অতি দর্পে…

সেই জগমোহন ডালমিয়ার আমলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ একত্রে বিশ্ব ক্রিকেটে উপমহাদেশের আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা শুরু করেছিল এবং সফল হয়েছিল। কারণটা ব্যবসায়িক। যতগুলো দেশ ক্রিকেট খেলে, তার মধ্যে খেলাটার জনপ্রিয়তা এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি এবং প্রত্যেকটা জনবহুল দেশ। এখন যুক্ত হয়েছে নেপাল আর আফগানিস্তান। ফলে এই উপমহাদেশই স্পনসরদের জন্যে সবচেয়ে বড় বাজার। অন্যান্য কুড়ি বিশের লিগের তুলনায় আইপিএলের রমরমাও এই কারণেই বেশি, বিসিসিআইও এই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট বোর্ড হতে পেরেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের হাত থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের রাশ কেড়ে নেওয়ার পরে ডালমিয়া চেষ্টা করেছিলেন ক্রিকেটকে আরও ছড়িয়ে দিতে। দক্ষিণ আফ্রিকাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনা, বাংলাদেশকে টেস্ট ক্রিকেটের আঙিনায় নিয়ে আসা সেই চেষ্টারই অংশ। সে আমলেই অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর মধ্যে ক্রিকেট আরও ছড়াচ্ছিল। কেনিয়া ভাগ্যের সামান্য সহায়তা পেয়ে ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল। সিঙ্গাপুর, টরন্টো, নাইরোবির মত নতুন নতুন জায়গায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসছিল। কিন্তু এন শ্রীনিবাসনের আমল থেকে, বলা ভালো, আইপিএলের টাকায় পকেট ভীষণ গরম হওয়ার পর থেকে, উপমহাদেশীয় ঐক্যের তোয়াক্কা না করে বিসিসিআই এককালে সকলের উপর ছড়ি ঘোরানো অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের সঙ্গেই জোট বেঁধে তৈরি করেছে ‘বিগ থ্রি’ মডেল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই মডেল অনুযায়ী, আইসিসির আয়ের সিংহভাগ নিয়ে নেয় এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড। বাকিদের দিকে কাঁটা কুটো ছুড়ে দেওয়া হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মত জায়গায় একাধিক কারণে ক্রিকেটের নাভিশ্বাস উঠে গেছে গত ১০-১৫ বছরে। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর অবস্থা স্বভাবতই আরও সঙ্গীন। দুর্বল দেশগুলোকে বেশি সাহায্য করাই তো যে কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থার দায়িত্ব হওয়ার কথা। কিন্তু ত্রিদেবের যুক্তি হল— আমাদের এখান থেকে আইসিসির সবচেয়ে বেশি টাকা আয় হয়, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব।

অর্থাৎ পুঁজিবাদের যতরকম মডেল হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে শোষণমূলক মডেলটাতেই চালানো হচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। টাকার নেশায় চুর এই ক্রিকেট প্রশাসকদের মাথায় ঢোকে না যে, পুঁজিবাদের যুক্তি অনুযায়ীই বাজার ক্রমাগত বড় করে যেতে হয়, ছোট করলে ব্যবসার পঞ্চত্বপ্রাপ্তির পথ খুলে দেওয়া হয়। ফলে বিসিসিআই তার দুই স্যাঙাতের সঙ্গেই বারবার খেলছে, বেশি ম্যাচের সিরিজ খেলছে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকাকেও বিশেষ পাত্তা দিচ্ছে না। আফগানিস্তান আর আয়ারল্যান্ডকে তো টেস্ট খেলার অধিকার দেওয়া হয়েছে নামেই। তারা টেস্ট দূরের কথা, বড় দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বা কুড়ি বিশ বা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলারও সুযোগ পায় না। নেদারল্যান্ডস একের পর এক বিশ্বকাপে নজরকাড়া ক্রিকেট খেললেও তাদের খেলা বাড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না আইসিসি। নেপালও আটকে আছে একই জায়গায়, অথচ সেখানে ক্রিকেটের বিপুল জনপ্রিয়তা। এসব হচ্ছে, কারণ আইসিসি ফিফার মত শক্তিমান নিয়ামক সংস্থা নয়, তাকে ঘাড় ধরে চালাচ্ছে বিসিসিআই। তার যাতে আগ্রহ নেই, আইসিসি তা করতে পারবে না।

