এই যে হঠাৎ করে নির্বাচনের অজুহাতে অন্তত এক-দেড় মাসের জন্য স্কুল ছুটি পড়ে গেল, এতে কার কী এসে গেল ভাবছিলাম। সরকারি স্কুলের পড়াশোনা নামক জিনিসটাকে যতটা সম্ভব গুরুত্বহীন এবং অপ্রয়োজনীয় করে তোলার জন্য উদ্যোগ আয়োজন দেশজুড়ে নতুন নয়। কিন্তু স্কুল বন্ধ থাকলে কাদের জীবন সবচেয়ে বেশি অন্যরকম হয়ে যায়? ভাবতে গিয়ে ভেসে উঠল তিন-চারটে চেনা মুখ, রোজ যাদের স্কুলবাড়ি জুড়ে দুষ্টুমি করে বেড়াতে আর বকুনি খেতে দেখি, নিজেও বিস্তর শাসন করি।
ধরা যাক, প্রথম জনের নাম আয়েষা। আয়েষার মা ভোর থাকতে উঠে বেরিয়ে যান একটা শপিং মলের ডিউটিতে, আয়েষা আর আয়েষার বছর পাঁচেকের ভাইয়ের জন্য রান্না করে রেখে। দিনের অনেকটা সময় মেয়ে স্কুলে থাকে বলে একটু নিশ্চিন্তে কাজে মন দিতে পারেন তিনি। আয়েষার বাবা ছেলেকে কাছের স্কুলে দিয়ে গাড়ি চালাতে বের হন, আবার এক ফাঁকে এসে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ক্লাস এইটের আয়েষা স্কুল থেকে একাই বাড়ি ফিরে সন্ধেটা ভাইকে চোখে চোখে রাখে, যতক্ষণ না ডিউটি সেরে মা ফিরছেন। কাজেই পড়তে বসার সুযোগ বা পরিস্থিতি আয়েষার জীবনে বাহুল্য। ওর একমাত্র খোলা আকাশ এই ইস্কুলবাড়ি, যেখানে পড়া মাথায় ঢুকুক বা না ঢুকুক, দিদিমণিরা যতই বকুন, বেশ দাপিয়ে বেড়ানো যায় দিনের পাঁচ-ছ ঘন্টা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অথবা ক্লাস সেভেনের টুম্পা। টুম্পার বাবা ওদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ওর ছোট্টবেলায়, টুম্পার মা-ও অন্য একজনকে বিয়ে করে তাঁর সাথেই থাকেন এখন। টুম্পা সেখানে যেতে চায়নি, দাদু- দিদার সঙ্গে থাকে। কারও কথা শোনে না। দিদা প্রতি অভিভাবক সভায় ছলছল চোখে বলে যান— মেয়েটার কী হবে ভেবে রাতে ঘুম হয় না তাঁর। তাও স্কুল, স্কুলের বন্ধু, দিদিমণিরা আছেন বলে মেয়েটা এতদিনে বাজে সঙ্গে পড়ে বখে যায়নি।
তৃতীয় জনের নাম হতেই পারে অমৃতা, যার বিধবা মা হাসপাতালের আয়া। মা বাড়ি থাকেন না সারাদিন, মেয়ে সেই সুযোগে বাড়িতে থাকলেই স্মার্টফোন খুলে বসে থাকে। স্কুলে গেলে অন্তত সারাদিন ফোন থেকে দূরে থাকছে, ক্লাসের পড়া একটু হলেও শুনছে, ভেবে মনকে প্রবোধ দেন মা।
উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। নাম পালটে গেলেও ওদের গল্পগুলো সর্বত্র একইরকম। খাতায় কলমে যাকে সিলেবাসের পড়াশোনা বলে, তার বাইরেও নানা কারণে একেকটা সরকারি স্কুলের উপর আজও নির্ভর করে থাকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এমন অসংখ্য জীবন, কারণে অকারণে স্কুল বন্ধ হলে যাদের বিরাট অসুবিধায় পড়তে হয়। আর এই স্কুল বন্ধের অনিয়মটাই যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, তখন যদি স্কুলের প্রতি ভরসা কমতে কমতে একসময় ছেলেপুলেদের স্কুলে পাঠানোই অদরকারি বলে মনে হয়, অভিভাবকদের খুব দোষ দেওয়া যায় কি?
