সুব্রত হালদার
একাধিক রাজ্য সহ আমাদের রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বাতিল বা বিবেচনাধীন ভোটার হওয়ার ঘটনা আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের সন্দেহের চোখে দেখে এবং তাদের অস্তিত্বের বৈধতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আমজনতার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অস্তিত্ব শর্তসাপেক্ষ; আর এই শর্ত নির্ধারণের একচেটিয়া ক্ষমতা রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনিক কাঠামোর হাতে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় তাঁরা উপলব্ধি করেন যে, অস্তিত্বের বৈধতা কেবল জীবিত থাকার মধ্যে নয়; বরং নথিভুক্ত থাকার মধ্যে। অর্থাৎ প্রমাণযোগ্য অবস্থায় উপস্থিত থাকাই বৈধ অস্তিত্বের অনিবার্য শর্ত। ফলে জনজীবন এক উদ্বেগজনক দ্বৈততার মধ্যে ঢুকে পড়ে— বাস্তবে উপস্থিত থেকেও প্রশাসনিকভাবে অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার দোলাচলে দুলতে থাকে। এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া বা বিবেচনাধীন হওয়ার ঘটনায় স্পষ্ট যে, একজন মানুষের বহুবছরের জীবনযাপন, শ্রম, সম্পর্ক, রাজনৈতিক অবস্থান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবদান— কোনোটাই তার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। চূড়ান্ত প্রমাণ কেবল রাষ্ট্র ও তার প্রশাসনের দেওয়া কিছু কাগজপত্র।
এসআইআর প্রক্রিয়া আমাদের কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— মানুষের অস্তিত্ব কী? তা কীভাবে নির্ধারিত হবে? আমাদের অস্তিত্ব নির্ধারণের প্রশ্নে কিছু নথিপত্রই কি শেষ কথা বলবে? সাধারণত আমরা জৈবিকভাবে বেঁচে থাকাকে অস্তিত্বের প্রমাণ হিসাবে দেখে থাকি। কিন্তু শুধুমাত্র বেঁচে থাকার মধ্যে দিয়েই কি আমাদের অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে? নাকি এক জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তা হয়? একথা অনস্বীকার্য যে, বেঁচে থাকা আমাদের অস্তিত্বের প্রাথমিক শর্ত। কিন্তু তা বৈধতা পায় সমাজ, রাষ্ট্র, প্রশাসনের পারস্পরিক জটিল ও বহুস্তরীয় সম্পর্কের বহুবিধ চিহ্নের মধ্যে দিয়ে। ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, সম্পর্ক, স্মৃতি, নথিপত্র– সব মিলে আমাদের অস্তিত্ব ফুটে ওঠে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই বহুমাত্রিক স্বীকৃতির জগৎকে সংকুচিত করে শুধুমাত্র নথিপত্রের চোখ দিয়ে অস্তিত্বের বৈধতা যাচাই করা হয়। অপর্যাপ্ত বা ত্রুটিযুক্ত নথি একজন ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসাবে চিহ্নিত করে। নথিপত্রের ত্রুটি, তথ্যের অসঙ্গতি, ভাষাগত সমস্যা কিংবা প্রযুক্তিগত জটিলতা— এসব মিলিয়ে তৈরি হয় স্বীকৃতির এক গভীর সংকট। যেহেতু নথি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্য দিয়েই তৈরি হয়, তাই এই অসঙ্গতি মূলত কাঠামোগত। কিন্তু যাচাইয়ের মুহূর্তে সেই দায় ব্যক্তির উপরেই বর্তায়। একজন প্রান্তিক মানুষ, যাঁর পর্যাপ্ত নথিপত্র নেই, হয়তো ছিল কিন্তু নানা কারণে সংরক্ষিত হয়নি, যেটুকু আছে তা ত্রুটিপূর্ণ, এমনকী তিনি হয়ত জানেনই না যে তাঁর নথিতে ভুল রয়েছে, তাঁকে হঠাৎ বলা হল ‘প্রমাণ করো তুমি বৈধ।’ ফলে যে ভুল তাঁর নয়, তার দায়ই তাঁকে বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় নথিপত্র আর নিরীহ কাগজ থাকে না, জন্ম নেয় নথির রাজনীতি।
