ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরে যাওয়ার শতবর্ষ পরে যখন বাংলার রাজধানীও হাওড়ায় স্থানান্তরিত হল, তার আগে থেকেই শংকর হাওড়ার বাসিন্দা; যেন মফস্বলের অধীশ্বর। তিনি, কেন জানি না, পাঁচের দশক থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে কলকাতা আর ভবিতব্য নয়। গঙ্গার পশ্চিম কূল বারাণসী সমতুল। সুতরাং এই পশ্চিম কূলে যদি অন্নপূর্ণা বসবাস করেন, তাহলে বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। শংকর বঙ্গবাসীর প্রীতি ও অর্থ— দুরকম দাক্ষিণ্যই পেয়েছিলেন।
আমরা যারা হাভাতে বাঙাল, তারা গ্র্যান্ড হোটেলের দিকে তাকিয়ে যা ভাবতাম তা শংকর অনেকটা ধরতে পেরেছিলেন চৌরঙ্গী-তে। ফলে ওই উপন্যাস আগেই জনপ্রিয় ছিল, সিনেমা (১৯৬৮) সেই জনপ্রিয়তায় একটু রং চড়াল— এই মাত্র। আসলে যে কজন বাঙালি ঔপন্যাসিক বা কথাসাহিত্যিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন উত্তমকুমার ব্যতিরেকেই, শংকর তাঁদের একজন। যেভাবে আমি নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি-তে একজন তরুণ বিজ্ঞানীর ক্রমাগত অধঃপতন দেখে যাচ্ছিলাম, তা বাঙালি আজ দেখছে আইআইটি-পাশ ডিজিটাল মজুরদের মধ্যে। মোট কথা, শংকর এমন কিছু কথা হয়ত বলতে পেরেছিলেন যেখানে আটপৌরে বাঙালি তার নিজের ভাষা খুঁজে পায়। আমার সমস্যা শংকরকে নিয়ে নয়। আমার সমস্যা হঠাৎ জেগে ওঠা বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে, যিনি আগেরদিন পর্যন্ত ফ্রাঞ্জ কাফকার প্রেমপত্র, আলবেয়ার কামুর স্বীকারোক্তি ছাড়া আর কিছুই স্বীকার করতেন না। এবং মধ্যে মধ্যে সিলভিয়া প্লাথ থেকে স্ট্যাটাস দিতেন। তিনি হঠাৎ শংকর বিহনে কেঁদে আকুল। কী যে হয়, কিছুই বোঝা যায় না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
চারুলতা চলচ্চিত্রে ভূপতি তার স্ত্রীকে আগ্রহ ভরে বলেছিলেন ‘সুরেন বাঁড়ুজ্জের বক্তৃতা যখন শুনি না চারু! আমি তোমাকে একদিন রাজনীতির ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেব।’ তার বহু পরে তপন সিংহের গল্প হলেও সত্যি ছবিতে দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রম্ভালাপের সময়ে উত্তমকুমারের সাধারণত্ব নিয়ে ভারি খুশি হয়ে উঠেছিলেন কয়েকজন মধ্যবয়সিনী গৃহবধূ। এই যে অন্দরমহলের গল্প, তার খোঁজ উন্নতমানের শিল্প প্রায়ই রাখে না। উপন্যাস অনেক সূক্ষ্মতার কাজ। কুসুম ও শশীর সংলাপ যেভাবে ইতিহাসের অন্তঃসলিলা সত্য, বা শৈবলিনীর স্বপ্নদৃশ্য যেমন প্রতীকী বাসনা, ততটা মেধাবী সাধারণ সমাজ না-ও হয়ে উঠতে পারে। তার তো অবসর বিনোদনের উপকরণ চাই। বিশেষত আমাদের মত গ্রাম্য চণ্ডীমণ্ডপে, যেখানে শাড়ি গয়না পরকীয়া এবং কেচ্ছার বাইরে অন্য কোনো অধিকার মধ্যবিত্তের নেই আজ, তাদের জন্যই হয়ত শংকর আদর্শ পাঠ্য। তাদের জন্যই ‘পাল্প’ বা কাহিনির জাবদা খাতা।
