‘সেই সময়কার কথা বলছি, যখন আমি খিদের জ্বালায় ক্রিস্টিয়ানিয়া শহরের পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি।’ এমনই এক অবিস্মরণীয় লাইন দিয়ে শুরু হয়েছিল ন্যুট হামসুনের উপন্যাস হাঙ্গার। তিরিশ বছর বয়সী নরউইজিয়ান লেখকের এই সপাট আত্মবিশ্বাসের চড় পাঠককে তৎক্ষণাৎ পেড়ে ফেলেছিল; ফলত এই বই অচিরেই হামসুনকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি, বিশ্ব সাহিত্যের ‘কাল্ট ফিগার’ হয়ে দাঁড়ান তিনি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত প্রায় আত্মজীবনীমূলক এই বইটি প্রকাশের ১৩৫ বছর বাদে আজও অনুসন্ধিৎসু পাঠকের অবশ্যপাঠ্য।
পাশাপাশি একথাও অনস্বীকার্য, সাহিত্যজগৎ হামসুনকে শুধুমাত্র তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অনবদ্য ভাষায় প্রকাশ করবার জন্য মনে রাখবে— একথা বললে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। ভুললে চলবে না, পরবর্তীকালে সাহিত্যে ‘স্ট্রিম অফ কনশাসনেস’ অথবা ‘ইন্টারনাল মনোলগ’-এর যে ব্যবহার আমরা দেখতে পাই, তার অনেকটাই কিন্তু শুরু করেছিলেন হামসুনই, সেই উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
তবুও, এবং তবুও। সমালোচকদের ময়না তদন্ত যা-ই বলুক, হামসুন কিন্তু পাঠকের হৃদয় জয় করেছিলেন তাঁর বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে অস্ত্র করে, এবং তিনি কোনো ব্যতিক্রম নন। একথা ধ্রুব সত্য যে বিশ্বব্যাপী লেখককুল যুগে যুগে তাঁদের কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন অভিজ্ঞতাকে মূলধন করেই। তারই উপর চাপিয়ে দিয়েছেন কল্পনার প্রলেপ, এবং সর্বোপরি পরিবেশিত করেছেন এমন ভাষায়, যা তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে অমরত্বের অমৃতফল।
এমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে মোটেই অপ্রতুল নয়। সেই চার্লস ডিকেন্সের আমল থেকে পাঠক সমাজে আদৃত হচ্ছে লিও তলস্তয়, ফিওদর দস্তয়েভস্কি, মার্ক টোয়েন, ডি এইচ লরেন্স, মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জর্জ অরওয়েল প্রমুখের লেখা, যা কিনা অভিজ্ঞতার অসাধারণ ফসল এবং সাহিত্যগুণে অতুলনীয়। বাংলায় আমরা পেয়েছি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, সুবোধ ঘোষ, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী এবং আরও অনেককে। সাহিত্যিক হিসাবে এঁরা সবাই একাসনে বসবার যোগ্য— এমন দাবি না করেও একটা কথা অবশ্যই বলা যায় যে এঁদের সবার গল্প উপন্যাস পাঠককে আপ্লুত করেছে, জনপ্রিয়তার নিরিখে বাংলা সাহিত্যের শীর্ষস্থানগুলি এঁদের নিয়মিত দখলে থেকেছে।
উপরোক্ত সব লেখকের একটা বিষয়ে আশ্চর্য মিল। এঁদের প্রায় কেউই সোনার চামচ মুখে নিয়ে পৃথিবীতে আসেননি, এঁদের শৈশব কেটেছে প্রতিকূল পরিবেশে, অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য অথবা অনাহারে, শিক্ষায় ব্যাঘাত ঘটেছে নিয়মিত, রুজি রোজগারের চেষ্টায় লেগে পড়তে হয়েছে প্রায় শিশুকাল থেকে। লড়াই ছিল এঁদের নিত্যসঙ্গী, তবু জীবনযুদ্ধে এঁরা পরাজিত হননি, সাহিত্যের মাধ্যমে নিজেদের মেলে ধরেছেন অনাবিল ভঙ্গিতে, পরিণত হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে।
