অভিজিৎ মোহান্তি

এখনো জানুয়ারির ভোরে দারিংবাড়ির সবুজ পাহাড়ের উপরে কুয়াশা ভাসে, বাতাসে ভেসে আসে ভিজে শালগাছের গন্ধ। কয়েক দশক হয়ে গেল, ওড়িশার কন্ধমল জেলার এই পাহাড়ি এলাকার ডাকনাম হয়ে গেছে— ওড়িশার কাশ্মীর। কারণ এখানে জব্বর ঠান্ডা পড়ে এবং এখানে এলে বরফ পড়া দেখার বিরল রোমাঞ্চও পাওয়া যায়। এখানকার বয়স্করা হলুদগাছের পাতায় বরফ জমে থাকতে দেখেছেন, রাতে অ্যালুমিনিয়ামের বালতিতে জল রেখে সকালে উঠে দেখেছেন সেটা জমে বরফ হয়ে গেছে। কিন্তু এখন আর তেমন ঠান্ডা পড়ে না। উপরন্তু দারিংবাড়ির বাসিন্দারা বলছেন, বদল শুধু এখানকার আকাশে নয়, মাটিতেও হয়েছে।

ভারতের সবচেয়ে বিপন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর অন্যতম, কুটিয়া কোন্ধ সম্প্রদায়ের প্রভাষিণী প্রধান (৫৪) বললেন ‘শীত আগের চেয়ে ছোট হয়ে গেছে।’ শশীগাড়া গ্রামে তাঁর মাটির বাড়ির বাইরে বসে তিনি বলছিলেন যে একসময় কুয়াশা ফেব্রুয়ারি মাসেও থাকত। গ্রীষ্মের অনেকটা সময় জুড়েও প্রচুর শিশির পড়ত আর ছোট নদীগুলো জলে ভরে থাকত। ‘এখন তো ফেব্রুয়ারির শেষের দিকেই রোদে তেজ এসে যায়। নদীগুলোও তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

প্রভাষিণী বললেন, দুই দশক আগে শীত পড়ে যেত নভেম্বরে আর থাকত মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। মাটি বরফে ঢেকে যেত আর সকালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সে বরফ গলত না। এখন ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকেই ঠান্ডা কমে যায়। আগে এখানে গরমকাল বলতে ছিল মার্চ আর এপ্রিলের মাঝের কিছুটা সময়, এখন গরমকাল শুরু হয়ে যায় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি আর চলে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত।

দিপুমাহা গ্রামের কৃষক রমাকান্ত প্রধান (৬৪) জানালেন ‘গরম ভীষণ বেড়ে গেছে। বাচ্চারা তো টেবিল ফ্যানের সামনে বসে হাওয়া খায়।’

যা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা প্রভাষিণী, রমাকান্তদের অনুভূতিতেই সিলমোহর দিচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত তাপমাত্রার নথি বলছে— দারিংবাড়ির শীতকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বরফ পড়া এবং শৈত্যপ্রবাহ সমেত -১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গেছে। একসময় বরফ পড়া এই এলাকার বৈশিষ্ট্য ছিল, এখন কালেভদ্রে দেখা যায়।

বৃষ্টিপাতের ধারাও বদলে গেছে। বৃষ্টি শুধু কমছে না, এলোমেলোও হয়ে যাচ্ছে। ২০১১ সালে কন্ধমল জেলায় বছরে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১,০১৩ মিলিমিটার। সেটা ২০১৮ সালে হয়ে যায় ১,৮২৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০২৪ সালে আবার কমে হয়ে যায় ১,২০৮ মিলিমিটার, যা জেলার গড় বৃষ্টিপাতের (১,৬২০ মিলিমিটার) থেকে কম। এখন বৃষ্টি আসে আচমকা। যখন দরকার তখন বৃষ্টি হয় না, যখন হয় তখন সব তছনছ করে দেওয়ার মত করে হয়। রমাকান্ত বললেন ‘আগে বর্ষা আসত এপ্রিলের মাঝামাঝি আর জুলাই জুড়ে চলত। এখন মে মাসের শেষে শুরু হয় আর অগাস্টে, ফসল তুলতে যখন হপ্তা তিনেক বাকি, একবার মুষলধারে বৃষ্টি হলেই সব ফসল নষ্ট হয়ে যায়।’