‘স্কুল বন্ধ তাতে কী? অনলাইনে তো পড়ানো হচ্ছে’। এই কথাটা আমাদের পরিচিত বৃত্তে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু সে পড়াশোনা হচ্ছে কলকাতা বা শহর ঘেঁষা হাতে গোনা স্কুলে, তাও কীভাবে? সেই করোনার সময়ে চালু হওয়া গুগল মিট ইত্যাদি লাইভ ক্লাস, যা বেশিরভাগ স্কুলেই এখন বন্ধ হয়ে গেছে ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ, উপস্থিতির হাল দেখে। রইল হোয়াটস্যাপ গ্রুপে পড়া পাঠানো। খানিক ভয়েস মেসেজ, খানিক ছবি বা ভিডিও, কিছু নোটস। পড়া তো পাঠানো হল, সেসব কে কখন দেখবে? মা অথবা বাবা, যার নম্বর আছে স্কুলের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে, তিনি হয়তো হা-ক্লান্ত হয়ে রোজ রাত দশটায় বাড়ি ফেরেন। তারপর কখন ফোন হাতে পাবে ছাত্র বা ছাত্রী, কখন পড়া শুনবে, নোটস লিখবে সে? যাদের এই অসুবিধা নেই, তারাই বা স্মার্টফোন হাতে পেয়ে কতটা পড়া দেখবে আর কতটা অন্য জিনিসে ডুবে যাবে, সে খেয়াল রাখবে কে?
ওইভাবে কতটুকু পড়া বোঝা হয়, সে তো পরের কথা। হয় না যে, তা ভারতের চেয়ে প্রযুক্তিতে অনেক বেশি উন্নত দেশগুলো কিন্তু মেনে নিয়েছে। সম্প্রতি সুইডেন ক্লাসঘর থেকে যাবতীয় ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র দূর করে দেবে ঠিক করেছে। বই, খাতা, কলম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। কারণ দেখা যাচ্ছে, বৈদ্যুতিন জিনিসপত্র ব্যবহার করে লেখাপড়ার করার ফলে ছাত্রছাত্রীদের মনঃসংযোগ কমছে। পড়ার ক্ষমতা, লেখার ক্ষমতার অবনতি হচ্ছে। সুইডেনের পথে হাঁটার কথা হচ্ছে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডসের মত দেশেও।
কাজেই ওসবে মন না দিয়ে ছেলেমেয়েক কোচিংয়ে পাঠানোয় মন-প্রাণ-অর্থ ঢেলে দেওয়ার যে প্রতিযোগিতা আমাদের এখানে বহুদিন ধরে চলছে, সেই প্রতিযোগিতাকে শিক্ষাবর্ষের মাঝখানে স্কুল বন্ধ রেখে প্রায় বাধ্যতামূলক করে তোলা হল। করলেন তাঁরাই, যাঁদের দায় এবং দায়িত্ব ছিল স্কুলশিক্ষাকে উন্নত, স্বনির্ভর এবং আবশ্যিক করে তোলা। শিক্ষার অধিকার আইনের গালভরা ভাষায় আজও শিক্ষা ‘অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক’ হয়েই আছে, কিন্তু ওই আইনের বইয়ের বাইরে শিক্ষাকে সত্যিই সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যা যা করা দরকার, বহুবছর ধরে কেন্দ্র-রাজ্য সরকারি উদ্যোগে হয়ে আসছে তার ঠিক উলটো।
যে সময়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি চালু করে শিক্ষাব্যবস্থার ঢালাও বেসরকারিকরণ করছে, ঠিক সেইসময় এ রাজ্যে হাজার হাজার সরকারি স্কুল তুলে দিচ্ছে তৃণমূল সরকার। জাতীয় শিক্ষানীতিতে অনলাইন শিক্ষাকে সহায়ক ব্যবস্থা হিসাবে না দেখে অনলাইনের দিকেই ঝুঁকে পড়ার যে প্রবণতা, রাজ্যে হাজারটা অনলাইন টিউটোরিয়ালের রমরমা দেখে সেই একই মানসিকতার আভাস পাওয়া যায়।
