বরানগর জুট মিলে তখন কমবেশি শ্রমিক অসন্তোষ চলছে। স্থায়ী শ্রমিকের বদলে ঠিকা শ্রমিকদের দিয়ে কাজ চালানোই এর কারণ। সেই সময়েই কারখানার এক ম্যানেজারের সঙ্গে এক শ্রমিকের বাদ-বিসম্বাদ হতে হতে তিনি নিজের রাইফেল থেকে সেই ক্ষুব্ধ শ্রমিকের উপর গুলি চালিয়ে দেন। বেচারি মজুরটি মারা যান। এই ঘটনায় স্তম্ভিত ও উত্তেজিত অন্য শ্রমিকরা তুমুল বিক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং সেই ম্যানেজারটিকে কারখানার ভিতরেই পিটিয়ে মারেন। সূক্ষ্ম আইনের আতশকাচে কার দায় কতটুকু— সেই প্রশ্ন অবান্তর। তবে মণিভূষণের ‘গান্ধীনগরের রাত্রি’ কবিতায় গোকুল বলে ‘এবার প্যাঁদাবো শালা হারামি ওসি-কে’। পরদিন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব অকুস্থলে আসেন। কারখানা ম্যানেজারের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং নিহত শ্রমিকটির নোংরা বস্তির ঘরে তিনি গিয়ে উঠতে পারেন না।
এটা এই শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকের কথা, সম্ভবত ২০০১-০২ সাল। এর থেকে আরও বছর কুড়ি আগে ফিরে যাই। হুগলী জেলার নর্থব্রুক জুটমিলের একদল শ্রমিক সভা করছেন এক ছোট মলিন ঘরে। কুপির আলোয় প্রোজ্জ্বল ছায়া ছায়া মুখ। মিলে কোনো শ্রমিক অশান্তি ছিল না, তবু মালিক লক আউট ঘোষণা করেছেন। তখন বামফ্রন্টের যুগ। অথচ চেনা ট্রেড ইউনিয়নগুলি খানিক লুকোচুরি খেলছে শ্রমিকদের সঙ্গে। এবারে তাঁরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন— সবাই নিজের নিজের পরিবার নিয়ে ঘিরে ফেলবেন মালিকের প্রাসাদ। অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই যা আলিপুরের অভিজাত এলাকায়, প্রাকার বেজায় উঁচু, দ্বাররক্ষীকে এড়িয়ে মাছি গলার জো নেই। লালবাজারের নিপুণ পাহারায় বিধস্ত নারী-পুরুষের দলটিকে আটকিয়ে দেওয়া হয় অনেক আগেই।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আরও একটি ঘটনা ঘটেছিল প্রকাশ্য দিবালোকে। শ্রীরামপুরের সারাভাই গোষ্ঠী পরিচালিত স্ট্যান্ডার্ড ফারমাসিউটিক্যালে কোনোকালে শ্রমিক অশান্তি ঘটেনি। তাঁদের তৈরি পেনিসিলিনের বাজার ছিল একচেটিয়া। কিন্তু তাঁরাই কৌশলে পুঁজি সরিয়ে নিয়ে সুবিখ্যাত এই কারখানাটিকে রুগ্ন করে এখান থেকে পাততাড়ি গোটান। গত শতাব্দীর আটের দশকে বন্ধ কারখানার উপর সমীক্ষা করার জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তেওয়ারি কমিটি তৈরি করে। কমিটি তার সুনির্দিষ্ট রিপোর্টে জানিয়েছিল, মাত্র ২% কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ হল শ্রমিক অসন্তোষ। এটি জনপরিসরে চালু বয়ানের একেবারে বিপরীত।
এই ঘটনাগুলি থেকে আরও বছর পঁচিশেক এগিয়ে এসেছি আমরা। এই সময়কালে বিপুল ও বিস্তৃত প্রচারে কয়েকটি বার্তা রোপণ করে দেওয়া হয়েছে। যেমন ১) সাবেকি সমাজতান্ত্রিক চাল আর ভাতে বাড়ছে না। ২) সাম্যের ধারণায় মার্কসবাদ ব্যাপারটার আসলে গোড়ায় গলদ এবং ৩) শ্রেণি-ফ্রেণি দিয়ে আর কিছু ব্যাখ্যা করা যাবে না। ভারি সুন্দরভাবে এই রোপিত (আসলে আরোপিত) আখ্যানের ফাটাফাটি শিরোনাম হল ‘গড দ্যাট ফেইল্ড’। অতএব, উপপাদ্যটি হল ‘দেয়ার ইজ নো অল্টারনেটিভ’। অর্থাৎ পুঁজিবাদের কোনো বিকল্প নেই।
এই ফোলা বেলুনটিকে হাওয়া দিয়ে আরও ফুলিয়ে সবার উপরে পুঁজি সত্য— এই বেদবাক্য উচ্চারণ করতে পারলে আহ্লাদ হয়। কিন্তু দিনকালের গতিপথ বুঝতে গেলে গলা আটকে আসে শোলোক বলা কাজলাদিদির। কারণ বাঁশবাগানের মাথার উপর যে চাঁদ উঠেছে, তাতে পিৎজার থেকে পোড়া রুটির ছায়া তীব্রতর। এটা ঠিক যে বিশ শতক শুরু হয়েছিল মার্কসবাদ নামক একটা প্রকাণ্ড হাতিয়ারকে সামনে রেখে। যে কমিউনিস্ট ইশতেহারে লেখা হয়েছিল ইউরোপ কমিউনিজমের ভূত দেখছে, সেই ভূত ‘বর্তমান’ হয়ে দেখা দিয়েছিল রাশিয়ায় ও পূর্ব ইউরোপের দেশে দেশে এবং এক শতকের মধ্যেই তা আবার ভূত হয়ে গেল প্রায় গোটা বিশ্বেই।
এই ভূতায়নের হরেক কারণ। বিশেষত নিজেদের মাতব্বর ভাবা এবং শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের মত খুব স্পর্শকাতর ধারণাটিকে নিজেদের কোলে টেনে পরিণামে নালে ঝোলে একাকার হয়ে যাওয়া। রাশিয়ার চিঠি-তে ‘ছাঁচে ঢালা মনুষ্যত্ব’ বরাবর না টেকার ভবিষ্যদ্বাণী করা সত্ত্বেও ১৯৩০-এর দশকে রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত ইউনিয়নের যে চেহারা দেখেছিলেন, তাতে তাঁর মানবিকতার আদর্শ কৃতজ্ঞতায় সিক্ত হয়েছিল। মৃত্যু-পূর্ববর্তী অসুস্থতার মধ্যেও তিনি খবর নিয়েছিলেন রণাঙ্গনের, এবং চেতনা লোপ পাওয়ার আগে পর্যন্ত বলেছিলেন— ওরাই পারবে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট দলের ৩৩ জন পলিট ব্যুরো সদস্যের মধ্যে ২১ জনের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না— এটা আজ আর লুকিয়ে রাখার মত কথা নয়। কিন্তু তার অজুহাতে সামাজিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ব্লকের মনে রাখার মত উন্নতি ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ বিপরীত শিবিরের মধ্যে গুপ্তহত্যা ও নিতান্তই পুঁজির স্বার্থে গণহত্যা ছিল প্রায় জলভাত। এ পক্ষের বিরুদ্ধে কামান দাগতে গিয়ে ওইসব লাশ আমরা দেখি না বলে সেগুলো ঘটেনি এমন তো নয়।
গত শতকের নয়ের দশকে সেই কামানবাহিনী গোলা ফেলার বেশ একটা চওড়া জায়গা পেয়ে গেল। কিন্তু সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতর আসলে যে প্রায়োগিক মার্কসবাদের চর্চারই নানা ধারা বিকশিত হয়েছিল— সেকথা আমরা ভুলেই গেলাম বা আমাদের ভুলিয়ে দেওয়া হল। ল্যাবরেটরিতে সব পরীক্ষায় সাফল্য আসে না। তার মানে বিজ্ঞানের মূল তত্ত্ব ভুল নয়। আর সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তো বিষয়টা আরও গোলমেলে। কিন্তু যেহেতু অবশিষ্ট বিশ্ব সন্ত্রস্ত ছিল পিছিয়ে থাকা সবহারাদের এই ধরনের মাথায় উঠে যাওয়া নিয়ে, তাই সেই ব্যবস্থাটা যখন নড়বড়ে হয়ে ভেঙেই পড়ল, সবথেকে বেশি হইহই করে উঠল তারাই। ‘দ্যাখ কেমন লাগে! বলেছিলাম না এসব জিনিস দুনিয়ার নিয়মের ধাতে সয় না?’
