ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি জনসমক্ষে আসার পর শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক। গত ৬ ফেব্রুয়ারি (আমেরিকার সময়ানুযায়ী) হোয়াইট হাউস এই চুক্তি নিয়ে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলেছিলেন, দুই দেশের যৌথ বিবৃতি ৪-৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত হবে। তার আগেই আমেরিকা সেই বিবৃতি প্রকাশ করায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু প্রশ্ন উঠেছে। তাহলে কি যৌথ বিবৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাই তৈরি করেছে? না হলে ‘চূড়ান্ত’ হওয়ার আগেই তা প্রকাশিত হল কেন? নাকি ভারত সরকার ইচ্ছা করেই সত্য গোপন করছিল, আগেই সব ঠিক হয়ে গিয়েছিল? গত বছর মে মাসে ভারত-পাক সংঘর্ষ বিরতির কথাও অবশ্য আমরা মার্কিন রাষ্ট্রপতির সোশাল মিডিয়া পোস্ট থেকেই প্রথম জানতে পেরেছিলাম। অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তি, সংঘর্ষ বিরতি – সবকিছুর খবরই নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে জানা যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থেকে। অমৃতকালে এটাই দস্তুর।

বাণিজ্য চুক্তিটা অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন, দীর্ঘমেয়াদি নয়, যার ‘কাঠামো’ (ফ্রেমওয়ার্ক) দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুটো দেশ ‘পারস্পরিক ও উভয়পক্ষের জন্য লাভজনক বাণিজ্য সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী চুক্তির জন্য একটি কাঠামোয় উপনীত হয়েছে।’ দ্বিপাক্ষিক এই বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হবে রয়ে সয়ে, অন্তর্বর্তীকালে সব ঠিকঠাক চলছে কিনা বিচার করে। সে বিচার অবশ্য একতরফা মার্কিন সরকারই করবে। সরাসরি তা লেখা না থাকলেও কার্যকারণ সম্পর্ক তাই বলছে। চুক্তি অনুসারে ভারত সরকার আমেরিকা থেকে আসা যাবতীয় শিল্পপণ্য, বিস্তৃত পরিসরে খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উপর শুল্ক হয় পুরোপুরি তুলে দেবে, নয়ত কমাবে। শুকনো নিষ্কাশিত (ডিস্টিলার্স) শস্য, লাল জোয়ার (দুটোই পশুখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়), বাদাম, তাজা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন, স্পিরিট এবং অতিরিক্ত পণ্যসহ যে কোনো খাদ্য ও কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই কার্যত শুল্ক তুলে দেওয়ার সংস্থান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ভারত, আমেরিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি, বিমান, বিমানের যন্ত্রাংশ, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তি পণ্য, কোকিং কয়লা কিনবে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

পক্ষান্তরে আমেরিকা ভারতে উৎপাদিত বস্ত্র, পোশাক, চামড়া, চপ্পল, প্লাস্টিক ও রাবার, জৈব রাসায়নিক, গৃহসজ্জার জিনিস, হস্তশিল্পজাত পণ্য, নির্দিষ্ট কিছু যন্ত্রপাতির উপর ১৮% ‘পারস্পরিক’ আমদানি শুল্ক আরোপ করবে। অন্তর্বর্তী চুক্তি সফলভাবে কার্যকর হলে, ভারত থেকে যাওয়া জেনেরিক ওষুধ, হীরে, পাথর, বিমানের যন্ত্রাংশ সহ বিভিন্ন পণ্যে আমেরিকা শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিতে পারে। এই অন্তর্বর্তী চুক্তি কাঠামোর পাশাপাশি রয়েছে মার্কিন সরকারের এক মারাত্মক আদেশনামা। ভারত রাশিয়া থেকে সোজাসুজি বা বাঁকা পথে অপরিশোধিত তেল কিনছে কিনা, তার উপর নজরদারি চালানো হবে। ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনলেই আমেরিকা আবার ভারতীয় পণ্যের উপর ২৫% শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা এই আদেশে নাকি ভারত সম্মত হয়েছে। ট্রাম্প সরকারের দাবি অনুসারে, এটা নাকি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির থেকে আলাদা নয়। এর সত্যতা নিয়ে বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে কিন্তু এখনো স্পষ্ট মতামত পাওয়া যায়নি।