শিক্ষা কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ তালিকাভুক্ত। এই যে কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে বলে রাজ্যের অসংখ্য স্কুল মার্চের মাঝামাঝি থেকে একটা একটা করে বন্ধ হতে শুরু করল, রাজ্য সরকারের তরফে আটকানোর কোনো চেষ্টাই কি করা যেত না? সরকারি শিক্ষায় সবার আগে অধিকার জনগণের, তাদের করের টাকায় চলে সমস্ত সরকারি পরিষেবা, প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা যদি নাগরিকের অধিকার হয়, তাহলে তাকে ব্যাহত হতে না দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। তাহলে সশস্ত্র বাহিনীর রাইফেল আর কুচকাওয়াজকে জায়গা করে দিতে ইতিমধ্যেই ধুঁকতে থাকা স্কুলশিক্ষাকে আরও কয়েক পা পিছিয়ে যেতে হল কেন? তৃণমূল-বিজেপির প্রবল ভোট দ্বৈরথের আবহে সরকারি নেতা মন্ত্রীদের তর্জন গর্জনে শিক্ষা নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলার বিরুদ্ধে একটিও কথা শোনা গেল না তো? ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (এআইডিএসও) কেন্দ্রীয় বাহিনী রেখে স্কুলের শিক্ষাদিবস নষ্ট করার প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিল, পরেও একাধিকবার বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সংগঠিত করেছে। সরকারি তরফে কোনো উত্তর মেলেনি, বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের এই হঠকারি সিদ্ধান্তই অবাধে কার্যকর হতে দিয়েছে রাজ্য সরকার।
ক্লাসরুমের পড়াশোনা বন্ধ, তার ক্ষতিপূরণ করতে শিক্ষা দফতরের বাংলার শিক্ষা পোর্টালে বিভিন্ন ভিডিও আপলোড হচ্ছে এবং শিক্ষকদের কাছে নির্দেশ আসছে ছাত্রছাত্রীদের সেসব পাঠানোর। ‘সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’ এখানে ভয়ানক দারিদ্র্য সত্যি, গ্রামগঞ্জের বহু স্কুলে পড়াশোনা চালানোর মত একটা বাড়ি না থাকা সত্যি, নদীনালা পেরিয়ে কাদা ভরা পথ দিয়ে মাইলের পর মাইল উজিয়ে স্কুলে আসা ম্লান মুখগুলো সত্যি, সরকারি স্কুলে পরিকাঠামো এবং শিক্ষকের ভয়ানক অপ্রতুলতা সত্যি, ডিজিটাল ডিভাইড সত্যি। পশ্চিমবঙ্গের মাত্র ২৫.১% স্কুলে কম্পিউটারের সুবিধা আছে, সারা দেশের গ্রামাঞ্চলের ২৪% ইন্টারনেট পরিষেবা পায়, দেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার হার ৩৮.১%। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতিতে অনলাইন শিক্ষা নিয়ে বাগাড়ম্বর প্রচুর এবং এ রাজ্যের শিক্ষা দফতর আশা করছে, সরকারি স্কুলে পড়তে আসা ছেলেমেয়েরা ইউটিউব ভিডিও দেখেই সব শিখে ফেলবে। পড়াশোনার পরিসর তো নষ্ট হচ্ছেই, সঙ্গে ঝাপসা হয়ে আসছে স্কুলের মাঠ, টিফিনবেলার খেলা-খুনসুটি, মিড-ডে মিলের পেট ভরা খাবার (মান যেমনই হোক), ক্লাসরুমে একসঙ্গে শেখা এবং শিক্ষক-ছাত্র সরাসরি সংযোগের মধ্যে দিয়ে পাওয়া মানবতার সহজ পাঠ, দুনিয়ার কোনো অনলাইন শিক্ষা যা দিতে পারে না।