ঠিক যেভাবে রঘুপতি ক্রমাগত সওয়াল করে চলে বিশ্বব্যাপী হিংসার পক্ষে, বেঁচে থাকার প্রতি অণুতে সে খুঁজে পায় হিংসার ফুটন্ত লাভা; তেমনই পিছু পিছু বাসা বাঁধল বিশ্বায়ন নামক একটি আপাত মোলায়েম বিশ্বদর্শন। এই ব্র্যাকেটের মধ্যে সবই নাকি উন্মুক্ত, মানে খোলাখুলি— বুকের কাঁচুলি থেকে কোমরের কাপড়। যথানিয়মে সেগুলি খসেই পড়ল এবং স্লটে স্লটে বিক্রি হয়ে গেল। কার্ল মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদী সভ্যতায় সবই পণ্য, এমনকি ব্যক্তিগত আবেগ ও সম্পর্কও। ‘নিয়ন আলোয় পণ্য হল যা কিছু আজ ব্যক্তিগত’। আদপে এইভাবে মার্কসীয় বীক্ষা যখন প্রায় খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে তখনই বলা হল— ওগুলো কিছু নয়।
যতদূর জানি, মার্কস-এঙ্গেলসের রচনাবলী ১০০ খণ্ডে প্রকাশ করার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল একদা। রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এত বিপুল ভাবনাচিন্তার কোনো তুলনীয় উদাহরণ আছে কিনা জানা নেই। স্বাভাবিকভাবেই এত বিস্তৃত চিন্তার সবটাই সবসময় প্রাসঙ্গিক থাকবে, পরিবর্তনশীল বিশ্বে এমনটা হতে পারে না। এরকম কোনো গোঁড়ামির কথা মার্কস ভাবেননি। শোনা যায়, শেষ জীবনে তিনি বন্ধুদের মজা করে বলেছিলেন ‘থ্যাংক গড, আই অ্যাম নট এ মার্কসিস্ট!’ কৌতুক হলেও, মার্কসের মুখে ‘গড’ প্রসঙ্গ সেই প্রথম ও সেই শেষ। কিন্তু এতবড় চিন্তাবিদের বহু ভাবনা বহু স্বর থাকলেও মৌলিক কিছু ভাবনার প্রাসঙ্গিকতা আজও সমানভাবে অর্থবহ। আজ এই যুগে, এই মুহূর্তে গোটা বিশ্বে ও আমাদের এই উপমহাদেশে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রধান দ্বন্দ্বটা কী? স্পষ্টত, আগ্রাসী পুঁজির বিরুদ্ধে প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম। উত্তর-বিশ্বায়নের চোখে চালশে পড়লেও সে কি এই দ্বন্দ্বের কোনো বিকল্প ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দিতে পেরেছে? খুব গোদাভাবে বিশ্বায়িত পুঁজির বরণডালায় খুঁজে পাওয়া যায় চোখের বিদেশি সানগ্লাস, পায়ের ব্র্যান্ডেড স্নিকার, পকেটে অ্যাপল আইফোন, চোখের উপর খ্যামটা নাচা মিডিয়া আর হঠাৎ-বড়লোক এক ব্রয়লার প্রজন্ম। এর বাইরে আর কিছু আছে নাকি?
প্রায়োগিক মার্কসবাদ নিয়ে দুনিয়া জুড়ে এষণার অন্ত নেই। তারা পোস্টমডার্ন থেকে পোস্ট ট্রুথের ভিকট্রি স্ট্যান্ডে উঠে পড়ে হাত নাড়াচ্ছে। কিন্তু আমার দেশের কৃষক ফসলের দাম পায় না বলে খালি পায়ে হেঁটে রক্তাক্ত হয়ে প্রতিবাদ জানান। চুক্তি চাষের আওতায় উপড়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের পছন্দমত ফসল ফলাবার অধিকার। আরেক দিকে দেশের সরকারি, বেসরকারি সমস্ত সংস্থার স্থায়ী চাকরি মাওবাদীদের মতই নিকেশ করা হয়েছে অবাধে। অস্থায়ী চাকরি কেড়ে নিচ্ছে শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা, আরও আরও বিপন্ন করে তুলছে তাঁকে। সামান্য কিছু সরকারি অনুদান তাঁদের আরও দূরে সরিয়ে রাখছে নিয়মিত ও ন্যায্য মজুরির দাবি থেকে। এগুলো শোষণ না মস্তি?