এই ব্যবস্থায় বিসিসিআই ফুলে ফেঁপে উঠছে, ফলে তার গোদি মিডিয়া (প্রাক্তন ক্রিকেটার সমেত) আপনাকে সারা বছর বোঝাচ্ছে— এটাই ঠিক ব্যবস্থা। যখন সাহেবদের ক্ষমতা ছিল সাহেবরা যা করত, আমরাও তাই করছি। একে তো খ-এর আজকের খারাপ কাজটা ক আগে করত বলেই সেটা ভালো কাজ হয়ে যায় না, তার উপর একথা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে যে সাহেবদের সঙ্গে গলাগলি করেই ব্যাপারটা করছি। এটা মোটেই তাদের বিরুদ্ধে কোনো জাতীয়তাবাদী আন্দোলন নয়। যা-ই হোক, ব্যাপারটা চলছিল ভালোই। কিন্তু এক মাঘে যে শীত যায় না সেটা ভুলে গিয়েই গোলমাল হয়ে গেল। ক্রিকেটের অর্থনীতি যে ভিতর থেকে ফোঁপরা হয়ে গেছে, তা প্রকাশ হয়ে গেল পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে খেলতে অস্বীকার করতেই। দেখা গেল, যে যার নিজের দেশে কুড়ি বিশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করে নিজেদের পকেট যতটা পারছে ভরাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভিতেই উই ধরে গেছে। বাকি ম্যাচগুলোকে অবহেলা করতে করতে আর ভারত-পাক ম্যাচের বেলুনে ফুঁ দিতে দিতে (২০২৩ বিশ্বকাপে কোনো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করা হয়নি। মনে আছে তো? ঝলমলে নাচাগানা হয়েছিল ভারত-পাক ম্যাচের দিন) এত বড় করা হয়েছে যে ওই ম্যাচের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে সকলের আয়। কোনো কোনো হিসাব বলছে, আইসিসি প্রতিযোগিতায় একটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ থেকে ২,২০০ কোটি টাকার বেশি উঠে আসে (প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার)। মানে ভারত-পাক রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুনেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রান্নাবাড়ি চলছে। আচ্ছা তা-ও নাহয় মানা গেল। কিন্তু কথাটা যখন জানাই আছে, তখন ম্যাচটা খেলতে গেলে যে পাকিস্তানকে লাগবে একথা তো বোঝা উচিত ছিল। সেক্ষেত্রে পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার কী প্রয়োজন ছিল?

দেশপ্রেম বনাম ডলার-প্রেম

এই প্রশ্নটা শুনেই অনেকে তেড়ে এসে বলবেন ‘পাকিস্তান আমাদের দেশের এত ক্ষতি করেছে, ওদের সঙ্গে কি গলাগলি করতে হবে?’ আজ্ঞে না, গলাগলি করা একেবারেই অনুচিত। দেশপ্রেমের যুক্তি বলে, পহলগামের সন্ত্রাসবাদী হানার পরে খেলাই উচিত নয় তাদের সঙ্গে। মানে ভারতেরই বরং পাকিস্তান ম্যাচ বয়কট করা উচিত। কী হবে তাতে? দুটো পয়েন্ট কাটা যাবে। আমাদের তো বিশ্বসেরা দল, তারা সে ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে খেতাব জিততে পারবে না? নির্ঘাত পারবে। তাহলে আমরা খেলি কেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে?

শুধু খেলি তা নয়। বিসিসিআই যে আইসিসির ঘাড় ধরে দুনিয়ার ক্রিকেট চালায়, সেটা আমাদের অনেকেরই গর্বের বিষয়। অথচ তা সত্ত্বেও সব আইসিসি প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে আমাদের গ্রুপেই রাখা হয়, যাতে নিদেনপক্ষে একবার ভারত-পাক ম্যাচ হয়। এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল (এসিসি) আয়োজিত এশিয়া কাপে তো ভারত-পাক ম্যাচ হতেই হবে, এড়ানোর উপায় নেই। কিন্তু ২০২৫ এশিয়া কাপে এমন ব্যবস্থা করা হল যে ফাইনালের আগেই দু-দুবার এই দুই দলের খেলা হল, ফাইনালে আরও একবার।

রাজনৈতিক কারণে এক দেশের আরেক দেশের বিরুদ্ধে না খেলা কিন্তু পৃথিবীর কোনো খেলাতেই বিরল ব্যাপার নয়। আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনা নামানোর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক বয়কট করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমেত ৬০ খানার বেশি দেশ। তার বদলা নিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তার বন্ধু দেশগুলো ১৯৮৪ সালের লস এঞ্জেলস অলিম্পিক বয়কট করে। আস্ত অলিম্পিক বয়কট করতে পেরেছে অতগুলো দেশ, আমরা একটা ম্যাচ বয়কট করতে পারি না?

