ছয় বছর আগে দিল্লির আনন্দ বিহার স্টেশনের মর্মস্পর্শী দৃশ্য নাড়া দিয়েছিল সারা বিশ্বকে। কাতারে কাতারে প্রবাসী শ্রমিক রেলস্টেশনে হাজির হয়েছিলেন বাড়ি ফেরার তাগিদে। লকডাউনে বাড়ি ফিরতে গিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর কথা ভোলা যায় না। আনন্দ বিহার স্টেশনে প্রবাসী শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার জন্য ভিড় আবার সে স্মৃতিকেই উস্কে দিচ্ছে, যদিও পরিস্থিতি এখনো তত ভয়াবহ নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বৈদ্যুতিন প্রচারমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে যে রান্নার গ্যাসের অভাবে বহু প্রবাসী শ্রমিক এখন ঘরমুখো। রান্নার গ্যাস জোগাড় করতে পারছেন না, হোটেলে খাওয়া খরচ বেড়ে গেছে, অনেকের রুজিতেও টান পড়েছে। সাংবাদিকদের তাঁরা জানাচ্ছেন, দিন দশ-পনেরো ধরে আধপেটা খেয়ে রয়েছেন। বাড়ি ফিরলে অন্তত উনুনে রান্না করতে পারবেন।

একই দৃশ্য মুম্বাইয়ের লোকমান্য তিলক টার্মিনাস ও ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ টার্মিনাস স্টেশনে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা পশ্চিমবঙ্গে আসার ট্রেন ধরতে প্রবাসী শ্রমিকদের ভিড়। বহু হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন খাবারের দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বা রান্না কম হওয়ায় কর্মীদের অনেকেই রোজগার হারিয়েছেন। বাণিজ্য ও শিল্পের কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের আকালে সংকটে রয়েছে মহারাষ্ট্রের শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্র। তার ফল ভুগতে হচ্ছে শ্রমিকদের। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের বস্ত্র শিল্পে সংকট। গুজরাটের মরবি, সেরামিক সিটি নামে খ্যাত। প্রায় চার লক্ষ শ্রমিক ওই অঞ্চলে সেরামিক ক্ষেত্রের কাজে যুক্ত রয়েছেন। এঁদের বড় অংশ উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিক। জ্বালানি সংকটে ওই ক্ষেত্রের নাভিশ্বাস উঠছে, বহু শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। কাঁচামালের সংকটে রাসায়নিক শিল্পেরও একই দশা। তামিলনাড়ু বা কেরালার নানা পরিষেবা ও শিল্পক্ষেত্রও বিপদে পড়েছে। নির্মাণ শ্রমিকদেরও একই অবস্থা। অনেকে কাজ হারাচ্ছেন বা রোজগার কমছে। তার সঙ্গে বাড়তি উপদ্রব রান্নার গ্যাসের আকাল। কালোবাজারি চলছে অবাধে। হোটেলে খাবারের অগ্নিমূল্য। স্বাভাবিকভাবেই প্রবাসী শ্রমিকদের আবার ঘরে ফেরার পালা।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কোথাও কোথাও পাঁচ কেজি গ্যাস সিলিন্ডার কালোবাজারে ২,০০০ টাকা দামেও কিনতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের বড় সিলিন্ডারের দাম কোনো কোনো জায়গায় পৌঁছেছে ৪,০০০ টাকায়। যেসব প্রবাসী শ্রমিকের রুজিতে টান পড়েনি, তাঁরাও এত দাম সামাল দিতে পারছেন না। গ্যাস সিলিন্ডারের গ্রাহক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনেকেরই কর্মস্থলে থাকে না। অনেকের নির্দিষ্ট ঠিকানাও নেই। রেশন কার্ড, আধার কার্ডের ঠিকানা সাধারণত কর্মস্থলের ঠিকানা নয়। অনেক প্রবাসী শ্রমিককে কাজের সন্ধানে দেশের নানা প্রান্তে একপ্রকার ভেসে বেড়াতে হয়। ফলে স্বাভাবিক নিয়মে এলপিজি গ্রাহক হওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারি নিয়ম কবেই বা এসব ভেবে তৈরি হয়!