মার্কসের বিবেচনায় যে সাম্রাজ্যবাদের ধারণা, তা-ই তো আজ কপি পেস্ট হয়ে একদিকে আমার দেশের মানব সম্পদ, ভূপ্রকৃতি, জল, জমি পাহাড়, জঙ্গল সব দখল করে নিচ্ছে। অন্য হাতে বাজিয়ে তুলছে দুনিয়া জোড়া নানা যুদ্ধের ফিফথ সিম্ফনি। তাহলে এখন কোনটা বেশি প্রাসঙ্গিক— গায়ত্রী মন্ত্র না মার্কসের ভাবনা? মার্কসের ভাবনাচিন্তাকে যাঁরা পরবর্তীকালে নতুন করে বিবেচনা করেছেন, তাদের ভাঁড়ারে দুটো আপত্তি।
একটা হল, ইউরোপের শিল্প বিপ্লবের আলোয় মূলত নির্মাণশিল্পের ভিত্তিতে মার্কসের মতবাদের কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা এশিয়ার উৎপাদন কাঠামোর সঙ্গে মেলে না। তাঁদের বক্তব্য হল, ইউরোপে যেমন খুব নির্দিষ্টভাবে দাস ব্যবস্থা থেকে সামন্তবাদে উত্তরণ ঘটেছিল, এশিয়ার দেশগুলিতে সেই বিভাজন খুব স্পষ্ট নয়। পরের কথাটি হল, প্রযুক্তির নতুন অগ্রগতি ও তার সামাজিক রাজনৈতিক অভিক্ষেপ মার্কসের বিবেচনায় আসেনি।
আসা সম্ভবও ছিল না। ঠিক যেমন ভাবে ‘আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে আমারে’ লেখা রবীন্দ্রনাথ জানতেন না যে একদিন সত্যিই আমরা মহাবিশ্বের অনেক নক্ষত্রের আরও নিবিড় অনুশীলন করতে পারব। পাশাপাশি একথাও ঠিক, পরের দিকে ‘এশিয়াটিক মোড অফ প্রোডাকশন’ সংক্রান্ত রচনায় মার্কস ইউরোপ ও এশিয়ার উৎপাদন কাঠামোর প্রভেদ বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন। আমাদের দেশের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকেও স্বতন্ত্র বিচারের আলোয় দেখেছেন। কিন্তু বিশ্বজোড়া প্রযুক্তি বিস্ফোরণের মধ্যে যাঁরা মার্কসবাদে পোড়া ছাই দেখতে পান, তাঁদের কাছে বিনীত জিজ্ঞাসা— প্রযুক্তির বিস্ময়কর বিস্তৃতিকে তাঁরা কি সমানাধিকারের বিজয় পতাকা বলে হাততালি দেবেন? শুধু একটিমাত্র ভোটের সাম্য নয়, ২০,০০০ বিলিয়ন ডলার শিল্পগোষ্ঠীর পরিচালক আর পাড়ার টোটো চালক, দুজনের মোবাইল ফোনেই একই কল চার্জ। সুতরাং দুজনেই হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছেন দুনিয়াকে? আহা কী আহ্লাদ! প্রযুক্তির কী সুন্দর ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’! যদিও দুজনের হাত ও পকেটের গভীরতা আসমান জমিন, তবু দুজনের রোজগারে জিডিপি আট মাসের পোয়াতির মত স্ফীত। তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, সব্বোনেশে মার্কসের কথা মনে এনে মোটেও ডানা ঝাপটিও না।
এখন নব্য দুনিয়ায় কর্পোরেটনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিতে কর্মীদের শ্রমিক না বলে ‘পার্টনার’ বলা হচ্ছে। কীসের পার্টনার? মুনাফার না বঞ্চনার?
একজন উবের চালক বলেছিলেন, তাঁদের অ্যাপে নাকি এমনভাবে প্রোগ্রামিং করা আছে, যাতে মাসে মোটামুটি ১৮,০০০-২০,০০০ টাকা রোজগার করতে গেলে তাঁদের দৈনিক কম করে ১৮ ঘন্টা ডিউটি করতে হয়। এর কম ডিউটি করলে ওই টাকা কিছুতেই আয় করা যাবে না। ই-কমার্সের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি গিগ শ্রমিক জানেন, কীভাবে দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ইনসেন্টিভের লোভে তাঁকে দৌড়তে বাধ্য করা হয়। এমনকি জীবনেরও তোয়াক্কা না করে বাইকে বাইকে ছুটে চলেছেন আজকের রানাররা— পিঠে সুখাদ্যের বোঝা, আর তাঁদের প্লাস্টিকের টিফিন কৌটোয় বিষণ্ণ রুটি আর আলুভাজা। এগুলো শিকল না নেকলেস?
