এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত আমার এলাকায় বিজেপি প্রার্থীর কোনো প্রচার চোখে পড়েনি। অথচ সিপিএম প্রার্থী অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রায় বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কোনো কোনো ফ্ল্যাটেও উঠে পড়ছেন। রাস্তায় বেরোলেই কোথাও না কোথাও তাঁর অথবা সিপিএমের অন্য কর্মীদের মিছিল, মিটিং চোখে পড়ছে। তৃণমূল প্রার্থীকেও হাত জোড় করে হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। দেয়াল লিখনেও সিপিএম আর তৃণমূলের উপস্থিতিই চোখে পড়ছে, বিজেপি নেই। বিজেপি যে আছে তার প্রমাণ হিসাবে কোনো কোনো পাড়ায় তিনকোণা গেরুয়া পতাকা শোভা পাচ্ছে, তবে সেগুলো লাগানো হয়েছিল রামনবমী উপলক্ষে। হনুমানপুজোর দিনও এলাকায় গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া, হিন্দিভাষীপ্রধান ফ্ল্যাটগুলোর সামনে রাম, সীতা, হনুমানের কাট আউটের পাশে ওই পতাকাগুলো দেখা গেছে। কোনো কোনো বাইকচালককে ওই গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচার বলতে যা বোঝায় তাতে বিজেপির বিশেষ উৎসাহ আছে বলে মনে হচ্ছে না। একাধিক কেন্দ্রের অধিবাসী পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে একইরকম তথ্য পাচ্ছি। এদিক ওদিক দু-একজন প্রার্থীর মাছ হাতে প্রচার করা বা প্রাক্তন এনএসজি কমান্ডোর সেই পোশাক পরে প্রচারে বেরিয়ে পড়ার মত ঘটনা বাদ দিলে, সংবাদমাধ্যম বা সোশাল মিডিয়াতেও কেন্দ্রের শাসক দলের প্রচারের প্রাবল্য নেই।

প্রশ্ন হল, এমন কেন হচ্ছে? বিজেপি কেবল ভারতের নয়, তাদের কথা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী বন্ডের কল্যাণে এবং আরও নানা কারণে তাদের টাকাপয়সারও অভাব নেই যে খরচের কথা ভেবে প্রচারে রাশ টানতে হবে। তাহলে এই কার্পণ্য কেন? দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা নির্বাচন দেখে আসছেন, তাঁদের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হল— বিজেপির সংগঠন নেই। অতএব সিদ্ধান্ত হল— ভোট পাবে না। দুঃখের বিষয়, এই ব্যাখ্যা প্রাক-২০১৯ নির্বাচনগুলোর জন্যে নির্ভুল। কিন্তু সেবার থেকে দেখা গেছে— এ রাজ্যে বিজেপির সংগঠন নেই, ভোট আছে। বামপন্থীদের আবার নয় নয় করেও খানিকটা সংগঠন আছে, কিন্তু ভোট নেই। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচন, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন— প্রত্যেকবার ফল বেরোবার পর এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করা গেছে। এর কারণ বামের ভোট রামে চলে যাওয়া, নাকি তৃণমূল-বিজেপি সেটিং—সে আলোচনা এবারকার মত মুলতুবি থাক। কারণ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবারের নির্বাচন অভূতপূর্ব। অথচ কথাটা বামপন্থীরা এবং তৃণমূল যেন বুঝেও বুঝতে চাইছে না। ফলে তাদের প্রচারকে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া আর কিছু ভাবা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে লোক সঙ্গে নিয়ে, পার্টির পতাকায় এলাকা ছয়লাপ করে, ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের ভোল পালটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বা গত ১৫ বছরের উন্নয়নের পাঁচালী শোনানোর যে কোনো মানে হচ্ছে না, সেকথা সাধারণ ভোটারদের কথাবার্তায় কান পাতলে দিব্যি টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যেন কানে গুঁজেছে তুলো আর পিঠে বেঁধেছে কুলো।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কেন বলছি এমন কথা?