এখন গ্যাস জোগাড় করতে এইসব মানুষকে কাজ ছেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তাও একদিন নয়, অনেকের গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে একাধিক দিন অনেকটা সময় কেটে যাচ্ছে। সময় মানেই শ্রম সময়। সেই সময় লাইনে দাঁড়িয়ে নষ্ট হলে মজুরি ছাঁটাই। কাজও চলে যেতে পারে। একে বেশিরভাগই ঠিকে শ্রমিক, তার উপর প্রবাসী। পয়সা, খুঁটি— কিছুরই জোর নেই। সম্প্রতি ফোনে কথা হচ্ছিল ওড়িশায় কাজে যাওয়া এক পরিচিত প্রবাসী নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে। মজুরি বৃদ্ধিসহ নানা দাবিতে তাঁরা ধর্মঘটে সামিল হয়েছেন। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার কিনেছেন ৪,০০০ টাকায়। বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ছে। ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গ, আসাম থেকে কাজে যাওয়া প্রবাসী শ্রমিকদের এমনিতেই কিছুদিন পর বাড়ি ফিরতে হবে। এর আগে অনেকেই কাজ ছেড়ে ভোট দিতে আসতেন না। কিন্তু এবারে এসআইআর আবহে তাঁরা আতঙ্কে রয়েছেন— ভোট না দিলে পাছে নাম কাটা যায়! তাই এবার ভোট দিতে বাড়ি ফেরার তাগিদ বেশি। জ্বালানি সংকট, খাওয়া খরচ বাড়ায় এই দুই রাজ্যের অনেক প্রবাসী শ্রমিকই আগেভাগে বাড়ি ফিরছেন।

সংকটকালে সরকারের দায়িত্ব কী? শুধুই ভাষণবাজি আর জ্ঞান বিতরণ? কথায় নয়, কাজে মানুষকে ভরসা জোগানোর দায়িত্ব এখন সরকার পালন করে না। সেই দায়িত্ব পালন করতে সরকারের কাছে দাবি তুলতেও আমরা যেন ভুলে যাচ্ছি। নিত্যনতুন নিয়ম করে মানুষকে লাইনে দাঁড় করানো, নাজেহাল ও আতঙ্কিত করাই আজ সরকারের কাজ। যে সরকার নাগরিকদের যত আতঙ্কিত করতে পারবে, সে যেন তত দক্ষ। নোট বাতিলে লাইন, করোনার টিকা নিতে লাইন, এসআইআরে নাম বাদ গেলে বা বিচারাধীন হলে আবেদনের লাইন, এখন গ্যাসের জন্য লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ, অটো— সকলেই। একে রোজগারের কোনো নিশ্চয়তা থাকছে না, তার উপর কাজ কামাই করে লাইনে দাঁড়াতে আর কাগজ জোগাড় করতে করতেই দিন কাবার।

লকডাউনের সময়ে প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে হইচই কম হয়নি, ফলে পরে বয়ে গিয়েছিল প্রতিশ্রুতির বন্যা। পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে সেই সমস্যা কিছুটা হলেও আলোচিত হয়েছিল। তবে এখন আমরা নয়া স্বাভাবিকতার যুগে প্রবেশ করেছি। সবকিছুই স্বাভাবিক, প্রবাসী শ্রমিকদের সংকটও স্বাভাবিক। অথচ এই পাঁচ বছরে তাঁদের সংকট কিন্তু বেড়েছে। প্রবাসী শ্রমিকরা নানা রাজ্যে বিদ্বেষের শিকার হয়েছেন, গণপিটুনিতে মারাও গেছেন। বাংলাভাষী শ্রমিকদের উপর অত্যাচারে বিভিন্ন রাজ্যের সরকারও সামিল হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইন্টার-স্টেট মাইগ্রান্ট ওয়ার্কমেন (রেগুলেশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড কন্ডিশনস অফ সার্ভিস) অ্যাক্টের সুযোগ থেকে যে অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক বঞ্চিত, লকডাউনেই সেটা পরিষ্কার হয়েছিল। তাঁদের খোঁজ কোনো রাজ্য সরকারই ঠিকঠাক রাখে না। পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়েছে শ্রমশ্রী প্রকল্প। অন্য রাজ্য থেকে কাজ ছেড়ে ঘরে ফিরলে ৫,০০০ টাকা ভাতার বন্দোবস্ত। ২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেটে বলা হয়েছে, প্রায় ৩২ লক্ষ ‘ঘরে ফেরা শ্রমিক’ শ্রমশ্রী প্রকল্পে উপকৃত হয়েছেন। বাস্তবে সামান্য ৫,০০০ টাকা ভাতার ভরসায় না থেকে দলে দলে মানুষ কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্য বা দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই ৩২ লক্ষ ভাতা প্রাপকদের সকলে কি সত্যিই অন্য রাজ্য থেকে কাজ ছেড়ে ভাতার ভরসায় ফিরে এসেছেন? নাকি শাসক দলের ঘনিষ্ঠরাই নানা কায়দাকানুন করে এইসব ভাতা পাচ্ছেন? সেই সংশয় থেকেই যায়।