চুক্তি অনুসারে ভারত কার্যত নিঃশর্তে আমেরিকা থেকে আসা শিল্পপণ্য এবং বিভিন্ন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের উপর শুল্ক পুরোপুরি মকুব করতে বা কমাতে বাধ্য থাকবে। নির্দিষ্টভাবে কয়েকটা খাদ্য ও কৃষিপণ্যের উল্লেখ থাকলেও ‘বিস্তৃত পরিসর’ এবং ‘অতিরিক্ত পণ্য’— এই দুই শব্দবন্ধ ব্যবহার করে সব খাদ্য ও কৃষিপণ্যকেই আগামীদিনে এর আওতায় নিয়ে আসা যাবে। আমেরিকা থেকে নির্দিষ্ট অর্থমূল্যের বিভিন্ন পণ্যও আমাদের দেশকে বাধ্যতামূলকভাবেই কিনতে হবে। এমনকি চুক্তি অনুসারে, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ প্রযুক্তির পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ভারতকে তুলে দিতে হবে। ওদিকে ভারতীয় পণ্যে আমেরিকার শুল্ক মকুব করা এবং কমানোর দায়বদ্ধতা পুরোটাই শর্তাধীন, নিঃশর্ত নয়। ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনলে শুল্ক বাড়ানো হবে। অর্থাৎ ভারত কোন দেশ থেকে কী আমদানি করবে সেটাও আমেরিকা ঠিক করে দেবে, না মানলেই শুল্ক বাড়ানোর শাস্তি। আবার অন্তর্বর্তী চুক্তি সফল মনে করলে তবেই আমেরিকা কিছু ভারতীয় পণ্যের শুল্ক মকুব করবে।

বিজেপি প্রচার করছে, চুক্তিতে ৫০% শুল্কের হার কমিয়ে ১৮% করা হয়েছে। সেটা আসলে নামমাত্র কয়েকটা পণ্যের ক্ষেত্রে সত্যি। ট্রাম্প আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে কিন্তু শুল্কের হার অনেক কম ছিল। আগে ভারতীয় পণ্যের উপর আমেরিকার শুল্কের গড় হার ছিল ২.৫%-২.৯%। জেনেরিক ওষুধের উপর কোনো শুল্ক ছিল না। বিমানের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রেও শুল্ক ছিল খুব কম। অর্থাৎ ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে আমেরিকার শুল্ক হার কার্যত ২.৯% থেকে বেড়ে হল ১৮%। অন্যদিকে আমেরিকা থেকে আসা শিল্প, খাদ্য, কৃষিপণ্যের উপর শুল্ক পুরোপুরি তুলে দিতে, নিদেনপক্ষে কমাতে ভারত বাধ্য।

এই চুক্তিতে দ্বিপাক্ষিক লাভের কথা বলা ভারতবাসীর সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়। একতরফা এই চুক্তিতে আমেরিকার পণ্য অবাধে ভারতে প্রবেশের সুযোগ পেল। চুক্তিতে কেবল শুল্ক তুলে দেওয়ারই সংস্থান রাখা হয়নি। বলা হয়েছে, ভারত আমেরিকা থেকে আমদানি হওয়া খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অশুল্ক (নন-ট্যারিফ) বাধাগুলো সরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। সম্মতি প্রদান একতরফা। আমেরিকা কিন্তু ভারতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বাধা দূর করতে সম্মত হয়নি। অশুল্ক বাধা দূর করার অজুহাতে ভারতের কৃষিনীতি আগামীদিনে পুরোপুরি আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের কৃষি ও খাদ্যের বিশাল বাজার দখলের দীর্ঘকালীন মার্কিন স্বপ্ন সফল হতে চলেছে।