১) ৬ এপ্রিল রাতে নির্বাচন কমিশন দয়া করে বিচারাধীন থাকা ভোটারদের মধ্যে কাদের ভাগ্যে ভোটদানের শিকে ছিঁড়ল আর কাদের ছিঁড়ল না— তার সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করেছে। রাজ্যসুদ্ধ লাখ লাখ লোক উৎকণ্ঠায় জীবন কাটাচ্ছিলেন, সেই উৎকণ্ঠা সহ্য করতে না পেরে রিষড়ার মিনতি সেন আত্মহত্যা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সোশাল মিডিয়া খুললে আরও বহু মানুষের কথা জানা যাচ্ছে, যাঁরা গত কয়েক দিনে এই দুর্ভাবনায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শেষমেশ জানা গেছে, ৬০ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ বাদ।

২) আগেই বাদ পড়েছিলেন ৫৮ লাখ, এবার আরও ২৭ লাখ। আগের ৫৮ লাখের মধ্যে অবশ্য কিছু মৃত ভোটার ছিল, তবে ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা থেকেই জীবিতকে মৃত বানিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ছিল। অনেক প্রগতিশীলও যা কীসব রাজনৈতিক অঙ্ক কষে মানতে চাইছিলেন না, তাও প্রমাণ হয়ে গেছে শেষ তালিকা বেরোবার পরে— মুসলমানদের বাদ পড়ার হার তাঁদের ভোটার তালিকায় উপস্থিতির হারের চেয়ে বেশি। অল্ট নিউজ এই তথ্য টেনে বের করেছিল কলকাতার দুটো বিধানসভা কেন্দ্রের বিশেষ নিবিড় সংশোধনী পরবর্তী ভোটার তালিকা থেকে, সবর ইনস্টিটিউট এই তথ্য বের করেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দুই কেন্দ্রের অন্যতম, নন্দীগ্রামের, তালিকা বিশ্লেষণ করে। উপরে দেওয়া নির্বাচন কমিশনের নিজের তালিকাতেও দেখা যাচ্ছে— মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগণা, মালদার মত যে জেলাগুলোতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি, সেখানেই বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহিলা, নিম্নবর্গীয় হিন্দু, আদিবাসীদের উপস্থিতি প্রধান। অর্থাৎ যাঁদের বিজেপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য থেকে শুরু, তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থারই ভালো নাম এসআইআর। বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্যে এত প্রাণ কাঁদে বিজেপি নেতাদের, অথচ সেখান থেকে তাড়া খেয়ে চলে আসা মতুয়াদের উপরেও কোপ পড়েছে। আমরা ছাপ্পা ভোট দেখেছি, বুথ দখল দেখেছি, ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ শুনেছি, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কারচুপির অভিযোগও শুনতে পাই। গণনার সময়ে ব্যালট খেয়ে নেওয়া, ধানখেতে বা নালায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও নতুন নয়। কিন্তু সেসবই ভোটদানের দিন বা ভোটদানের পরের ব্যাপার। ভোটগ্রহণের আগেই নির্বাচন জিতে নেওয়ার এমন ভবিষ্যনিধি প্রকল্প আমরা দেখিনি।

৩) ধরা যাক, আপনি নিরীহ লোক। আপনাকে মেরে ধরে এলাকার গুন্ডারা সর্বস্ব কেড়ে নিল। আপনি পুলিশের কাছে গেলেন, বাকি যা দু-চার পয়সা ছিল সেগুলোও তারা কেড়ে নিল, আপনি পথে বসলেন। এমতাবস্থায় আমাদের দেশের মানুষ কোনো একটা উপায় বের করতে পারলে যায় আদালতের কাছে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তা আমাদের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের এমন দয়ার শরীর যে তাঁরা বলেছেন যাদের নাম জজসাহেবদের বিচারেও বাদ গেছে, তাঁরাও ফের আবেদন করতে পারবেন। তবে তাঁদের আবেদনের নিষ্পত্তি হোক আর না-ই হোক, ভোট ভোটের সময়েই হতে হবে। যাঁরা এবার ভোট দিতে পারছেন না, তাঁরা নাহয় পরেরবার দেবেন। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে ভোট হয় ভোটারের স্বার্থে। এখন ধর্মাবতাররা যা সিদ্ধান্ত নিলেন তাতে বোঝা গেল, পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে ভোটের স্বার্থে। ভোটার হলেন ফাউ। ভোটার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন না, নির্বাচন কমিশন ভোটার নির্বাচন করবে। তারা না পারলে বিচারপতিরা করবেন। যেভাবে পারবেন সেভাবে করবেন, যখন ইচ্ছে হবে তখন করবেন। ভোটার অধিকার হারালে প্রতিবাদ করতেও পারবেন না। করলে পাইক, বরকন্দাজ ডাকা হবে, হাজতবাস হবে, ভোটার সন্ত্রাসবাদী কিনা তাও খতিয়ে দেখা হবে। ডিগ্রিধারী উচ্চবর্গীয় সাংবাদিকরা স্টুডিওতে বসে বিচারকদের জন্যে চোখের জল ফেলবেন আর প্রতিবাদী ভোটারদের ভীষণ বকে দেবেন।