মাটির পরিবর্তন

দারিংবাড়ির বাসিন্দারা বলছেন, এই উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণ বুঝতে হলে মাটিতে যা হচ্ছে তার দিকে তাকাতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কন্ধমলের আদিবাসীরা পাহাড়ের ঢালে নানারকম জিনিস চাষ করতেন। একই খেতে হলুদ, নানারকমের বাজরা, জোয়ার, কড়াইশুঁটি, অড়হর, কন্দ এবং শাকসবজি চাষ করা হত। এই বৈচিত্র্য কিন্তু ঘটনাচক্রে হয়নি। ভেবেচিন্তেই রাখা হয়েছিল। একাধিক ক্যানোপি লেয়ার থাকায় মাটি আর্দ্রতা ধরে রাখত, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমত এবং মাটিতে জৈব কার্বন তৈরি হত। ফলে এখানকার মাটি বেশিক্ষণ জল ধরে রাখত, বেশি ঠান্ডা থাকত এবং পরিবর্তনীয় পরিস্থিতি থেকে ফসলকে সুরক্ষিত রাখত। কোনো একটা শস্যের ফলন ঠিকঠাক না হলেও অন্যগুলো বেঁচে যেত।

এই ব্যবস্থার ধারক ছিল কন্ধমলের হলুদ। গাঢ় সোনালি রং, ঝাঁঝালো গন্ধ এবং কারকিউমিনের উচ্চ মাত্রার জন্যে প্রসিদ্ধ এই হলুদ ২০১৯ সালে জি আই ট্যাগ পায়। এই হলুদ ফলে দশমাসের জীবনচক্রে। এর জন্যে দরকার স্থিতিশীল আর্দ্রতা এবং ঠান্ডা জমি। এই অবস্থা ওই মিশ্র কৃষি ব্যবস্থা তৈরি করে দিত। সেই ব্যবস্থা বদলাতে থাকা আবহাওয়ার চাপে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল অনেকদিন ধরেই, এখন আরও কিছু কারণে সেই বদল বেড়ে চলেছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা আর অনিয়মিত বৃষ্টিপাত হলুদের স্পর্শকাতর জীবনচক্রে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

পরতামাহা গ্রামের আবিলা নায়েক (৬১) বললেন ‘আগে আমরা জানতাম ঠিক কখন বীজ পুঁততে হবে। এখন কিছু দুম করে ভারি বৃষ্টি চলে আসে আর রাইজোমগুলো ধুয়ে চলে যায়। তারপর দীর্ঘদিন বৃষ্টি হয় না।’ যে চাষিরা একসময় একর পিছু পাঁচ কুইন্টাল হলুদ উৎপাদন করতেন, তাঁরা এখন ২-৩ কুইন্টাল উৎপাদন করতে পারছেন। ব্যবসায়ীরা এক কুইন্টালে ১৩,০০০ টাকার বেশি দরে হলুদ কেনেন না। ওতে চাষ করার মজুরিই ওঠে না। ফলে আবিলা বলছেন, হলুদ চাষ এখন আর অর্থকরী নয়। উৎপাদন কমছে আর অনিশ্চয়তা বাড়ছে, ফলে চাষিরা অন্য জিনিস চাষ করছেন। এই বদলের কারণে মাটিও বদলে যাচ্ছে। হলুদ চাষের জায়গা নিয়েছে হাইব্রিড ভুট্টা। ২০২৩ সালে চালু হওয়া ওড়িশা সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মক্কা মিশনে এই চাষকে প্রশ্রয়ও দেওয়া হয়। কেবল ২০২৫-২৬ আর্থিক বর্ষেই দারিংবাড়ির প্রায় ৪০০ একর জমিতে হাইব্রিড ভুট্টার চাষ হয়েছে। শীতলকুপড়া গ্রামের সবিতা প্রধান (৪১) বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চাষ হওয়া হাইব্রিড ভুট্টা দেখিয়ে বললেন ‘এখন তো সবাই এটাই ফলাচ্ছে। এতে দামি কেমিকাল লাগে। তিনমাসের মধ্যে ফসল রেডি হয়ে যায়। কিন্তু তিন থেকে চার বছর পরে জমি শুকনো আর নির্জীব হয়ে যায়।’ শস্য পরিবর্তন স্বল্পমেয়াদি নিশ্চয়তা দেয়, ফসলের দ্রুততর জীবনচক্র আর বেশি প্রত্যাশিত পরিণাম পাওয়া যায় এমন এক জলবায়ুতে যা পরিচিত ছন্দে আর চলছে না।

