প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী
চারদিকে হুলস্থুল, বিশেষত পাশ্চাত্যে। নামজাদা সংবাদমাধ্যম আর উদারপন্থী ভাষ্যকারদের শব্দভাণ্ডারে সবেমাত্র একটি নতুন শব্দ আবির্ভূত হয়েছে— সাম্রাজ্যবাদ! রয়টার্স সতর্ক করে দিয়েছে যে ‘ট্রাম্পের বিদেশনীতিকে বিশেষজ্ঞরা সাম্রাজ্যবাদী বলে অভিহিত করেছেন।’ কানাডার বিখ্যাত ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা প্রেস ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যাবর্তনের’ কথা বলেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
আর আমরা ভাবছি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইরাক এবং আফগানিস্তান আক্রমণ করেছিল, তখন এরা কোথায় ছিল!
তবে এটা ঠিক যে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতির অপহরণ, কিউবা, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধে হুমকি, গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষিত অভিপ্রায়, পিছিয়ে থাকা দেশগুলির উপর শুল্কের বোঝা চাপিয়ে তাদের মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে বাধ্য করা, গাজার পুনর্গঠনের জন্য বোর্ড অফ পিস তৈরি, পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত— সব মিলিয়ে গত কয়েক সপ্তাহে আমেরিকা বিশ্ব পরিস্থিতিতে একটা পরিমাণগত পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প আর ওইসব ‘গণতন্ত্র, স্বাধীনতা’ জাতীয় প্যানপ্যানানির আড়াল নিচ্ছেন না। স্পষ্ট বলছেন, তিনি ভেনেজুয়েলার তেলের জন্য নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেছেন, গ্রিনল্যান্ডের খনিজ তাঁর চাই, ইরানেও তিনি চাইলেই আক্রমণ করতে পারেন। অর্থাৎ আমেরিকা সরাসরি নিজের উপনিবেশ তৈরি করতে চাইছে। যদিও পুয়ের্তো রিকো আর গুয়ামের মতো দুটি উপনিবেশ তার রয়েছে। গতকাল তো নিজের দেশের সুপ্রিম কোর্টের শুল্ক সম্পর্কিত রায়ে ট্রাম্প স্পষ্ট বলে দিয়েছেন— আমি যে কোনো দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারি…’, সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি অভিমানে বলেছেন ‘…অথচ কারও থেকে এক ডলার শুল্ক নিতে পারি না!’ অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট যা-ই বলুক, তিনি যে তাঁর মতই চলবেন সে কথাও জানিয়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার এই নতুন অবতারকে উদারপন্থী ভাষ্যকাররা ‘অনুশোচনাহীন সাম্রাজ্যবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। যদিও আমরা জানি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, বিশেষত সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের পর থেকে আমেরিকা দুনিয়ার এক নম্বর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসাবেই রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ, বাজার ও সস্তা শ্রম দখল, বেশকিছু নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা, রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যা করানোর মত কাজগুলির জন্য সে কবে অনুশোচনা প্রকাশ করেছে, আমাদের জানা নেই। তবে হ্যাঁ, আজকের এই নির্লজ্জতা নতুন বটে। জানুয়ারিতে হয়ে যাওয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নে বলেছেন, এটা একটা নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা। পুরনো ‘নিয়মবদ্ধ বিশ্ব ব্যবস্থা’ আর ফিরবে না।
সেই ব্যবস্থাটা কেমন ছিল, তা নিয়ে আমরা একটু পরে সংক্ষেপে আলোচনা করব। তবে কার্নে যা বলেছেন সে ব্যাপারে বলে নেওয়া দরকার, চলে যাওয়া ব্যবস্থার জন্য আর শোক করবেন না।
বস্তুত এই নতুন পরিস্থিতি নিছক ট্রাম্পের ঔদ্ধত্যের ফল নয়। সংকট থেকে বেরোতে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা যেসব কাণ্ড করছে, ট্রাম্প তাতে অনুঘটক মাত্র। গত কয়েক বছর ধরেই আমরা দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ এবং বাণিজ্যযুদ্ধের পুনরুত্থান দেখছি। অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, ১৯৪৬ সালের পর ২০২৪ সাল ছিল সবচেয়ে বেশি সশস্ত্র সংঘাতের বছর।
আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে লড়াই (যা ফ্রান্স আসলে হেরেছে), ইয়েমেনে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মধ্যে ছায়াযুদ্ধ, সুদানের গৃহযুদ্ধ— যেখানে বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সক্রিয়, অথবা ইউক্রেনে ন্যাটো (কার্যত) ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধের কথা বিবেচনা করুন। জঙ্গলের ক্ষুধার্ত জানোয়ারদের মত সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি মাংসপিণ্ডের জন্য লড়াই করছে। সেই লড়াইতে ট্রাম্প নিজের ছাপ রাখছেন। দ্বন্দ্ব তত্ত্বের নিয়ম অনুসরণ করলে আমরা বলতে পারি, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার অভ্যন্তরে থাকা বাধ্যবাধকতাই ট্রাম্পের কার্যকলাপের মাধ্যমে আকস্মিকভাবে আমাদের সামনে আসছে। এটা আসলে অবশ্যম্ভাবীই ছিল।
প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে অর্থনীতির গতি কমে যাচ্ছে, জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাচ্ছে। ধনী, গরিবের ফারাক বাড়ছে। সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানে তেমন কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদ্বুদ ও ফাটকাবাজি দিয়ে আমেরিকা তার অর্থনীতির রুগ্ন দশাটি লুকিয়ে রেখেছে। নিজের দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমছে। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান নেমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে মার্কিন প্রশাসন অভিবাসীদের উপর নিপীড়ন তীব্র করে চলেছে। দুনিয়ার প্রায় সর্বত্র পুঁজিবাদী শাসনের মূল স্তম্ভগুলির প্রতি মানুষের বিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। তা সে পুলিশের মত আইনের শাসন রক্ষা করার বাহিনী হোক, সংসদ হোক বা গণমাধ্যম।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও গণবিক্ষোভ ফেটে পড়ছে। গত কয়েক বছরে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়েছে। পরিস্থিতি আগামী দিনে আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা। এই পরিস্থিতি সামলাতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলির রক্ত আরও বেশি করে চুষে নেওয়া ছাড়া সাম্রাজ্যবাদীদের কোনো উপায় নেই। কার্ল মার্কস ব্যাখ্যা করেছিলেন, যে ব্যবস্থা উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটাতে ব্যর্থ হয়, তার মৃত্যু হবেই। খয়রাতি ও নিপীড়ন দিয়ে কেবল সেই মৃত্যুযন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করাই সম্ভব।
যদিও এই অবস্থা সম্পূর্ণ নতুন কিছু নয়। বিশ্ব মঞ্চে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসাবে চিনের উঠে আসা এবং রাশিয়ার নতুন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠার ফলে আমেরিকা আজ বেপরোয়া। দুনিয়ার জনগণের পয়লা নম্বর শত্রু হওয়ার কাঁটার মুকুটটি যাতে খসে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে রাখতে সে তার লজ্জাবস্ত্র ত্যাগ করছে মাত্র। লেনিন বলেছিলেন ‘সাম্রাজ্যবাদ মানেই যুদ্ধ’। গত ৮০ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকলাপে শ্যেনদৃষ্টিতে লক্ষ করলেই তা স্পষ্ট হবে।
রাষ্ট্রপুঞ্জ ও নিয়মবদ্ধ বিশ্বব্যবস্থার কল্পকাহিনি
‘নিয়মবদ্ধ বিশ্ব ব্যবস্থা’(rules-based international order) কথাটি আসলে ‘উদারবাদী বিশ্ব ব্যবস্থা’(liberal international order) কথাটিরই রকমফের। যার ভিত্তি খোলা বাজার, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতি এবং জাতিরাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন উদ্যোগেই এই ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যা কার্যকর করার জন্য মার্কিন স্বরাষ্ট্র দফতর বানিয়েছিল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মত প্রতিষ্ঠান। দুনিয়া জুড়ে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখাই ছিল এই প্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্দেশ্য। সে জন্যই গঠিত হয় তার নিরাপত্তা পরিষদ। তাতে তৎকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি অনুযায়ী আমেরিকা, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়াও ফ্রান্স আর চীন স্থায়ী সদস্যপদ পায়। বাকি সব দেশই কেবল সাধারণ পরিষদের সদস্য। ক্ষোভ প্রকাশ আর পরামর্শ দেওয়া ছাড়া কার্যত তাদের আর কিছু করণীয় নেই।
