অনন্য মুখার্জি
ভারতের হিন্দি বলয়ে এ যাবৎ ধারাবাহিক শ্রমিক ধর্মঘট, বিশেষ করে নয়ডা শিল্পাঞ্চলের ‘দাঙ্গা’, এখন খবরের কেন্দ্রে। এ নিয়ে নানা ধরনের মতামত পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে দ্য ওয়্যার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সরোজ গিরির নিবন্ধ সবচেয়ে ভাববার মত, গুরুত্বপূর্ণ এবং তাত্ত্বিক দিক থেকে সময়োপযোগী রচনা। তাঁর মতে, ভারতের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনে এক নতুন ধরনের শক্তির, আন্দোলনের এক নতুন প্রকরণের উন্মেষ ঘটেছে যা স্বতঃস্ফূর্ত, নেতাবিহীন এবং সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রকরণ সচেতনভাবে ট্রেড ইউনিয়ন, রাজনৈতিক দল বা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মত সব পুরনো মধ্যস্থতাকে পাশ কাটিয়ে যায়। চরম ঠিকাদারি ব্যবস্থা আর অনিশ্চিত কাজের পরিস্থিতিতে যেসব প্রবাসী ঠিকা শ্রমিক এমনিতেই সুরক্ষাবিহীন এবং সহজে বাদ পড়ে যেতে পারেন, তাঁরাই এখন নিজেদের দুর্বলতাকে এই প্রকরণের মধ্যে দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করছেন। তাঁরা তথাকথিত দাঙ্গার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। এই প্রতিরোধ পুঁজির নিজস্ব ‘ঠিক সময় মত’ (just-in-time) উৎপাদন ব্যবস্থার মতই আকস্মিক, এবং বিকেন্দ্রীভূত বিস্ফোরণের রূপ নিচ্ছে। এই প্রতিরোধ সরাসরি কাজের জায়গার বাস্তব পরিস্থিতি থেকে তৈরি হয় এবং এমন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চলে যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না, সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সোশাল মিডিয়া প্রায়শই এই প্রক্রিয়াকে আরও ছড়িয়ে দেয়, ফলে রাষ্ট্র বা পুঁজির পক্ষে আগেভাগে আন্দাজ করা বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে প্রচলিত ইউনিয়নগুলো প্রান্তে সরে যাচ্ছে। প্রতিক্রিয়া দেখানো ছাড়া তাদের কিছুই করার থাকছে না। এদিকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হিমশিম খাচ্ছে। গিরির মতে, এটা শুধু পুরনো শ্রম-রাজনীতি ভেঙে পড়া নয়, বরং সংগঠনের এক নতুন রূপের সম্ভাব্য উদয়, যা অস্থায়ী হবে না দীর্ঘস্থায়ী, তা এখনো অমীমাংসিত।
এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ, যা মাথায় রেখে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য শ্রমিক আন্দোলনের নতুন প্রকরণের এই তত্ত্বায়নে কিছু পরিমার্জন করা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই প্রকরণ পুরোপুরি নতুন নয়
স্বতঃস্ফূর্ত, নেতাহীন, তথাকথিত দাঙ্গার চেহারায় শ্রমিক প্রতিরোধ শুধু নয়া উদারনীতির ফল নয়। প্রাথমিক পুঁজিবাদের সময়েও আমরা এটা দেখেছি, সে লুডাইট বিদ্রোহই হোক আর ক্যাপ্টেন সুইংয়ের দাঙ্গা। লুডাইটদের প্রসঙ্গে কার্ল মার্কসের বক্তব্য শুধু যন্ত্র নিয়ে ছিল না। তিনি আসলে বলছিলেন, রাজনৈতিক দিকনির্দেশ না থাকলে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন প্রায়শই আসল শত্রুকে চিনতে ভুল করে, সমস্যার উৎস অর্থাৎ উৎপাদন সম্পর্কের বদলে উপসর্গকে আক্রমণ করে।
আজকের আন্দোলনগুলো কিন্তু অনেক বেশি পরিণত। শ্রমিকরা দিনে আট ঘন্টার বেশি কাজ না করার অধিকার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি আর দ্বিগুণ ওভারটাইমের দাবি তুলছেন। তাঁরা স্পষ্টভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনাকে প্রতিপক্ষ হিসাবে চিহ্নিত করছেন এবং রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করছেন। স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, দ্রুত সরকারি ছাড়, তারপর এক জায়গায় আন্দোলন থেমে যাওয়া এবং অন্য জায়গায় সরে যাওয়া— এই নকশাটাও নতুন নয়। তাই আজকের দিনে এই রূপের নতুনত্ব থাকলেও— যা অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নিবিড় অনুসন্ধানের দাবি রাখে— এই প্রকরণের ঐতিহাসিক ধরনকে উপেক্ষা করলে বাড়াবাড়ি হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়।