এই সংকট থেকেই মানুষ না-মানুষ হয়ে ওঠে। না-মানুষ সেই ব্যক্তি, যার জৈবিক ও সামাজিক অস্তিত্ব আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অনিশ্চিত বা স্থগিত। সে অদৃশ্য নয়, আবার পুরোপুরি দৃশ্যমানও নয়। সে উপস্থিত, কিন্তু শর্তাধীনভাবে। এই অর্থে, না-মানুষ অনুপস্থিতির নয়, বরং শর্তাধীন উপস্থিতির সত্তা। না-মানুষ হয়ে ওঠা মানুষ এক অদ্ভুত অস্থিরতায় বসবাস করে। তার অস্তিত্ব আর স্থায়ী নয়, এক চলমান যাচাই প্রক্রিয়া। সমাজ ও প্রশাসনের নানা স্তরে বারবার প্রমাণ করতে হয় তার অস্তিত্বের বৈধতা। এই পরিস্থিতি কেবলমাত্র প্রশাসনিক জটিলতা নয়, এক নতুন ধরনের শাসনব্যবস্থারও ইঙ্গিত দেয়— অনিশ্চয়তাভিত্তিক শাসন। এখানে রাষ্ট্র সরাসরি মানুষকে বাদ দেয় না, আবার সম্পূর্ণ স্বীকৃতিও দেয় না। বরং তার অস্তিত্বকে স্থায়ী অনিশ্চয়তার মধ্যে জাগিয়ে রাখে। ফলে অনিশ্চয়তাই হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণের কার্যকর মাধ্যম।
নথির রাজনীতি কেবল রাষ্ট্রের একমুখী প্রকল্প নয়, তা সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের স্তরেও বিস্তৃত। সমাজের স্তরে স্তরে জমে থাকা বিদ্বেষ, ঘৃণা, হিংসা, ক্ষমতা ও অসাম্যের বহুস্তরীয় জটিল বিন্যাস, ধর্মীয় মেরুকরণ, ভোট রাজনীতির পরিসংখ্যানগত সমীকরণ— এগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নীতির এক জটিল ও পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কের রসায়নের ভিত্তিতে জন্ম নেয় কতকগুলো আখ্যান, এবং ক্রমে তা পরিণত হয় সাধারণ বিশ্বাসে। যেমন লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী আমাদের জনবিন্যাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, অনুপ্রবেশকারীদের কাঁধে ভর করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল একের পর এক নির্বাচনী বৈতরণী পার করে যাচ্ছে। এ জাতীয় আখ্যান যখন সাধারণ বিশ্বাস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন আমরা দেখতে পাই, আমাদেরই সহনাগরিকদের একাংশ জোরালো দাবি তুলছে— চিহ্নিত করো, যাচাই করো, আলাদা করো, দেশান্তরিত করো। রাষ্ট্র সেই দাবিকে প্রশাসনিক রূপ দেয়। ফলত সমাজের এই অংশটি নিজেরাই শাসনের অংশ হয়ে ওঠে। তারা হয়ে ওঠে এই ব্যবস্থার নীরব এজেন্ট। সন্দেহকে স্বাভাবিক করে তোলে, অবিশ্বাসকে বৈধতা দেয় এবং অন্যের প্রতি অবহেলাকে যুক্তিসঙ্গত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফলে যে মানুষটি নথির বাইরে পড়ে যায়, তার বিরুদ্ধে শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজের একাংশও দাঁড়িয়ে যায়।
আরো পড়ুন ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ আসলে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ফিকির
