অভিষেক মাইতি
গত শারদোৎসবে এক বন্ধু হঠাৎ কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল ‘এবার পুজোয় কী কী বই লঞ্চ হচ্ছে রে?’
প্রশ্নটা শুনে চমকাইনি। কারণ ‘বই’ আর ‘বাজার’ শব্দদুটো আজ আর আলাদা ঘরে থাকে না; একই শপিং মলে পাশাপাশি স্টলে বসে। মোবাইল, প্রসাধনী, ইলেকট্রিক স্কুটারের মতই বইও এখন ‘প্রোডাক্ট’। তাই আইফোনের মতই, নবীনতম লেখক হোন বা প্রবাদপ্রতিম— বই আর প্রকাশ করেন না, ‘লঞ্চ’ করেন। বুক-লঞ্চ আজ রেড কার্পেট ইভেন্ট: ড্রোন শট, ব্যাকড্রপ, স্পটলাইট, সঞ্চালকের কেতাদুরস্ত ইংরেজি। লেখক সেখানে একাধারে শিল্পী, একাধারে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। দেব-শুভশ্রীর ধূমকেতু ছবির টিজার আর অরুন্ধতী রায়ের মাদার মেরি কামস টু মি বইয়ের প্রচ্ছদ উদ্ঘাটন— ভাষা আলাদা, মোড়ক এক। দুটোই ‘কনটেন্ট’, দুটোই ‘ভাইরাল’ হতে চায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে ব্র্যান্ড বিল্ডিং এখন জলভাত। চেতন ভগত লাইভে এসে পাঠককে ‘হ্যাক’ শেখান, প্রীতি শেনয় ইনস্টা-স্টোরিতে ‘বুক-সাইনিং’-এর কিউ দেখান, স্মরণজিৎ চক্রবর্তী রিল বানান— ‘Gen Z প্রেম মানে কী?’। প্রকাশকরাও পিছিয়ে নেই। তাঁদের ফেসবুক পেজে এখন পরিষেবার তালিকা: সোশাল মিডিয়া প্রোমোশন, পোস্টার ডিজাইন, বুক ট্রেলার, অথর রিল, অ্যামাজন অ্যাড ম্যানেজমেন্ট। সাহিত্য এখন ৩৬০° মার্কেটিং।
এতে দোষের কিছু নেই। লেখক পাঠকের কাছে পৌঁছবেন, এ তো আনন্দের কথা। কিন্তু প্রশ্ন জাগে— এই জাঁকজমকের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে না তো সাহিত্যের সেই নিভৃত নির্জন অন্তর্মুখী কক্ষটি, যেখানে লেখক একা, পাঠক একা, আর মাঝখানে শুধু শব্দের সাঁকো?
লেখক কে? পাঠকই বা কী?
মৃত্যুর আগে ফ্রাঞ্জ কাফকা বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে বলে গিয়েছিলেন ‘আমার সমস্ত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে দিও।’ ব্রড কথা রাখেননি। তাই আমরা পেয়েছি মেটামরফোসিস-এর গ্রেগর সামসাকে, পেয়েছি দ্য ট্রায়াল-এর কে-কে। কাফকার আত্মপ্রচারবিমুখতা, নিজের লেখা নিয়ে সন্দেহ, অসম্পূর্ণতার যন্ত্রণা— এগুলোই তাঁকে লেখক করে তোলে। আজ তার উলটোটা চলছে। আজ লেখক প্রথমে ‘কনটেন্ট ক্যালেন্ডার’ বানান, তারপর উপন্যাস নিয়ে বসেন। আগে ভাবেন ‘হ্যাশট্যাগ কী দেব’, পরে ভাবেন ‘চরিত্রের সংকট কী’। এ এক মর্ষকামী আত্মবিস্তার। লাইক, শেয়ার, প্রি-অর্ডার সংখ্যার নিরিখে নিজেকে মাপা।
এই বাজারে আরেকটা কাফকা জন্মাবেন না, আরেকজন মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও না। জন্মাবেন না, কারণ আমরা চাই না। আমার এক বন্ধু, স্মরণজিৎ-অন্তপ্রাণ, তারাশঙ্কর-বনফুলের নাম শুনেই খেঁকিয়ে উঠল ‘তুই বড্ড আঁতেল, ভাই! ওসব সেকেলে মাল কে পড়ে?’ ওর ধমক শুনে মনে হল, নিরাকার ব্রহ্মের সাধককে ভক্ত এসে বলছে ‘শুষ্ক জ্ঞানী, তুই ভক্তিরসের কী বুঝবি?’