কোনো সন্দেহ নেই যে মাসের পর মাস যখন বিমল মিত্র সাহেব বিবি গোলাম দেশ পত্রিকায় লিখে গেছেন, তখন ‘ভূ’ নিশ্চিতভাবে কম পড়েছে সে যুগের সীসার মুদ্রণালয়ে; থমকে গেছে ভূগোলের বই ছাপা, কেন-না ভূতনাথ সমাজে সর্বত্রগামী হয়েছিল, আর এমনভাবেই কড়ি দিয়ে কিনলাম। একটা সময় পর্যন্ত আমরা এঁদের ভাবতাম গন্ধমাদন, যেখানে আখ্যান থেকে উপাখ্যান আরও সরু গলি, চুন বালি পাথর ইত্যাদি ইচ্ছাপূরণের ইতিবৃত্ত। আজ বুঝতে পারি, সতেরো শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ইতিহাসের নানা উপকরণ বিশল্যকরণী হয়ে এইসব উপন্যাসের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। সেইসব কাঁচা রাস্তা দিয়ে বিমল মিত্র হেঁটেছিলেন বলেই হয়ত গুরুদত্ত অমন কারুবাসনা খুঁজে পেয়েছিলেন মীনাকুমারীর চোখে। তাছাড়া এসব তো কলকাতা শহরেরই ইতিবৃত্ত। তখনকার বাংলা উপন্যাসের দিকে চোখ রাখলে বুঝতে পারি, ওইসব কাহিনিসমূহ অন্তত এখনকার টেলিসিরিয়ালের তুলনায় অনেক মূল্যবান। শংকর শিল্পের তৃতীয় নয়ন থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, কিন্তু হাওড়ার মাছ বা ফুলের বাজারের মত জমা রাখা যে তথ্যের স্তূপ, জ্ঞানের জানালা—সেসব উপন্যাসের বাইরে তাঁর এক দুরন্ত হাতছানি আছে।
শংকরকে কারা উপেক্ষা করেছিলেন? নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ নয়। শংকর যখন লিখেছেন তখন দূরদর্শন ছিল না বলেই খবরের কাগজের বিকল্প হিসাবে আমাদের সম্বল ছিল রোমাঞ্চকর সাংসারিক আখ্যান। শহরের যেমন মফস্বল থাকে, এই বৃহদায়তন কাহিনিসমূহ বা কথোপকথনের মত আখ্যান হল শিল্পের মফস্বল। সকলে তো আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নন যে ইছামতী বা অপরাজিত লিখবেন। কিন্তু সাক্ষর মানুষের উপযোগী জীবনের ব্রতকথা শনির পাঁচালীর বদলে যদি চৌরঙ্গী হয়ে প্রকাশিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ পড়বেই। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমাদের কিছু নব বাবু ও নব বিবি আর্থার হেইলি, জেমস হেডলি চেজ বা মারিও পুজো পড়তেন। চালাক যুক্তিটা এইরকম যে ‘ইংরিজি পড়ছি।’ তাছাড়া বাংলায় যা মেলে না, তেমন নির্ভীক কামের উপচার তো ছড়িয়ে ছিলই ওসব লেখায়। সাহেবরা কিন্তু পাঁচের দশকের পর থেকেই সরস্বতীর পুজো করবেন বলে মা শীতলাকে অবজ্ঞা করেননি। ‘পপুলার’-এর নামে তাঁদের চেতনার মোড়ে মোড়ে দেখার এই লাইসেন্স। আর জনচিত্তহারী এইসব দীর্ঘ উপাখ্যান আমাদের কত জানায়। একের ভিতর বারো। আমেরিকায় না গেলেও হেইলির এয়ারপোর্ট বা হোটেল যে তথ্যের ভাঁড়ার খুলে ধরে, তার জোরে কলকাতার বেচুবাবুদের বাঁশবনে শিয়াল রাজা হতে কিছু বাকি থাকে না। তাহলে শংকরের দোষ কোথায়? তিনি তো আমাদের মত করে আমাদের অজানা, অদেখা অনেক জগৎ দেখিয়েছিলেন।
আরো পড়ুন পাঠক পেয়েছেন শংকর, তাই সমালোচকের স্বীকৃতির দরকার পড়েনি
স্পেনসার্স হোটেলটি একসময় ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের মোড়ে ছিল। সেই হোটেলে আমাদের জানা দুজন ও আধা-সাহেব ও সাহেব ব্যারিস্টার থাকতেন—মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও বারওয়েল। আর বারওয়েল সাহেবের ফাইফরমাশ খাটবার সময়ে শংকর কিন্তু হোটেলটিকে দেখেছিলেন। আসলে আমাদের মত বাঙালদের গ্র্যান্ড হোটেল দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম— ফুলের মত বাগানে সুন্দরী বা সাদা মানুষেরা কীভাবে হাঁটে। আমাদের তো রানাঘাটে বা কালীঘাটে বসে তা জানার কথা ছিল না। যাযাবরের দৃষ্টিপাত, বিমল মিত্রের লেখাগুলি বা নিমাই ভট্টাচার্যের মেমসাহেব— এসব কত কার্যকরী ছিল! এবং এর চেয়েও বড় কথা, শংকররা কিন্তু তাঁদের কথায় অন্তর্বাসের কথা উল্লেখ না করেও অন্তর হরণ করতে পারতেন। যেমন শংকরের কত অজানারে আমরা উপেক্ষা করতে পারি, কিন্তু ঋত্বিক ঘটক করেননি। তার কারণ কলকাতার শেষ সাহেব ব্যারিস্টার তো কলকাতার পরিবর্তমান সভ্যতাকে একজন বহিরাগতের চোখেই দেখছিলেন। শংকর সেই বিবরণ আটপৌরে ভঙ্গিতে আমাদের সামনে রাখছিলেন। যদি আমরা অযান্ত্রিক (১৯৫৮) ছবির বিমলের কথা ভাবি, তাহলে দেখব যে বিমল আর বারওয়েল সাহেব— দুজনেই কিন্তু শহরে একইসঙ্গে বহিরাগত এবং অন্তর্গত, কেবল আখ্যানের ঘরানাটা আলাদা। তাঁরা শহরবাসী হয়েও শহরের নিজস্ব নন। ফলে ঋত্বিক বিমলের চরিত্রাভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বারওয়েলের চরিত্রেও নেন। সত্যজিৎ রায় সীমাবদ্ধ (১৯৭১) এবং জনঅরণ্য (১৯৭৬) করেছিলেন। নিঃসন্দেহে শংকর অত নিষ্ঠুর ও উদ্যত আততায়ী ছিলেন না। তিনি সুন্দর মোড়কেই মানুষের পতনের ইতিবৃত্ত লিখেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, মানুষ নিজের পতন দেখতে চায় না। সত্যজিৎ শিল্পী, তাই তাঁর হয়ত আরও অনেক উচ্চাশা ছিল। কিন্তু বলার কথাটা হল, এসব আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা দেখেছি কীভাবে অর্থ এবং নারী মানুষের জ্ঞান এবং প্রজ্ঞাকে কেড়ে নিতে পারে নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে। কিন্তু আমাদের মনে ধরেনি। আমরা ভেবেছিলাম, শিল্প এমন একটা বস্তু যা এইসব বাজার চলতি ঔপন্যাসিকের সঙ্গে থাকে না। যাঁরা এসব বলতেন তাঁরা জানেন না যে বৈচিত্র্যহীন মধ্যবিত্ত জীবনে শ্মশান কীভাবে মায়াকানন হয়ে উঠতে পারে, তা একদা অবধূত দেখিয়েছিলেন। জীর্ণ পলির ঘরে কেরানির শার্ট ও ধুতির আড়ালে বিবাহপ্রত্যাশী যুবতীর উৎকণ্ঠায়, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লেখানো যুবকের কাতর প্রহরে শংকর তাদের জন্য অনেক আশ্বাস জমা রাখতে পেরেছিলেন।
যাঁরা বলেন ‘শিল্প তো নয়’, তাঁদের জন্য আমার করুণা হয়। শিল্প তো দু-একজনের। কমলকুমার মজুমদার যে রোজ শ্মশান আলো করে বসে থাকতে পারেন না, মতি নন্দীও রোজ আহিরীটোলার গলিতে নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান খেয়াল করতে পারেন না। সীমানার বাইরে কিছু উদ্বৃত্ত তো থেকে যায়ই। আমাদের এই বিস্তৃত ধারাবাহিক যেসব কেরী সাহেবের মুন্সীরা লিখে যেতেন চৌরঙ্গীর মত উপন্যাসে, তাঁরা অন্তত টেলিসিরিয়ালের চিত্রনাট্যকারের মত অধঃপতিত নন। কিংবা আজকের ঔপন্যাসিক নন যে কাউন্টার সেল হবে না, শুধু লাইব্রেরি আর ফাউন্ডেশনই ভরসা। তাঁরা ইতিহাসে প্রবেশ করতে পারেন না হয়ত, কিন্তু দেউড়িতে বর্শা হাতে পাহারা দেন। বাংলা সাহিত্যের এই অমাবস্যার ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে আলোটুকু হয়ত দেখা যাচ্ছে বঙ্কিমচন্দ্র, বিভূতিভূষণ ও মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য; কিন্তু আমাদের শংকরকেও দরকার। আজ তো অন্ধকারকে অন্ধকার বলে চিনিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই। আমাদের শৈশবের সুগন্ধ বলতে এইসব জাবদা খাতা। এইসব পাঠশালায় না পড়লে আমরা চট করে মিলান কুন্দেরা বা অরহান পামুক হাতে নিতে পারতাম না। শংকর চলে যাওয়ার পরে উচ্ছ্বাস দেখে আমার মনে হচ্ছে— যেসব বাঙালি বাবু হর্হে লুইস বর্হেসের নিচে নামতেন না, তাঁদের কী পরিমাণ কোমর ব্যথা হল শংকরের স্মৃতিচারণে। আজকাল একটা উপন্যাস একটা সংস্করণই পার হয় না, আর শংকর এত বই লিখতেন যে এক ব্যাগে ধরত না। এটুকুই বলার।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








