অর্ক মুখার্জি

এবার ভারত এবং শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে আয়োজন করছে দশম আইসিসি টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। বলার অপেক্ষা রাখে না, বর্তমানে ক্রিকেটের নানা ধরনের মধ্যে কুড়ি ওভারের খেলাই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য। কুড়ি বিশের ক্রিকেট বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের সৌজন্যে। যেসব দেশে ক্রিকেট তেমন বড় খেলা নয়, সেসব দেশও অংশ নিচ্ছে এবং বড় দলগুলোর বিরুদ্ধে ভালোই লড়ছে। পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপে এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও অ্যাসোশিয়েট দেশগুলো অতীতে অংশগ্রহণ করেছে এবং এক-আধটা অঘটন ঘটিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ম্যাচই একপেশে হত। এখন দেখা যাচ্ছে কুড়ি বিশের সংস্করণে নেপাল, ইতালি, স্কটল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডস বেশ লড়ে যাচ্ছে। পুরনো টেস্ট খেলিয়ে দেশ হলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গত ১৫-২০ বছরে প্রান্তিক হয়ে পড়া জিম্বাবোয়ে পর্যন্ত এবারের বিশ্বকাপে অপরাজিত থেকে, অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সুপার এইটে উঠেছে। এ পর্যন্ত সব ঠিকই আছে, কিন্তু সমস্যা অন্যত্র।

একথা মানতে দ্বিমত থাকা উচিত নয় যে মাঠে গিয়ে খেলা দেখার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি ভারতে। ২০২৩ সালে ভারত একক আয়োজনে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপের আয়োজন করেছিল এবং এখন যৌথ আয়োজনে কুড়ি বিশ্বের বিশ্বকাপ করছে। কিছুদিন পর কলকাতার ইডেন উদ্যানে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে সুপার এইটের ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ। বাংলার মানুষের ক্রিকেটপ্রেম এবং মাঠে গিয়ে খেলা দেখার উৎসাহ ভারতের অনেক শহরের চেয়েই বেশি, আমেদাবাদের চেয়ে বেশি তো বটেই। চলতি বিশ্বকাপের ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-স্কটল্যান্ড, ইতালি-ইংল্যান্ড, ইতালি-স্কটল্যান্ড প্রভৃতি ম্যাচেও বেশকিছু মানুষ মাঠে বসে খেলা দেখেছেন। এদিকে ভারতের অধিকাংশ শহরেই এখন ভারত না খেললে মাঠে মাছি তাড়ানোর লোক থাকে না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

স্বাভাবিকভাবেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে ভারতের ম্যাচ ঘিরে টিকিটের চাহিদা তুঙ্গে। আরেকটি সেমিফাইনাল হওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তান উঠলে সে খেলা হবে শ্রীলঙ্কায়, আর একটা সেমিফাইনাল যে মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে হবে তা স্থির হয়ে আছে। অর্থাৎ বাংলার ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে মাঠে বসে ভারতের খেলা দেখার প্রথম এবং শেষ সুযোগ আগামী রবিবারের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, টিকিট অমিল।

অনলাইনে কিছু টিকিট বিক্রির জন্যে ছাড়া হয়েছিল, কিন্তু তখনো স্থির হয়নি যে সুপার এইট ম্যাচে কোন কোন দল ইডেনে খেলবে। অফলাইনে কখন টিকিট দেওয়া হচ্ছে সেই সম্পর্কেও সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা অন্ধকারে থাকছেন। জয় শাহের রাজত্বে এই রোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপেও একই সমস্যা দেখা গিয়েছিল বহু জায়গায়। তিনি তখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। ৮ অক্টোবর, ২০২৩, গ্রুপ লিগের ম্যাচে চেন্নাইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। টিকিটের চাহিদা ছিল প্রবল। বেশ কিছুদিন আগে থেকে বহু ক্রিকেটপ্রেমী অনলাইনে টিকিট কাটার চেষ্টা করেন এবং ব্যর্থ হন। অনলাইনে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে ছিল বুক মাই শো। হঠাৎ শেষ মুহূর্তে কিছু টিকিট ছাড়া হয়, ফলে অনেকের পক্ষেই কাজ বা ব্যবসা থেকে ছুটি নিয়ে খেলা দেখা সম্ভব হয়নি। আবার যাঁরা শহর থেকে দূরে থাকেন, তাঁদের পক্ষেও অত অল্প সময়ের ব্যবধানে মাঠে পৌঁছনো। বহু ক্রিকেটপ্রেমীই এ নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন সোশাল মিডিয়ায়। প্রশ্ন তুলেছিলেন, এতদিন ঝুলিয়ে রেখে শেষ মুহূর্তে কেন টিকিট ছাড়া হল? তার আগেই কেন ‘সোল্ড আউট’ নোটিস জারি করা হল? কেন ক্রিকেটপ্রেমীদের এইভাবে বিভ্রান্তির মধ্যে রাখা হল?

আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছিল সেবারের বিশ্বকাপ। প্রথম ম্যাচ ছিল ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েকদিনের মধ্যেই থেকে দাবি করা হয়, ৮০% টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। কিন্তু ম্যাচের দিন ম্যাচ খেলা শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে পর্যন্তও সংশ্লিষ্ট অনলাইন প্ল্যাটফর্ম দেখাচ্ছিল— টিকিট রয়েছে। আরও অদ্ভুত কাণ্ড হল, এক স্থানীয় বিজেপি নেতা দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-কে বলেছিলেন – প্রথম দিনের ম্যাচের ৩০,০০-৪০,০০০ টিকিট মহিলাদের বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছে সংসদে তার কদিন আগেই পাশ হওয়া মহিলা সংরক্ষণ আইনের অনুপ্রেরণায়। সেবার একজন একবারে মাত্র দুটো টিকিট অনলাইনে কিনতে পারছিল।

আরো পড়ুন জয় জয় জয় জয় হে

প্রসঙ্গত, ৬৫ হাজার দর্শকাসনসম্পন্ন ইডেনের মাত্র ৩২,০০০ টিকিট, চেন্নাইয়ের ৩৭,০০০ দর্শকাসনসম্পন্ন এম এ চিদম্বরম স্টেডিয়ামের মাত্র ১৩,০০০ টিকিট বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু আমেদাবাদের প্রায় এক লক্ষের কাছাকাছি টিকিট প্রতি ম্যাচে বিক্রি হচ্ছিল। অর্থাৎ আমেদাবাদে মোট আসনসংখ্যার প্রায় ৯০% টিকিটই বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। কেন আমেদাবাদ এই সুবিধা পেয়েছিল তা আন্দাজ করার জন্যে কোনো পুরস্কার নেই।

২০২৩ সালে ভারত খেলছে না এমন ম্যাচের অনলাইন টিকিট বিক্রি শুরু করে ২৫ আগস্ট। ভারতের ম্যাচের টিকিট ৩১ অগাস্ট-৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত ত্রুটি এমন পর্যায়ে ছিল যে অনেকেই কিনতে পারেননি, সোশাল মিডিয়া জুড়ে বিস্তর হইচই শুরু হয়। প্রথমে টিকিট নিঃশেষিত দেখালেও, পরে আবার চাপে পড়ে ৬ সেপ্টেম্বর আরও টিকিট ছাড়ার কথা ঘোষণা করা হয়। সেই টিকিটগুলো কি আকাশ থেকে পড়েছিল? আবার ১৪ অক্টোবরের ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের জন্য ৮ অক্টোবর আরও ১৪,০০০ টিকিট বিক্রির কথা ঘোষণা করা হয়। এসব নিয়ে তখন বিতর্ক হয়েছিল।

এবার বর্তমানের কথায় ফেরত আসা যাক। বহুদিন ধরেই ইডেনের ম্যাচের টিকিট বন্টন ব্যবস্থা কলকাতাকেন্দ্রিক। কলকাতা এবং সংলগ্ন অঞ্চলের মানুষের কেনার সুবিধা অনেক বেশি। একসময় খেলা হলে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হত— কবে, কখন, কোথা থেকে টিকিট বিক্রি করা হবে। এখন ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গলের মর্জির উপর ব্যাপারটা নির্ভর করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেরকম কোনো বিজ্ঞাপন দেখা যায় না। টিকিটের কালোবাজারি করা লোকেদের অনেকের বক্তব্য— তারা সিএবির লোকেদের থেকেই খবর পায় এবং সেভাবেই টিকিটও তাদের হাতে আসে। একথা যদি সত্যি না-ও হয়, একথা কিন্তু অনস্বীকার্য যে এই অনলাইন টিকিটের যুগেও কলকাতা থেকে দূরে থাকা মানুষের ইডেনে খেলা দেখার সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। দূরের জেলার মানুষকে উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়, শেষ মুহূর্তে টিকিট পাওয়া গেলে আচমকা ১২-১৪ ঘন্টা বা তার বেশি সময় ট্রেনে বা বাসে চেপে কলকাতায় পৌঁছতে হয়।

তবে তাতে বিসিসিআই বা সিএবি-র কী? ওঁরা দুহাতে টাকা করতেই ব্যস্ত। টিকিট বিক্রি ঝুলিয়ে রাখলে চাহিদা বাড়বে, চাহিদা বাড়লে টিকিটের দাম চড়বে। কালোবাজারি জাঁকিয়ে বসবে। সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর আবেগ বুঝতে ওঁদের বয়েই গেছে। এখন তো আর এটা খবর নয় যে বিসিসিআই বিজেপির দখলে। সেই দল যে কত বাঙালিপ্রেমী তাও কারও জানতে বাকি নেই। যতদিন ভারতীয় ক্রিকেট এঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, ততদিন সুষ্ঠুভাবে ম্যাচের টিকিট পাওয়ার আশা দুরাশা। অব্যবস্থা আর লোভ— দুটো একসঙ্গে কাজ করলে যা হয়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.