কিন্তু সমস্যাটা ‘আঁতলামি বনাম রস’ নয়। সমস্যাটা পাঠকের। আমরাই ধ্রুপদী সাহিত্যকে ‘কঠিন’, ‘বোরিং’, ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলে দেগে দিয়েছি। আমরাই ৩০০ পাতার উপন্যাসের বদলে ৩০ পাতার ‘সেলফ-হেল্প’ চাই, ‘হিলিং ফিকশন’ চাই, ‘কমফোর্ট রিড’ চাই। চাই, কারণ আমাদের ধৈর্য নেই, সময় নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা— যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। ফিওদর দস্তয়েভস্কি পড়লে রাতের ঘুম চলে যায়, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ পড়লে বাস্তবের মাটি সরে যায়, সতীনাথ ভাদুড়ীর ঢোঁড়াই চরিত মানস পড়লে নিজের ভদ্রলোকি মুখোশ খুলে পড়ে। আমরা সে ঝুঁকি নিতে নারাজ। ফলে আরেকটা ব্রাদার্স কারামাজভ লেখা হবে না, কারণ আমরা পড়ব না। বাজারও তাই ছাপবে না।
বার্তের মৃত্যু, ব্র্যান্ডের জন্ম
রোলাঁ বার্ত বলেছিলেন, লেখকের মৃত্যুই পাঠকের জন্ম। অর্থাৎ লেখক যা বোঝাতে চেয়েছেন তা নয়; পাঠক যা খুঁজে পেলেন, সেটাই সাহিত্য। আজ বার্ত কবর থেকে উঠে এলে কেঁদে কূল পেতেন না। কারণ আজ পাঠক লেখককে খোঁজে না, লেখক পাঠককে খোঁজে— বুস্টেড পোস্ট দিয়ে, টার্গেটেড অ্যাড দিয়ে। ব্র্যান্ডিং আর ঢাকঢোল পিটিয়ে আত্মপ্রচারের যুগে আমরা একটা কথা যেন ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি। সেটা হল পাঠকের লেখককে খুঁজে নেওয়ার কথা, লেখকের পাঠককে খুঁজে নেওয়ার কথা নয়। বার্থের ‘দ্য ডেথ অফ দি অথর’ যেন আজ আর খাটে না। থমাস মান বলেছিলেন ‘In books we never find anything but ourselves. Strangely enough, that always gives us great pleasure, and we say the author is a genius.’ আজ কথাটা ডাহা মিথ্যা বলে প্রমাণিত। পাঠক প্রথমেই বড় বড় নামে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। আমরা বইয়ে নিজেকে আর খুঁজি না, লেখকের ‘ভেরিফায়েড ব্লু-টিক’ এর আদিখ্যেতায় খুঁজি।
ফলে দুই ধরনের পাঠক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এক দল, ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নয় বলে, স্মরণজিৎ চক্রবর্তী-সায়ন্তনী পুততুণ্ডদের ‘সহজপাচ্য’ গদ্যে আশ্রয় নেয়। তারা বঙ্কিমচন্দ্র-শরৎচন্দ্র খুলে দেখেনি, দরকারও পড়ে না। আরেক দল, ইংরেজি শিক্ষিত, অরুন্ধতী রায়-ঝুম্পা লাহিড়ী-চিত্রা দিবাকারুণীদের ‘গ্লোবাল’ খ্যাতিতে নিজের আধুনিকতা মাপে। অথচ তাদের কজন ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট-এর শেষ পাতা অবধি গেছে সন্দেহ আছে।
দুটো দলই আসলে লেখক পড়ে, লেখা পড়ে না। ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে ‘স্ট্যাটাস সিম্বল’। শেলফে রাখার, ইনস্টায় ছবি দেওয়ার, ‘কারেন্টলি রিডিং’ স্টিকার লাগানোর বস্তু। পড়া নয়, ‘পড়ছি’ দেখানোই উদ্দেশ্য।
ফেসবুকীয় ‘হাইপ’ ও অনামী লেখকের আত্মহত্যা
সকালে ফেসবুক খুললেই দেখি ‘অরুন্ধতী রায়ের নতুন বই, প্রি-অর্ডার করুন’। লাইক হাজার দশেক, শেয়ার হাজার দুয়েক, মন্তব্যে ‘কুইন’, ‘লেজেন্ড’, ‘ক্যান্ট ওয়েট’। ক্ষতি কার? পাঠকের। কারণ এই সেলিব্রিটি-সাহিত্য বাকি সব কণ্ঠস্বরকে গিলে খায়। তরুণ, অনামী লেখক বুঝে যায়— ভালো লিখে লাভ নেই, ‘ভাইরাল’ হতে হবে। তাই সে গল্পের প্লটের চেয়ে বেশি ভাবে থাম্বনেলের রং নিয়ে, উপমার চেয়ে বেশি ভাবে রিলের আবহসঙ্গীত নিয়ে।