৪) সন্ত্রাসবাদের কবলে থাকা কাশ্মীর বা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে দীর্ণ আট-নয়ের দশকের পাঞ্জাব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো ছাড়া কোথাও কখনো নির্বাচনে এত বাইরে থেকে আনা সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহৃত হয়েছে কিনা সন্দেহ। অনেকদিন যাবৎ একটা কথা চালু হয়েছে— ভোট নাকি গণতন্ত্রের উৎসব। এবারে দেখে মনে হচ্ছে যুদ্ধ। সে যুদ্ধে আসার জন্যে রওনা দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা আবার অযোধ্যার রামমন্দিরে মাথা ঠুকে আসছেন। মানে যুদ্ধকে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের চোখে একেবারে ধর্মযুদ্ধে পরিণত করার চেষ্টা। কীরকম নিরপেক্ষ ভোটদান নিশ্চিত করতে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

৫) মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যই যে এসআইআর, সেটা অবশ্য বাঙালি বুদ্ধিমানরা বিহারের এসআইআরের দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই টের পেতেন। কিন্তু পাননি। যা-ই হোক, বিহারে ও জিনিস আগে করা হয়েছে বলেই বাংলায় যা হল তাকে অভূতপূর্ব বলা চলে না। তবে ভাববেন না, এসআইআরেই কমিশনের গাফিলতি শেষ হয়। আমরা যেমন বিহারের খবর রাখি না, তেমন ওড়িশার খবরও রাখি না। ফলে আমরা অনেকেই জানি না, সেখানে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগণনায় কী কাণ্ড হয়েছে। ফ্রন্টলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বহু বুথে যত ভোট পড়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ১৭সি-তে) আর যত ভোট গোনা হয়েছে (যার হিসাব থাকে ফর্ম ২০-তে) তা মেলেনি। বিজু জনতা দল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাদের প্রেস নোটে জানায়— ১৪৭ খানা বিধানসভা কেন্দ্রের ৫৮ খানা বুথে পড়া ভোট আর গোনা ভোটের তফাত এক থেকে ৯০৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। দুটো চোখ কপালে তোলা উদাহরণ দিয়ে চক্করটি বোঝানো যাক। ফুলবনী কেন্দ্রের ৫৭ নম্বর বুথে ভোট পড়েছে ৬৮২, কিন্তু ফর্ম নং ২০ বলছে একটা ভোটও গোনা হয়নি। তালসারার ১৬৫ ও ২১৯ নম্বর বুথে মোট ১,৪৪৪ জন ভোট দিয়েছেন বলছে ফর্ম নং ১৭সি। অথচ ফর্ম নং ২০ বলছে ও দুটোরও কোনো ভোট গোনা হয়নি। উলটো উদাহরণও আছে। পদমপুরের ১৪ খানা বুথ মিলিয়ে নাকি ভোট পড়েছে ৮২, গোনা হয়েছে ৯,৩০৪। এসব নিয়ে বিজু জনতা দল দুবার নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানিয়েছে, তথ্যের অধিকার আইনেও আবেদন জানিয়েছে। কেউ পাত্তা দেয়নি।