এ তো গেল সেইসব লেখকদের কথা, যাঁরা চিরকালীন, ‘ক্লাসিক’ লেখকদের মধ্যে যাঁদের আসন অবধারিতভাবে সংরক্ষিত। কিন্তু এঁদের পরে এলেন আরেক দল লেখক, যাঁদের লেখার প্রধান অবলম্বন অভিজ্ঞতাপ্রসূত হলেও, তা মূলত পেশাগত অভিজ্ঞতার ফসল। এঁদের আবির্ভাব বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে। বিভিন্ন পেশায় এঁরা বহুবছর নিযুক্ত থেকেছেন, কিছু নির্দিষ্ট পেশাকে নিবিড়ভাবে চিনেছেন, অন্তর থেকে উপলব্ধি করেছেন তার দোষগুণ, ভালমন্দ; মিশে গেছেন এই বিশেষ পেশাগুলির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের সঙ্গে, হয়ে উঠেছেন এঁদের সুখদুঃখের সাথি। এরপর যখন কলম ধরেছেন, তখন স্বভাবতই উঠে এসেছে অতি বিশ্বাসযোগ্য যাবতীয় কাহিনি। প্রসাদগুণে সেগুলি হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়, ‘বেস্টসেলার’ তালিকা হয়ে উঠেছে এঁদের মৌরসি পাট্টা। ইয়ান ফ্লেমিংকে দিয়ে শুরু করলে এঁদের মধ্যে আছেন বহু পরিচিত কিছু নাম, যেমন রিচার্ড প্যাটারসন, মাইকেল ক্রিকটন, হারম্যান মেলভিল, আর্থার হেলি থেকে শুরু করে আজকের যুগের রবিন কুক, জন গ্রিশাম, খালেদ হোসেইনি অবধি।
তবে বাংলা সাহিত্যের দিকে তাকালে যে দুটি নাম আমাদের প্রথমেই চোখে পড়ে তা হল জরাসন্ধ এবং সদ্যপ্রয়াত শংকর। বয়সের দিক থেকে বিচার করলে জরাসন্ধ, যাঁর পিতৃদত্ত নাম চারুচন্দ্র চক্রবর্তী, শংকরের আগের প্রজন্মের মানুষ। কিন্তু দুজনেরই সাহিত্যিক যাত্রা শুরু পাঁচের দশকে, বছর দুয়েক আগে পরে। পেশায় কারাবিভাগের উচ্চপদস্থ অফিসার জরাসন্ধর প্রথম বই লৌহকপাট অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর বেশকিছু উপন্যাস বাংলায় ও হিন্দিতে চলচ্চিত্রায়িত হয়। অন্তত বছর বিশেক তাঁর এই জনপ্রিয়তা অক্ষুণ্ন ছিল, তারপর যথানিয়মে ভাঁটার টান আসে। আসলে কারান্তরালের বিভিন্ন অজানা কাহিনি প্রাথমিকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করলেও, পরে ব্যাপারটা কিছুটা ক্লান্তিকর হয়ে পড়ে, যা সম্ভবত প্রভাবিত করে লেখক এবং পাঠক— দুজনকেই।
শংকরও শুরু করেন সাড়া জাগিয়ে। সদ্য কুড়ি পার করা এই যুবকের প্রথম বই কত অজানারে বস্তুত ইতিহাস সৃষ্টি করে। মণিশংকর মুখোপাধ্যায় জানান দেন— তিনি এসে গেছেন। সেদিক থেকে তিনি অনন্য এবং বিরল প্রজাতির এক লেখক। জরাসন্ধ এবং বহু বিদেশি লেখকের মত একটিমাত্র পেশাকে অবলম্বন করে তিনি তাঁর ডালি সাজিয়ে বসেননি। সেখানে বিভিন্ন রঙের, গন্ধের এবং মরশুমি ফুলের রমরমা, নিয়মিত পালটে গেছে তাঁর গল্পের ধারা ও পারিপার্শ্বিক। হাইকোর্ট এবং কলকাতার শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টারকে ঘিরে শুরু হয়েছিল শংকরের প্রাথমিক যাত্রা। এরপর পেশাগত কারণে তিনি জীবিকা পালটেছেন, সুতরাং পালটে গেছে তাঁর গল্পের প্লটও। কখনো তাঁর গল্প গড়ে উঠেছে পাঁচতারা হোটেলের ঝাঁ চকচকে কিন্তু রহস্যময় আবর্তে, কখনো আবার পেশাদার মঞ্চের চোখ ধাঁধানো আলোর ঠিক নিচেই কতটা অন্ধকার জমে আছে— তার খোঁজে কলম ধরেছেন লেখক। একবারের জন্যেও একঘেয়েমির শিকার হতে দেননি পাঠককে; এককথায়— গল্প জমিয়ে দিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয়তর হয়েছেন শংকর। নিজগুণে এবং নিজ কৃতিত্বে।
