এদেশে আর কিছু হোক না হোক, চটজলদি কোনোকিছুকে নিষিদ্ধ করতে দেরি হয় না। অবশ্যই এক্ষেত্রে শর্তাবলী প্রযোজ্য। তেমনই সম্প্রতি দুটি রাজ্যের সরকার অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব এনেছে। কর্ণাটকে ১৬ বছরের কমবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে সে রাজ্যের কংগ্রেস সরকার। এ মাসের গোড়ায় অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডুও বিধানসভায় বলেছেন, ওই রাজ্যে ১৩ বছরের কমবয়সী ছেলেমেয়েদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করা হবে।
আপাতদৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত মনে হতেই পারে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, শিক্ষক বা শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই যে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তা হল অল্পবয়সীদের মধ্যে মনঃসংযোগের সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মনে করেন যে এর জন্য দায়ী সোশাল মিডিয়ার নেশা, যা অনেকসময়, বিশেষ করে একাকী, দলছুট শিশু বা কিশোরদের বেশি আকৃষ্ট করে। এছাড়া অল্পবয়সীদের মনের উপর সোশাল মিডিয়ার বিরূপ প্রভাব নিয়েও মনস্তত্ত্ববিদরা চিন্তিত। এ প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে গতবছর মার্চেই নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া অ্যাডলেসেন্স (২০২৫) সিরিজের কথা। সেখানে আমরা দেখেছিলাম— কীভাবে একজন অতি সাধারণ কিশোর সোশাল মিডিয়া দ্বারা মগজ ধোলাইয়ের ফলে অতি তুচ্ছ কারণে এক সহপাঠিনীকে খুন করে এবং তার কোনো অনুশোচনাও হয় না। সোশাল মিডিয়ার প্রতি অতিমাত্রায় অনুরক্ত হওয়ার কারণে অল্পবয়সীদের শিক্ষা যে বিভিন্নভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে—তা নিয়েও ওয়াকিবহাল মহল একমত।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তাহলে কি অল্পবয়সীদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করাই সঠিক পথ? একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায়, নিষিদ্ধকরণের পথটি শুধু জটিলই নয়, এ যুগে তা কার্যকরী করাও প্রায় অসম্ভব। অস্ট্রেলিয়া ডিসেম্বর মাসে পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসাবে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করেছে; তাছাড়া ব্রিটেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রীস, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশও নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা ভাবছে। কিন্তু ভারতের বাস্তবতা হল, এখানে সরকার নিষিদ্ধকরণের সিদ্ধান্ত নিলেও তা প্রয়োগ করা অনেক বেশি কঠিন। প্রথমত, অল্পবয়সী অনেকেই ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করতে জানে। ফলে তারা নিষিদ্ধ যে কোনো সাইটই খুলে ফেলতে পারে, সোশাল মিডিয়া তো বটেই। এখানে উল্লেখ্য, এদেশের আইন অনুসারে ১৮ বছরের কমবয়সী কেউ মোবাইল ফোনের সিম কার্ড কিনতে পারে না। কিন্তু অন্তত শহরগুলোতে কিশোর-কিশোরীই নিজস্ব মোবাইল ব্যবহার করে। বাবা-মায়েরাই কিনে দেন। সেখানে সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করার চেষ্টা যে একেবারেই কাজে দেবে না, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া আছে বিভিন্ন জায়গায় বিনামূল্যে ওয়াই ফাই ব্যবহার করার সুবিধা। বিশেষ করে করোনা অতিমারীর সময় থেকে বহু স্কুলে শিশু-কিশোরদের লেখাপড়ার খানিকটা স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমত্যনুসারেই হোয়াটস্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে চলে।
এর থেকেও বড় সমস্যা হল, সোজা পথে সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করতে না পারলে বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা বা আরও অল্পবয়সীরা বিভিন্ন বাঁকা পথ খুঁজে নিতে পারে। ইতিমধ্যেই জেনারেটিভ এআই-এর বহুবিধ অপব্যবহারের উদাহরণ দেখা গেছে। অন্যদিকে রয়েছে অ্যান্ড্রু টেটের মত ক্ষতিকর ইনফ্লুয়েন্সার, যারা শিশু ও কিশোর মনে একগাদা অযৌক্তিক নেতিবাচক ধারনা ঢুকিয়ে দিয়ে অর্থোপার্জন করে। এরা বয়ঃসন্ধির কিশোরদের মনে যৌন সচেতনতার বদলে গোটা নারী জাতির প্রতি তীব্র বিরূপতা সৃষ্টি করে। তা বাদে আছে ‘ডার্ক ওয়েব’। তার নিষিদ্ধ হাতছানিতে অল্পবয়সীরা আকৃষ্ট হবেই, কারণ সেখানে বাবা-মা দূরের কথা, কোনোরকম আইনি বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণই নেই। সোশাল মিডিয়ার রাস্তা বন্ধ হলে ওই চোরাগলিতে অল্পবয়সী মনগুলোর হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে বই কমবে না।
আরো পড়ুন সোশাল মিডিয়া: বিপ্লব নয়, প্রতিবিপ্লব
বস্তুত, ২০২০ সালের লকডাউনের সূচনা থেকেই আর অল্পবয়সীদের কাছে ইন্টারনেট শুধুমাত্র বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এর থেকে, এমনকি সোশাল মিডিয়া থেকেও, বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন সম্ভব। তাই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা আজ কোনো সমাধান হতে পারে না। নীতিগতভাবে তা যেমন ইন্টারনেট স্বাধীনতার বিরোধী, তেমনি কার্যক্ষেত্রেও ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তাহলে প্রশ্ন উঠবে, সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব থেকে অল্পবয়সী মনকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব? এর উত্তরে ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন অন্য কয়েকটি জরুরি ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছে। যেমন সরকারের সরাসরি বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লাগাম পরানো। আইনগত কিছু রদবদলের মাধ্যমে সরকার চাইলে এদের বাধ্য করতে পারে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতে, যা না করলে বিরাট আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে। এইসব আইনের প্রয়োগ করতে দক্ষ বিশেষজ্ঞদের দরকার হবে, যাঁরা আইনের অপব্যবহারজনিত সমস্যা সম্পর্কে সম্যক অভিহিত। আমাদের দেশের সরকারি অফিসাররা অনেকেই তেমন নন। তাছাড়া সরকারি তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করা যেতে পারে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জাতি, বর্ণ, ধর্ম ইত্যাদির উপর সোশাল মিডিয়ার প্রভাব সংক্রান্ত গবেষণার জন্য। সেই গবেষণায় সোশাল মিডিয়া সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে সুবিধা হবে এবং অঞ্চলভিত্তিক সুযোগ ও অসুবিধা সম্বন্ধে সচেতনতা সরকারি নীতিতে প্রতিফলিত হবে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত ব্যাপারেও আলোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন আছে। কারণ অল্পবয়সীদের মধ্যে এর কুপ্রভাবও বিপুল।
সমস্যা হল, এত গভীর ও দীর্ঘ সমাধান সূত্র কি কোনো সরকার মেনে নেবে? তার চেয়ে অনেক সোজা সোশাল মিডিয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নাম কেনা। তাতে সাপও মরে, লাঠিটিও অক্ষত থাকে। তারপরও যদি সুকুমার মনে সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব সমস্যা সৃষ্টি করে, তখন অম্লানবদনে সে দায় পরিবার পরিজনের উপর চাপিয়ে দেওয়ার রাস্তা তো রইলই।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