সমাজের একাংশ, যারা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দৃষ্টিতে প্রমাণিত সত্তা, তারা অন্যদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে শুরু করে। ‘ওরা অবৈধ’, ‘ওরা সন্দেহজনক’— এই ভাষা সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে। ফলে নথি কেবল পরিচয়ের প্রমাণ নয়, হয়ে ওঠে বিভাজনের ভাষা। একইসঙ্গে এখানে আরও একটি গভীর সমস্যা কাজ করে— প্রতিষ্ঠান ও মানুষের মধ্যে কাঠামোগত দূরত্ব। যেসব প্রতিষ্ঠান দ্বারা মানুষের অস্তিত্বের স্বীকৃতি নির্ধারিত হয়, তার অনেকগুলির কাছেই অনেক মানুষ পৌঁছতে পারে না। পারলেও সেই প্রতিষ্ঠানের ভাষায় কথা বলতে পারে না। ফর্মের ভাষা, আইনের ভাষা, নথির ভাষা— এসব তাদের কাছে অপরিচিত, দুর্বোধ্য। ফলে তাদের জীবনের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্য ভাষায় প্রকাশিত হয় না। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠান নিজেই হয়ে ওঠে নথি ও প্রমাণের প্রধান অনুসন্ধানকারী। সে মানুষের অভিজ্ঞতা নয়, নথিকেই সত্য হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে যে ব্যক্তি ইতিমধ্যেই নথিগত অসামঞ্জস্যের কারণে বিপন্ন, তিনি এই প্রতিষ্ঠানগত দূরত্বের কারণে আরও অসহায় হয়ে পড়েন। এমন নয় যে এই সংকটের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তা রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বরং আমরা লক্ষ করেছি যে, গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলার বিপরীতে প্রশাসনিকভাবে বিষয়টির সমাধানের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তা কার্যত না-মানুষকে আরও প্রান্তে ঠেলে দেয়।
এই অবস্থায় তাঁদের অভিজ্ঞতা আরও জটিল হয়ে ওঠে। সে শুধু স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত নয়; সে সেই কাঠামো থেকেও বিচ্ছিন্ন, যার মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন করা সম্ভব। ফলে তার বঞ্চনা কেবল একটি ফলাফল নয়, তা প্রক্রিয়ার মধ্যেই নিহিত। তার ব্যর্থতা ব্যক্তিগত নয়, কাঠামোগত। কিন্তু সেই ব্যর্থতার দায় শেষপর্যন্ত তার উপরেই বর্তায়। সমাজ সন্দেহ তৈরি করে, প্রতিষ্ঠান দূরত্ব বজায় রাখে, রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের অংক কষে আর রাষ্ট্র সেই ফাঁককে প্রশাসনিক নিয়মে স্থায়ী করে তোলে। এই বহুমুখী প্রক্রিয়ার মধ্যেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে স্বীকৃতি হারাতে থাকে, হয়ে ওঠে না-মানুষ।
এই পরিস্থিতিতে অদৃশ্যতা আর কেবল প্রশাসনিক থাকে না, সামাজিকভাবেও গ্রহণযোগ্য হয়ে যায়। এখানেই সেই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে— মানুষ কি এমনিতেই অস্তিত্বশীল, নাকি সে কেবল তখনই অস্তিত্বশীল যখন তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়? স্বাধীনতা কি অধিকার ভোগ করার ক্ষমতা, নাকি সেই অধিকার বারবার প্রমাণ করার বাধ্যবাধকতা? এসআইআর প্রক্রিয়া এই ধারণা, এই প্রশ্নগুলি নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ এতে দেখা যাচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে কেবল বাদ দেয় না। বরং তাকে অনিশ্চয়তা, দূরত্ব এবং প্রমাণের এক অন্তহীন প্রক্রিয়ার মধ্যে আটকে রেখে নিয়ন্ত্রণ করে। এই বাস্তবতায় ‘থাকা’ আর কোনো স্বতঃসিদ্ধ সত্য নয়; এক চলমান, অনিশ্চিত এবং গভীরভাবে রাজনীতি দ্বারা নির্ধারিত অবস্থা।
নিবন্ধকার পেশায় অধ্যাপক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