বিএড পড়ার সময় শিখন-শিক্ষণ পদ্ধতিতে ‘স্টেকহোল্ডার্স’ বলে একটা শব্দ শিখেছিলাম। যাঁরা কোনোভাবে একটা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, যাঁরা তার ভালো মন্দে প্রভাবিত হন এবং দায়িত্বও পালন করেন, তাঁদের বলে স্টেকহোল্ডার্স, অর্থাৎ অংশীদার। স্কুলশিক্ষার অংশীদারদের মধ্যে যদি শিক্ষক শিক্ষিকারা পড়েন, এবং তাঁরা সত্যিই মন দিয়ে পড়াতে চান, তাহলে তাঁদের অবস্থা এখন দাঁড়িয়েছে ইতিহাসে পড়া সেই অধীনতামূলক মিত্রতা নীতির বশ্যতা মেনে চলা রাজাদের মত। মানে দায়িত্ব প্রচুর, কিন্তু ক্ষমতা এক তিলও নেই। শিক্ষায় স্বাধিকার এখন সুদূর কল্পনা। নিজের প্রতিষ্ঠানের বা শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্য সরকারি নীতির বিপক্ষে গিয়ে কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার শিক্ষকদের নেই। দুঃখের হলেও সত্যি, রাজনীতি এড়িয়ে চলার এই আবহে সংগঠিত প্রতিবাদ-আন্দোলনের পরিসর থেকে দূরে সরে থাকতেই স্বস্তি বোধ করেন বেশিরভাগ শিক্ষকও। কাজেই, সারা বছর ধরে হয় শাসকের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলানো, নইলে ক্ষমতাহীন দায়িত্বের মনোকষ্টের বোঝা নিয়ে চলা আজ শিক্ষকদের চাকরির বাধ্যতা বা ভবিতব্য।
ফলে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক স্কুলে মার্চ মাস থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনী আনাগোনা শুরু করল, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের পরীক্ষা অনেক স্কুলে নেওয়া গেল না, কোথাও একটা-দুটো পরীক্ষা নিয়ে পরীক্ষা বন্ধ করে দিতে হল, কোথাও স্কুলের একটা অংশ কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ছেড়ে দিয়ে বাকি অংশে তাড়াহুড়ো করে পরীক্ষা শেষ করা হল। এমনকী উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষাও ক্ষতিগ্রস্ত হল। শিক্ষকদের তরফে সংগঠিত বা অসংগঠিত, কোনো প্রতিবাদই কিন্তু তেমন চোখে পড়ল না। ব্যতিক্রম স্টিয়া (এসটিইএ) শিক্ষক সংগঠন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বাহিনী রাখার প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা ফেব্রুয়ারি মাসেই মুখ্যমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন এবং স্কুলশিক্ষাকে ব্যাহত না করে গেস্ট হাউজ, কমিউনিটি হল, ক্লাবঘরে বাহিনী রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন। বলা বাহুল্য, সে প্রস্তাবে কেউ কর্ণপাত করেনি। সশস্ত্র বাহিনীকে কেন সরকারি শিক্ষালয় দখল করেই থাকতে হবে, সে প্রশ্নের উত্তর সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কাছে আছে নেই বোধহয়।
আরো পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা অপরাধ
সংবাদপত্র বলছে, রাজ্যে নির্বাচনের জন্য ২,৪০০ কোম্পানি সেনা মোতায়েন হয়েছে, নির্বাচনের ফল বেরোবার পরের পরিস্থিতি সামাল দিতে থেকে যাবে অন্তত ৫০০ কোম্পানি। গত কদিনের কাগজ ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে— কলকাতার পার্ক ইনস্টিটিউশন, সেন্ট পল’স স্কুল, যোধপুর পার্ক বয়েজ, সেন্ট পিটার স্কুল, টাকি গভমেন্ট স্কুল, দিনাজপুরের প্রায় সমস্ত সরকারি স্কুল, দক্ষিণ ২৪ পরগণার জগদীশপুর স্মৃতিকণ্ঠ ইনস্টিটিউশন, ডায়মন্ডহারবার গার্লস স্কুলে পরীক্ষা ও পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে হয়েছে এই কেন্দ্রীয় বাহিনী আসার কারণে। ভাঙড়ের পোলেরহাট হাইস্কুলে বিনা নোটিশে প্রধান শিক্ষকের ঘরও দখল করেছে বাহিনী, যেখানে স্কুলের সমস্ত