এই প্রকরণ এখনো সর্বজনীন নয়
গোটা দেশে, বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে, গত বছর ডিসেম্বর থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০ থেকে ৮০টা জায়গায় ছোটবড় ধর্মঘট হয়েছে, যার কিছু কিছু খবর ছড়িয়েছে, অনেকটাই ছড়ায়নি। ভারতীয় মজদুর সংঘ (আরএসএসের শ্রমিক সংগঠন) বাদে সমস্ত কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় সংগঠনগুলোর ডাকা গত ১২ ফেব্রুয়ারির দেশব্যাপী ধর্মঘটের পর থেকে, বিশেষ করে পানিপথ আইওসিএল ধর্মঘটের পর থেকে, চলমান আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু পানিপথ আর নয়ডার বাইরে ‘দাঙ্গা’ এখনো এই আন্দোলনের সাধারণ বা সর্বজনীন প্রকরণ হয়ে ওঠেনি। যেসব জায়গায় এই প্রবণতা বেশি দেখা গেছে, সেখানে কাজের ধরন খুব অনিশ্চিত, ঠিকাদারিভিত্তিক আর শ্রমিকদের বড় অংশই প্রবাসী। এতে বোঝা যায়, এই ‘দাঙ্গার ধরন’ কোনো সার্বিক নতুন শ্রমিক চেতনার প্রকাশ নয়, বরং নির্দিষ্ট ধরনের শ্রমব্যবস্থার (labour regime) ফল। এই পর্যায়ে এই প্রকরণকে সর্বজনীন বলে ধরে নেওয়া মানে একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিগত বিস্ফোরণকে, তা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, শ্রমিকশ্রেণির চেতনার বড় ধরনের রূপান্তর বলে গণ্য করা।
এই ধরন আংশিকভাবে রাষ্ট্রের দমনপীড়নের ফল
এই দিকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের এই দাঙ্গার মত চেহারা শ্রমিকরা সচেতনভাবে বেছে নেননি, অনেকটাই তৈরি হয়েছে তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের কারণে। যখন সংগঠিত ক্ষেত্রে, বিশেষ করে বেসরকারি শিল্পে, ট্রেড ইউনিয়ন গড়তে আইনিভাবে বাধা দেওয়া হয়, পিকেটিংয়ে পুলিশি হামলা হয় আর বিভিন্ন সংগঠনের শ্রমিক নেতাদের বেআইনিভাবে আটক করা হয়, তখন শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে এমন পদ্ধতি নেন, যা অনানুষ্ঠানিক, নেতাহীন এবং যার দায়িত্ব সহজে অস্বীকার করা যায়।
এই ধরনের কর্মসূচি সাধারণ শ্রমিককে কিছুটা সুরক্ষা দেয়, কারণ এতে নির্দিষ্ট কাউকে দমন করা কঠিন হয়, সামগ্রিক দমনের প্রশ্ন চলে আসে। যে কারণে আদিত্যনাথ সরকারের বারবার ‘উসকানিদাতা’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’ খোঁজার চেষ্টা। সেভাবে কোনো নেতা নেই, তাই বস্তি ধরে ধরে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার পরিজনকে আটক করার ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে এই প্রকরণের আন্দোলন রাষ্ট্রের দমননীতিকে বিভ্রান্ত করতে সফল হচ্ছে। কিন্তু একথাও মানতে হবে যে, আন্দোলনের এই প্রকরণ রাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়েছে। ফলে এর ভিতরে শ্রমিক চেতনা উন্মেষের সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি সীমাবদ্ধতাও আছে।
ইউনিয়নের অনুপস্থিতি বনাম ইউনিয়নের ব্যর্থতা
এবার আমরা একটা অত্যন্ত বিতর্কিত তাত্ত্বিক প্রশ্নে পৌঁছলাম। কারণ এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক মানে একেবারেই আলাদা। গিরির মতে, অন্তত ২০১৩ সালের মারুতি সুজুকি আন্দোলনের পর থেকে ট্রেড ইউনিয়নগুলো ধীরে ধীরে প্রান্তে সরে গেছে। এখন তারা অনেক সময় এমন ভূমিকায় নেমে এসেছে যেখানে শ্রমিকরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়, আর ইউনিয়ন শুধু সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রচার চালানোর কাজ করে।
কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণগত (causality) প্রশ্ন আছে, যা রাজনৈতিকভাবে খুবই জরুরি। ইউনিয়নগুলো কি এই জায়গাগুলোতে ঢোকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছে, যা আমলাতান্ত্রিকতা বা শ্রেণি সমঝোতার দিকে ইঙ্গিত করে? নাকি পুঁজি আর রাষ্ট্র মিলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে ইউনিয়ন গড়ে তোলা বা তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি, আর সেই অনুপস্থিতি থেকেই এই নতুন ‘দাঙ্গার ধরন’ তৈরি হয়েছে? নাকি এই দুই কারণই একসাথে কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আলাদা আলাদা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়। আমরা কি এই আন্দোলনের প্রকরণের মধ্যে বিদ্যমান ট্রেড ইউনিয়নের ব্যর্থতা দেখছি, নাকি ট্রেড ইউনিয়ন নামক ধারণাটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে? এই দুটো অবস্থান এক নয়।
ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের দাবির উত্তরাধিকার
এই আন্দোলনে কোনো আনুষ্ঠানিক ইউনিয়ন নেতৃত্ব নেই, তবুও আট ঘন্টা কাজের দাবি উঠে এসেছে। এর মানে এই নয় যে এই আন্দোলন হঠাৎ শূন্য থেকে আবির্ভূত হয়েছে। বরং এটা দেখায় যে বহু বছর ধরে চলা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন শ্রম কোডের বিরুদ্ধে সারা দেশে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ইউনিয়নগুলোর যে আন্দোলন ও প্রচার হয়েছে, তাদের সীমাবদ্ধতা আর রাজনৈতিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও, সেগুলো শ্রমিকদের সাধারণ বোধে ঢুকে পড়তে পেরেছে।
আন্তোনিও গ্রামশি যাকে ‘বৈপরীত্যপূর্ণ চেতনা’ বলেছেন, সেরকমই শ্রমিক শ্রেণি একইসঙ্গে শাসক শ্রেণির মতাদর্শ বা dominant ideology আর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি ‘নিচুতলার’ জ্ঞান (subaltern knowledge) দুটোই সমান্তরালভাবে বহন করে। কোনো তীব্র সংকটের মুহূর্তে এই দুয়ের সমান্তরালতা মুছে যায়। তখন সেই নিচুতলার জ্ঞান বা সাধারণ জ্ঞান প্রধান হয়ে ওঠে এবং সামনে চলে আসে। এখন প্রশ্ন হল, এই আট ঘন্টা কাজের দাবি কি শুধু একটা স্লোগান, যা তার রাজনৈতিক অর্থ থেকে আলাদা হয়ে ভাসছে? নাকি শ্রমিক শ্রেণি সত্যিই তার গভীরতর গুণগত রাজনৈতিক অর্থ বুঝে এই দাবি তুলছে, যে শ্রমশক্তির একটা মাত্রা আছে, যা পুঁজি ইচ্ছে মত ভাঙতে পারে না?
বাহ্যিক দ্বন্দ্ব ও চেতনার প্রশ্ন
যদি আমরা জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, এলপিজি সংকটের কারণে তা আরও তীব্র হওয়াকে এই আন্দোলনের এক প্রধান কারণ হিসাবে ধরি, তাহলে একটা পুরনো, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এসে পড়ে— অর্থনৈতিক চেতনা আর রাজনৈতিক চেতনার সম্পর্ক কী? লেনিন What Is to Be Done রচনায় দেখিয়েছিলেন যে ট্রেড ইউনিয়ন চেতনা, এমনকি লড়াকু ট্রেড ইউনিয়ন চেতনা, সাধারণত মানুষের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সমস্যার অভিজ্ঞতা থেকেই তৈরি হয়। কিন্তু সমাজ বদলানোর মত রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করতে গেলে সেই অভিজ্ঞতার বাইরে থেকে সচেতন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দরকার।
এই দিক থেকে দেখলে, যদি এলপিজি সিলিন্ডারের অভাব আর জীবনযাত্রার খরচের সংকটই প্রধান ট্রিগার হয়, যা এমনিতেই খুব খারাপ অবস্থায় থাকা শ্রমিকদের দৈনন্দিন জীবনের সংকটকে আরও তীব্র করেছে, তাহলে শ্রমিক শ্রেণির এই হঠাৎ বিস্ফোরণ হয়ত কর্মক্ষেত্রের ভিতরে কোনো ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক চেতনার ফল নয়, বরং বাইরের চাপ বা দ্বন্দ্বের ফল— এমন দাবি করা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন উঠে আসে— এত খারাপ কাজের পরিবেশ যখন আগে থেকেই ছিল, তখন আগে কেন এই ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেনি? সম্ভবত এখন সহ্যের সীমা পার হয়ে গেছে। তাহলে কি আন্দোলনের এই চেহারা কি অস্তিত্বের সংকটের কারণে তৈরি হয়েছে?