সবই সম্ভব হল ট্রাম্পের পরম মিত্র মোদীর আমেরিকার প্রতি অন্ধ আনুগত্যে, যে আনুগত্য নতজানু হওয়ারই নামান্তর। খাল অবশ্য কাটা হয়েছিল গত শতকের নয়ের দশকে, ভারত যখন গ্যাট চুক্তিতে স্বাক্ষর করে, প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। কৃষি বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো তার আওতায় চলে আসে। তারপর ভর্তুকি কমানো, কৃষকদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) না দেওয়া, খাদ্য ও কৃষিপণ্য থেকে আমদানি শুল্ক তুলে দিয়ে এদেশের বাজার উন্মুক্ত করার জন্য ভারতের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। কৃষি সরঞ্জাম থেকে শুরু করে ফসল বিক্রি— সবই আজ অনেকখানি বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার নিয়ন্ত্রণে। বীজের অধিকারও কৃষকের নেই। সেই সর্বনাশের আয়োজনকে পূর্ণতা দিতে আনা হয়েছিল তিনটে কৃষি আইন। কৃষক আন্দোলনের চাপে মোদী সরকার পিছু হটলেও, এমএসপিকে আইনে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। তার কারণ অবশ্যই আমেরিকা সহ বিভিন্ন কর্পোরেট মহলের চাপ। এবার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে আমেরিকার কাছে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারও উন্মুক্ত করে দেওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া হল। মোদী সরকারের গ্যারান্টির আসল লক্ষ্য যে কেবলই কর্পোরেট স্বার্থ পূরণ করা, তা আবার প্রমাণিত হল। বলা যায়, তিন দশক আগে কাটা খালে এবার বড়সড় কুমির ডেকে আনা হল।

কৃষিতে ভর্তুকি কমানোর জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া হলেও, আমেরিকা সহ বিভিন্ন ‘উন্নত’ বিশ্বের দেশে কিন্তু ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেশি। গত বছরের হিসাবে অনুসারে, ভারতের কৃষকদের তুলনায় আমেরিকার কৃষকরা ১২২ গুণ বেশি ভর্তুকি পান। নয়া উদারনীতির ফলে ভারতের কৃষকদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। এই বাণিজ্য চুক্তি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। খাদ্যশস্য সহ বিভিন্ন ফসল, ফল চাষ, ডেয়ারি শিল্পে বড়সড় আঘাত আসবে। কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম থেকে আরও বঞ্চিত হবেন। বহু কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্পও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার বদলে এই চুক্তিতে আরও বহু মানুষের জীবিকা বিপন্ন হবে। খাদ্যপণ্যের বাজার কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় গণবন্টন ব্যবস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পশুখাদ্যের নাম করে জিন পরিবর্তিত (জি এম) ফসল ভারতে ঢোকার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি ভারত কার থেকে তেল কিনবে সেটাও কার্যত আমেরিকা ঠিক করে দেবে। যার সঙ্গে কেবল বাণিজ্য নীতিই নয়, জড়িয়ে আছে ভারতের বিদেশনীতি। অর্থাৎ শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে লাভজনক এই চুক্তিতে ভারতবাসীর জীবিকা, দেশের খাদ্য, জ্বালানি, বাণিজ্য নীতি, বিদেশনীতির সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।