আরো পড়ুন গরিব মানুষ পরজীবী হলে এদেশের সস্তা শ্রমিক কারা?

১৯৭৯ সালে তৈরি কেন্দ্রীয় আইনটি অবশ্য আর থাকছে না। সব শ্রম আইন বাতিল করে এসেছে চারটে শ্রম কোড। নয়া অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস (ও এস এইচ ডব্লিউ) কোডে আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিকদের ইএসআই, প্রভিডেন্ট ফান্ড সহ নানা সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কাজের জায়গায় অথবা নিজেদের বাড়িতে তাঁরা রেশনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য পাবেন— একথাও বলা আছে। পাশাপাশি বলা হয়েছে, কোনো সংস্থায় দশজনের কম আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিক থাকলে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অধিকার ও সুযোগ প্রযোজ্য হবে না। ১৯৭৯ সালের কেন্দ্রীয় আইনটিতে কিন্তু পাঁচজন বা তার বেশি প্রবাসী শ্রমিক থাকলেই নানা সামাজিক প্রকল্পের সুযোগ ছিল। ২০১৩-১৪ সালের রিপোর্ট জানাচ্ছে, ৭০% সংস্থাতেই ছজনের কম আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিক ছিলেন। অর্থাৎ নতুন কোডের মাধ্যমে সিংহভাগ প্রবাসী শ্রমিককেই বিভিন্ন অধিকার ও প্রকল্পের সুযোগ থেকে ছেঁটে দেওয়া হল। অথচ বলা হচ্ছে শ্রম কোডে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নাকি বেড়েছে। অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক ঠিকাদারদের অধীনে কাজ করেন। শ্রম কোডে ঠিকাদারদের ক্ষমতা বেড়েছে। ওএসএইচডব্লিউ কোড অনুসারে, ৫০ জনের কম শ্রমিক সরবরাহকারী ঠিকাদারদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক নয়। আগের আইনে ২০ জন বা তার বেশি শ্রমিক সরবরাহ করলেই ঠিকেদারের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক ছিল। নতুন কোডে বেশিরভাগ ঠিকাদারই ধরাছোঁয়ার বাইরে। শ্রমিকের মজুরিতে ভাগ বসানো, মজুরি মেরে দেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে। মূল নিয়োগকর্তারও দায় থাকবে না।

এসআইআর-ও প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রান করছে। অনেকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে, অনেকের শুনানিতে ডাক পড়ায় কাজ ছেড়ে চটজলদি বাড়ি ফিরে আসতে হয়েছে। এখন আবার নতুন বিপদ হল পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জন্য জ্বালানি সংকট। দিল্লিতে সাংবাদিকদের কাছে কয়েকজন প্রবাসী শ্রমিক জানিয়েছেন, বাড়ি ফেরার সময়ে ঠিকাদার তাঁদের ঠিকমতো মজুরি দেয়নি। প্রবাসী শ্রমিকদের সঠিক মজুরি, আশ্রয়, নিরাপত্তা ঠিকাদার বা নিয়োগকারী সংস্থা— কেউই দেয় না। সরকারও নিষ্ক্রিয়, অথচ তাঁদের শ্রম ছাড়া বিকশিত ভারত অচল।

বিধানসভা নির্বাচনে প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে অনেক কথা হবে। তাঁদের ধর্ম, ভাষাগত পরিচয়কে মূলধন করে অনেকে ভোটের বাজার গরম করবে। কিন্তু শ্রমিক হিসাবে তাঁদের অধিকার, সামাজিক সুরক্ষার গ্যারান্টি দেবে কে? নির্বাচন গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ উৎসব। শ্রমিক, কৃষকের অধিকার ছাড়া কি গণতন্ত্রের মূল্য থাকে?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.