সাবেকি মিশ্র কৃষি ব্যবস্থায় যে লেয়ার্ড ক্যানোপি থাকত, তার বদলে হাইব্রিড ভুট্টার খেতে খুব সামান্য ছায়া বা আবরণ থাকে। তিনমাস পরের ফসল উঠে গেলে অনেকখানি জমি একেবারে খালি পড়ে থাকে। চার দশকের বেশি সময় ধরে কন্ধমলের আদিবাসীদের সঙ্গে কাজ করা এনজিও জাগৃতির এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি কৈলাশ চন্দ্র দণ্ডপাট বললেন ‘প্রায় ৭৫% প্রথাগত ভুট্টার জায়গাতেই হাইব্রিড ভুট্টার চাষ হচ্ছে। মিশ্র কৃষি মাটিতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং জৈব কার্বন উৎপাদনে সাহায্য করত। এখন একটাই ফসল চাষ করার ফলে মাটি খালি পড়ে থাকে। মাটির কার্বন কমে যাচ্ছে এবং ভূপৃষ্ঠ আগের চেয়ে তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যাচ্ছে।’

এই বদল খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে। খোলা মাটি যেভাবে জল শোষণ করে এবং তাপ বিকিরণ করে তা মিক্সড ক্যানোপির থেকে আলাদা। খোলা মাটি বেশি তাড়াতাড়ি শুকোয়, বেশি তাড়াতাড়ি গরম হয় আর আর্দ্রতা ধরে রাখে কম। ইতিমধ্যেই ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে এমন অঞ্চলে মাটি ঢেকে রাখার মত শস্য না থাকলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার গতি বৃদ্ধি পায়। ফলে জলবায়ুগত সেইসব চাপও বৃদ্ধি পায়, যেগুলোর কারণে চাষিরা অন্য জিনিস চাষ করা শুরু করেছিলেন।

কমে আসা জঙ্গল

কৃষিকাজের বাইরেও একই জিনিস দেখা যাচ্ছে। কন্ধমলে পাহাড়ের ঢালে শাল, পাইন, বাঁশ, মহুয়া, কেন্দুপাতা আর বিভিন্ন ওষধিজাতীয় গাছ আছে। ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট ২০২১ অনুযায়ী, এই জেলায় প্রায় ৫,৪০৩ বর্গ কিলোমিটার অরণ্য আছে। এটা ওই ভৌগোলিক এলাকার ৬৭.৪%। ওড়িশার সমস্ত জেলার মধ্যে শতাংশের হিসাবে অরণ্য অঞ্চল এখানেই সবচেয়ে বেশি। এই হিসাব অবশ্য অরণ্য অঞ্চল হ্রাসেরও প্রমাণ। ২০২২ সালের এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছিল যে ২০০১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে কন্ধমলে ৪৫৯.৯৪ বর্গ কিলোমিটার অরণ্য অঞ্চল কমে গেছে, যা ওই পর্বে ওড়িশায় সর্বোচ্চ। গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের তথ্য বলছে, শুধু ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যেই এই জেলার প্রাকৃতিক অরণ্য কমে গেছে প্রায় ৩,৯০০ হেক্টর। এর একটা নথিভুক্ত কারণ হল বনজ সম্পদের বাণিজ্যিক আহরণ।

আরো পড়ুন কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছেন না, অথচ বাজার আগুন কেন?