দরকারি কাগজপত্র থাকে। বিপুলসংখ্যক জওয়ানকে জায়গা দিতে রাজ্যজুড়ে আরও অসংখ্য স্কুল এভাবেই অচল হয়ে গেছে। যদি এঁদের স্কুলে রাখার সিদ্ধান্তই হয়ে থাকে, তাহলে আগেই শিক্ষা দফতর থেকে পরীক্ষার তারিখ বদল করা হল না কেন? যেসব স্কুল পরীক্ষা হওয়ার আগেই বন্ধ করে দিতে হল, সেখানে এই প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা এবং তার ফলপ্রকাশ কবে হবে? দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা যদি সরকারি নিয়ম মেনে অগাস্টের শুরুতেই নিতে হয়, তাহলে এত দীর্ঘ ছুটির পর সেই পরীক্ষার পাঠক্রম কীভাবে শেষ করা সম্ভব? বেসরকারি স্কুলগুলো কিন্তু দিব্যি চলছে, পরীক্ষা-পড়াশোনা-ফলপ্রকাশের নিয়মে কোনো নড়চড় নেই। অর্থাৎ টাকার জোরে যারা শিক্ষা কিনতে পারল, তাদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটল না। নির্বাচনের মাশুল দেওয়ার দায় শুধু সরকারি স্কুলে পড়তে আসা হাজার হাজার মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের?
এমন অন্তহীন প্রশ্নের সারির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আর কিছু না পারি, সরকারি উদ্যোগে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ করার এই সর্বাত্মক আয়োজনের কথা বারবার বলে যাওয়াও এই সময়ের একটা জরুরি কাজ।
এই ধ্বংসের আরেকটা দিক যেন আমাদের চোখ এড়িয়ে না যায়। নির্বাচনকে বলা হয় ‘গণতন্ত্রের বৃহত্তম উৎসব’। অথচ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষকে অন্যায়ভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে যেভাবে এবারের নির্বাচন হতে চলেছে, এমন অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের নজির ইতিহাসে বিরল। রাষ্ট্রের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গলা তুলতে পারে যারা, দেশ আর রাষ্ট্রের সংজ্ঞা যাদের গোলমাল হয়ে যায় না, মেকি দেশভক্তির বাণী শুনিয়ে রাষ্ট্রের অমানবিক মুখ যাদের সামনে আড়াল করা যায় না, তারা কিন্তু গড়ে ওঠে কোনো না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই। রাষ্ট্র যখন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করে, বন্দুকধারী জওয়ানের সামনে দিয়ে পড়ুয়াদের পরীক্ষার হলে ঢুকতে হয়, তখন মনে পড়ে যায় পিট সিগারের সেই বিখ্যাত গান ‘হোয়াট ডিড ইউ লার্ন ইন স্কুল টুডে, ডিয়ার লিটল বয় অফ মাইন?’
ছোট্ট বাচ্চাটিকে সেই স্কুলে শেখানো হত— ওয়াশিংটনের কর্তারা কোনোদিন মিথ্যে বলে না, পুলিশ সবসময় জনগণের বন্ধু, সরকারকে শক্তিশালী করাই আমাদের কাজ, আমাদের দেশের সেনারা অবধ্য ইত্যাদি। আজকের ভারতবর্ষে আমরা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের অন্ধ স্তাবক তৈরির এমন স্কুলের দিকেই এগোচ্ছি কি? যদি তেমন দুর্দিন আটকাতে চাই, তাহলে যুক্তি-বুদ্ধি-বিজ্ঞানচর্চার স্কুল, ধর্মবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ভালোবাসার কথা বলার স্কুল, অন্যায় মেনে না নেওয়ার স্কুল খোলা রাখার কাজটাও আমাদেরই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








