পার্থসারথি বিশ্বাস
গতমাসে মাধবরাও রোয়াসাহেব কদম (৪৩) তাঁর এলাকার বেসরকারি চিনিকলে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আখের দাম যা আশা করা যায় তার চেয়ে কম দেওয়া হয়েছে কেন? উত্তরটা তাঁকে চিন্তায় ফেলে দেয়। মহারাষ্ট্রের হিংগোলি জেলার বাসমথ তালুকের আকোলি গ্রামের এই চাষিকে চিনিকল বলে, তারা ওর বেশি দিতে পারবে না, কারণ সরকার তাদের তৈরি ইথানল কিনছে না।
কদম বললেন ‘কোলাপুর আর সাংলি জেলার চিনিকলের মালিকরা টন পিছু ৩,৫০০ টাকা দিচ্ছে। এদিকে আমাদের এলাকায় মাত্র ২,৫০০ টাকা দেওয়া হচ্ছে। মিল কথা দিয়েছে পরে বেশি টাকা তুলতে পারলে আমাদের আরও দেবে। সেটা হয়ত এই মরশুমে পরের দিকে হতে পারে।’ তিনি নিজের চার একর জমির এক একরে আখ চাষ করেন। বাকি জমিতে তিনি সয়াবিন, ছোলা আর গম চাষ করেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
চিনিকলের ব্যাখ্যা অবশ্য তাঁকে সন্তুষ্ট করেনি। বললেন ‘ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগছে। মিল তো এই নতুন ইথানলের কারখানাটা তৈরি করতে বেশ ভালো টাকা লগ্নি করেছে। কিন্তু চাষিদের টাকা দেওয়ার সময়ে সবসময় ওদের একটা অজুহাত তৈরি থাকে।’
চাষিদের অসন্তুষ্টি ইথানল শিল্পক্ষেত্রের মধ্যেও রয়েছে। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের বেসরকারি চিনিকলগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সুগার মিলার্স অ্যাসোসিয়েশন (WISMA) সভাপতি ভৈরবনাথ বি থোমাব্রে বললেন, ইথানল শিল্পেও দুঃসময় চলছে। তাঁর ভাষায় ‘চিনি শিল্পে আর্থিক চাপ চলছে। এই মুহূর্তে মহারাষ্ট্রের চিনিকলগুলোর দেয় বকেয়ার পরিমাণ ৪,০০০ কোটি টাকার বেশি। চাষিদের টাকা যথাসময়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
ইথানল, স্থিতিশীল রাজস্ব
অন্যান্য ফসলের সঙ্গে আখের তফাত হল, আখচাষিদের ফেয়ার অ্যান্ড রেমিউনারেটিভ প্রাইস (FRP) হিসাবে ফসলের টাকা পাওয়া নিশ্চিত। ১৯৬৬ সালের সুগারকেন কন্ট্রোল অর্ডার অনুযায়ী আখ সরবরাহ করার ১৪ দিনের মধ্যে চাষিকে টাকা দিতেই হবে। না দিলে চিনিকলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এই ব্যবস্থাদির মধ্যে টাকা তোলার জন্যে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করাও পড়ে। ফলে চিনিকলের টাকা দেওয়ার অক্ষমতা চাষি আর চিনিকলের মালিক— দুই পক্ষের জন্যেই অশনি সংকেত।
চিনি শিল্পের জন্যে স্থিতিশীল রাজস্বের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইথানল। কার্বোহাইড্রেট গাঁজিয়ে তৈরি এই জিনিসটা পেট্রলের সঙ্গে মেশানো হয় কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানোর জন্যে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি কমাতে। চিনিকলগুলো অনেকদিন ধরেই উপজাত দ্রব্য হিসাবে ইথানল উৎপাদন করছিল। ২০১৮ সালে যখন তেল বিপণন কোম্পানিগুলো (OMCs) ইথানলের নিশ্চিত ক্রেতা হয়ে দাঁড়ায়, তখন থেকে উৎপাদনে গতি আসে। আখ থেকে চিনি নিষ্কাশনের পর উপজাত দ্রব্য আখের রস বা বি-হেভি আর সি গুড় থেকে সরাসরি ইথানল তৈরি করা যায়। চিনির মাত্রা বেশি থাকা কাঁচামাল থেকে এটা বের করা সহজ হওয়ায় চিনিকলগুলো অতিরিক্ত চিনিকে ইথানলে পরিণত করতে উৎসাহিত হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে চিনিকলে ইথানল উৎপাদন চালু করা এবং উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোয় উৎসাহ দিয়েছে। যেমন নতুন প্রকল্পের ঋণের সুদে ভর্তুকি দিয়েছে। চিনি শিল্পের সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে এই খাতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা। সুদে সরকারি সাহায্যের চেয়েও স্থিতিশীল বাজারের নিশ্চয়তাই মিলগুলোকে ইথানল উৎপাদনে লগ্নি করতে উৎসাহিত করেছিল।
থোমাব্রে বললেন ‘সরকারের ইথানল কিনে নেওয়ার নীতিতে এই হঠাৎ বদল চাষি বা মিল মালিক, কারও পক্ষেই ভালো নয়। চিনিকলগুলো তাদের ডিস্টিলারিগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে মুশকিলে পড়েছে।’
নীতি নির্ধারকরা ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন
২০১৯-২০ সালে খরার সময় থেকে আখ চাষের এলাকা এবং ইথানল উৎপাদন কমে যায়। তারপর সরকার ভুট্টা ও ভাঙা চালের মত খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদন বাড়াতে শুরু করে। একে দ্বিতীয় প্রজন্মের (2G) ইথানল বলা হয়ে থাকে। ২০২০ সালের নভেম্বরে সরকার ভুট্টাকে ইথানল উৎপাদনের কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। গত কয়েক বছরে ভুট্টার উপর ভিত্তি করে তৈরি ইউনিটগুলো থেকে OMC কেনা সমানে বেড়েছে।
ইথানল সরবরাহ বর্ষ (ESY) হিসাব করা হয় ১ ডিসেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর। ২০২২-২৩-এ ভুট্টা থেকে ইথানল উৎপাদকদের ২.৭০ কোটি লিটারের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাঁরা সরবরাহ করেছেন ৩১.৫১ কোটি লিটার। ২০২৩-২৪-এ লক্ষ্যমাত্রা বেড়ে ২০৫.৮৮ কোটি লিটার হয়ে গিয়েছিল, আর সরবরাহ হয়েছিল আরও বেশি— প্রায় ২৮৯.৯১ কোটি লিটার। এই বদল আরও চোখে পড়ার মত হয়ে যায় ২০২৪-২৫-এ। OMC-গুলো ভুট্টা থেকে নিষ্কাশিত ইথানল চেয়েছিল ৫২০.২৭ লিটার এবং নিয়েছিল ৪১৯.৯৭ কোটি লিটার। অন্যদিকে চিনি শিল্পের কাছে চাওয়া হয়েছিল ৩৪৯.৯৭ কোটি লিটার এবং নেওয়া হয়েছিল ৩০৬.৭ কোটি লিটার। ভুট্টার ডিস্টিলারিগুলো চিনির ইউনিটগুলোর তুলনায় দামও বেশি পেয়েছে। এদিকে বছর বছর ভুট্টার উৎপাদন এলাকাও বেড়েছে। ২০২৫ সালে খারিফ শস্য রেকর্ড ৭১.২১ লক্ষ হেক্টরে ফলেছে।
ইথানল উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া
চিনি শিল্পের জন্যে এই পরিবর্তনের মানে হল ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার না হওয়া। মহারাষ্ট্রের শিল্পক্ষেত্রের সূত্র বলছে, প্রায় ৩০০ কোটি লিটার নিষ্কাশনের ক্ষমতাসম্পন্ন ডিস্টিলারি মাত্র এক তৃতীয়াংশ ক্ষমতায় কাজ করছে এই মুহূর্তে।
ন্যাশনাল ফেডারেশন অফ কো-অপারেটিভ সুগার ফ্যাক্টরিজ অ্যাসোসিয়েশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চিনিকলের ১,৮২২ কোটি লিটার নিষ্কাশনের ক্ষমতাসম্পন্ন ডিস্টিলারির মাত্র ১,০০০৩.১ কোটি লিটার ২০২৪-২৫-এ ব্যবহার করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের এক চিনিকলের মালিক পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত বলে বর্ণনা করলেন। বললেন ‘চিনিকলের মালিকদের ধার শোধ করতে হয়। ইথানল থেকে টাকা পাওয়া নিশ্চিত ছিল বলে চাষিদের বকেয়া টাকা দেওয়া আর ধারগুলো শোধ করা— দুদিকেই সুবিধা হত। এখন ক্ষমতার পুরো ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা জানি না ডিস্টিলারিগুলোর আর্থিক ভবিষ্যৎ কী।’
আরো পড়ুন কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না, অথচ বাজার আগুন কেন?
মহারাষ্ট্র আর কর্ণাটক থেকে কাজ চালানো রেণুকা সুগার্স লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর বিজেন্দ্র সিং কাজ সমানভাবে বিতরণের দাবি তুললেন। ‘চিনিকলের মালিকরা চাষিদের আয়েরও উৎস। তাই ইথানল উৎপাদনের দায়িত্ব সমানভাবে ভাগ করে দিলে সকলের জন্যেই ভালো হবে।’
চাষিরা আরও কম টাকা পাওয়ার আশংকা করছেন
ভগবৎ যাদবও (৩৮) তাঁর এলাকার মিল মালিকদের ইথানল নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বারবার বলতে শুনেছেন। তিনি সাংলি জেলার ওয়ালওয়া তালুকের নওয়ে খেড় গ্রামে চার একর জমিতে আখ চাষ করেন। তিনি বললেন ‘এখানকার চিনিকলগুলোর রিকভারি (উৎপাদিত চিনি আর পেষাই হওয়া আখের অনুপাত) বেশি, যা দিয়ে সুগারকেন কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৬৬ অনুযায়ী চাষিদের দেয় টাকার পরিমাণ ঠিক হয়। তাই এরা আমাদের টন পিছু ৩,৫০০ টাকা দিতে পারে। কিন্তু ওরা বলছে গোটা মরশুম এটা চালাতে পারবে না।’
যাদব কৃষক সংগঠন স্বাভিমানী শ্বেতকারী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। তাঁর অভিযোগ, মিল মালিকরা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে তা অজুহাত মাত্র। জানালেন ‘আমাদের অঞ্চলে চাষিদের টাকা কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমরা পথে নেমে আন্দোলন করব।’
কদমের মত চাষিদের জন্যে সরকারের ইথানল নীতির পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক ফলাফল রয়েছে। তিনি বললেন ‘আখ হল একমাত্র ফসল যার জন্যে টাকা পাওয়া নিশ্চিত। এখন মিলগুলো ইথানলকে ব্যবহার করে আরও বেশি টাকা দেওয়া এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের জন্যে এটা বিনা মেঘে বজ্রপাত।’
প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.com–এর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