বাংলা সাহিত্যে শংকর প্রবেশ করেন এমন একটা সময়ে, যখন উপন্যাসের ধারায় একটা পরিবর্তনের পদধ্বনি আসন্নপ্রায়। তারাশঙ্কর তাঁর শ্রেষ্ঠতম উপন্যাসগুলি ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন; মনোজ বসু, বিমল মিত্রদের সিংহাসনচ্যুত করতে গোকুলে বাড়ছেন মতি নন্দী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা। শংকর এই দুটি ধারার কোনোটিরই সেই অর্থে অনুগামী নন। তাঁর মনন, দৃষ্টিভঙ্গি এবং, অবশ্যই প্রকাশভঙ্গি, স্বতন্ত্র। তাঁর পথ চলা সমসাময়িক দ্বারা খুব একটা প্রভাবিত নয়। জনপ্রিয়তা তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি, মহান সাহিত্যের তকমা জোগাড় করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু জনপ্রিয়তা বজায় রাখার আপ্রাণ তাগিদে শংকর কোনোদিন পথভ্রষ্ট হননি, বিষয় কিংবা ভাষায় কোনো বাচালতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি, নিজের বেছে নেওয়া পথে অবিচল থেকেছেন। কর্পোরেট জগতের উচ্চকোটিতে তাঁর পেশাদার বিচরণ, তারই অলিগলি দিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর বেশ কিছু বহুপঠিত কাহিনী। কিন্তু শংকরের লেখায় কোনো দেখনদারি হামবড়া ভাব নেই, তিনি ভাষা প্রয়োগে অতিমাত্রায় সংযত, ‘ওভারস্মার্ট’ হওয়া তাঁর কল্পনার অতীত। আদতে তাঁর আত্মবিশ্বাস প্রবল। পাঠককে আকর্ষণ করার যাবতীয় মালমশলা বহুবছর যাবৎ তাঁর করতলগত। এখানেই তাঁর সাফল্য।
আরো পড়ুন উপন্যাস, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?
বহুবছর আগে পশ্চিমবঙ্গের অগণিত লিটল ম্যাগাজিনের কোনো একটি, তাদের প্রথম পাতায় লিখে জানায়— এক কিলো চাল, এক প্যাকেট নিরোধ আর এক ব্যাগ শংকর, এর মধ্যে কোনটি আসলে সাহিত্য তা তাদের বোধগম্য হচ্ছে না। এই নিম্নরুচির রসিকতার অবশ্যই লক্ষ্য ছিলেন লেখক শংকর। নির্দ্ধিধায় বলা যাক— সাহিত্যের মাপকাঠি নয়, লেখকের জনপ্রিয়তাই ছিল এই ঈর্ষামূলক মন্তব্যের প্রধান কারণ। বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পেলে, এবং যে কোনো ক্ষেত্রে এক নম্বর স্থান, অধিকার করলে মানুষটি অবধারিত চরম আক্রমণের লক্ষ্য হবেন ও ভেসে আসবে কুৎসার তির। রবীন্দ্রনাথ থেকে সত্যজিৎ রায়, উত্তমকুমার থেকে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়— সবাই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। শংকরের বেলায় ব্যতিক্রম হবে— এমন আশা করা বৃথা। সুতরাং তাঁর সেরা দিনগুলিতে নিয়মিত এবং বারবার প্রমাণ করবার চেষ্টা হয়েছে যে সাহিত্যজগতে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, কালের বিচারে পথপার্শ্বে পড়ে থাকবেন। শংকর কোনোদিন জবাব দেননি। আসলে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি, কারণ পাঠকরা সর্বদাই বিশাল সংখ্যায় তাঁর পাশে থেকেছেন।
সৌভাগ্যবশত, একথা আজ সর্বজনবিদিত যে সমালোচকদের সম্বন্ধে একদা জর্জ বার্নার্ড শ যে বক্রোক্তি করেছিলেন তা বহুলাংশে সঠিক এবং সাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দেওয়ার কোনো ঈশ্বরপ্রদত্ত দায়িত্ব কারও হাতে সঁপে দেওয়া নেই। সেটাই বাঁচোয়া। পরিণত বয়সে চলে গেলেন শংকর; আশঙ্কা হয় সমালোচকরা আবার তেড়ে ফুঁড়ে উঠবেন, আগামী বইমেলায় যাতে তাঁর বইগুলির বিক্রি আবার হঠাৎ বেড়ে না যায়, সেদিকে কড়া নজর রেখে। শংকরের মনন, গভীরতা ইত্যাদি নিয়ে আবার নতুন করে প্রশ্ন উঠতেই পারে, অথবা তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছিল— এমন কথাও কেউ কেউ বলতেই পারেন। তবে মুশকিল হল, যে যা-ই বলুন, অন্তিমে সেই শেষ বিচারের আশায় আমি বসে আছি। সেই সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকমণ্ডলীতে পাঠকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