তাই আমেরিকা উচ্ছ্বাস গোপন করেনি। ট্রাম্প থেকে শুরু করে আমেরিকার কৃষি সচিব, বাণিজ্য সচিব, প্রেস সচিব (সচিবরা আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সমতুল্য)— সবাই দাবি করছেন যে এতে আমেরিকার বিরাট লাভ হবে। আমেরিকার উৎপাদিত ফসল ভারতে বিক্রি করে দেশের কৃষকদের রোজগার বাড়বে। বিজেপির পক্ষ থেকে প্রথমে হইচই করে মোদীকে মালা পরিয়ে এই চুক্তিকে সাফল্য বলে দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর নানা প্রশ্ন দেখা দিতেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা সেসবের স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে, এ ওকে দেখাচ্ছেন আর ও একে। বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ রাশিয়া থেকে তেল কেনার ব্যাপারে বিদেশমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে বলেছেন। তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে, ব্যাপারটা ভারতের বিদেশনীতির সঙ্গেও জড়িত। বিদেশমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর ইনিয়ে বিনিয়ে অনেক কথা বললেও, রাশিয়া থেকে তেল কেনায় নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ট্রাম্পের দাবি নস্যাৎ করেননি। পীযূষ আর কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে বলে আশ্বাস দিয়ে চলেছেন। অথচ প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিই বলে দিচ্ছে, এসব আশ্বাস দিয়ে দেশবাসীর সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারসাম্য আনার নামে একতরফা আমেরিকার পক্ষে সুবিধাজনক শুল্ক নীতি গ্রহণে সম্মত হয়েছে ভারত।

ভারসাম্যের এই হিসাবটা খুব মজার। ২০২৪ সালে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য করে ভারতের উদ্বৃত্ত হয়েছিল ৪,৫৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ভারত থেকে যত আর্থিক মূল্যের পণ্য আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছিল, তার থেকে ৪,৫৭০ কোটি ডলার কম মূল্যের পণ্য আমেরিকা থেকে ভারত আমদানি করেছিল। আমেরিকার কাছে এটাই ভারসাম্যহীনতা। কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করলে উদ্বৃত্ত না হয়ে ঘাটতি হলেই আমেরিকা চটে যায়। তাদের কাছে ভারসাম্য আনার সহজ পদ্ধতি হল, ভারত থেকে আসা পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে ভারতে বেশি পণ্য বিক্রি করা। সে কাজে বড় অস্ত্র হল, শুল্ক যুদ্ধ। ভারসাম্যের নামে ভারতের বাজার আমেরিকার পণ্যের জন্য খুলে দিয়ে মোদী সরকার ট্রাম্প সরকারের কাছে আত্মসমর্পণ করল।

প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার ও গোদি মিডিয়া মিথ্যাচার এবং প্রতারণা করে চলেছে। প্রচার চলেছিল, ভারতের বিদেশমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী নাকি কঠোরভাবে আমেরিকার চাপের মোকাবিলা করছেন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প যা যা দাবি করেছেন, সবই মানা হচ্ছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতি অনুসারে, ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ও মোদীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যে আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছিল, এই চুক্তি সংক্রান্ত কাঠামো নাকি তারই ফলাফল। মোদী গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আলোচনার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। প্রচার হয়েছিল, দুই দেশই নাকি লাভবান হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যে ৫০০ বিলিয়ন (৫০,০০০ কোটি) ডলার মূল্যের পণ্য লেনদেন হবে। ঘটা করে এর নাম দেওয়া হয় মিশন ৫০০। অন্তর্বর্তী চুক্তিতে দেখা গেল, ভারত এই অর্থমূল্যের দ্রব্য আমেরিকা থেকে আমদানি করতে দায়বদ্ধ থাকলেও, আমেরিকার নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা নেই।