আরো পড়ুন উদারপন্থী ঘোমটার নিচে সাম্রাজ্যবাদের খ্যামটা নাচ বন্ধ করেছেন ট্রাম্প
কার্যত যে বাস্তবতায় আমরা আজ প্রশ্বাস নিচ্ছি, তার গোটাটাই বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত। খাওয়া-পরা-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-প্রমোদ— প্রতিটি বেঁচে থাকার প্রদেশ আজ পুঁজির মুক্তাঞ্চল। রাষ্ট্র সেখানে গাছের গুঁড়ি সরিয়ে বাকিদের ঢোকার রাস্তা তো করেই না, বরং আরও আরও ব্যারিকেডে পাহারা দেয় ওই চিড়িয়াখানাকে। তাহলে বিশ্বায়ন নামক ভেল্কিবাজির আড়ালে স্বপ্নের দিন আনবার যে ঢপবাজি, তার পাপের ঘড়া কি এখনো পূর্ণ হয়নি?
যত দিন যাচ্ছে, আরও আগ্রাসী চেহারায় আবির্ভাব ঘটছে মারমুখী পুঁজির। প্রতিটি এলাকার প্রতিটি প্রদেশাঞ্চল দখল নিয়ে যে আজ বেপরোয়া। সম্ভবত এই আশঙ্কা ও তার পরিণতি মার্কসের বিশ্ববীক্ষায় ছিল। প্রান্তিক মানুষ যে পুঁজির আওতায় আরও পরিধির বাইরে চলে যাবেন, এর মধ্যে কোনো গ্রহ নক্ষত্রের বিধান নেই। নিজের প্রজ্ঞা ও মেধা দিয়ে মার্কস এই বিশ্লেষণ করেছেন। তাকে ‘টাইমড আউট’ বলে যাঁরা প্রেতনৃত্য করছেন, হয় তাঁরা ধান্দাবাজ অথবা নিরেট।
এইসব বাচনের মধ্যে যাঁরা মৌলবাদের পরমাণু খুঁজবেন, তাঁদের জন্য ছোট্ট একটা ডিসক্লেমার— বিজ্ঞানের নানা তত্ত্ব নিয়ে নানা কাটাছেঁড়া হলেও, মৌলিকভাবে বস্তু বিজ্ঞান কতগুলো তত্ত্বকে মেনে নেয়। নইলে বিজ্ঞানচর্চার ধাঁচাটিই ভেঙে পড়ে। মার্কসের মত ব্যক্তির অনুধ্যান মালা হতে খসে পড়া ফুলের একটি দল নয়, বৈজ্ঞানিক এক নিবিড় চর্চার শস্য, যার মধ্যে পরিবর্তনের ফোটন কণাই থেকে গেছে, আলো নিভে যাওয়া ডার্ক ম্যাটার নয়। বিশ্ব মনীষার আলোয় যদি রবীন্দ্রনাথকে চাই, তাহলে দীপ্ত মানবমুক্তির জন্য চাই মার্কসবাদের দীপশিখা। যেদিন বোঝা যাবে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে, সেদিন সত্যিই নামিয়ে রাখব গাণ্ডীব। আজ সেই দিন নয়।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।









এইসব ফালতু কথা না ঝেড়ে.. তোমরা বাপু.. basic economics পড়া শুরু করো and see the reality..
Jottosob brairot আলোচনা..
Audacity … to know nothing , to learn nothing .. শুধু কতক গুলো vulgar Marxist conspiracy theories দিয়ে কেবল মস্তক এর কোষ গুলোর ক্ষতি সাধন করা..
No body should be allowed to talk economics without completing basic microeconomics , macroeconomics , developement economics & social choice and public choice theories …
আগে এইগুলো পড়ে নিন.. তৎপর নিজেকে intellectual বলে জাহির করার চেষ্টা করুন.
Jottosob ..