৬) কলকবজা কী আছে না আছে না জেনেও যেমন আমরা ট্রেনে বাসে চড়ি, সেভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কী আছে বা অমুক নম্বর ফর্ম আর তমুক নম্বর ফর্ম দিয়ে কী হয় না জেনেও সেই ১৯৫২ সাল থেকে ভারতের মানুষ ভোট দিয়ে আসছিল। এবারে জ্ঞানেশ কুমারের দৌরাত্ম্যে আমরা কিছু কিছু কল বা গ্যাঁড়াকল সম্পর্কে জানতে বাধ্য হয়েছি। সেরকম দুটো গ্যাঁড়াকল হল ফর্ম নং ৬ আর ৭। এমনিতে ফর্ম নং ৬ খুবই নিরীহ জিনিস। ওটা দিয়ে ভোটার হওয়ার আবেদন করতে হয়। কিন্তু বিহারের অভিজ্ঞতা থেকে এবং পশ্চিমবঙ্গেও গত কয়েকদিনের অভিজ্ঞতায় আমরা জেনে গেছি যে, ওটা ব্যবহার করে ভিনরাজ্যের লোককে রাতারাতি ভোটার তালিকায় ঢোকানোর কাজ করা হয় বলে প্রচুর অভিযোগ আছে। সে কাজ করতে গিয়ে কিছু লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, কিন্তু সব যে ধরা সম্ভব হবে না তা বলাই বাহুল্য। ফর্ম নং ৭-এর ব্যবহার আরও চমৎকার। ও দিয়ে কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়— অমুক বৈধ ভোটার নয়, ওকে বাদ দিন। সেটাকে ব্যবহার করে মুসলমানদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে— একথা কিছুদিন আগে সগর্বে জানিয়েছিলেন আসামের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এসব সম্ভব হয় না নির্বাচন কমিশন ওই ফর্মগুলোর আবেদনকারীদের ব্যাপারে নিয়মমাফিক যাচাই করলে। কিন্তু তা কি করা হয়? হলে আসামের বিএলও সুমনা চৌধুরী, ফর্ম নং ৭-এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার ক্যামেরার সামনে ফাঁস করে দেওয়ার জন্যে, চাকরি থেকে সাসপেন্ড হলেন কেন? পশ্চিমবঙ্গেও গুচ্ছ গুচ্ছ ফর্ম নং ৭ নিয়ে ধরা পড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির কর্মীদের বিরুদ্ধে।

৭) নির্বাচন কমিশনের এতরকম কীর্তিকলাপ দেখে ভারতের প্রায় সব বিরোধী দল তার উপর আস্থা হারিয়েছে। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশকে অপসারণের প্রস্তাব এনেছিলেন বিভিন্ন দলের ১৯৩ জন সাংসদ। লোকসভার স্পিকার এবং রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সেই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাই হতে দেননি। কোনো কারণও দেখাননি।

এই সাত কাণ্ড রামায়ণ জানার পরে, বিজেপি যে অমিত শাহ আর নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছাড়া প্রচারে বিশেষ মন দিচ্ছে না, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে কি? অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপিবিরোধী দলগুলো যে প্রাণপণ প্রচার করে চলেছে, তাকে শিশুদের আপন মনে রান্নাবাটি খেলা ছাড়া অন্য কিছু বলা চলে কি? ভোটারদের অধিকারের কথা নির্বাচন কমিশন ভাবেনি, সুপ্রিম কোর্ট ভাবেনি— একথা ঠিক। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস বা বামপন্থীরা যে ভাবছেন, তারই বা প্রমাণ কোথায়? কোনো পক্ষই প্রথম থেকে একবারও বলেনি যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানে হল, জনগণের বেছে নেওয়া তন্ত্র। এ তো তন্ত্র জনগণ বেছে নিচ্ছে। এ অধিকার রাষ্ট্রের নেই, অতএব এই প্রক্রিয়া বাতিল করতে হবে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের দলগুলো বলেনি তা নয়, যে ১২ খানা রাজ্যে এসআইআর হল, কোথাও কোনো দলই বলেনি। সবাই মেনে নিল যে এটা সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। অথচ সংবিধানে এমন কোনো প্রক্রিয়ার কথা আছে— একথা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টও বলে উঠতে পারল না। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও আছে নিবিড় সংশোধনের কথা, যা ভারতে এর আগেও বহুবার হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে শেষ হয়েছিল ২০০২ সালে। তার জন্যে ভোটারকে ফর্ম পূরণ করতে হয় না, নিজের নাগরিক হওয়ার প্রমাণ দিতে হয় না, বাপ-মা নাগরিক ছিলেন কিনা তাও দেখাতে হয় না। নির্বাচন কমিশনই নিজের উদ্যোগে নিজের ভুল সংশোধন করে। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বলে যে আদৌ কিছু নেই, তা নাগরিক ডট নেটের পডকাস্টে এসে পরিষ্কার বলে গিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের প্রাক্তন সিইও জহর সরকার।