এখানে একটা তফাত করা দরকার। সংগঠিত উৎপাদন ক্ষেত্রে কাজ করা প্রবাসী ঠিকা শ্রমিকরা, যাঁদের প্রায় কোনো সম্পত্তি নেই, এমনকি মার্কস যাকে মিথ্যা সম্পত্তি (Sham Property) বলেছিলেন, সেটাও প্রায় নেই, তাদের অবস্থান সেইসব শোষিত গোষ্ঠীর থেকে আলাদা, যাদের ছোটখাটো সম্পত্তি বা নিয়ন্ত্রণের ভ্রম এখনো আছে। এই ভ্রমও চেতনার উপর প্রভাব ফেলে। সেদিক থেকে, সংগঠিত ক্ষেত্রের প্রবাসী ঠিকা শ্রমিকদের, ধ্রুপদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আধুনিক সর্বহারা (modern proletariat) বলা যেতে পারে। এদের পক্ষে নিজের সমস্যাকে অবস্থানগতভাবে সাধারণীকরণ করা সহজতর। কিন্তু শুধু এই অবস্থান থাকলেই রাজনৈতিকভাবে সেই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথের সাধারণীকরণ করা সম্ভব হয় না। তার জন্য কোনো না কোনো মধ্যস্থতা বা সংগঠনের প্রয়োজন পড়ে।
গঠনমূলক দিকনির্দেশের প্রশ্ন
গিরির নিবন্ধ সঠিকভাবেই তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্তে পৌঁছবার বিরুদ্ধে সতর্ক করে। তাঁর মতে এই ‘দাঙ্গা’ প্রকরণ বা সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়াই হয়ত নতুন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠনের রূপ হয়ে উঠছে; অন্তত তার ভিতরের উপাদানগুলো বহন করছে। কিন্তু তাহরির স্কোয়ার বা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের ঘটনাগুলো আমাদের সতর্ক করে দেয়। সেখানে আমরা দেখেছি, বিশাল স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত অন্য শক্তির হাতে চলে গেছে। সেটা কখনো ইসলামপন্থী রাজনীতি, কখনো সেনাবাহিনী, আবার কখনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সমর্থিত ‘সুশীল সমাজ’। কেন এমন হয়? কারণ, এমন কোনো সংগঠিত শক্তি ছিল না, যার রাজনৈতিক স্পষ্টতা ও সামাজিক ভিত্তি আছে এবং যা আন্দোলনকে উত্তরণের পথে নিয়ে যেতে পারে। সোশাল মিডিয়া কখনোই এই সমস্যার সমাধান নয়, কারণ শেষ পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মগুলো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পুঁজির নিয়ন্ত্রণেই চলে।
এখানে আসল প্রশ্নটা হল, শুধু অভিযোগ জমতে থাকলেই কি তা নিজে থেকে মৌলিক গুণগত রাজনৈতিক পরিবর্তনে পরিণত হয়? একথা অবশ্যই সত্যি যে পুরনো সংগঠনের ধরনগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাই বলে ট্রেড ইউনিয়ন বা সংগঠন পুরোপুরি অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে এমন নয়। সংগঠিত ক্ষেত্রকে পুঁজি খুব শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যাপক ঠিকাকরণ, আইনি দমন আর খুব দ্রুত নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের (hire and fire) নীতির মাধ্যমে। কিন্তু শ্রমিকরা তো কাজ শেষ হলেই অদৃশ্য হয়ে যান না। তাঁরা বস্তিতে থাকেন, শহরের প্রান্তিক অঞ্চলে ভাড়া বাড়িতে থাকেন, শ্রমিক কলোনিতে থাকেন, যেখানে বেঁচে থাকার লড়াই, মানে খাওয়া-থাকা-চিকিৎসার সংকট সবচেয়ে তীব্র। অথচ এই জায়গাগুলোতেই ট্রেড ইউনিয়ন আর বাম সংগঠনগুলোর কার্যত কোনো উপস্থিত নেই। তারা মূলত কারখানার গেট, শ্রম দফতরের অফিস, সোশাল মিডিয়া ও সেমিনার হলেই সীমাবদ্ধ।
‘এরপর কোথায়’ থেকে ‘এরপর কী’
এই যে শ্রমিক প্রতিবাদের ঢেউ— যাকে আমরা দাঙ্গা প্রকরণ (riot form) বলছি— স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর নতুনভাবে ভাবা দরকার। এখন সবার মনেই প্রশ্ন উঠছে যে নয়ডা তো হল, এরপর কোথায়? কিন্তু এই প্রশ্নটা এই চলমান শ্রমিক আন্দোলন মূল যে ইঙ্গিত বহন করছে, তাকে কোথাও না কোথাও ঢেকে দিচ্ছে। আমাদের প্রশ্ন করা দরকার—এরপর কী?