জাগৃতির অরণ্য অধিকার আইনের টেকনিকাল বিশেষজ্ঞ ধনেশ্বর সাউ বললেন ‘অন্য রাজ্যের ব্যবসায়ীরা প্রায়শই বেশি পরিমাণে বনজ সম্পদ সংগ্রহ করার জন্যে মজুর নিয়োগ করে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক আমলকি গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল ভমরবাড়ি, মুন্ডানাজু, দানাইবাড়ি ও সোনারপুরের মত গ্রাম জুড়ে। যেসব ব্যবসায়ী কম পরিশ্রমে বেশি সম্পদ সংগ্রহ করতে চায়, তারা বেছে বেছে জিনিস নেওয়ার বদলে আস্ত আস্ত গাছ কেটে ফেলে।’ দারিংবাড়ির মত পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে এ কাজ করলে মাটির জল ধরে রাখার ক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতার উপর প্রভাব পড়ে। ফলে বিপর্যয় ঘটছে। কন্ধমলে ধস একসময় কার্যত অজানা জিনিস ছিল, কিন্তু ইদানীং শুরু হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলিঙ্গ ঘাটে অবিরাম বৃষ্টিতে বিরাট ভূমিধস হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে কুম্ভারিপদর গ্রামের প্রায় ৪০০ বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাল ধসে যাওয়ার ভয়ে।

পরতামাহা পঞ্চায়েতের প্রাক্তন সরপঞ্চ জ্যোতিরাজ প্রধান (৬২), বললেন ‘আমি আজীবন এখানে আছি। কখনো এভাবে পাহাড়ে ধস নামতে দেখিনি।’

সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অফ ওড়িশার অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর দেবব্রত পাণ্ডা বললেন ‘জলবায়ুর এই চরম পরিবর্তনগুলো ঘটে ব্যাপক বৃষ্টিপাত এবং ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ফলে, জঙ্গল কাটা এবং জমির অসংযত ব্যবহার প্রায়শই এটা বাড়িয়ে তোলে।’ এখানেও অবশ্য ছকটা সোজাসাপটা নয়। প্রবল বৃষ্টির ঘটনা ক্রমশ বেশি বেশি করে অনিয়মিত হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং সেইসব জায়গার ভূমিরূপকে আঘাত করছে যেগুলোর জল শোষণ করা এবং জল ধরে রাখার ক্ষমতা কম। অরণ্য অঞ্চল হারানো শিকড়ের বাঁধন আলগা করছে এবং মৃত্তিকার স্থিতিশীলতার ক্ষতি করছে। ফলে প্রবল বৃষ্টি এলেই ঢাল বেয়ে ধস নামছে।

বনবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর জন্যে কাজ করা সংগঠন বসুন্ধরার প্রোগ্রাম অফিসার সুশান্ত কুমার দলাই বললেন ‘দারিংবাড়ির জলবায়ুগত চাপকে আলাদাভাবে দেখলে চলবে না। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এর একটা অংশ। কিন্তু মাটির ব্যবহারের স্থানীয় পরিবর্তন, একই জিনিসের চাষ এবং জঙ্গল হারানো তার সঙ্গে মিলে আছে। এই ব্যাপারগুলো একে অন্যকে বাড়িয়ে তুলছে।’

এটা আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে ২০০৬ বন অধিকার আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে। এই আইনে জঙ্গলের জমি ও অন্যান্য জিনিসের উপর অরণ্যবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর অধিকার স্বীকৃত। কন্ধমলে কয়েক হাজার ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে অরণ্যের অধিকার বিলি করার পরেও খামতি রয়ে গেছে। অনেক জনগোষ্ঠীর পাওয়া অধিকারের নথিতে পরিষ্কার সীমানা নির্দেশ নেই এবং একটা বড় অংশের জমি এখনো বন দফতরের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। ফলে যেসব জনগোষ্ঠী এই জঙ্গলগুলোর উপর নির্ভরশীল, তাদের বনজ সম্পদ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করার, ক্ষয় রোধ করার বা বদলাতে থাকা বাস্তুতন্ত্রের চাপ সামলানোর ক্ষমতা সীমিত।