গতবছর ১০ মে ভারত-পাক সামরিক সংঘর্ষ বিরতির পর ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, তাঁর চাপেই নাকি দুই দেশ সংঘর্ষ থামাতে রাজি হয়েছে। বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দিয়ে তিনিই ভারত ও পাকিস্তানকে সংঘর্ষ বিরতিতে বাধ্য করেছেন। ভারত সরকার মুখে একথা অস্বীকার করলেও, বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করেনি। মোদী স্বয়ং তো এ ব্যাপারে মুখই খোলেননি। ১৫ মে ট্রাম্প কাতারের রাজধানী দোহায় বলেন, ভারত নাকি আমেরিকার প্রায় সমস্ত পণ্যে আমদানি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনতে রাজি হয়েছে। শুধু তাই নয়। তিনি অ্যাপল কোম্পানির আইফোন তৈরির কারখানা ভারতে তৈরি হওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেন। মে মাসেই বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে কথা বলতে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। বারবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা আশ্বাস দিয়ে এসেছেন, চুক্তিতে ভারতের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। অথচ একবারও আমেরিকান পণ্য পুরোপুরি শুল্কমুক্ত করা হবে না— একথা স্পষ্ট বলেননি।

এবছর ২ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প সোশাল মিডিয়ায় জানান, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনলে তাঁর সরকার ভারতীয় পণ্যে শুল্ক ১৮% করে দেবে। ৪ ফেব্রুয়ারি পীযূষ সংসদে বলেন, ভারতবাসীর জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য দেশ থেকে তেল কেনা হবে। অনতিবিলম্বেই প্রকাশ্যে এল অন্তর্বর্তী চুক্তির কাঠামো এবং ভারতের তেল কেনা নিয়ে ট্রাম্পের আদেশনামা। দেখা গেল ট্রাম্প যা বলেছিলেন সেটাই চুক্তিতে রয়েছে, আর জ্বালানি নিরাপত্তার নামে অন্য দেশ থেকে তেল কেনার কথা বলে সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী সত্যের অপলাপ করেছেন। আসলে চুক্তিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন আদানি থেকে মাস্ক: গণতন্ত্র নয়, চলছে কর্পোরেটতন্ত্র

আমেরিকা যখন আর্থিক ও বিদেশনীতিতে চাপে রয়েছে, ডলারের বিশ্ববাজারে একচেটিয়া আধিপত্য যখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যখন গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্নে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, তখন ভারত দর কষাকষি না করে আত্মসমর্পণ করল কেন? ভারতের মত বিশাল বাজার যে কোনো দেশের পক্ষেই লোভনীয়। তাকে হাতিয়ার করে এই সময়ে ভারত দর কষাকষি করতেই পারত। আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করে মোদী সরকার কেবল বিদেশনীতি ও বাণিজ্য নীতির সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করল না, ব্রিকস গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর কাছেও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাল। ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার কথা ঘুরপথে স্বীকার করে, ভেনেজুয়েলার তেল ভাণ্ডার লুঠের আমেরিকান নীতির শরিক হয়ে গেল। যেমন আগেই মোদী সরকার স্বাধীন বিদেশনীতি জলাঞ্জলি দিয়েছে ইজরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে। জোট নিরপেক্ষ নীতি থেকে বিচ্যুত হতে হতে আজকের এই আত্মসমর্পণ দেশের অর্থনীতি-কূটনীতির পক্ষে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়াবে। মোদী-ঘনিষ্ঠ ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর স্বার্থরক্ষা, এপস্টিন ফাইল সমেত নানা কারণে মোদী সরকারের এই আত্মসমর্পণ দেশবাসীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার সামিল।

বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা আগেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে ভারতকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে দাবি তুলেছিল। সেই দাবি কতখানি সঠিক ছিল তা এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি প্রমাণ করল। ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক, খেতমজুর সংগঠনগুলোর ডাকা আজকের ধর্মঘটেও এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি তোলা হয়েছে। প্রবল আন্দোলনের চাপে যেমন তিনটে কৃষি আইন প্রত্যাহারে সরকার বাধ্য হয়েছিল, তেমনই এই চুক্তি বাতিল করাতেও তীব্র আন্দোলন দরকার। দ্বিপাক্ষিক চুক্তির নামে সাম্রাজ্যবাদের কাছে দেশ বেচার এই নীতি যে কোনো মূল্যে বাতিল করতে হবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.