এরপর দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের পুনর্গঠনে সাহায্য করে, দুনিয়া জুড়ে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি কারও ছিল না। বিশ্ব যখন মার্কিন এবং সোভিয়েত শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, দরিদ্র দেশগুলিকে লুঠপাট সহজতর করতে এবং সোভিয়েত শিবিরের বিস্তার রোধ করতে একাধিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হয়। ফলে ন্যাটো সামরিক জোট এবং ব্রেটন উডস সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা গঠিত হয়, যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার ও বিশ্বব্যাংক তৈরি করে। এই ব্যবস্থা মার্কিন ডলারকে বিশ্ব বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। লুঠপাটে অংশ নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় স্তরের কিছু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যেমন কানাডা ও ইউরোপের দেশগুলি, স্বেচ্ছায় এই চক্রে যোগ দেয়।
সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ শুরু থেকেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী জোটের দুনিয়া জুড়ে আধিপত্য কায়েমকে বৈধতা দেওয়ার কাজ করে এসেছে। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।
১৯৪৭ সালে প্যালেস্তিনীয়দের অনুমোদন ছাড়াই নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক গৃহীত প্যালেস্তাইন বিভাজন পরিকল্পনা, যা মূলত ইজরায়েলিদের দ্বারা তাদের অর্ধেক অঞ্চল চুরির আইনি আবরণ হিসাবে কাজ করেছিল। তারপর থেকে প্যালেস্তাইন সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবগুলি যখন সেগুলি ইজরায়েলের পক্ষে যায়, তখন তা কার্যকর হয়, নইলে উপেক্ষা করা হয়। সাম্প্রতিক ইজরায়েল-হিজবুল্লা যুদ্ধবিরতির কথা ভাবুন, যা আসলে একতরফা যুদ্ধবিরতি, যেখানে ইজরায়েল নিয়মিতভাবে লেবাননে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমরা কোরিয় যুদ্ধের কথাও ভাবতে পারি, যে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল মার্কিন জোটের একনায়কতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়া। সেই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নিরাপত্তা পরিষদ দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল (সোভিয়েত ইউনিয়ন সেইসময় নিরাপত্তা পরিষদ বয়কট করছিল কমিউনিস্ট চীনকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে)। এগোনো যাক।
১৯৬০ সালে বেলজিয়াম থেকে স্বাধীনতা পায় আফ্রিকার কঙ্গো। আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব প্যাট্রিস লুমুম্বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনী, মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং বেলজিয়ামের গোয়েন্দা বিভাগ চক্রান্তমাফিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে লুমুম্বাকে অপহরণ করে। কয়েকমাসের মধ্যেই তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে অ্যাসিডে গলিয়ে দেওয়া হয়। অনেক পরে, ২০০২ সালে, বেলজিয়াম ব্যবসাবাণিজ্যের ধান্দায় লুমুম্বার হত্যার জন্য ক্ষমা চেয়েছে। যদিও সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ আর আমেরিকার কোনো অনুশোচনার কথা আমাদের জানা নেই।
আরো পড়ুন বাণিজ্য চুক্তি নয়, এ হল আত্মসমর্পণ