জীবিকা নির্বাহের সমস্যা

এই ক্রমশ বাড়তে থাকা বদলগুলোয় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত আদিবাসী মহিলারা, বিশেষ করে কুটিয়া কোন্ধ সম্প্রদায়ের মহিলারা। কন্ধমলের মহিলারা পুষ্টি আর অতিরিক্ত আয়, দুটোর জন্যেই ভীষণভাবে নির্ভর করেন সেগুন বাদে অন্যান্য বনজ সম্পদের উপর। উদ্বৃত্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে বছরে তাঁরা ১৫,০০০-১৮,০০০ টাকা আয় করেন বলে হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গল যত কমছে আর বৃষ্টিপাতের ধারা যত বদলাচ্ছে, এই নিরাপত্তা বলয় তত দুর্বল হচ্ছে।

জঙ্গলের ভিতরের ছোট নদী বা জলা জায়গাগুলোর পাশে চিটি শাক বলে এক ধরনের বুনো পাতা গজায় যা আগে গ্রামের কাছেই পাওয়া যেত। বাসন্তী দিগল (৪৫) জানালেন ‘এখন ছোট নদীগুলো ফেব্রুয়ারিতেই শুকিয়ে যায়। আমাদের চিটি শাক তুলতে ২-৩ কিলোমিটার হাঁটতে হয়। গরম অনেক বেশি হয়ে গেছে। বিকেলের দিকে মাথা ঘোরায়।’

ব্যাঙের ছাতা, পত্র কুটকা, মেড়া কুটকা, দাদো কুটকা একসময় প্রথম বৃষ্টির পরে প্রচুর পরিমাণে ফলত। সেসব গাছের মরা পাতা জঙ্গলের মাটিতে পড়ে জমিটা নরম ও আর্দ্র রাখত। পদমি গ্রামের দীপিয়া প্রধান (৫২) বললেন ‘এখন পাতা মরার আগেই দাবানল লেগে পুড়ে যায়। অনিয়মিত বৃষ্টির জন্যে গাছে ফলও কম ফলছে।’

পরিযান সমস্যা আরও বাড়িয়ে তুলছে। জাগৃতির এক সমীক্ষার হিসাব অনুযায়ী, দারিংবাড়ির প্রত্যেক গ্রামের প্রায় ২১% মানুষ মরশুমে মরশুমে অন্য রাজ্যে চলে যান। যেহেতু পুরুষরা নভেম্বরে ফসল ওঠার পরে চলে যান, মহিলাদেরই খামার, গবাদি পশু আর ঘরকন্না সামলাতে হয়। ব্রহসেলকা গ্রামের কবিতা প্রধান (৪২) বললেন ‘আমার স্বামীর অনুপস্থিতিতে আমি আমাদের খেত, ছেলেমেয়ে, পোষা গরু ছাগল, সবই সামলাই। বৃষ্টি এসে গেলে আমার খেতের পরিশ্রম অনেকসময় মাঠে মারা যায়।’

ভারসাম্যহীনতা

দারিংবাড়িতে রাত নামলে ঠান্ডা পড়ে এখনো। আজও ডিসেম্বর মাসে এই ব্লকের মানুষের ঘুম ভাঙে কুয়াশার মধ্যে। প্রভাষিণী এখনো শীতের রাতে শাল কাঠ ধরিয়ে ঘর গরম রাখেন, যদিও আগে যতক্ষণ রাখতেন ততক্ষণ নয়। কিন্তু এই কুয়াশার তলায় মাটি বদলে গেছে।

পরতামাহা পঞ্চায়েতের উপরের ঢালের দিকে তাকিয়ে জ্যোতিরাজ প্রধান বললেন ‘বৃষ্টি আগে আস্তে আস্তে আসত। এখন একবারে মুষলধারে নামে। আমরা পুরোপুরি বৃষ্টির জলে চাষে নির্ভর করি। আকাশের অবস্থা বুঝতে একবার ভুল হলে, বীজ পোঁতা বা ফসল তোলার সিদ্ধান্তের সময় গণ্ডগোল করে ফেললেই গোটা মরশুমটা জলে যায়।’

প্রতিবেদক একজন ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং 101reporters.comএর সদস্য। এই প্রতিবেদন ওই ওয়েবসাইট ও নাগরিক ডট নেটের সহযোগিতার ভিত্তিতে মূল প্রতিবেদন থেকে ভাষান্তরিত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.