনো কমিউনিস্টের সঙ্গে তোমার কথার মিল পাওয়া গেলেই তোমাকে কমিউনিস্ট বলে দেগে দেওয়া হবে। তারপর তুমি যখন কমিউনিস্ট, তখন তোমাকে জেলে পুরলেও অন্যায় হয় না। মেরে ফেললেও দোষ নেই। ইয়ান বলেছেন, ইউরোপে এ জিনিস চলছে আরও আগে থেকে – সেই স্প্যানিশ ইনকুইজিশন থেকে।

হিসাব করে দেখলাম, হার্কেনরাইডার যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ বিল্ডিংয়ের একখানা ঘরে দানার মৃত্যুকে স্রেফ ভুল বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন আনাস, ইব্রাহিম, নওফল, মোয়েমানরা নেহাত শিশু। ক্রইকহ সবে কৈশোরে পা দিয়েছেন। যৌবন পেরোবার আগেই দানার মতই তাঁদের সাংবাদিক পরিচয় অগ্রাহ্য করে হত্যা করা হল। প্যালেস্তাইনের ওয়েস্ট ব্যাংকে দীর্ঘকাল কাজ করা দানা ইরাকে গিয়েছিলেন ইরাক যুদ্ধের ছবি তুলতে। সেই যুদ্ধে দানার আগেও ১৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছিলেন। আনাসরা কিন্তু অন্য কোথাও যাননি। নিজভূমে সাংবাদিকদের জন্য চিহ্নিত ক্যাম্পেই তাঁদের মেরে ফেলা হয়েছে সন্ত্রাসবাদী বলে দেগে দিয়ে। অবশ্য ইরাকে লড়াই হচ্ছিল, গাজায় চলছে গণহত্যা। কয়েক হাজার শিশু, বৃদ্ধ, নারীকে বোম ফেলে মারতে যাদের বুক কাঁপেনি; হাসপাতালে বোম ফেলেও যাদের অপরাধবোধ থাকে না; নিরস্ত্র মানুষের জন্য আসা খাবার, ওষুধ, জল আটকে দিয়ে যারা গলা উঁচিয়ে কথা বলতে পারে; যারা সচেতনভাবে দুর্ভিক্ষ তৈরি করে, তারপর ত্রাণশিবির থেকে খাবার নিয়ে ফেরা মানুষের উপর বোম ফেলতে পারে – তারা যে ২৭০ জনের বেশি সাংবাদিক মারবে তাতে আর আশ্চর্য কী? বরং সাংবাদিক খুন করা অমন জায়গায় অমন পরিস্থিতিতে বিশেষ প্রয়োজন। মার্কিন দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সদা চিন্তিত সিএনএন বা বাকস্বাধীনতার ধ্বজাধারী ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন তো আর আল জাজিরার মত করে গণহত্যাকে গণহত্যা বলছে না শুরু থেকে। বাকি বিশ্বে যে প্রতিবাদ হচ্ছে গাজার জন্যে, তা হয়ত সম্ভব হত না আল জাজিরার মত সংবাদমাধ্যম না থাকলে। দুনিয়া জোড়া প্রতিবাদের ফলে নেতানিয়াহু এবং তাঁর সবচেয়ে বড় বন্ধু মার্কিন সরকারকে (এখানে জো বাইডেন, কমলা হ্যারিস বা ডোনাল্ড ট্রাম্পে বিশেষ তফাত নেই) কিঞ্চিৎ প্রশ্নের মুখোমুখি যে হতে হচ্ছে তাতে তো সন্দেহ নেই। বেশকিছু দেশ প্যালেস্তাইনকে আলাদা রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে, যা আগে হয়নি। ফ্রান্সের মত দেশও সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি চাইছে, যদিও গণহত্যায় যুদ্ধবিরতি চাওয়ার মানে কী তা বোঝা শক্ত। তা এইসব চাপ কমে যেতে পারে আল জাজিরা সেইসব ছবি দেখাতে না পারলে, যা দেখলে যে কোনো সংবেদনশীল মানুষ অসুস্থ বোধ করবেন। মানুষের ভিতরের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, অন্য মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য, গাজার অপুষ্টিতে পেট ফুলে যাওয়া এবং চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া হাড় জিরজিরে শিশুকে তো দেখাতেই হবে। আল জাজিরা গাজায় না থাকলে, তার প্যালেস্তিনীয় সাংবাদিকরা না থাকলে আর কে করবে সে কাজ?

সাংবাদিকশূন্য দেশ কোন শাসক না পছন্দ করে আজকাল? তালিবানি আফগানিস্তানে ছবি তুলতে গিয়ে নিহত দানিশ সিদ্দিকির জন্যে শোকপ্রকাশ সহজ। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে গৌরী লঙ্কেশের খুনিদের আজও শাস্তি হল না, মুকেশ চন্দ্রকরকে সেপটিক ট্যাংকে মড়া হয়ে ভাসতে হল আমাদের দেশেও। কাশ্মীরের কতজন সাংবাদিক জেলে আছেন তার হিসাব তো বাকি ভারতের সাংবাদিকদের কাছেও থাকে না সাধারণত। জায়নবাদী ইজরায়েল সরকার অপছন্দের সাংবাদিকদের বলে হামাসের লোক, আমাদের দেশে সিদ্দিক কাপ্পান বা মহম্মদ জুবেরকে তাঁদের নামের কারণে সন্ত্রাসবাদী বা মৌলবাদী বলে দেওয়া হয় চট করে। যে কোনো মামলায় অভিযুক্ত করে জেলের ঘানিও টানানো যায়। নামটা অজিত অঞ্জুম হলে তা করা একটু মুশকিল হয়, তবে বিহারের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর গলদ ফাঁস করে দিচ্ছেন বলে তাঁকেও এফআইআর করে হয়রান করা হয়। তবে সবসময় যে নাম কারাবাস ঠেকিয়ে দিতে পারে তা-ও নয়। কাজকম্ম নেহাতই রাষ্ট্রের পক্ষে অসুবিধাজনক হয়ে উঠলে নিউজক্লিক সম্পাদক প্রবীর পুরকায়স্থের মত জেল খাটতে হয়।

আরো পড়ুন সরকারের কিছু দেশদ্রোহী দরকার, তাই নিউজক্লিক আক্রমণ

সুতরাং আজকের দুনিয়ায় প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স আর সাংবাদিকের স্বাধীনতা হল ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী। সবাই বলে তারা আছে, কান পাতলে তাদের কথোপকথনও শোনা যায়, কিন্তু কেবল দু-একজন ভাগ্যবানই তাদের দেখতে পায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.