এমন অবস্থায় মার্কেজও বোধহয় ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচিউড লিখতে পারতেন না। কারণ মাকোন্দো গড়তে সময় লাগে, নিঃসঙ্গতা লাগে, লোকচক্ষুর আড়াল লাগে। আজকের লেখককে প্রতি সপ্তাহে ‘এনগেজমেন্ট’ রিপোর্ট দিতে হয়। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার পাগলামি, উরসুলার শতবর্ষের সহ্য, কর্নেল আউরেলিয়ানোর ৩২টি ব্যর্থ অভ্যুত্থান— এসব ধীরে জন্মায়। ‘ডেইলি কনটেন্ট আপডেট’ দিয়ে মাকোন্দো হয় না।
আমরা সবাই পারফর্মার
সমাজতাত্ত্বিক স্টিফেন বল একে বলেছেন ‘পারফরমেটিভ সোসাইটি’ যা নয়া উদারনীতিবাদের শেষ পর্যায়। এখানে সবাই ‘পারফর্ম’ করছে। ছোটবেলা থেকে আমাদের অসম প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। নিজেকে এই ইঁদুর দৌড়ে প্রমাণ করতে গিয়ে আমরা আত্মসর্বস্ব হয়ে উঠছি। ছাত্র ‘পারফর্ম’ করছে CGPA-র জন্য, শিক্ষক পারফর্ম করছেন NIRF বা QS র্যাংকিংয়ের জন্য, লেখক ‘পারফর্ম’ করছেন অ্যামাজন র্যাংকের জন্য, পাঠক পারফর্ম করছেন ‘গুডরিডস চ্যালেঞ্জ’-এর জন্য। দার্শনিক মাইকেল স্যান্ডেল বলেছেন, আমরা আর ‘মার্কেট ইকোনমি’ নই, ‘মার্কেট সোসাইটি’। বাজারের যুক্তি এখন আত্মা, সম্পর্ক, শিল্প— সবকিছুকে গ্রাস করেছে।
তাই বই এখন ‘প্রোডাক্ট’, লেখক ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’, প্রকাশক ‘ইনভেস্টর’, পাঠক ‘কনজিউমার’। এই চতুর্ভুজে সাহিত্য বলে কিছু থাকে না; থাকে ‘কনটেন্ট’, ‘ROI’, ‘CTR’। যে সমাজে শিশুর ফেসবুক ফলোয়ার দিয়ে তার ‘ট্যালেন্ট’ মাপা হয়, যে সমাজে বাবা-মা সন্তানকে রাজস্থানের কোটার আত্মহত্যার কারখানায় পাঠিয়ে গর্ব করে, যে সমাজে ক্লাসে প্রশ্ন করলে ছাত্রকে ‘বেয়াদব’ বলা হয়— সেই সমাজের লেখকের নিঃসঙ্গতা না বোঝারই কথা।
তবু, রবি ঠাকুর যেমন বলেছেন, ‘শেষ নাহি যে, শেষ কথা কে বলবে?’ পরের পুজোয় কী কী বই ‘লঞ্চ’ হল, কোন লেখক কত ‘প্রি-অর্ডার’ পেলেন— এসবের হিসাব না রেখেও, যদি কোনো এক শীতের দুপুরে, ছাদের মাদুরে শুয়ে, বিভূতিভূষণের ‘স্মৃতির রেখা’ পড়তে পড়তে চোখ ভিজে যায়— জানব, পাঠক হিসাবে আমি এখনো মরিনি।
আরো পড়ুন শ্রীমালবিজয়: রক্তাক্ত প্রথম উপন্যাসে অকুতোভয় পরীক্ষা
কারণ সাহিত্য শেষ পর্যন্ত একান্ত। লেখক যখন লেখেন, তিনি একা। পাঠক যখন পড়েন, তিনিও একা। এই দুই একাকিত্বের মাঝখানে যে নীরব সেতু তৈরি হয়, তার নামই সাহিত্য। সেই সেতুতে কোনো স্পনসরশিপ চলে না, কোনো হ্যাশট্যাগ চলে না, কোনো বুস্ট চলে না। সেখানে শুধু একটা হৃদয় আরেকটা হৃদয়কে চিনে নেয়। আমরা যদি সেই সেতুটা বাঁচাতে পারি, তবে কাফকা না হোক, মাণিক না হোক— অন্তত একজন সৎ লেখক জন্মাবে, একজন সৎ পাঠকও। আর তাতেই, এই ব্র্যান্ডিংয়ের বাজারে সাহিত্য আবার নিঃশ্বাস নিতে পারবে।
নইলে ‘বেস্টসেলার’ থাকবে, ‘বুক’ থাকবে না। ‘লঞ্চ’ থাকবে, ‘জন্ম’ বা সৃষ্টিশীল ‘নেটালিটি’ থাকবে না। আর আমরা— পাঠক— একদিন সত্যিই মরে যাব। নিঃশব্দে, ইনস্টা-স্টোরি ছাড়াই।
নিবন্ধকার ছাত্র এবং গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