আরো পড়ুন ভারত-পাক ম্যাচ এখন ক্রিকেটের দুর্বিপাক

কেন পারি না? উত্তর একটাই। ওই ২৫০ মিলিয়ন ডলার। ও হিসাবটা তবু পাওয়া যায়, এই খেলা ঘিরে যে উন্মাদনা তাকে ব্যবহার করে সংবাদমাধ্যম, তথাকথিত স্বাধীন সাংবাদিক, সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যে কত টাকা রোজগার করেন তার হিসাব পাওয়াও সম্ভব নয়। ওই ভাগটা কেউই ত্যাগ করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান বয়কটের কথা বলতেই, বিসিসিআইয়ের চেয়েও বেশি উৎসাহে এই ম্যাচ না খেলা কেন পাকিস্তানের অন্যায়, তা আপনার মাথায় ঢোকাতে কদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন আপনার প্রিয় সাংবাদিকরা। এদিকে দেশপ্রেমও দেখাতে হবে। তাই কী বুদ্ধি বের করেছিল বিসিসিআই?

খেলব, কিন্তু খেলার মাঠের দস্তুর অনুযায়ী পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সঙ্গে আমাদের ক্রিকেটাররা হাত মেলাবেন না। উপরন্তু আমাদের অধিনায়ক সাংবাদিক সম্মেলনে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা দেবেন। গোদি মিডিয়া হাততালি দেবে, আপনাকে জানাবে যে পহলগামের মুখের মত জবাব এইটাই। সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। এক বাংলা কাগজে তো লেখা হয়েছিল, ভারত এতদ্বারা পাকিস্তানকে বলল ‘চল ফোট’।

এই নাটুকেপনা পৃথিবীর অন্য কোনো খেলার নিয়ামক সংস্থা করতে দিত না। তার প্রমাণ— এশিয়া কাপে যেদিন (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) সূর্যকুমার যাদবের দল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার খেলেছিল, সেদিনই কাঠমান্ডুতে সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ফুটবলে ভারত বনাম পাকিস্তানের খেলা ছিল। সেই ম্যাচ ভারত ৩-০ জেতে এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে করমর্দন করেই মাঠ ছাড়ে। কিন্তু এশিয়া কাপে ফাইনালের পরে আরও বড় নাটক করে ভারতীয় দল। তারা নাকি কোনো পাকিস্তানির হাত থেকে কাপ নেবে না। অথচ আগে থেকেই জানা ছিল যে, এসিসির প্রধান এখন মহসীন নকভি। ফলে কাপ জিতলে তাঁর হাত থেকেই নিতে হবে। জেদ করে সেই কাপ না নিয়েই ফিরে এসেছিলেন সূর্যকুমাররা।

তখনো ভারতের প্রথিতযশা ক্রিকেট সাংবাদিকরা এবারকার মতই প্রবল জাতীয়তাবাদী হয়ে উঠেছিলেন এবং রেলা নিয়ে লিখেছিলেন, ও কাপ নাকি দিয়ে যেতে বাধ্য হবেন নকভি। পাঁচ মাস হয়ে গেল, আজও সে কাপ এল না। বিসিসিআই এ নিয়ে আইসিসির কাছে, মানে প্রবল পরাক্রমশালী জয় শাহের কাছে, ছুটে গিয়েছিল। তিনিও সুবিধা করতে পারেননি। তাঁর আইসিসি মধ্যস্থতা করার জন্যে একখানা কমিটি গড়ে দিয়েছিল, সেই কমিটি ততটাই সফল হয়েছে যতটা গাজার গণহত্যা থামাতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ সফল। মহসীন বলেছেন, কাপটা রাখাই আছে। একখানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারি, এসে নিয়ে যেতে হবে এসিসি অফিস থেকে। হয়ত বিসিসিআই ভিখারি নয় বলেই হকের কাপ নিতেও ক্রিকেটারদের পাঠাতে রাজি নয়।

এসব অসোয়াস্তি এড়ানো যায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মায়া ছাড়তে পারলে। কিন্তু তা তো হয় না, গোটা ক্রিকেট-দুনিয়ার দায়িত্ব যেখানে আমাদের ঘাড়ে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর কী কী যে করতে হবে? দেখুন আবার, আজ থেকে ফের পাকিস্তানিদের সঙ্গে করমর্দন শুরু করতে হয় কিনা। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে করমর্দনের প্রশ্ন উঠতেই সূর্যকুমার যেভাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্মার্ট সাজার চেষ্টা করেছেন, তাতে সন্দেহ হয়, তাঁকেও বলা হয়েছে ‘জো আপ উচিত সমঝো।’ তাঁকে অবশ্য এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দিতে পারে কলম্বোর বৃষ্টি।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

মতামত জানান

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.