চলমান শ্রমিক আন্দোলনের ট্রিগার যেহেতু বেঁচে থাকার প্রশ্ন বা social reproduction-এর জায়গা থেকে উদ্ভূত, সেহেতু অবশ্যই এই আন্দোলন আগামীদিনের সাংগঠনিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রের দিকেও স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। পাড়া বা মহল্লাভিত্তিক কাজ কোনোভাবেই শ্রেণি রাজনীতি থেকে সরে আসা নয়। বরং এটাকেই আসল শ্রেণি রাজনীতি বলা উচিত। কারণ পুঁজি শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, মানুষের থাকার জায়গা, চিকিৎসা, খাবার, দৈনন্দিন জীবন— সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যদি রাজনীতি শুধু কারখানার চৌহদ্দিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে শ্রমিকদের জীবনের বাকি অংশ পুরোপুরি পুঁজি আর রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। একথা আরও বিশেষ করে প্রযোজ্য এমন এক যুগে, যখন কর্মক্ষেত্র আর বসবাসের জায়গা বা জীবনের পুনরুৎপাদনের জায়গাকে পুঁজি এক করে দিয়েছে। তাই দরকার পাড়াভিত্তিক সংগঠন, যা শুধু ট্রেড ইউনিয়নের সাহায্যকারী কাজ নয়, বরং শক্তিশালী স্বশাসিত আর্থরাজনৈতিক সংগঠন গড়ার কাজ। যেমন যৌথ রান্নাঘর, আবাসন সমবায়, কমিউনিটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ, নানা ধরনের কো-অপারেটিভ। যা দিয়ে একসাথে বাজার করা যাবে, যাতে কম দামে কেনা যায়, বা উৎপাদিত পণ্য একসাথে বাজারে বেচে বেশি দাম পাওয়া যায়। পাড়ার লাইব্রেরিও শুধু সহায়ক কাজ নয়। এগুলো আসলে দেখায় ব্যক্তিমানুষ কীভাবে একটা সমষ্টির অংশ হয়ে সমষ্টির ভালোমন্দের ভিত্তিতে নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এলপিজি সংকট, যা সম্ভবত এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কারণ, সেটা আসলে এই দৈনন্দিন জীবনের সংকট। তাই এখানেই সংগঠিত রাজনীতির ভিত্তিভূমি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আরো পড়ুন নয়ডার শ্রমিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে ইতিহাস তৈরি হবে
তবে এতে একটা বড় ঝুঁকিও আছে। এই ধরনের উদ্যোগ এনজিও মার্কা হয়ে যেতে পারে। মানে শুধু পরিষেবা দেওয়ার জায়গা হল, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক শক্তি তৈরি হল না। সেখানে আসল লড়াইটা হল, এই উদ্যোগগুলো যেন শুধু সহানুভূতি দেখানোর কাজ না হয়ে ওঠে সেটা খেয়াল করা। বরং নতুন ধরনের স্বশাসন, নতুন রাজনৈতিক চেতনা তৈরি করার কাজ করা। তাই এই সংগঠনগুলোকে বা উদ্যোগগুলোকে শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক ও বড় দাবির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যেমন সামাজিক পরিকল্পনার অধিকার, উৎপাদনের উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আর সামাজিক উদ্বৃত্তের উপর গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন। তবেই পাড়া শুধু বেঁচে থাকার সংগ্রামের জায়গা থাকবে না, রাজনৈতিক শক্তির জায়গা হয়ে উঠবে।
এই মুহূর্তে ‘দাঙ্গা প্রকরণ’ হয়ত শ্রমিকদের শক্তির সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ। কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট কিনা, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তা নির্ধারিত হবে একমাত্র আগামীদিনে কী ধরনের নতুন সংগঠন গড়ে ওঠে তার ভিত্তিতে।
নিবন্ধকার প্রাক্তন পাবলিক পলিসি পেশাজীবী। বর্তমানে এসওএএস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে গবেষণারত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