বিহারে এই প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল মতলবখানা কী। অথচ রাষ্ট্রীয় জনতা দল, কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা সেই প্রক্রিয়া মেনে নিয়েই নির্বাচনে লড়লেন। বোধহয় ভেবেছিলেন এত মানুষ নীতীশ কুমারের সরকারের উপর খাপ্পা যে যত ভোটারই বাদ যাক, ঠিক জিতে যাবেন। তা যখন হল না এবং অপ্রত্যাশিত বড় ব্যবধানে হার হল, তখন বিস্তর গণ্ডগোল আছে বলে অভিযোগ জানিয়েও দু-একবার মৃদু প্রতিবাদ করে বাধ্য ছেলেমেয়েদের মত তাঁরা বিধানসভায় গিয়ে বসে পড়লেন। কোথাও কোনো আন্দোলন, অবরোধ কিছু দেখা গেল না। যে রাহুল গান্ধী ভোট চুরি ধরে ফেলেছেন বলে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্র নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এ বোমা সে বোমা ফাটানো সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, তিনিও চুপসে গেলেন। সেই যে চুপ করেছেন, পশ্চিমবঙ্গে কোটিখানেক মানুষের ভোটাধিকার হরণ নিয়ে আজ পর্যন্ত এক লাইন সোশাল মিডিয়া পোস্টও করে উঠতে পারেননি। তাহলে তো ধরে নিতে হবে, কর্ণাটক আর মহারাষ্ট্রের ভোট চুরি নিয়ে তাঁর ভাবনা আছে, কারণ সেখানে তাঁর দল জেতার অবস্থায় থাকে। পশ্চিমবঙ্গে খুব ভালো ফল করলেও যেহেতু কংগ্রেস গোটা পাঁচেকের বেশি আসন জিতবে না, সেহেতু এ রাজ্যের লোক বাঁচুক, মরুক বা ডিটেনশন ক্যাম্পে যাক, তাঁর কিছু এসে যায় না। মহব্বতের দোকান দেখা যাচ্ছে খুবই ছোট।

আরো পড়ুন মমতা যা করেছেন তাতে তিনি জিতলেও হিন্দুত্ববাদ হারবে না পশ্চিমবঙ্গে

তৃণমূল কংগ্রেস যে মতলবটা প্রথমে ধরতে পারেনি তা পরিষ্কার। ভেবেছিল তাদের সাংগঠনিক জোর দিয়ে ভোটার বাদ দেওয়া সামলে নেবে। তাই মোড়ে মোড়ে ভোটার সহায়তা কেন্দ্র খুলে বসে এসআইআরে সাহায্য করেছে। সিপিএমের পলিটবুরো যতই প্রথম থেকে এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করুক, বঙ্গীয় নেতা ও কর্মীরা ভেবেছিলেন এতে তৃণমূলের ভুয়ো ভোটার বাদ যাবে। তাই তাঁরাও মহা উৎসাহে এই কর্মযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলেছিলেন, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ঢুকে পড়ার পর থেকে ঢোঁক গিলে প্রতিবাদ করছেন। এখনো ভাঙবেন তবু মচকাবেন না, বলে যাচ্ছেন ওই জিনিসটা না থাকলেই ভালো এসআইআর হত। অথচ বিহারে ওটা না থেকেও প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজটা হয়েছিল।

যা-ই হোক, ভুল মানুষমাত্রেই করে, ফলে মানুষের তৈরি রাজনৈতিক দলও করতেই পারে। কিন্তু ভুল বুঝতে পারার পর, ‘বাদ পড়ে যাওয়া ভোটারদের তালিকায় না ঢোকানো পর্যন্ত ভোট করা চলবে না এবং করলে সে ভোটে অংশগ্রহণ করব না’, একথা তৃণমূল, বামেরা বা কংগ্রেস বলতে পারছে না কেন? সাধারণ বুদ্ধিতে এর উত্তর হল— মমতা ভাবছেন, এসব সত্ত্বেও কোনো মতে জিতে গেলে ক্ষমতায় টিকে যাব। আর বাম, কংগ্রেস শূন্যের গেরো কাটিয়ে গোটা কয়েক বিধায়ক বাগানোর সুযোগ ছাড়তে চায় না। কিন্তু কথা হল, অক্টোপাসের মত যে ফাঁদ পাতা হয়েছে, তাতে ওই আশায় থেকে আর পাঁচটা ভোটের মত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার কি কোনো মানে আছে? জিতলেও তো গণতন্ত্রের শবদেহের উপর নৃত্য করেই জেতা হবে।

ছোটবেলায় রান্নাবাটি খেলার সময়ে আমরা ধুলোকেই ভাত হিসাবে প্লেটে নিতাম বটে, তবে মুখ পর্যন্ত তুলে নামিয়ে রাখতাম। খেতাম না কিন্তু।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.