আরও সম্প্রতি হাইতিতে জাতিসংঘের ‘শান্তি রক্ষা’ মিশনের ঘটনায় চোখ রাখি। ২০০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডার সঙ্গে যৌথভাবে জাঁ-বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টাইডের নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের আয়োজন করে। অ্যারিস্টাইড এমন কিছু নীতি নিয়েছিলেন যা গরিবদের অবস্থার উন্নতি করছিল। ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো হয়েছিল, স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই নীতিগুলি ফরাসি, কানাডিয় এবং মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়। বছরের পর বছর চাপ প্রয়োগের কৌশল অবলম্বন করার পর অ্যারিস্টাইডকে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স দ্বারা অপহরণ করা হয় এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা হয় এক অনুগত রাষ্ট্রপতিকে। পরিস্থিতি সামলাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের বিশেষ বাহিনীকে হাইতি পাঠানো হয়। সেই বাহিনী সেদেশের বামপন্থীদের উপর হিংস্র আক্রমণ নামিয়ে আনে।
উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। শুধু এটুকু বলা যাক, সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের আইনগুলো এমনই যে সেগুলির মাধ্যমে গরিব দেশগুলিকে ‘সাহায্য’ করে তাদের ভোট কেনা সম্ভব। তাছাড়া এমন কোনো উদাহরণ নেই, যেখানে শক্তিশালী দেশ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে কোনো গরিব দেশ আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্য পেয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এই আইনগুলির প্রয়োগ অনেকটাই পেশাদার কুস্তির মত, অর্থাৎ পুরোটাই কুনাট্য ছাড়া কিছু নয়। এতে কেবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষই বিনোদিত হয়ে থাকে।
এই নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থাও এখন অতীত
চীন, রাশিয়ার সাম্প্রতিক উত্থানের ফলে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জকে ব্যবহার করে যা খুশি করা হয়ত কিছুটা জটিল হয়েছে। অন্যদিকে সংকট তীব্র। তবু এসব নিয়ে শক্তিশালী দেশগুলি নিজেদের মধ্যে ঝামেলা কমিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যায় শেষ অবধি। এড়াতে চায় যুদ্ধ (যদিও যুদ্ধ হওয়া বা না হওয়া কারও বা কোনো দেশের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না, পুঁজির নৈরাজ্যের ফলেই তা ফেটে পড়ে)। তবে গ্রিনল্যান্ডের ব্যাপার একটু আলাদা। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পশ্চিম ইউরোপের এক সাম্রাজ্যবাদী দেশ ডেনমার্ককে হুমকি দেওয়ায় সকলে একটু নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে। নইলে প্যালেস্তাইনের গণহত্যা, ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের আগ্রাসন নিয়ে এদের মুখে কোনো কথা শোনা যায়নি।
দুর্বল হয়ে পড়া আমেরিকা এখন কানাডা ও অন্যান্য ইউরোপীয় অনুগামীদের লুঠপাটের ভাগ দিতে চায় না। নিজের তৈরি পুরনো ব্যবস্থা সে নিজেই ভেঙে দিয়েছে। কারণ সে জেনে গেছে, অনেক তথাকথিত অনুগামী রাশিয়া, চীনের সঙ্গে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে রয়েছে বা জড়াতে উৎসুক। সে গুড়ে বালি দিতেই ভারতের রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করিয়েছেন ট্রাম্প।
রাষ্ট্রপুঞ্জের পূর্বসূরি ছিল ‘লিগ অফ নেশনস’। লেনিন তাকে ‘চোরেদের রান্নাঘর’ বলেছিলেন। দিনে দিনে সেই রান্নাঘর মডিউলার কিচেন হয়ে উঠলেও, তাতে এখন কাঁচামাল আর জ্বালানির প্রবল সংকট। যখন সংকট কম ছিল, তখনও চোরেরা চোরই ছিল। আজও তাই আছে। চোরেদের কাজই জনগণের সম্পদ চুরি করা আর চুরির এলাকাভিত্তিক অধিকার নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করা। সেখানেই লুকিয়ে তাদের জিয়নকাঠি। আর সাধারণ মানুষের সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে চোরেদের কবরে পাঠানোর মধ্যে। সে কাজ করতে হলে চোরেদের তৈরি যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মোহ কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
নিবন্ধকার সাংবাদিক ও অনুবাদক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পৃথিবীর অতি চমৎকার ও যথার্থ বর্ণনা। লেনিন যেমন League of Nationsকে Thieves’ kitchen বলেছিলেন, ১৯৬০এর দশকের চীনের কমিউনিস্ট পার্টি United Nationsকে ” আখ্যা দিয়েছিল “a platform of transactions, manoeuvres and cunning intrigues of the imperialists”